আলোকপাত

গ্রামবাংলার পরিবহন আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে

স্কুলে পড়াকালীন এক শিক্ষক বলেছিলেন, বিশেষজ্ঞ হচ্ছেন যিনি বিশেষভাবে অজ্ঞ। শুনে অবাক হয়েছিলাম। এ তো সবাই যা বলে, ঠিক তার উল্টো কথা। কিন্তু কেন তিনি এমন কথা বলেছিলেন তা জানার কৌতূহল থাকলেও সাহস পাইনি প্রশ্ন করার। তবে তিনি আমাদের মুখ দেখে মনের কথা ঠিকই বুঝেছিলেন। তিনি বলেছিলেন বিশ্বকে জানলে, দেশকে বুঝলে তখন তোমরা আমার কথার সত্যতা দেখতে পাবে। আজ সেই নমস্য শিক্ষককে শতকোটি প্রণাম জানাই। এখন দেশ

স্কুলে পড়াকালীন এক শিক্ষক বলেছিলেন, বিশেষজ্ঞ হচ্ছেন যিনি বিশেষভাবে অজ্ঞ। শুনে অবাক হয়েছিলাম। তো সবাই যা বলে, ঠিক তার উল্টো কথা। কিন্তু কেন তিনি এমন কথা বলেছিলেন তা জানার কৌতূহল থাকলেও সাহস পাইনি প্রশ্ন করার। তবে তিনি আমাদের মুখ দেখে মনের কথা ঠিকই বুঝেছিলেন। তিনি বলেছিলেন বিশ্বকে জানলে, দেশকে বুঝলে তখন তোমরা আমার কথার সত্যতা দেখতে পাবে। আজ সেই নমস্য শিক্ষককে শতকোটি প্রণাম জানাই। এখন দেশ জাতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বচনামৃত শুনে, তাদের কর্মকাণ্ড দেখে শিক্ষকের কথার মর্মার্থ কিছুটা বুঝতে চেষ্টা করছি। দেশের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সময়ের সিদ্ধান্ত সময়ে নিতে না পারায় চারদিকে ব্যর্থতার পাহাড় গড়ে উঠেছে। অথচ তারা কিন্তু অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের সব ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে স্বস্তিতে আছেন, আনন্দে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিদিন রাজধানীর ঠাণ্ডা ঘরে বসে প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে, প্রতিদিন একনেকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ দেখছে এসব কর্মকাণ্ডে প্রতিদিন জাতীয় স্বার্থ কীভাবে একপেশে হয়ে পড়ছে। আর দায়িত্বপ্রাপ্তরা একেই উন্নয়নের জোয়ার বিবেচনায় আত্মতুষ্টি লাভ করছেন। দেশ উন্নয়নশীল থেকে মধ্যম আয়ের এবং মধ্যম আয় থেকে উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখানোর প্রতিযোগিতায় সাফল্য লাভ করছে। অথচ এত উন্নয়ন আর অগ্রগতির মধ্যে অনেকে সাধারণ মানুষকে দেখতেই পারছে না। আবার সাধারণ মানুষ স্ব-উদ্যোগে নিজেকে রক্ষা করার কর্মকাণ্ডে প্রতি পদে পদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

৩০ বছরের বেশি সময় ধরে গ্রামবাংলার পরিবহন হিসেবে নসিমন-করিমন-আলমসাধু বাংলাদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আর গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রেখে চলেছে। সারা দেশে লাখ লাখ নসিমন-করিমন মানুষের বেকারত্ব দূর করেছে, পরিবারের অন্নের সংস্থান করেছে, সাধারণ মানুষকে সততার সঙ্গে জীবনসংগ্রামে ব্রতী করেছে। তবে একথা স্বীকার করতে লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই যে বর্তমান সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি বিবেচনায় গ্রামবাংলার পরিবহনগুলো অনেক অনেক পিছিয়ে। কিন্তু শুধু বিবেচনায় পরিবহনগুলোকে বন্ধ করে দিতে হবে! সড়কে চলতে দেখা যাবে না! সেটা তো কাম্য হতে পারে না। অথচ আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা এমন কর্মকাণ্ডই করে চলছেন বছরের পর বছর। নসিমন-করিমনের অবদান বিবেচনা করলেন না, প্রস্তুতকারকদের দিকে তাকালেন না, শুধু নিজেদের বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে, একের পর এক নির্দেশ দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাস্তায় নামিয়ে দিলেন। পরিবহনচালকরা নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করতে বারবার আন্দোলন-সংগ্রামে বাধ্য হলেন, আর সেখানেও কোটি কোটি টাকার খেলা হলো। সবকিছুর মধ্যে পরিবহনটিকে বিজ্ঞানসম্মত করতে কেউ এগিয়ে এলেন না। বরং আইনের আশ্রয় নিয়ে পরিবহনগুলো বন্ধের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ পাকাপোক্ত করল ক্ষমতার কেন্দ্র। আর সব বাধা মাথায় নিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল গ্রামবাংলার পরিবহন, গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

নসিমন-করিমন-আলমসাধুর অনেক যান্ত্রিক ত্রুটির কথা সাধারণ মানুষ জানে। একুশ শতকে এমন পরিবহন কল্পনা করাও কঠিন। তার পরও সাধারণ মানুষ পরিবহন থেকে যে পরিমাণ সেবা পায় তা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারে না। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে পরিবহন বন্ধ করতে যত উদ্যোগ গ্রহণ করছে, এর আসন ততই পাকাপোক্ত হচ্ছে। আজ পর্যন্ত কোনো জাতীয় স্থানীয় দৈনিকে এমন কোনো সমীক্ষা প্রতিবেদন দেখেছি বলে মনে করতে পারিনি, যেখানে পরিবহনকে দেশের সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে সড়ক দুর্ঘটনার দায় কেন এদের ওপর চাপানো হচ্ছে! অনেকে বলেন, গ্রামবাংলার পরিবহন তৈরিতে দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কোনো ভূমিকা নেই। এখানে তেল-কালিমাখা শ্রমিকের ভূমিকাই মুখ্য। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অনেকের পক্ষেই বিষয়টা সহ্য করা খুব কঠিন। তাই পরিবহনগুলোকে কিছু লোক মসৃণ চলাচলে বাধা হিসেবে দেখছে আবার পরিবহন ব্যবসায়ীরা দেখছেন তাদের ব্যবসার একটা অংশ নিয়ে চলে যাচ্ছে এগুলো। দুই দলের মধ্যকার স্বার্থের টানাপড়েনেই যত সমস্যা।

অবশেষে নভেম্বর ২০২১- সরকার গ্রামবাংলার পরিবহনগুলোকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ নীতিমালার ভিত্তিতে চলাচলের সুযোগ দেয়ার কার্যক্রম হাতে নেয়। সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন এবং মহাসড়ক বিভাগ নীতিমালার খসড়া তৈরি করবে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার নীতিমালা করতে চায়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে পরিবহনগুলোর আধুনিকায়নসহ চলাচলের ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। পরিবহনগুলোর আধুনিকায়ন নিয়ে এর আগে বহুবার কথা বলা হলেও কোনো ব্যক্তি বা সরকারের পক্ষে কেউ পর্যন্ত এগিয়ে আসেননি। এমনকি দেশের এতগুলো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো আশাবাদ শোনায়নি। তাই যানগুলোর আধুনিকায়ন আগামী কত বছরে হতে পারে তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে নিয়ন্ত্রিত চলাচলের বিষয়টা পূর্বনির্ধারিত হয়েই আছে বলে বিশ্বাস।

সরকারি নীতিমালার আওতায় নসিমন-করিমন-আলমসাধুর সঙ্গে ইজিবাইক ইঞ্জিনচালিত রিকশাকেও যুক্ত করা হয়েছে। পরিবহনগুলোর মধ্যে ইজিবাইক ছাড়া বাকি সবগুলোই দেশে তৈরি। অথচ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হিসেবে পরিবহনগুলো নিয়ে আমরা গর্ববোধ করতে পারি না। বরং আমাদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে। আমরা সমালোচনার ঝড় তুলে আনন্দ পাই। সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করলে এখানে একটা প্রশ্ন এসেই যায়, সমস্যা বোঝার শুরুতেই কেন ধরনের যানবাহন বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হলো না? দরিদ্র অসহায় বেকার মানুষগুলো সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিজসহ পরিবারের জীবিকার সন্ধানে যখন ছুটে চলা শুরু করেছে তখন তাদের পেটে লাথি মারার ব্যবস্থা কেন? ইজিবাইক বিদেশ থেকে আমদানি করা। দৃষ্টিনন্দন, আরামদায়ক, সুলভ হওয়ার কারণে তা সাধারণ জনগণের কাছে সমাদৃত। তবে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় ইজিবাইকের আধিক্য অনেকের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা বিবেচনায় খুব জানতে ইচ্ছা করে, দেশে কোনো কিছু আমদানিতে সরকারের ভূমিকা আছে কিনা? বিত্তবান মানুষ ইচ্ছা করলেই এক কোটি ইজিবাইক এনে রাজধানী বা যেকোনো নগরে ছেড়ে দিতে পারে কিনা? কারণ লাখ লাখ ইজিবাইক দেশে আমদানি করা হলো, তাতে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু সাধারণ মানুষ তা ক্রয় করে রাস্তায় নামতেই সমস্যার শুরু। পর্যায় থেকেই পরিবহনটি নিয়ন্ত্রণ করার ভাবনা এসেছে। কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনা ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। যারা আমদানি করল কিংবা কাজে যারা সহযোগিতা করল, তাদের কি কোনো দায় নেই? সব দায় যারা রাস্তায় নেমেছে তাদের? বিষয়টা অনেকটা এমন—‘আমাদের ব্যবসা শেষ, এবার তোমাদেরটা তোমরা বুঝে নাও।

বাংলাদেশে একটা নীতিমালা করা সহজ কাজ নয়। তার ওপর আবার গ্রামবাংলার পরিবহনগুলো এমন এক যানবাহন, যেটি সড়কে চলাচল করুক তা ক্ষমতার বলয়ে থাকা প্রায় কেউই চান না তাই আশা করা যায়, নীতিমালা সময়ের মধ্যেই পাওয়া যাবে। নীতিমালা প্রস্তুতকারী কমিটি এরই মধ্যে বিশ্বের ১০ শতাংশ ভ্রমণ করে ফেলেছে সদলবলে। তারা বিশ্ব ঘুরে এসে সিদ্ধান্ত জানাবে—‘এসব যান সড়কে চলাচল করতে পারবে না। সড়ক পারাপারের প্রতিটা ক্ষেত্রে টানেল নির্মাণ করতে হবে। আধুনিকায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধরনের যান চলাচল স্থগিত থাকবে। যান চলাচলে সরকারি অনুমোদন রুট পারমিট নিতে হবে। নীতিমালায় এমন কিছু বিষয় থাকলেই পরিবহনচালকদের ভিক্ষা চাই না কুকুর ঠেকাও অবস্থা হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরের যত সমস্যা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিয়ে। নিত্যনতুন আইন প্রণয়ন করে পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলো নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দেখা যায়। আবার এসব পাবলিক ট্রান্সপোর্টের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা ত্রিচক্র যান নিয়ে। দেশব্যাপী কখন কোন পথ এদের জন্য নিষিদ্ধ হচ্ছে তা একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারেন। সমস্যাবেষ্টিত ত্রিচক্র যানের বিপরীতে ব্যক্তিগত ট্রান্সপোর্টের রয়েছে অবাধ সুযোগ। তারা বাধাহীনভাবে সর্বত্র যাতায়াতের সুযোগ পায়। বিত্তবান হলেই পরিবারের প্রতি সদস্যের জন্য পৃথক যানের ব্যবস্থা করতে পারা যায়। সড়কের ধারণক্ষমতা নিয়ে এক্ষেত্রে কারো মনে কোনো প্রশ্ন নেই। একে তো একবিংশ শতাব্দী, তার ওপর উন্নত দেশের কাতারে শামিল হচ্ছে দেশ। মানুষের আয় যেখানে বেড়েছে, সেখানে দেশীয় তৈরি নসিমন-করিমনসহ ইজিবাইক, ইজিরিকশা সড়কে দেখা দিলে কি দেশ জাতির সম্মান থাকে? তাই সাধারণ মানুষের দাবি সরকারিভাবে পরিবারপ্রতি অন্তত একটা করে প্রাইভেট কারের ব্যবস্থা করা হোক। সরকার একটা মেগা প্রকল্প হাতে নিলেই হবে। প্রকল্পের অর্থায়ন হবে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত এনে। এছাড়া কোনো নীতিমালা, কোনো বৈধতায় উদ্ভূত সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অতীত থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষমতার বলয়ে থাকা সব বিশেষজ্ঞই বিশ্বাস করেন, এসব যানই সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

 

এম আর খায়রুল উমাম: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও