অভিমত

একনেকের এক বৈঠকে কেন রেকর্ড প্রকল্প অনুমোদন?

গত ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক বৈঠকে মোট ৪৪টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যা এক্ষেত্রে একটি নতুন রেকর্ড। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বর্তমান সরকারের অধীনে ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এটিই ছিল শেষ একনেক বৈঠক। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তের ফায়দা নেয়ার লক্ষ্যে তড়িঘড়ি করে

গত ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক বৈঠকে মোট ৪৪টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যা এক্ষেত্রে একটি নতুন রেকর্ড। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বর্তমান সরকারের অধীনে ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এটিই ছিল শেষ একনেক বৈঠক। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তের ফায়দা নেয়ার লক্ষ্যে তড়িঘড়ি করে এবং যথেষ্ট বাছবিচার ছাড়াই যেনতেনভাবে প্রকল্প গ্রহণের নজির এর আগেও রয়েছে। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত শেষ একনেক বৈঠকে প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল ৩৮টি এবং সেটিও ছিল সেই সময় পর্যন্ত একনেক কর্তৃক এক বৈঠকে সর্বোচ্চসংখ্যক প্রকল্প অনুমোদনের রেকর্ড। সেদিক থেকে বলা যায় যে একনেকের সদস্যরা ক্রমাগতভাবে নিজেরাই নিজেদের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আর গতির দিক থেকেও সম্ভবত এটি একটি নতুন রেকর্ড। উল্লিখিত এ বৈঠকে এক একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য বৈঠকের প্রকৃত কার্যসময়ের বিবেচনায় গড়ে সময় লেগেছে মাত্র ৫ মিনিটেরও কম।

তো, এক বৈঠকে এত দ্রুত ও এত সংখ্যক প্রকল্প কেন ও কীভাবে অনুমোদন দেয়া সম্ভব হলো—এ প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘‌আমরা প্রকল্প তৈরিতে পরিপক্ব হয়ে গেছি। প্রকল্প তৈরি করে করে পেকে পেকে দুর্দান্ত হয়ে গেছি।’ (প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০২৩)। অবশ্য তার এ বক্তব্য প্রকল্প প্রণয়ন বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দেয়া পূর্ববর্তী বক্তব্যের স্ববিরোধী। এর আগে বিভিন্ন প্রকল্পের অবাস্তব ব্যয় প্রাক্কলন প্রসঙ্গে একাধিকবার তিনি বলেছেন যে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে প্রকল্প প্রণয়নে আরো মনোযোগী হতে হবে এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে তা প্রণয়ন করতে হবে। আর সে অনুযায়ী প্রণীত না হওয়ায় এর আগে বহু প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছে ফেরতও পাঠানো হয়েছে। ফলে এবার যে তিনি বললেন, প্রকল্প প্রণয়নে কর্মকর্তারা ‘পাকা’ হয়ে ওঠেছেন—তার এ বক্তব্য যুক্তির বিচারে একেবারেই টিকছে না। আসল ঘটনা হচ্ছে, সরকারের মেয়াদের শেষ মুহূর্তে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধাদানের জন্যই বস্তুত এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে বিশ্বাস করার সব কারণই বিরাজমান আছে।

এখন দেখা যাক, কী ধরনের প্রকল্প সর্বশেষ এ একনেক বৈঠকে অনুমোদিত হলো। উল্লিখিত ৪৪টি প্রকল্পের মধ্যে আটটিই বৈদেশিক ঋণ সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প। এগুলো অনুমোদনের যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে যে এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণচুক্তি আরো আগেই স্বাক্ষর হয়ে গেছে। অতএব এগুলো অনুমোদন না করে উপায় নেই। কর্তৃপক্ষীয় এ বক্তব্য শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়। এ বক্তব্য সত্য হলে এক্ষেত্রে একই সঙ্গে দুটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে: এক) প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার আগে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হওয়া এবং দুই) বৈদেশিক মুদ্রার চরম সংকটের এ মুহূর্তে নতুন করে ঋণগ্রহণ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান বৈদেশিক ঋণদেনার পরিমাণ প্রায় ৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা পরিশোধের স্বাভাবিক সামর্থ্য বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির নেই। ফলে অসহনীয় ঋণের এ ভার ও বৈদেশিক মুদ্রার বিপজ্জনক এ ঘাটতির মুহূর্তে বৈদেশিক ঋণ সহায়তাপুষ্ট কোনো প্রকল্প অনুমোদন করার মানেই হচ্ছে গোষ্ঠীস্বার্থে সাধারণ মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগকে আরো ব্যাপক ও দীর্ঘায়িত করে তোলা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমতে কমতে এখন ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে এসেছে, নেট হিসাবে যা ১৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও কম।

এবার অবশিষ্ট ৩৫ প্রকল্পের দিকে তাকানো যাক, যার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে: তেজগাঁওয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুতল বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ, শেরেবাংলা নগরে বহুতল বিশিষ্ট সরকারি অফিস ভবন নির্মাণ, গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্ক নির্মাণ ইত্যাদি। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বিশেষ উদ্দেশ্যে সরকারি কর্মচারীদের আর কত পুষবেন? গত এক যুগে তাদের যা কিছু এবং যতটুকু দেয়া হয়েছে, উদ্দেশ্য হাসিলে সেটুকুই যথেষ্ট নয় কি? এতটুকু পাওয়ার পরও যদি তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা না দেন, তাহলে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা আরো বহুগুণ বাড়ালেও তারা তা দেবেন না। তবে মানতেই হবে যে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এরই মধ্যে তারা যথেষ্ট করেছেন এবং অন্য কোনো বাধা না এলে নিকট ভবিষ্যতেও তারা তা করে যাবেন বলেই আশা করা যায়। অনেক সরকারি কর্মচারী তো এরই মধ্যে প্রকাশ্যেই সে ধরনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে চলেছেন। ফলে সাধারণ জনগণের স্বার্থকে পথে বসিয়ে এ ধরনের প্রকল্প সাম্প্রতিক একনেক বৈঠকে অনুমোদন না করলেও চলত বলে মনে করি। কিন্তু তার পরও যে তারা সেটি করলেন, সেটি হয়তো সৃষ্ট সম্পর্কের এক ধরনের পুনঃনিশ্চিতকরণ মাত্র।

কোনো একটি সরকারের কার্যকালের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে এসে উপনীত হলে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সুবিধা লোটার কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধাদানের এমন সংস্কৃতি বস্তুতই পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার সমসামাজিক সংস্কৃতির প্রতিবেশী দেশগুলোতেও নয়। সত্যি এ এক অদ্ভুত সমাজ এবং সে অদ্ভুত সমাজ নিয়ে গড়া হীনতা ও নীচতায় ভরা এক অদ্ভুত রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রে গত ৫২ বছরে কতিপয় সুবিধাবাদী চালাক-চতুর লোকের হাতে পাপবিদ্ধ সম্পদের কুক্ষিগতকরণই হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় লক্ষযোগ্য অগ্রগতি। নইলে অর্থনীতির এ নাজুক পরিস্থিতিতে মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বাধিক সুবিধাদানের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রেখে একনেকের এক বৈঠকেই কেন ৪৪ প্রকল্প অনুমোদন করতে হবে? এ দেশে সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে গ্রহণযোগ্য এরচেয়ে ভালো কোনো প্রকল্প কি রাষ্ট্রের ‘পরিপক্ব’ কর্মকর্তারা খুঁজে পেলেন না বা তা খুঁজে পেয়ে তার জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করে একনেক বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য পাঠাতে পারলেন না?

সরকারের কার্যমেয়াদের শেষ পর্যায়ের সর্বশেষ একনেক বৈঠকে ৪৪ প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ায় সবার কাছেই হয়তো বিষয়টি অস্বস্তিকর লাগছে। কিন্তু একনেক বৈঠকের গত এক দশকের প্রকল্প অনুমোদনের ধরন ও প্রবণতা সম্পর্কে যারা ন্যূনতম পর্যায়ের খোঁজখবরও রাখেন তারা সবাই জানেন যে একনেক বৈঠকে উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোর খুব সামান্য সংখ্যকই শেষ পর্যন্ত ফেরত আসে। এ নিয়ে জনপ্রিয় আলোচনা এমন যে ওখান থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না। ফলে একনেকের এক বৈঠকে যে ৪৪ প্রকল্প অনুমোদন পেয়ে গেল, তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে এতে অবশ্যই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে এবং সেটি এই যে এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অতিউচ্চ ঋণগ্রস্ত বাংলাদেশের ঘাড়ে নতুন করে আরো ৭৬৮ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণের বোঝা যুক্ত হলো। বাংলাদেশের মোট ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে এ ৭৬৮ কোটি টাকাকে খুব সামান্য বলে মনে হলেও বুঝতে হবে যে এটি এখন বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো। তা, সে শাকের আঁটিটি এখন একনেক কর্তৃক জনগণের ওপর চাপানোটা কি ঠিক হলো?

এ ক্ষুদ্র পরিসরের আলোচনার সমাপ্তি টানার আগে অত্যন্ত কষ্ট ও হতাশার সঙ্গে যে বিষয়টি সামনে আনতে চাই তা হচ্ছে, একনেক অনুমোদিত উল্লিখিত ৪৪ প্রকল্পের মধ্যে কৃষি খাতের একটি প্রকল্পও নেই, যদিও কৃষকরাই হচ্ছেন দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি। তবে সংখ্যায় তারা ৭০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য একটি প্রকল্পও সেখানে না থাকার কারণটি খুবই স্পষ্ট। তারা একদিকে যেমন অসংগঠিত, অ-ধূর্ত ও অ-চতুর, অন্যদিকে তেমনি সিদ্ধান্তগ্রহীতাদের মধ্যেও তাদের প্রতি মমতাবান কেউ নেই। ফলে তাদের সারল্য ও অসংগঠিতপনার বিপরীতে ক্ষমতাশ্রয়ী রাজনৈতিক টাউট, উদীয়মান ধূর্ত বণিক ও বিকাশমান বিত্তবান শ্রেণীর স্বার্থেই যে একনেক কর্তৃক প্রকল্পগুলোর বাছাই ও অনুমোদন চূড়ান্ত হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার কোনোই কি উপায় নেই?

আবু তাহের খান: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

আরও