দ্য নিউ ওয়েলথ অব নেশনস

ডিজিটাল অর্থনীতির তথ্যগত অসংগতি কমানো প্রসঙ্গে

বাজার নৈপুণ্য ব্যাহত হওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার তথ্যগত অসামঞ্জস্যের বিষয়টি বেশ আগে থেকে সবারই জানা। তবে সেই দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। সাধুবাদ প্রাপ্য যে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং এটি সৃষ্ট বিপুল প্রবেশগম্য তথ্যভাণ্ডার এসব তথ্যগত ব্যবধান কমাচ্ছে, দীর্ঘদিনের সামঞ্জস্যহীনতা দূর করছে।

বাজার নৈপুণ্য ব্যাহত হওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যকার তথ্যগত অসামঞ্জস্যের বিষয়টি বেশ আগে থেকে সবারই জানা। তবে সেই দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। সাধুবাদ প্রাপ্য যে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং এটি সৃষ্ট বিপুল প্রবেশগম্য তথ্যভাণ্ডার এসব তথ্যগত ব্যবধান কমাচ্ছে, দীর্ঘদিনের সামঞ্জস্যহীনতা দূর করছে। 

সাম্প্রতিক সময়ের আগে পর্যন্ত ভৌত ভৌগোলিক সীমানা দ্বারা বাজার গঠন সীমাবদ্ধ ছিল। বাজার গঠনের একটি পূর্বশর্ত হলো ক্রেতা বিক্রেতা একে অন্যেকে পেতে সমর্থ হতে হবে এবং এই প্রক্রিয়া ঐতিহ্যিকভাবে হাটবাজার, শেয়ারবাজার কিংবা ডিলারশিপ (যদিও লেনদেন সহজতর করতে মধ্যবর্তীরা ফোন ফ্যাক্স মেশিন ব্যবহার করে) প্রভৃতি মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে এসেছে। -বের মাধ্যমে বিষয়গুলো পরিবর্তন হওয়া শুরু করেছে, যা অনেক অনলাইন মার্কেটপ্লেসের মৌলিক মডেল। হঠাৎ করে ভৌগোলিক সীমানা ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে দুর্ভেদ্য বাধা হিসেবে আর কাজ করছে না। 

যুক্তিসংগতভাবে ভৌগোলিক বাধা থেকে বাজার মুক্ত হওয়ায় দূরবর্তী জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য বাজারে প্রবেশাধিকারের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বৈশ্বিকভাবে অনেক জায়গায় বড়সংখ্যক একটি সম্ভাব্য ভোক্তার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য সেবা পাওয়ার একমাত্র ব্যবহারিক অপশন হতে পারে অনলাইন চ্যানেলগুলো। এটি চাহিদা সরবরাহ উভয় দিকেই প্রযোজ্য। আবার ভোক্তারা পণ্য সেবায় সম্প্রসারিত প্রবেশাধিকার উপভোগ করার কারণে বিক্রেতা উৎপাদকরা বর্ধিত চাহিদা পূরণে নাটকীয়ভাবে স্কেল আপ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চীনে ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোগগুলোর সম্ভাব্য বাজারের ডিজিটাল সম্প্রসারণ ছিল আলিবাবার অনেকটা উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি, যেটি দেখিয়েছে বিশ্বব্যাপী মোবাইল ইন্টারনেটের জোরালো প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলো কীভাবে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ধরন চালিত করতে পারে।

অবশ্য অনলাইন মার্কেটপ্লেসের উন্নয়ন এটি দ্রুত স্পষ্ট করে তুলেছে যে আলোচ্য প্লাটফর্ম কার্যকরভাবে সচল রাখার জন্য অতিরিক্ত তথ্যসংক্রান্ত ইস্যুগুলো আমলে আনা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, ক্রেতাদের জন্য বিক্রেতাদের পাশাপাশি অনলাইনে প্রদানকৃত পণ্য সেবার গুণগত মানে ভিন্নতা শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় বাজার অংশগ্রহণকারীদের নির্ভরযোগ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে আরো তথ্য সংযোজন করা প্রয়োজন। সমস্যা আবশ্যিকভাবে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের জন্য প্রযোজ্য, প্রথমোক্ত পক্ষ অর্থের বিনিময়ে কী গ্রহণ করছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে শেষোক্ত পক্ষ উদ্বিগ্ন অর্থ পাওয়া নিয়ে।

এটি হুবহু সেই ধরনের তথ্যগত সামঞ্জস্যহীনতাই, যা বাজার তথ্য প্রতিহত করে কিংবা প্রথম ক্ষেত্রে বাজার লেনদেন সীমিত করে। সুতরাং ডিজিটাল পেমেন্ট প্লাটফর্মগুলোর একটি অংশ প্রাথমিকভাবে অনলাইন বাজারগুলোর মৌলিক আস্থা সমস্যা সমাধানে গড়ে উঠেছিল। আবাসন লেনদেনে (রিয়েল এস্টেট ট্রানজেকশন) পরিচিত ইস্ক্রু সিস্টেম অনুসরণ করে -কমার্স প্লাটফর্মগুলো ইন্টারমিডিয়ারিগুলো সৃষ্টি করেছেযারা আশা করে যে পণ্য সেবার ডেলিভারি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা অর্থ সংগ্রহ এবং ক্রেতা থেকে পেমেন্ট ধরে রাখায় আস্থাভাজন হবে।  

চীনের ক্ষেত্রে আলি পে এবং লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে মারকাদো প্যাগোর মতো পদ্ধতিগুলো প্রাথমিকভাবে -কমার্স প্লাটফর্মগুলোর উত্থান ত্বরান্বিত করতে উন্নয়ন করা হয়েছিল, তবে সময়ান্তরে সেগুলো অর্থনীতিজুড়ে অফলাইনে ব্যবহূত মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং পুরো অর্থনীতিতে আবর্তিত হয়েছে। প্রক্রিয়া চীনে খুব উন্নত, যদিও নগদ প্রবাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে এগিয়ে লাতিন আমেরিকা। এসব পদ্ধতি কেবল সাংঘাতিকভাবে মূল্যবান তথ্যভাণ্ডারই তৈরি করছে না, উপরন্তু প্রতি লেনদেনে বাজার তৈরির প্লাটফর্মগুলোকে আরো শক্তিশালী হওয়ারও সুযোগ দিচ্ছে।

এদিকে বিক্রেতা (এবং মাঝেমধ্যে ক্রেতা) এবং পণ্যের রেটিং এখন অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গবেষণা নির্দেশ করে যে ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রভাবিত করতে রেটিংগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাববিস্তারী। তবে যথাযথ উদ্দেশ্যে কাজটি সম্পাদনে প্লাটফর্মগুলোর বাড়তি পদ্ধতি উন্নয়ন, রেটিং ম্যানিপুলেশন প্রতিরোধ এবং নতুন নামে নিষিদ্ধ গ্রাহকের পুনঃআবির্ভাব থামানো প্রয়োজন। তথ্যগত ব্যবধান কমানো ছাড়াও রেটিং এভাবে আরো ভালো আচরণ করতে বাজার অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রণোদনাও সৃষ্টি করে থাকে।

অনলাইন মার্কেটপ্লেসে অধিক থেকে অধিক পণ্য আবির্ভূত হওয়ায় ব্যবহারকারীরা যা খুঁজছেন, তা পেতে জটিলতায় পড়ছেন, কারণ একটি বাস্তবিক দোকানে কেনাকাটার মতো একই কায়দায় তারা সেখানে ব্রাউজ করতে পারেন না। সমস্যা সমাধানে অনলাইন প্লাটফর্মগুলো শুধু ব্যক্তি ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং পারচেজ হিস্ট্রি নয়, উপরন্তু অন্য সব ব্যবহারকারীর আচরণগত তথ্যের ভিত্তিতে সার্চ আলগরিদম রিকমেন্ডশন ইঞ্জিন উন্নয়ন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অগ্রগতি দ্বারা এসব আলগরিদমের আরো উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে এবং তথ্যের পরিমাণ মান বাড়ানো হয়েছে। সার্চ রিকমেন্ডশন ইঞ্জিনগুলো ম্যাচিং প্রবলেমের একটি আংশিক সমাধান দিয়েছে এবং সেগুলো এভাবে অনলাইন বাজার নৈপুণ্যের প্রধান উেস পরিণত হয়েছে। অনলাইন প্লাটফর্মগুলো ক্রেতা বিক্রেতার জন্য মূল্য সংযোজন করে এবং লক্ষণীয়ভাবে লেনদেনের পরিমাণ চাঙ্গা করে, বিশেষত কম জানা বিক্রেতা ব্রান্ডগুলোর ক্ষেত্রে।

অধিকন্তু, ব্যাপকভাবে সুলভ প্রবেশ কম ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনলাইন তথ্য -কমার্স জগতের বাইরে তথ্যগত অসামঞ্জস্য কমিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোক্তাদের ভালোভাবে তথ্যসমৃদ্ধ করা এবং মুখোমুখি বিক্রেতাদের অধিক ক্ষমতায়িত করার মাধ্যমে এমনকি বাস্তব বিশ্বেও গাড়ি, স্বাস্থ্যসেবা বীমা বাজারগুলোর রূপান্তর ঘটেছে। 

চূড়ান্ত তথ্যগত চ্যালেঞ্জ প্রবেশগম্যতা সম্পর্কিত। সুনির্দিষ্টভাবে বললে ভোক্তাদের সহজগম্য অনলাইন পরিচয় প্রদান এবং ট্র্যাকিং রেকর্ড সম্পর্কিত, যা বিচিত্র বাজার বিন্যাসে কাউন্টারপার্টিজগুলো হিসেবে তাদের আকর্ষণক্ষমতার সংকেত প্রদান করে।

ক্রেডিট একটি ভালো উদাহরণ। অফলাইন জগতে মানুষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ট্র্যাক রেকর্ড এবং আর্থিক ইতিহাসগুলো থাকে, যা অনুমানমূলকভাবে ক্রেডিট বা বীমা বাজারগুলো আন্ডারপিন করতে পারত। সমস্যা হলো, এসব অফলাইন রেকর্ড বিচ্ছিন্ন অপ্রবেশগম্য হতে পারে। অন্যদিকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিশেষ করে মোবাইল পেমেন্ট -কমার্সের উচ্চ প্রেনিট্রেশনের সুবাদে সেগুলো সহজেই পুনরুদ্ধারযোগ্য আরো অধিক সুফলপ্রদায়ী হয়েছে। জ্ঞানের মতো তথ্য নন-রাইভাল। এটি একবার ব্যবহার করা হলেও পরবর্তী ব্যবহার কিংবা কয়েকটি পক্ষ ব্যবহার সত্ত্বেও এর মূল্য নিঃশেষ হয় না। 

জামানত না থাকা মানুষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং গতানুগতিক ডিজিটাল-বহির্ভূত অর্থনীতি আর্থিক খাতগুলোর সঙ্গে কম যোগাযোগ থাকাদের মূল্যায়ন দাম ক্রেডিট যাচাইয়ে এআই আলগরিদম উন্নয়ন করা যেতে পারে। প্লাটফর্মভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা উন্নয়ন করা গেলে একদিকে তথ্যগত ব্যবধান কমবে, প্রণোদনা বাড়বে; অন্যদিকে পরিবার ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর বাজার প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত হবে। 

সংক্ষেপে বলা যায়, তথ্যচালিত ডিজিটাল বাজারগুলো তাদের অফলাইন প্রতিপক্ষগুলোর চেয়ে বেশি তথ্যগত প্রবাহ থাকাদের তথ্যগত ব্যবধান নিয়ে লড়াই করা থেকে আবর্তিত হয়েছে। ডিজিটাল তথ্যের প্রবেশগম্যতা নতুন স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার সুযোগ দেয় এবং বাস্তব বিশ্বে পৌনঃপুনিকভাবে মিসিং হওয়া আচরণের সংকেত প্রদান করে।

অবশ্যই হ্যাঁ, ব্যাপকভাবে প্রবেশগম্য তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে নিজস্ব বাস্তব বেশ আলোচিত ঝুঁকিগুলোও সামনে আসে এবং সম্ভাব্য কার্যকারিতা অর্জন অন্তর্ভুক্তিতার সুফল নিশ্চিতে সেগুলো অবশ্য মোকাবেলা করতে হবে। 

সর্বোপরি, তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (সরকারসহ) এবং ডিজিটাল তোরণরক্ষক হিসেবে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অবশ্যই আস্থাশীল হতে হবে। একটি ন্যূনতম পর্যায়ে তারা প্রয়োগযোগ্য বিধিমালা পরিপালনে বাধ্য, যা স্বচ্ছতাবিষয়ক ব্যক্তির অধিকার, তথ্য ব্যবহার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করে। যুক্তিসংগতভাবে এক্ষেত্রে আমরা উন্নতি করছি বটে, কিন্তু অনেক দূর যাওয়া এখনো বাকি রয়ে গেছে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

মাইকেল স্পেন্স: নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং হুভার ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

আরও