জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রূপকল্প দক্ষ ও কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তোলা। কিন্তু দক্ষ ও কার্যকর জনপ্রশাসন সেভাবে এখনো গড়ে ওঠেনি দেশে। তবে এ খাতে প্রতি বছরই বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাবদ সরকারের ব্যয় বেড়েছে। এ খাতে সরকার ব্যয় কোনোভাবেই কমাতে পারছে না। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুরো জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়। সরকারি কর্মকর্তারা নানা সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতির দাবিতে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ওপর নজিরবিহীনভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবি অপরিবর্তিত থাকে। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে কর্মচারীদের মহার্ঘ্য ভাতা দেয়ার আলোচনা শুরু হলেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বিগত সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ১৭ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত আছেন। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি একসঙ্গে ৭৬৪ জনের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এসব কর্মকর্তার বেতন-ভাতাসহ পেনশনের পাওনা টাকা পরিশোধে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে সরকারের ব্যয় আরো বাড়তে পারে।
কাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশের জনপ্রশাসন অনেকটা ‘পিরামিডে’র মতো হওয়ার কথা। ‘অর্থাৎ প্রশাসনের মাথার দিকে জনবল কম থাকবে এবং নিচের দিকে বেশি থাকবে, যা দেখতে অনেকটা মিসরের পিরামিডের মতো।’ অথচ এখন সেটির উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। নিচের দিকে কর্মকর্তার সংখ্যা কম এবং ওপরের দিকে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি। ফলে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে মাথাভারী প্রশাসনের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গত দেড় দশকের শাসনামলে জনপ্রশাসনে অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে প্রায় দেড় গুণ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব করা হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা দুই গুণ ছাড়িয়ে গেছে। অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের বেতন-ভাড়া বাবদ একদিকে প্রশাসনিক ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি দেয়ায় বাকি কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আগের অনেক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা আনতে এবং ব্যয় কমাতে জনপ্রশাসন খাতের নীতিতে পরিবর্তন এনে ঢেলে সাজানো দরকার।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রশাসনিক উত্তরাধিকারের উৎস এক। সেটি ব্রিটিশ প্রবর্তিত শাসন ও বিচার ব্যবস্থা। স্বাধীনতার পর ভারত প্রশাসনিক গঠন কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন না এনেও ভারতবাসীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়ার দর্শনে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছে। একটি মেধাবী, দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ প্রশাসন ব্যবস্থা তারা সফলভাবে তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এক থাকলেও সেবার মানে পিছিয়ে দেশের জনপ্রশাসন। প্রশাসনকে দক্ষ ও গতিশীল করতে এর কাঠামোগত পরিবর্তন আনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যোগ্য ও সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে পদায়ন প্রয়োজন। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে সিভিল সার্ভিস কমিশন গঠনের কথা বলা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে এবং মেধার প্রাধান্য দেয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বিভিন্ন সুপারিশও করেছে। তবে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে তাদের পদোন্নতি দেয়া প্রয়োজন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনার আগ্রহ তৈরি হবে। হতাশার বিষয় হলো স্বাধীন বাংলাদেশে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করা হলেও জনপ্রশাসনের কাছ থেকে যে প্রত্যাশা, তা পূরণ হয়নি। এর মূল কারণ প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত নানামুখী উদ্যোগ যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া।
এ কথা অনস্বীকার্য, উন্নয়নের জন্য একটি দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন অপরিহার্য। সংস্কারের মাধ্যমে তেমন একটি জনপ্রশাসন গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিকল্প নেই। দুঃখজনক বিষয় হলো, দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের অবস্থান পাকিস্তান, এমনকি নেপালেরও নিচে। এখানকার নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরনো। পদোন্নতি মেধাভিত্তিক তো নয়ই, পদের বিপরীতেও নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনপ্রশাসনের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মকর্তা দেশের প্রশিক্ষণে সক্রিয় অংশ নেন। অন্যদের দেখলে মনে হয় যেন তাদের জেলে পাঠানো হয়েছে। বিদেশে প্রশিক্ষণ ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অকার্যকর। কর্মকর্তাদের কাজের সঙ্গে এ প্রশিক্ষণের কোনো সম্পৃক্ততা থাকে না। এর সংস্কারও অতিজরুরি। সব দেশেই যেকোনো ধরনের সরকার ব্যবস্থায় একটি বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো থাকে। এ কাঠামো যত মজবুত আর কার্যকর হয়, তত বেশি দক্ষ হয় সেই সরকার। তার সুফল ভোগ করে জনগণ। আর তা করতে প্রয়োজন নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদায়ন ও পদোন্নতিকালে মেধা ও উপযুক্ততার যথার্থ মূল্যায়ন। তদুপরি আবশ্যক উপযুক্ত বেতন কাঠামো। আরো প্রয়োজন আইনানুগ দায়িত্ব সম্পাদনে তাদের ওপর অকারণ হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। দুর্ভাগ্যবশত আমরা কয়েক যুগ ধরে এর কোনোটিই যথার্থভাবে করতে পারছি না।
সরকারি চাকরিতে পেশাদারি প্রতিষ্ঠা করতে হলে পাঁচটা জিনিস প্রতিপালন করা খুব প্রয়োজন। এগুলো হলো নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি। এগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে হতে হবে। বিগত সরকারের শাসনামলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিপুল বেতন বৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর হয়নি। অথচ একসময় স্বল্প বেতনকে দুর্নীতির কারণ মনে করা হতো। তাহলে বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা গেল না কেন? এর কারণ সরকারি চাকরিজীবীদের পেশাদারির শৃঙ্খলে বাঁধা যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুর্বলতাও দৃশ্যমান।
একবিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে নাগরিকদের তুলনামূলকভাবে ভালো ও সহজপ্রাপ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ফলাফলমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে, যেটি ভারতে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। ভারতে পেশাদারত্ব উন্নয়নে মন্ত্রণালয়গুলোর ফাংশনাল ক্লাস্টার গঠন এবং আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্ব নিরসন, চাকরিতে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে তা হস্তান্তরের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, জনবল সুষমকরণ ও ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, প্রশাসনিক সরকারে অনেক দেশের চেয়ে বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। সরকারি অর্থের অপচয় হ্রাসে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য হিসাব নিরীক্ষণের জন্য মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তরকে শক্তিশালী করতে হবে।
জনপ্রশাসনকে আধুনিকীকরণ, যুগোপযোগী ও উন্নয়নমুখী করা এবং প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে সুপ্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব সরকারের। একই সঙ্গে সরকারের ভাবনা বা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমলাতন্ত্রের। তাই সরকার ও আমলাতন্ত্র প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং পরস্পরের পরিপূরক। এ প্রেক্ষাপটে সরকারকে এমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে হয়, যার মাধ্যমে সরকারের চিন্তাচেতনা, পরিকল্পনা ও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন যেমন সম্ভব, তেমনি জনগণ যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সুবিচার পায়, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে সর্বস্তরে সরকারের উপস্থিতিকে জনগণের কাছে প্রতিভাত করতে পারলেই তার সাফল্য দৃশ্যমান হয়। বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বর্তমানে সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পাবলিক সেক্টরকে প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। সে কারণে দক্ষ ও যুগোপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং একে কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। পাবলিক সেক্টরে সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ প্রয়োগ একটি রাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে জাতীয় ও বিশ্ব অর্থনীতিতে দক্ষতার সঙ্গে অবদান রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে।