বিনিয়োগ

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি সংবাদ শিরোনামে আধিপত্য বিস্তার করলেও বৈশ্বিক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে কেবল এ শক্তিই একমাত্র নিয়ামক নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি সংবাদ শিরোনামে আধিপত্য বিস্তার করলেও বৈশ্বিক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে কেবল এ শক্তিই একমাত্র নিয়ামক নয়। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার অনেক আগে থেকেই নতুন বিনিয়োগের ধরন বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রকে পুনর্গঠিত করে আসছিল।

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহের দিকে তাকালে এ পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়ার একটি বৃহৎ অংশে এফডিআই প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে আফ্রিকায় এফডিআই প্রবাহ ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার হয়েছে।

এ প্রবণতার পেছনে রয়েছে বহুজাতিক সরবরাহ চেইনে একটি ব্যাপক পুনর্গঠন, যা ধারাবাহিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্য আমেরিকার দিকে স্থানান্তর হচ্ছে। ফলস্বরূপ, এফডিআইয়ের বিন্যাসেও পরিবর্তন আসছে: যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও চীন বৃহত্তম বহির্গামী বিনিয়োগকারী হিসেবে বহাল থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য এখন এফডিআইয়ের একটি প্রধান উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের আর্থিক প্রসার এবং চীনা ‘গ্রিনটেক’ বিনিয়োগ

জ্বালানি তেলের আয়ে সমৃদ্ধ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলো বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২২ ও ২০২৩ সালে আফ্রিকায় প্রায় ১১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা মহাদেশটিতে তাদের অর্থনৈতিক পদচিহ্ন নাটকীয়ভাবে প্রসারিত করেছে। এ পুঁজির সিংহভাগই মূলত লজিস্টিকস ও অবকাঠামো প্রকল্প যেমন বন্দর, বিমানবন্দর এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের পাশাপাশি তেল ও গ্যাস খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

বিশেষ করে সবুজ বিনিয়োগের (গ্রিন ইনভেস্টমেন্ট) ক্ষেত্রে মনোযোগের কেন্দ্র দ্রুত চীনের দিকে সরে যাচ্ছে। নিট জিরো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি ল্যাবের একটি নতুন প্রতিবেদনে চীনা বহির্গামী এফডিআইয়ের ব্যাপকতা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে কীভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (ক্লিন এনার্জি) দিকে চীনের মনোযোগ তার অর্থনৈতিক প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলছে।

২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘোষিত চীন সমর্থিত ৪৬১টি গ্রিনটেক ম্যানুফ্যাকচারিং প্রকল্পের একটি ডাটাবেজের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি দেখায় যে ২০২২ সাল থেকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ৫৪ দেশের ৩৮৭টি প্রকল্পে ২২ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বৃহৎ ব্যাটারি কারখানা, নতুন জ্বালানির যানবাহন, চার্জিং অবকাঠামো এবং এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ের গ্রিন হাইড্রোজেন স্টার্টআপ।

প্রতিবেদন অনুসারে, চীনা বিনিয়োগগুলো মূলত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার সুবিধা (মার্কেট অ্যাকসেস) এবং নির্ভরযোগ্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এ ধরনের প্রকল্পগুলোর প্রধান গন্তব্য আসিয়ান দেশগুলো হলেও ২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অংশীদারত্ব দ্রুত বেড়ে ২০ শতাংশ অতিক্রম করেছে; লাতিন আমেরিকা এবং মধ্য এশিয়াও চীনা এফডিআইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আকর্ষণ করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনা এফডিআইয়ের এ ঢেউ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না, বরং এটি আসছে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে, যারা রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে বড় ঋণ বা আতিথেয়কারী সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করছে না। যেমনটি গবেষণার একজন লেখক মন্তব্য করেছেন, ‘চীনা সরকারি কর্মকর্তারা নিজেরাই হয়তো বিদেশে এ বেসরকারি খাতের সবুজ বিনিয়োগের সম্পূর্ণ পরিসর এবং সম্মিলিত মোট পরিমাণ সম্পর্কে অবগত নন।’

নতুন কৌশলগত পর্যায় ও আতিথেয়কারী দেশের করণীয়

এ সম্মিলিত অগ্রগতি চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রসারে একটি নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দেয়। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) বিপরীতে মুনাফাভিত্তিক এসব বিনিয়োগ সরবরাহকেন্দ্রিক চাপ (Supply-side pressures)—যেমন চীনের অভ্যন্তরে শিল্পের অতিরিক্ত সক্ষমতা—এবং চাহিদাকেন্দ্রিক গতিশীলতা (Demand-side dynamics) উভয়কেই প্রতিফলিত করে। এর মধ্যে গ্রহীতা দেশগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের পরিবর্তে সংযোজিত মূল্য উৎপাদনের (Value-added processing) সঙ্গে বাজার সুবিধা যুক্ত করছে।

যেহেতু এ প্রকল্পগুলোর পূর্ণ প্রভাব কয়েক বছর পরে স্পষ্ট হবে, তাই অনেক পর্যবেক্ষক—বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয়—অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকতে পারেন। চীনা রফতানি এবং নিষ্কাশনমূলক বিনিয়োগকে প্রায়ই গ্রহীতা দেশগুলোর শিল্পায়নের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান উৎপাদনমুখী এফডিআই প্রবাহে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বৃহত্তর উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি সীমিত প্রযুক্তি হস্তান্তরও রূপান্তরমূলক প্রমাণ হতে পারে, যা পরিচ্ছন্ন শক্তির স্থানান্তরকে দ্রুততর করবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের রূপ বদলে দেবে।

তবে চীন যে দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়, তা নিশ্চিত। এফডিআই—তা পশ্চিম, চীন বা উপসাগরীয় অঞ্চল যেখান থেকেই আসুক না কেন—তা মুনাফা দ্বারা চালিত এবং কখনো কখনো এটি সুবিধাবাদী মুনাফা অনুসন্ধান (রেন্ট-সিকিং) দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়। এটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা দিতে পারে, তবে এটি ঝুঁকিও বহন করে: পরিবেশের অবনতি, বাস্তুচ্যুতি, শ্রম শোষণ, মুনাফা প্রত্যর্পণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষতি এবং ব্যয়বহুল কারিগরি ফি বা রয়্যালটি। যখন প্রত্যাশিত সংযোগ এবং ফলস্বরূপ বহিঃপ্রবাহ (স্পিলওভারস) ব্যর্থ হয়, তখন সুবিধাগুলো অত্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে।

সর্বদাই, আতিথেয়কারী দেশগুলো কর্তৃক গৃহীত নীতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আশার কথা হলো, কিছু রফতানিমুখী উন্নয়নশীল অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া থেকে শিক্ষা নিয়েছে, যেখানে সরকার বিনিয়োগের শর্ত হিসেবে চীনা সংস্থাগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে আরো বেশি সংযোজিত মূল্য উৎপাদন (বিশেষত নিকেল প্রক্রিয়াকরণে) করতে বাধ্য করেছে। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে বেশ কয়েকটি সরকার স্থানীয় উৎপাদন এবং জ্ঞান হস্তান্তরের ওপর অধিক জোর দিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ওপর অনুরূপ প্রয়োজনীয়তা আরোপের চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিলে কনজিউমার ইলেকট্রনিকস কোম্পানি লেনোভো স্থানীয় ডিজিটাল বুদ্ধিমান উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে।

তবে ইন্দোনেশিয়ার আপেক্ষিক সাফল্যও উচ্চ বাস্তব মজুরি এবং উন্নত কর্মপরিবেশের দিকে নিয়ে যায়নি। এফডিআইকে স্বাগত জানানোই যথেষ্ট নয়; সুবিধাগুলো যেন ব্যাপকভাবে ভাগ করে নেয়া যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য আতিথেয়কারী দেশগুলোর শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, সরকারি হস্তক্ষেপ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত বান্দুং সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল একই দাবি, যা একটি ন্যায্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল।

উল্লেখ্য, চীনা সরকারের ওয়েবসাইটে এখনো সেই প্রস্তাবের উদ্ধৃতি দেয়া হয়। কিন্তু বান্দুং সম্মেলনের ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আহ্বান পূরণ করতে কেবল মুনাফাচালিত বিনিয়োগের চেয়েও বেশি কিছুর প্রয়োজন। এর জন্য এমন সরকার দরকার যারা বাজারকে কেবল শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নয়, সমাজের সামগ্রিক স্বার্থে পরিচালনার জন্য একত্রে কাজ করতে ইচ্ছুক।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

জয়তী ঘোষ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট; ক্লাব অব রোমের রূপান্তরমূলক অর্থনীতি কমিশনের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক করপোরেট কর সংস্কারের জন্য স্বাধীন কমিশনের কো-চেয়ার

আরও