২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ দিনে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন প্রায় ১২ কোটি ডলার। তার আগেই ইতিহাস গড়া হয়ে গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
কিন্তু এ সংখ্যার পেছনে যারা আছেন, তাদের কেউ সেদিনও বেতন না পেয়ে, কেউ ঋণের কিস্তি গুনে, কেউ বা যুদ্ধের সাইরেনের শব্দে দিন কাটাচ্ছিলেন। প্রশ্নটা সরল: যারা অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, রাষ্ট্র তাদের জন্য কতটা ভূমিকা রাখে?
প্রবাসী বা বিদেশ গমনেচ্ছুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি কম দেয়নি, ফারাক ঘটেছে খাতা আর বাস্তবতার হিসাবে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার দালালমুক্ত ব্যবস্থা, ব্যয় হ্রাস ও প্রবাসীদের মর্যাদার অঙ্গীকার করেছিল। অর্জনও আছে: প্রবাসীদের ভোটাধিকারের স্বীকৃতি, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রথম শ্রম চুক্তি, জাপানে পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর সমঝোতা, বিমানবন্দরে দুটি প্রবাসী লাউঞ্জ, অনলাইন প্লাটফর্ম।তবে মূল রোগে হাত পড়েনি
টাকার অংকে গত অর্থবছরের রেমিট্যান্স প্রায় ৪ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন হিসাবে এটি জিডিপির সাড়ে ৬-৭ শতাংশ এবং আমদানি ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক মেটানোর মতো বৈদেশিক মুদ্রা জোগায়। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ উপাত্তে (২০২৫) ভারত, মেক্সিকো, ফিলিপাইন, মিসর, পাকিস্তান ও ফ্রান্সের পরই রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।
এ অবস্থান যাদের হাতে গড়া, সেই যোদ্ধা আসলে কতজন? নিখুঁত উত্তর কারো কাছে নেই। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে ২০০৪ সাল থেকে ১ কোটি ৪৪ লাখের বেশি মানুষ কর্মসংস্থান নিয়ে বিদেশে গেছেন। তবে একই ব্যক্তি একাধিকবার গণনায় আসেন, ফেরত কর্মীর হিসাবও নেই। তাই বিদেশে থাকা কর্মী ও প্রবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখের মধ্যে বলা হয়।
আয়ের ভিত্তিও বড় সংকীর্ণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশগামী ১০ লাখ ১২ হাজার কর্মীর ৬ লাখ ৭১ হাজারই গেছেন সৌদি আরবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রেমিট্যান্সের ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে উপসাগরীয় ছয় দেশ থেকে।
রেমিট্যান্স যোদ্ধার যুদ্ধ শুরু হয় বিমানবন্দরে ওঠার আগেই। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও সিঙ্গাপুরের মতো গন্তব্যে নিম্নদক্ষ কর্মীর অভিবাসন ব্যয় এখন ৪-১০ লাখ টাকা, যা সরকার নির্ধারিত সীমার তিন-চার গুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২০ সালের জরিপে গড় ব্যয় ছিল ৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা, যা তুলতেই লাগে প্রায় ১৮ মাসের আয়। ভিসা-বাণিজ্য, দালাল আর এজেন্সি সিন্ডিকেটের কারণে জমি বেচে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে অনেক পরিবার বিমানে ওঠার আগেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
তারপর আছে মজুরি-চুরি আর এক নিয়োগকর্তায় বাধা ওয়ার্ক পারমিট। চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে এ ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়েছে। এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ৯০০ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, হাজার হাজার কর্মী আটকে পড়েছেন।
মে মাসে গবেষণা সংস্থা আরএমএমআরইউ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, লেবাননে অন্তত পাঁচ হাজার বাংলাদেশী কাজ হারিয়েছেন এবং উপসাগরে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। মৃত্যু যেন নীরব মহামারী। সংসদে মন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ হাজার ৩১২ জন প্রয়াত কর্মীর পরিবার সরকারি সহায়তা পেয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪টি পরিবারে শোকের খবর পৌঁছেছে।
প্রবাসী বা বিদেশ গমনেচ্ছুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি কম দেয়নি, ফারাক ঘটেছে খাতা আর বাস্তবতার হিসাবে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার দালালমুক্ত ব্যবস্থা, ব্যয় হ্রাস ও প্রবাসীদের মর্যাদার অঙ্গীকার করেছিল। অর্জনও আছে: প্রবাসীদের ভোটাধিকারের স্বীকৃতি, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রথম শ্রম চুক্তি, জাপানে পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর সমঝোতা, বিমানবন্দরে দুটি প্রবাসী লাউঞ্জ, অনলাইন প্লাটফর্ম।
তবে মূল রোগে হাত পড়েনি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অভিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা নিজেই স্বীকার করেন, দালালনির্ভর ব্যবস্থার গভীরে পৌঁছানো যায়নি। দুই শতাধিক লাইসেন্স বাতিলের পর প্রায় সমসংখ্যক নতুন লাইসেন্স দেয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা আড়াই হাজারের আশপাশেই ছিল। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের শ্রমবাজারও খোলেনি।
নির্বাচিত সরকারের নতুন উদ্যোগও আছে: জুনে অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল, সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৩৬ সদস্যের জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি, বাজেটে ডিজিটাল ‘প্রবাসী কার্ড’ ও ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা অব্যাহত রাখার ঘোষণা। অথচ একই প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে। কল্যাণ কার্যক্রমের বড় অংশ চলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল থেকে, যা প্রবাসীদের নিজেদেরই টাকায় গড়া।
প্রবাসীদের পাঠানো ডলারকে বৈধ পথে রাখাও রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। হুন্ডি ঠেকাতে কেবল প্রশাসনিক কঠোরতা যথেষ্ট নয়; বৈধ পথকে হতে হবে সস্তা, দ্রুত ও সহজ। ২০২২ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, মাত্র ৫১ শতাংশ রেমিট্যান্স আসে বৈধ পথে।
বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা বলছে, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বিনিময় হারের ব্যবধান ১ শতাংশ বাড়লে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ রেমিট্যান্স বৈধ পথ থেকে সরে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর হুন্ডি চক্রের ওপর চাপ বাড়ায় ও ডলারের দর বাজারের কাছাকাছি আসায় ব্যবধান কিছুটা কমেছে; বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেকর্ড প্রবাহের পেছনে এটি বড় কারণ।
খরচও বাধা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর গড় মোট খরচ ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশের চেয়েও বেশি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩ শতাংশের দ্বিগুণেরও বেশি।
সমস্যার ভেতরেই অবশ্য লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা। বছরে ১০ লাখের বেশি কর্মী পাঠানো হলেও তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নিম্ন দক্ষ। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, বছরে ১২-১৩ লাখ কর্মী পাঠানোর দরকার নেই; কম কিন্তু দক্ষ ও সুরক্ষিত কর্মী গেলে রেমিট্যান্স স্থিতিশীল থাকে, ঋণের বোঝাও কমে।
দক্ষতা বাড়লে মজুরি ও দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ে, শোষণের ঝুঁকি কমে। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের সংখ্যার চেয়ে গুণগত মান বাড়ানোই এখন আসল সম্ভাবনা।
তাহলে এখন কী করতে হবে? সংকেত ইতিবাচক, কিন্তু পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নে। আমার বিবেচনায় নয়টি পদক্ষেপ জরুরি।
সিন্ডিকেট ভাঙা: নিয়োগ হোক সরকারি ডেটাবেজ ও যাচাই করা চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে; এজেন্সির ফি মিলুক কর্মী কাজে যোগ দেয়ার পর; সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে হোক; ভিসা-বাণিজ্য বন্ধে গন্তব্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চাপ বাড়ুক।
জামানতবিহীন অভিবাসন ঋণ: প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কম সুদের ঋণসহ সরকারিভাবে বিশেষ রিফাইন্যান্স স্কিম পরিবারগুলোকে মহাজনের থাবা থেকে বাঁচাবে।
দক্ষতা ও বাজার বহুমুখীকরণ: ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষক, যন্ত্রপাতি ও ভাষা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের দক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশ জরুরি; সৌদি-নির্ভরতা কমাতে হবে।
সংকটকালীন তহবিল: যুদ্ধ-দুর্যোগে আটকে পড়া ও ফেরত কর্মীদের জন্য জাতীয় বাজেট থেকে আলাদা বরাদ্দ, উপসাগরীয় দূতাবাসে ২৪ ঘণ্টার বাংলা হটলাইন, মজুরি-চুরির দ্রুত নিষ্পত্তি ও পুনর্বাসন প্যাকেজ চাই।
পরিবার ও সম্পত্তির সুরক্ষা: ইউনিয়ন ও উপজেলায় প্রবাসী সহায়তা ডেস্ক, ভূমি-বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির বিশেষ ব্যবস্থা এবং জমি হস্তান্তরের চেষ্টা হলে প্রবাসী মালিকের কাছে এসএমএসে সতর্কবার্তা পাঠানো দরকার।
তথ্যের স্বচ্ছতা: প্রস্থান ও প্রত্যাবর্তনের একক ডিজিটাল রেজিস্ট্রি এবং কে কোথায় আছেন, তার রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড চাই; না হলে সংকটে উদ্ধার পরিকল্পনা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতোই থাকবে।
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ও স্মার্ট প্রণোদনা: বৈধ ও খোলা বাজারের ব্যবধান দুই-তিন টাকার মধ্যে রাখতে হবে। ঢালাও নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি রেমিট্যান্সের পরিমাণ অনুযায়ী পয়েন্টভিত্তিক সুবিধা, যেমন বিমান ভাড়া বা পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ে বিশেষ ছাড ও জীবন বীমা চালু করা যেতে পারে।
প্রযুক্তিতে সহজ পথ: পাসপোর্টভিত্তিক ই-কেওয়াইসিতে দেশে না এসেই ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব খোলার সুযোগ ওপেন করে দিতে হবে। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতাদের আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একক জাতীয় রেমিট্যান্স এপিআই হাব এবং বিএফআইইউর ডেটা-বিশ্লেষণনির্ভর নজরদারিতে হুন্ডি ও বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার শনাক্তও জরুরি। প্রযুক্তির সহায়তায় ই-কেওয়াইসি ও হারের ব্যবধান কমানো এক থেকে তিন মাসেই সম্ভব; হাব ছয় থেকে ১২ মাসের কাজ।
রেমিট্যান্স থেকে বিনিয়োগ: রেমিট্যান্সের রেকর্ডভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরে পরিবারের জন্য গৃহ, কৃষি ও ব্যবসা ঋণ; প্রবাসী বন্ড ও ট্রেজারি বিল অ্যাপে কেনার সুযোগ; ‘প্রবাস’ পেনশনের কিস্তি রেমিট্যান্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাটার ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে রেমিট্যান্স কেবল ভোগে ফুরিয়ে না যায়।
পরিশেষে, ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার কেবল একটি সংখ্যা নয়। এর প্রতিটি ডলারে মিশে আছে কারো জমি বেচার দীর্ঘশ্বাস, কারো ঘরে ফেরার প্রতীক্ষা। ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ উপাধি হাততালি পাওয়ার জন্য যথেষ্ট, অধিকার পাওয়ার জন্য নয়।
ব্যাংক খাত যদি খরচ, গতি ও সুবিধায় হুন্ডিকে হারাতে পারে, আর রাষ্ট্র যদি ন্যায্য খরচে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ, প্রবাসে নিরাপত্তা ও দেশে ফেরার পর সম্মান নিশ্চিত করে, তবে প্রবাসীরা বৈধ পথেই দেশকে বেছে নেবেন। যোদ্ধারা রণাঙ্গনে একা লড়েন না, তাদের পেছনে দাঁড়ায় একটি রাষ্ট্র। প্রবাসীদের পেছনে সেই রাষ্ট্র কি দাঁড়াবে?
এমএম মাহবুব হাসান: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক