দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দিতে গড়ে তোলা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। বর্তমানে ১৪ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত বিপুলসংখ্যক ক্লিনিকে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। এর কারণ ক্লিনিকগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। যে কারণে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিকেন্দ্রীকরণ ও তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে ক্লিনিকগুলো কার্যকর করা দরকার। দেশের সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় প্রায়ই রোগীদের চাপ বেড়ে যায়। জ্বর, সর্দি-কাশির মতো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতেও মানুষ এসব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ভিড় জমান। এমনকি স্থানীয় ফার্মেসির শরণাপন্ন হন। ডাক্তারের পরামর্শ ও ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে সেবন করেন। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রাথমিক সেবা কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ারের (সিবিএইচসি) মাধ্যমে সবার পাওয়ার কথা। কিন্তু কমিউনিটিগুলো প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না বিভিন্ন সমস্যার কারণে। এটা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। সরকারের উচিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পুরোপুরি সক্রিয় করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর বড় সমস্যা হলো অপ্রতুল অবকাঠামোগত সুবিধা। বেশির ভাগ ক্লিনিক জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেয়ালে-ছাদে ফাটল, পানি চুইয়ে পড়ে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে এবং অনেক ক্লিনিকের কার্যক্রম ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেকগুলোয় বর্ষায় পানি ওঠে, সাপ ওঠারও অভিযোগ রয়েছে। অনেকগুলোয় নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকে না, পানিরও সুব্যবস্থা নেই। নেই পয়োনিষ্কাশনের সুব্যবস্থাও।
এসব অবকাঠামোগত অসুবিধার পাশাপাশি রয়েছে ওষুধ সংকট। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্লিনিকগুলোয় পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে না। কমিউনিটি ক্লিনিকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ২৭ প্রকার ওষুধ সরবরাহের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আবার যেসব ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে সেগুলোও পর্যাপ্ত পরিমাণে দেয়া হয় না। ক্লিনিকগুলোয় মূলত কৃমি, স্ক্যাবিস, গ্যাস, চর্মরোগ ও প্রজননজনিত রোগের সাধারণ ওষুধই পাওয়া যায়। যে কারণে এসব ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজন অনুসারে ওষুধ দেয়া সম্ভব হয় না। এতে বিপাকে পড়ে এসব ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল তৃণমূলের মানুষ। এমনকি স্বাস্থ্যকর্মী না পেয়ে চিকিৎসা নিতে এসে ঘুরে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে ছয়দিন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি), তিনদিন স্বাস্থ্য সহকারী এবং বাকি তিনদিন পরিবার কল্যাণ সহকারীর কাজ করার কথা। কিন্তু তারা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো স্থাপনের যে মূল উদ্দেশ্য, তা অপূরণীয়ই থেকে যাচ্ছে।
গত মে মাসে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সমস্যা সমাধানে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এ কমিশন মোটা দাগে পাঁচ ধরনের সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় রেখেছে। এক. যোগাযোগ সেবা: মানুষকে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে তথ্য প্রদান; দুই. স্বাস্থ্য উন্নয়ন: শিশু ও মাতৃমঙ্গল সেবা, কৈশোরকালীন সেবা, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; তিন. সীমিত পর্যায়ে রোগের চিকিৎসা: নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, গোদ রোগ, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, আমাশয়, চোখ ওঠা, কানের প্রদাহ, ত্বকের খোসপাঁচড়া ও অন্য রোগ, দাঁতের মাড়ির প্রদাহ, নাকের প্রদাহ, সাধারণ জ্বর, বমি, মাথাব্যথা, পাকস্থলীতে অ্যাসিডের আধিক্য, কুকুর ও সাপের কামড়, পানিতে ডোবা, গলায় কিছু আটকে যাওয়া, দুর্ঘটনাজনিত সাধারণ জখম ও রক্তপাত, হাড় ভাঙার চিকিৎসা, কৃমিনাশ, রক্তস্বল্পতা, জটিলতাবিহীন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, অস্থিসন্ধির ক্ষয় ও ব্যথা, মানসিক সমস্যা, জননেন্দ্রিয়ের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ; চার. পরিবার পরিকল্পনা সেবা এবং পাঁচ. রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণসেবা: ইপিআই, রোগ পরিবীক্ষণ বা নজরদারি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এসব প্রাথমিক সেবা যেন কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে মানুষ নিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
কমিশনের সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিক্রির সুযোগ রাখতে হবে। পাশাপাশি যেসব ওষুধ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই কেনা যায়, সেসব ওষুধ কমিউনিটি ক্লিনিকে বিক্রির ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে জরুরি প্রয়োজনে মানুষের ওষুধ পেতে বিলম্ব না হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় বর্তমানে যে ওষুধ সংকট রয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা। নয়তো যেখানে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না, সেখানে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি সেবা দেয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে না। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতেও সরকারকে নজর দিতে হবে। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে আরো কী ব্যবস্থা নেয়া যায় তা সরকারকে বিবেচনা করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিধিও নির্দিষ্ট করা উচিত। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে) এক সভায় উল্লেখ করেন যে কমিউনিটি ক্লিনিক এলাকায় সেবার দ্বৈধতা আছে। একটি পরিবারে স্বাস্থ্যকর্মী একবার সেবা দিতে যান। একই পরিবারে আবার পরিবার পরিকল্পনা মাঠকর্মীও সেবা দিতে যান। অন্যদিকে সিএইচসিপির কাজ মূলত ওষুধ বিতরণ করা। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এ তিনজন স্বাস্থ্যকর্মীর কাজে সমন্বয় আনার কথা ভাবছে, যাতে একই কাজ দুজন না করেন। দ্রুত এর সমন্বয় ঘটুক, সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতেও সরকারের ভূমিকা রাখা দরকার।
১৯৯৮ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে তোলার কাজ শুরু হয় বিগত সরকারের শাসনামলে। যদিও ২০০১ সালে সরকার বদলের প্রেক্ষাপটে কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কমিউনিটি ক্লিনিক আবার চালু করার চেষ্টা হয়। ২০০৯ সাল থেকে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিদ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্রয়োজনমাফিক সংস্কার ও গুরুত্বের অভাবে তেমন কাজে আসছে না। এগুলো সক্রিয় করা গেলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য পূরণেও এগুলো কার্যকর করা প্রয়োজন।