আমাদের মধ্যে বরাবরই দ্বিচারিতা কাজ করে! যুগ যুগ ধরে অনেক মহৎ ইতিহাস গড়েছেন আমাদের পূর্বপুরুষ। উত্তরপুরুষ আমরা পূর্বপুরুষের সৃজিত চেতনাকে ক্রমাগত লাঞ্ছিত করেছি। খ্রিস্টপূর্ব যুগে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিদেশী আর্য আগমন রুখে দিয়েছিল অসাধারণ বীরত্বে, আবার উত্তর ভারতের মৌর্য ও গুপ্ত রাজাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে তেমন ভূমিকা রাখিনি। সাত শতকে শত বছরব্যাপী মাৎসন্যায়ের অন্ধকার আমরাই সৃষ্টি করেছি। আবার গণতান্ত্রিক বোধ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পাল রাজত্বের পত্তনে এ বাঙালিই গৌরবময় ভূমিকা রেখেছে। এগারো শতকে বিদেশী সেন ব্রাহ্মণদের আধিপত্যবাদী ক্ষমতা দখলকে যে পূর্বপুরুষ নীরবে মেনে নিয়েছিলেন তাদেরই উত্তরপুরুষ আত্মরক্ষার জন্য মুসলিম শাসকদের আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যে বাঙালি পূর্বপুরুষ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাদেরই উত্তরপুরুষ ইংরেজ শাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। আর এ দ্বিচারিতার নষ্ট ঐতিহ্য এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।
মুক্তিযুদ্ধের আগের কথা বলছি। আমার এক আত্মীয় একটি হাই স্কুলের হেডমাস্টার। বেশ জনপ্রিয়। তার একটি বক্তব্য এখনো আমার মনে রেখাপাত করে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘ইংরেজি ভালো না জানলে তাকে আমি শিক্ষিতই বলব না।’ আমি সেই ছোট বয়সে ভারি অবাক হয়েছিলাম। একটি ভাবনা এসে মাথায় জট পাকিয়েছিল। আমরা তখন বড়দের সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে ফুল হাতে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে যাই। বাংলা ভাষার পক্ষে কত বিজ্ঞজন কত বক্তৃতা করতেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের কথা মনে পড়ে। ইংরেজি ছাড়া যদি শিক্ষিত হওয়া না যায় তবে ভাষাসৈনিকরা মায়ের ভাষা বাংলার জন্য জীবন দিলেন কেন? আবার সংবিধানে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার কথা বলা হলেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার ভাষা কেবল ইংরেজি হবে কেন! এমন নানা বিচারবোধ দেখে মনে হয় আমরা প্রকৃতপক্ষেই যেন একুশের চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি।
২০১৬-তে প্রথম প্যারিস যাই। দুদিনের মধ্যেই বেশ বিরক্ত হয়ে গেলাম। কোথাও ইংরেজির চল নেই। ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশ না জানলে চলা মুশকিল। কেউ এক বর্ণ ইংরেজি দিয়ে এ পরদেশীকে সাহায্য করে না। রাস্তার সাইনবোর্ড থেকে খাবারের প্যাকেট—কোথাও ইংরেজির বালাই নেই। সবচেয়ে বিরক্ত হলাম বিশ্ববিখ্যাত ল্যুভ জাদুঘরে গিয়ে। প্রদর্শনীতে রাখা সুবিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের সৃষ্টি দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। অথচ সব পরিচিতি ফরাসি ভাষায়। সন্ধ্যায় আমার হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললাম। চৌকস শিক্ষিত ফরাসি মঁসিয়ে। বললাম, তোমরা এত রক্ষণশীল কেন! আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি, একে জাদুঘরেও জায়গা দাওনি! উত্তরটি মনে গেঁথে গেল। বলল, দেখো আমাদের যে উন্নত বিশ্বের দেশ বলো, তা তো আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে। আমরা নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার কারণেই আজকে উন্নত বিশ্বের একটি দেশের গর্বিত অধিবাসী। আমাদের আশঙ্কা, আজ যদি আন্তর্জাতিক ভাষার অজুহাতে ইংরেজি ব্যবহারের সুযোগ দিই তবে দুর্বল হয়ে পড়বে আমার ভাষা ও সংস্কৃতি। আর এতে দুর্বল হবে আমাদের দেশ। এমন ঝুঁকি আমরা নিতে পারব না।
আমার চকিতে মধ্যযুগের বিশ্বসভ্যতার কথা মনে পড়ল। সে যুগের গল আজকের ফ্রান্স তখন গভীর গ্রাম। সামান্য প্রাথমিক শিক্ষাও ছিল না। পরে নবম শতকে শার্লামেন নামের একজন রাজা বসলেন গলের সিংহাসনে। তিনি প্রথমে চার্চগুলোর ভেতরে প্রাথমিক স্কুল খুললেন। শিক্ষার যাত্রা শুরু হলো। ১০ শতকের শেষ বা ১১ শতকের শুরুতে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলো। এরপর মাতৃভাষাকে মর্যাদা দিয়ে এগিয়ে চলা।
মনে পড়ল আমাদের ইতিহাস। ফ্রান্সে যখন প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে, এর সহস্র বছর আগে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছে। আর নয় শতকের মধ্যে আমাদের দেশে একাধিক বৌদ্ধবিহারকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। অথচ এর পর থেকে আমরা ধীরে ধীরে স্বাজাত্য বোধকে বিসর্জন দিয়েছি। নানা জাতির আক্রমণ-আধিপত্যে প্রতিরোধ যেমন গড়েছি, আবার নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভীষণ উদারতায় লাঞ্ছিতও করেছি। সবচেয়ে বড় সংকট হয়েছে ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে। ওরা ইংরেজি ভাষাকে শিক্ষিত এলিট শ্রেণীর মগজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিয়েছে। শিখিয়েছে ইংরেজি ছাড়া মুক্তি নেই। আর তা প্রবলভাবে বহন করছি এ যুগেও আমরা। শুধু আমরা নই, পৃথিবীর যত দেশে ইংরেজরা উপনিবেশ বানিয়েছিল, সব দেশের মানুষের ‘শিক্ষিত’ এলিট শ্রেণীর বড় অংশ এভাবেই ইংরেজির দাসত্ব মেনে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিকৃত করছে। কেউ কেউ বলছেন, দ্বিতীয় একটি ভাষা শেখায় অন্যায় তো নেই, লাভ আছে বরঞ্চ। বিলক্ষণ, এতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চাকে সর্বাধিক মূল্য না দিয়ে অন্য ভাষাচর্চাকে অধিক গুরুত্ব দেয়ায় একটি অসুস্থ ও স্বার্থপর মানসিকতা কাজ করে। আর অমন মানসিকতার বীজ উপ্ত হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসন আমল থেকেই। যে কারণে আমার সেই স্বর্গীয় আত্মীয় হেডমাস্টার ইংরেজি না জানা মানুষকে শিক্ষিতই বলতে চাননি।
আজকে অমন অসুস্থ মানসিকতার ধারাবাহিকতা যারা বহন করেন তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে হয়, আমাদের অনেক পরে সভ্যতা গড়ে তোলা ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানির মতো দেশগুলো নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি লালন করে এগিয়ে যাচ্ছে কেমন করে? ইউরোপের অনেক দেশ কি শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আশায় যুগে যুগে আমাদের দেশে আসেনি? প্রাচীন বাংলায় চীনের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আমাদের বিহারকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবাধে এসেছেন। চীন-জাপানের মতো দেশগুলো এ যুগেও নিজ ভাষার চর্চা করে বিশ্বকে অর্থনৈতিকভাবে শাসন করছে না?
নিজ ভাষাকে অবজ্ঞা করে অন্য ভাষায় দক্ষ হয়েও প্রাজ্ঞ হওয়া যায় না। ইংরেজি চর্চা করা প্রাজ্ঞ বাঙালিও ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন বাংলায়, নানা ভাবনা-পরিকল্পনাও মগজের কোষে কোষে বাংলাতেই ছোটাছুটি করে। পরে তিনি তা প্রকাশ করতে চান বিদেশী ভাষায়। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সনাতন ধারায় বাংলা মাধ্যমেই পড়াশোনা করেছেন। তাদের মধ্যে মেধাবী যারা উচ্চশিক্ষার জন্য পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে, নানা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সাফল্য দেখিয়ে আসছেন। নিজ ভাষায় সবল থাকলে অন্য ভাষা, বিশেষ করে আমাদের সবচেয়ে চেনা ভাষা ইংরেজি আয়ত্তে আনা কঠিন কিছু নয়। এর জন্য বাংলা বিসর্জন দিয়ে সম্ভ্রান্ত হওয়ার তেমন কারণ নেই।
সম্ভবত বছর চারেক আগে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে ইতিহাস একাডেমি, ঢাকার উদ্যোগে আন্তর্জাতিক ইতিহাস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। একটি সেশনে আমি সভাপতিত্ব করছিলাম। কলকাতার তিনজন গবেষক প্রবন্ধ পড়লেন। আমি বাংলা ভাষায় লেখা একজনের প্রবন্ধের ভাষা ও বানান ভুল নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। কমন উত্তর পেলাম। বাংলা বেশি চর্চা করা হয় না তাই...। বললাম, মাতৃভাষায় দুর্বল থেকে আপনি অন্যের ভাষায় কী করে সবল হবেন?
নানা ভাষা শিখতে পারা তো কৃতিত্বের বিষয়। বাংলা ভাষায় জড়িয়ে থাকা প্রচুর বিদেশী শব্দ আমার ভাষাকেই সমৃদ্ধ করেছে। তাই বলে নিজের ভাষা শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে যারা আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চান তাদের দশা তো হবে না ঘরকা না ঘাটকা। আজকাল টিভি চ্যানেল ও নানা নামের রেডিওতে বাংলা ও ইংরেজির অদ্ভুত মিশেলে অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করে বণিক বুদ্ধির এবং দুর্বল সাংস্কৃতিক বোধের মিডিয়া পরিচালকরা বাংলা ভাষার বক্ষ বিদীর্ণ করছেন। উচ্চ আদালয় রায় দিয়েও এদের নিবৃত্ত করতে পারছেন না।
আমি অনেক দিন থেকে ঐতিহ্য বিকৃতি আর ইতিহাস হারিয়ে ফেলার কথা বলে আসছি। আমি যখন বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী প্রমুখ নেতার ছবি দেখি তখন বুঝতে পারি তারা বাঙালি সংস্কৃতির নিয়ম মেনে প্রত্যুষকে একুশের প্রথম প্রহর মানতেন আর নগ্ন পায়ে প্রভাতে প্রভাতফেরি নিয়ে শহীদ মিনারে যেতেন। এখন তাদেরই উত্তরসূরিরা অর্থাৎ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাশ্চাত্যের প্রথা মেনে মধ্যরাতকে একুশের প্রথম প্রহর মানতেন। মধ্যরাতে ‘প্রভাতফেরি’ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করতেন। যখন স্বৈরাচার এরশাদ নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে প্রভাত থেকে প্রভাতফেরিকে মধ্যরাতে নামিয়ে আনলেন তখন অনেকেই হায় হায় করেছিলাম। অথচ আমরা ক্ষমতাবানরা এরপর থেকে অবলীলায় স্বৈরাচারকেই অনুসরণ করতে থাকলাম। অথচ একবারও ভাবলাম না এতে একুশের ঐতিহাসিক সত্য ও সংস্কৃতি বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। প্রভাতফেরি নামটি থেকে যাচ্ছে অথচ প্রজন্ম প্রভাত খুঁজে পাচ্ছে না। আরো সংকট বড় হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের মানুষ ভাষা দিবস উদযাপনের সময় উৎস দেশটিকে অনুসরণ করতে চাইবে। আমরা মধ্যরাতের প্রভাতফেরির ভুল সংস্কৃতি নির্দেশ করছি। একটি মাত্র জাতীয় দিবস যার সঙ্গে ‘প্রভাতফেরি’ নামটি জড়িয়ে আছে। আমরা স্বাধীন দেশে অচেনা করে দিচ্ছি এ সংস্কৃতিকে। অথচ কী আশ্চর্য! এতে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন না ভাষাসৈনিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। চাইলেও স্থানীয় প্রশাসন-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রভাতে প্রভাতফেরি করতে পারছেন না। কারণ তাদের প্রশাসনের মাথারা মধ্যরাতে আসেন।
আমি বহু অনুরোধ-উপরোধ আর দাবি জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামান্য মন গলিয়েছিলাম। মধ্যরাতের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেও জাবি প্রশাসন জনাকয়েক হলেও রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে আমাদের সঙ্গে প্রভাতফেরি করে আসছেন। শিক্ষার্থীদেরও উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। মধ্যরাতের আয়োজন সম্পন্ন করে সংখ্যায় অল্প হলেও কোনো কোনো সংগঠনের ছেলেমেয়েরা প্রভাতফেরি করছে। কিন্তু চেতনা খুব জাগাতে পেরেছি মনে হয় না। কারণ মধ্যরাতকে ওরা বর্জন করতে পারেনি। ছাত্র সংগঠনগুলোর ছেলেদের মুখেই শুনেছি, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাকি কথা দিয়েছিলেন চেষ্টা করবেন মধ্যরাতের বদলে প্রভাতেই প্রভাতফেরি করতে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখেছি ‘চেষ্টায়’ তিনি সফল হননি।
আমাদের পূর্বপুরুষ বুকের রক্ত দিয়ে ঐতিহ্য গড়ে দিলেও আমরা সচেতনভাবেই যেন একুশের চেতনা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। আমাদের চৈতন্য থেকে একুশের চেতনা যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়