জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও প্রকাশ। একটি সরকার কাদের পাশে দাঁড়াবে, কাদের কষ্টকে গুরুত্ব দেবে, কাদের জীবনমান উন্নয়নে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে তার প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আলোচনায় জরুরি প্রশ্ন হলো, এ বাজেটে দেশের উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা কতটা প্রতিফলিত হয়েছে?
বাংলাদেশে উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী বলতে আমরা সাধারণত তাদের বুঝি, যারা রাষ্ট্রের উন্নয়নের ভাষণে থাকে, কিন্তু বাস্তব সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বারবার পিছিয়ে পড়ে। এদের মধ্যে রয়েছে শহরের বস্তিবাসী, অতিদরিদ্র পরিবার, দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহকর্মী, নিম্নআয়ের নারী, একক মা, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, পথশিশু, শ্রমজীবী শিশু, নদীভাঙন ও জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার জনগণ, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক এবং দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত পরিবারগুলো।
এরা কেন উপেক্ষিত থাকে? প্রথম কারণ, এদের কণ্ঠস্বর দুর্বল। তারা সংগঠিত নয়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাদের প্রতিনিধি নেই। দ্বিতীয় কারণ, বাজেট প্রণয়নের সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তব দারিদ্র্য, অসুস্থতা, পুষ্টিহীনতা, বস্তির জীবন, নারীর অনিরাপত্তা ও শিশুদের ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তৃতীয় কারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বড় অংশ কাগজে থাকলেও প্রকৃত দরিদ্র, বস্তিবাসী ও প্রান্তিক মানুষ অনেক সময় তালিকা, পরিচয়পত্র, স্থানীয় প্রভাব, দালালি ও তথ্যের অভাবে সুবিধা থেকে বাদ পড়ে। চতুর্থ কারণ, আমরা উন্নয়নকে অনেক সময় বড় প্রকল্প, রাস্তা, ভবন ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি; কিন্তু মানুষের পুষ্টি, চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে যথেষ্ট অগ্রাধিকার দিই না।
সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু শুধু বরাদ্দের অংক বাড়লেই হবে না। সেই অর্থ সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছবে কিনা এটিও নিশ্চিত করতে হবে। যদি বৃদ্ধ ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিধবা ভাতা, শিশুখাদ্য সহায়তা, মাতৃস্বাস্থ্য সহায়তা, নগর দরিদ্রের স্বাস্থ্যসেবা, বস্তিবাসীর পানি স্যানিটেশন, দরিদ্র শিক্ষার্থীর বৃত্তি এবং নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য সহায়তা বাস্তবে শক্তিশালী না হয়, তাহলে বাজেটের মানবিক উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যাবে।
শহরের বস্তিবাসী বাংলাদেশের সবচেয়ে উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি। তারা শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখে, রিকশা চালায়, বাসাবাড়িতে কাজ করে, পোশাক কারখানায় শ্রম দেয়, দোকান হাটে কাজ করে, নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে ঘাম ঝরায়। অথচ তাদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, স্বাস্থ্যসেবা সীমিত, শিশুদের স্কুলে ধরে রাখা কঠিন, অগ্নিকাণ্ড ও উচ্ছেদের ভয় সবসময় থাকে। শহরের উন্নয়নে তাদের শ্রম আছে, কিন্তু শহরের বাজেটে তাদের অধিকার নেই এটাই বড় অন্যায়। গ্রামের প্রান্তিক মানুষও একইভাবে অবহেলিত। চরাঞ্চল, হাওর, উপকূল, নদীভাঙন এলাকা ও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি হারায়, জমি হারায়, আয় হারায়, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়। বাজেটে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন, জীবিকা সহায়তা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা না থাকলে তারা বারবার দরিদ্রতার চক্রে ফিরে যায়।
নারী ও শিশুদের বিষয়েও বাজেটকে আরো মানবিক হতে হবে। দরিদ্র পরিবারের কন্যাশিশু পুষ্টিহীনতা, বাল্যবিবাহ, স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকে। গর্ভবতী মা, নবজাতক, কিশোরী ও শ্রমজীবী নারীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। শিশুদের জন্য শুধু বিদ্যালয় থাকলেই হবে না; দরকার পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ ও পরিবারভিত্তিক সহায়তা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী আরো গভীরভাবে উপেক্ষিত। অনেক পরিবারে তারা করুণা পায়, কিন্তু অধিকার পায় না। ভাতা অপ্রতুল, চিকিৎসা ব্যয় বেশি, চলাচলের পরিবেশ অনুপযোগী, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষা, চিকিৎসা, সহায়ক যন্ত্র, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানকে আলাদা অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রবীণ মানুষের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ, মানসিক সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন সরকারের সামনে সুযোগ আছে। প্রস্তাবিত বাজেট পাসের আগে উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা দরকার। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ শুধু বাড়ানো নয়, বরং তা লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও সহজপ্রাপ্য করতে হবে। বস্তিবাসী, দিনমজুর, গৃহকর্মী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, শিশু, নারী, জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য আলাদা বাজেট লাইন থাকা উচিত। এক্ষেত্রে সরকার দ্রুত পাঁচটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রথমত, নগর দরিদ্র ও বস্তিবাসীর জন্য স্বাস্থ্য, পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপদ আশ্রয়কে বাজেটে পৃথকভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্থানীয় প্রভাব ও দালালি বন্ধ করে ডিজিটাল যাচাই, কমিউনিটি যাচাই ও অভিযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, বিধবা, একক মা ও দরিদ্র শিশুর ভাতা বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। চতুর্থত, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি ও দরিদ্রের ওষুধ সহায়তায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, বাজেট বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সরকার, এনজিও ও কমিউনিটি সংগঠনকে যুক্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় বাজেটের প্রকৃত সফলতা জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয়, বরং একজন দরিদ্র মা সন্তানের চিকিৎসা পেল কিনা, একজন বয়স্ক মানুষ ওষুধ কিনতে পারল কিনা, একজন প্রতিবন্ধী শিশু স্কুলে যেতে পারল কিনা, একজন বস্তিবাসী পরিবার নিরাপদ পানির অধিকার পেল কিনা এসব দিয়ে বিচার করা উচিত।
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষের জীবনে আলো নিয়ে আসে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট পাসের আগে সরকারের উচিত উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর কথা নতুনভাবে ভাবা এবং বাজেটে তাদের জন্য দৃশ্যমান, কার্যকর ও মানবিক প্রতিফলন ঘটানো। রাষ্ট্রের শক্তি বড় প্রকল্পে নয়; রাষ্ট্রের মহত্ত্ব প্রকাশ পায় দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উপায় খোঁজা ও বাস্তবায়ন করে।
ইকবাল জিল্লুল মজিদ: পরিচালক, কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার