রাত যত গভীর হয়, মেঘমুক্ত অন্ধকার আকাশে তারারা তত জ্বল জ্বল করে ওঠে। বিজ্ঞানের কল্যাণে বিশাল আকাশের বিস্তৃত অন্ধকার ও তারকারাশির সমীকরণ বিষয়ক অনেক কিছু জানা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীতে যারা স্পটলাইটে এসেছেন, প্রকাশিত হয়েছেন আলোর মতো, যাদের নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে তারকা তকমা, বিশ্বখ্যাত মাইকেল জ্যাকসন থেকে মেরিলিন মনরো কিংবা বাংলার ডলি আনোয়ার থেকে সালমান শাহ—এসব তারকার মৃত্যু বিষয়ে কিছুই ঠাহর করা যায়নি আজ পর্যন্ত। লাইমলাইটে আমরা তারকাদের দেখেছি কেবল কিন্তু আলোর চারপাশে ঘনীভূত অন্ধকারে ঘটে যায় কত ঘটনা, তা থেকে যায় আমাদের জানার অন্তরালে। প্রত্যেক তারকার উদ্ধারকৃত লাশ মনে করিয়ে দেয় অগণিত তারকার অমীমাংসিত মৃত্যুগল্প। বিগত বছরের ২ নভেম্বর টেলিভিশন নাটকের সুপরিচিত মুখ, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ চলচ্চিত্রের তরু আপা ওরফে হুমায়রা হিমুর হঠাৎ মৃত্যু অমীমাংসিত মৃত্যুর সাগরে ঢেউ তুলে যায়। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এ বছরের শুরুতেই, ৫ জানুয়ারি, মডেল, অভিনয় জগতের উদীয়মান মুখ তানজিম তাসনিয়ার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ তার নিজ বাসভবন থেকে। এরপর সম্প্রতি এ তালিকায় যোগ হলো দেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাদি মহম্মদের নাম। শোনা যায়, কাজের স্বীকৃতি না পাওয়ার অভিমান ছিল সাদি মহম্মদের। যে অভিমানে আগেও তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
মৃত্যু স্বাভাবিক নিয়মে শোকের হয়। কিন্তু হত্যা বা আত্মহত্যা বরাবরই দুঃখজনক, আতঙ্কের ও অকামনীয়। আবার এমন মৃত্যু থেকে অনেক সময় উঠে আসে নানান চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা মানুষকে আশ্চর্যান্বিত করে, হতবাক করে দেয়। তবুও অহর্নিশ ঘটে চলছে গোপন মৃত্যুর ঘটনা। তারকারা গণমাধ্যমের নাগালে থাকে বলে তাদের মৃত্যুর খবর অতি দ্রুত চাউর হয়ে যায়। কিন্তু এমন মৃত্যুর পেছনে কারণ কী?
কোন বিপন্ন বিস্ময় মানুষের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে তা কবি জীবনানন্দ দাশও যেমন নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি, বলতে পারেননি পৃথিবীখ্যাত দার্শনিকরাও। তবুও কিছু তত্ত্ব প্রচলিত আছে যেগুলোকে আত্মহননের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের ‘আত্মহত্যার তত্ত্ব’ সর্বাধিক আলোচিত হয়ে আসছে। তবে এ প্রসঙ্গে ফ্রেডরিক নিৎসের নিহিলিজমকে আলোচনায় না আনা সমীচীন হবে বলে মনে হয় না। তাই কয়েকটি সরল বাক্যে ডুর্খেইমের আত্মহত্যার তত্ত্বের কথা বলে এগিয়ে যাব নিৎসের নিহিলিজমের দিকে।
১৮৯৭ সালে সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের গবেষণালব্ধ বই ‘দ্য সুইসাইড’ প্রকাশিত হয়। ডুর্খেইমের সুইসাইডের তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, আত্মহত্যাকারী মানুষ সমাজের সঙ্গে খুব বেশি সম্পৃক্ত থাকে নয়তো খুব বেশি বিচ্ছিন্ন থাকে। তবে এই দুই শ্রেণীর মানুষই আত্মহত্যার আগে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, মানুষ থেকে, নিজের সত্তা থেকে নিজেকে। এ বিচ্ছিন্নতাবোধই একসময় ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক সংহতির বাঁধনটা খুলে ফেলে আত্মহননের পথে নিয়ে যায়। আর এমন বিচ্ছিন্ন মনোভাব তৈরি হয় অবিশ্বাস থেকে, চাওয়া-পাওয়ার অমিল থেকে। তাই হয়তো ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে ভারতীয় অভিনেত্রী সিল্ক স্মিতা আত্মহত্যা করেন, চিরকুটে লিখে যান মায়া, ভালোবাসাহীন জীবনের কথা, বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়ার কথা। সমাজের সঙ্গে অতিমাত্রার সম্পৃক্ততা তারকাদের জন্য নতুন কিছু নয়। খ্যাতির জৌলুসই শেষ কথা নয় তারকাদের আত্মহত্যা আমাদের সেই বার্তা বারবারই দিয়ে গেছে। বিদ্যা বালান অভিনীত সিল্ক স্মিতার বায়োপিক ‘দ্য ডার্টি পিকচার’-এ উঠে এসেছে সিল্কের অমসৃণ জীবনের করুণ সমাপ্তি। উল্লেখ্য, অবিশ্বাস মানুষের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়। যার পরিণতি হতে পারে স্বেচ্ছামৃত্যু।
এদিকে প্রচলিত বাংলায় হতাশাবাদকেই নিৎসের ভাষায় বলা হয় নিহিলিজম। হতাশাবাদ মূলত ফলাফল। মানুষ যখন নিজেকে খুঁজতে যায়, জগৎ সংসারের অর্থ খুঁজতে যায়, ঈশ্বরকে খুঁজতে যায় এবং ব্যর্থ হয় তখন তাদের কাছে সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। এ অর্থহীন (মিনিংলেস) মনে হওয়াটাই নিহিলিজম যেখান থেকে হতাশা তৈরি হয় এবং ভাইস-ভারসা। নিৎসে দুই ধরনের নিহিলিজম/নিহিলিস্টদের নিয়ে কথা বলেছেন,
১. অ্যাকটিভ নিহিলিজম/নিহিলিস্ট এবং
২. প্যাসিভ নিহিলিজম/ নিহিলিস্ট
যাদের কাছে সবকিছুই অর্থহীন, তারা প্রথম সারির মানুষ। অর্থাৎ এদের মধ্যে হতাশাবাদ সক্রিয়। পক্ষান্তরে যারা প্যাসিভ নিহিলিস্ট তাদের মধ্যে একধরনের মূল্যবোধ (ভেল্যু) সর্বদা বিরাজমান, যা হতাশাকে জীবনের ওপর চড়াও হতে দেয় না। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চলমান সময়ের তুখোড় অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে তৃতীয়বারেও প্রত্যাখ্যাত হয়ে জীবনের নিদারুণ কষ্টে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি চতুর্থ এবং শেষবারের মতো আরেকটি প্রচেষ্টার তাগিদে। বলা বাহুল্য, মনোজ বাজপেয়ীর জীবনে চরম হতাশার দিনে ‘অভিনয়’ ছিল তার বিশ্বাস এবং পাকাপোক্ত মূল্যবোধ যা তাকে জীবনের পথ থেকে ছিটকে যেতে দেয়নি। অর্থাৎ কিছুতে আস্থা রেখে জীবনযাপন করা মানুষ তুলনামূলক কম হতাশায় ভুগে থাকে, নিৎসের মতে।
যদিও বাস্তবিক পক্ষে শোবিজ অঙ্গনে সফলতার সমান্তরালে চলতে থাকে হতাশা। সফল হওয়ার নেশা যেমন মানুষকে পেয়ে বসে, তেমনি একে অন্যকে টপকে যাওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতাও দেখা যায়। অনেক সময় এ প্রতিযোগিতা সুস্থ-স্বাভাবিকও থাকে না। তাই বেশির ভাগ সময় তারকাদের আত্মহত্যায় হত্যার ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত থাকে। অভিনেত্রী মিতা নূর কি আসলেই স্বামীর পরকীয়ার জেরে আত্মহত্যা করেছিলেন? জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা স্বপ্নের নায়ক সালমান শাহ কেন আত্মহত্যা করবেন? সমসাময়িক নবাগতদের মধ্যে দ্রুতলয়ে বলিউডে জায়গা করে নেয়া সুশান্ত শিং রাজপুতই বা আত্মহত্যা করবেন কেন? এমন অহরহ প্রশ্ন দর্শকদের মনে ঘুরেফিরে আসতে থাকে। উল্লিখিত সকল তারকার আত্মহত্যা (!) নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। তাই তো শিরোনামের হেডলাইনে লেখা থাকে, ‘তারকার রহস্যজনক মৃত্যু’। আবার হত্যার শিকার হওয়া তারকার সংখ্যাও তো কম নয়। ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবের সামনে ঢাকাই চলচ্চিত্রের অভিনেতা সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করার গল্পে আজও গা শিওরে ওঠে, অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর বস্তাবন্দি লাশের কথা গায়ে কাঁটা হেনে যায়। কম-বেশি প্রতি বছরই এমন দুঃখজনক মৃত্যুর খবর দর্শকরা জানতে পারে, কেবল জানতে পারে না তারকার চারপাশে ঘনীভূত অন্ধকারে কী ঘটেছিল।
সাবরিনা স্বর্ণা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা