আলোকপাত

কৃষি ও শিক্ষা প্রসঙ্গে

কৃষি মানুষের আদিমতম পেশা। এর সঙ্গে তার অস্তিত্বের সম্পর্ক—যেমন ছিল শুরুতে তেমনি আছে আজও এবং কোনো না কোনো আঙ্গিকে এ যোগসূত্র নিরন্তর এভাবেই বজায় থাকবে। তবে বিজ্ঞান যদি কোনো দিন কোনো বিস্ময়কর ‘বড়ি’ আবিষ্কার করে, মাছ-ভাত, আলু-মুলা, আম-কাঁঠাল ও রসগোল্লা-সন্দেশকে আমাদের জীবনে ষোলো আনা অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়, তাহলে অন্য কথা। সভ্যতার

কৃষি মানুষের আদিমতম পেশা। এর সঙ্গে তার অস্তিত্বের সম্পর্কযেমন ছিল শুরুতে তেমনি আছে আজও এবং কোনো না কোনো আঙ্গিকে যোগসূত্র নিরন্তর এভাবেই বজায় থাকবে। তবে বিজ্ঞান যদি কোনো দিন কোনো বিস্ময়কর বড়ি আবিষ্কার করে, মাছ-ভাত, আলু-মুলা, আম-কাঁঠাল রসগোল্লা-সন্দেশকে আমাদের জীবনে ষোলো আনা অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়, তাহলে অন্য কথা। সভ্যতার ঊষালগ্নে মূলত কৃষির প্রয়োজনে এবং কাজে উত্কর্ষ সাধনের জন্যই আমাদের পূর্বপুরুষরা হাতের কাছে যা পেতেন তা নিয়েই নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিত্যনতুন জ্ঞান আহরণ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় কালের আবর্তে বিশ্বব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয়ে অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি সার্বিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মানুষের ক্রমবর্ধমান বৈষয়িক উন্নতি অগ্রগতির জন্য ব্যবস্থাই প্রথম প্রধান অবলম্বন।

কৃষিগর্ভে শিক্ষার উত্পত্তি হলেও বর্তমানে আমরা ইতিহাসের এমন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তামাম দুনিয়ায় কৃষি শিক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক দুটো বিষয় হিসেবেই গণ্য করা হয়। এজন্য সব দেশে কৃষি শিক্ষা আলাদা আলাদা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফুলে-ফলে বিকশিত হচ্ছে, তার পরও দুয়ের মাঝে একটি নিবিড় সংসর্গও আদিকাল থেকেই বিদ্যমান। মুদ্রার -পিঠ -পিঠের মতো যোগাযোগেরও দুটো দিক আছে। শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন নতুন জ্ঞান প্রযুক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণে সহায়তা করে। এর বিপরীতে সবার জন্য খাদ্য সরবরাহ ছাড়াও কৃষি, শিক্ষা খাতকে সরাসরিভাবেও মদদ দেয়। সংশ্রবেরও আবার দুটো মাত্রা আছে। একটির কথা আমি আগেই জানতামকৃষিতে উত্পন্ন সম্পদের একটি অংশ কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে এবং তারই একটি ভগ্নাংশ বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে শিক্ষা খাতে গিয়ে খরচ হয়। কৃষি, শিক্ষাকে আরেকভাবেও সমৃদ্ধ করে। এই দ্বিতীয় মাত্রাটির কথা মাত্র সেদিন স্মরণ করিয়ে দিলেন অধ্যাপক . সলিমুল্লাহ খান। সম্প্রতি উনিশ শতকের প্রথমার্ধে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা সমাজসেবায় খান বাহাদুর আহসান উল্লাহর অবদানের কথা বলতে গিয়ে তিনি এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, অঞ্চলে একসময় পাটের দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করত মুসলমান শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তির হার।

বিষয়টি নিয়ে কোনো অর্থনীতিবিদ কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা করেছেন কিনা, আমার জানা নেই। তবে আমার লেখার জন্য তা জানার কোনো জরুরতও নেই। আমার নানা ১৯৩০-এর দশকে তার ভাইকে পাট বিক্রি করে কলেজে পড়িয়েছেন। তারও ৩০ বছর পর পাকিস্তান আমলে একই অর্থকরী ফসল বিক্রি করে তিনি তার তিন সন্তানের কলেজ খরচের অর্থ জোগান দিয়েছেন। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে আমার ছেলেবেলায় আমি নানাবাড়িতে ছিলাম প্রায় দুই বছর। তখন নানাকে ফড়িয়াদের কাছে পাট বিক্রি করতে নিজ চোখে দেখেছি। সেই সুবাদে লাল রঙের ৫০০ টাকার নোট প্রথমবারের মতো নেড়েচেড়ে দেখারও আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। আহা, অল্প বয়সে সে কী উচ্ছ্বাস উত্তেজনাকর অনুভূতি! আমার নানী পাট বেচার টাকা বড় একটি কাঠের সিন্দুকের ভেতর টিনের কৌটায় সযত্নে সামলে রাখতেন। তখন নানাবাড়ির ১৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো ব্যাংক ছিল না।

কথায় কথায় কৃষকদের টাকা হেফাজতে রাখা প্রসঙ্গে আরেকটি মজার গল্প মনে পড়ে গেল। সে যুগে উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো অঞ্চলে ধান পাট বিক্রির টাকা কৃষকরা ঘরের ভেতর বাঁশের মাচানের ওপর শুকনো তামাকের স্তূপের মধ্যে গুঁজে রাখতেন। একথা শুনেছি আমার স্ত্রীর কাছে। ১৯৬৩-৬৫ সময়কালে সরকারি চাকরি সূত্রে আমার শ্বশুর সপরিবারে রংপুর থাকতেন। তখন ওই জেলাশহরে যে দুজন নারী ডাক্তার ছিলেন, আমার শাশুড়ি ছিলেন তাদেরই একজন। শহরের উপকণ্ঠে গ্রামের সচ্ছল কৃষকদের বাড়িতে গিয়ে রোগী দেখার জন্য তিনি মাঝে মাঝে হাউজ কল পেতেন। হাউজ কলের ভিজিট ফি বাবদ তাকে টাকা দেয়া হতো। সেই টাকার নোট থেকে ভকভক করে তামাকের কড়া গন্ধ বেরিয়ে আসত।

যে সময়ের কথা বলছি তখন কৃষকরা উদ্বৃত্ত ফসল ফলিয়ে হাতে কিছু টাকা জমানোর পরই কেবল তাদের ছেলেদের কলেজে পাঠানোর কথা চিন্তা করতেন। দু-একটি বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া সে কালে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে মুসলমান মেয়েরা কলেজের দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছতে পারত না। বাস্তবতা পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ক্ষেত্রে যতটা প্রবল প্রাসঙ্গিক ছিল, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ততটা ছিল না। কারণ তারা শিক্ষা, সমাজসচেতনতা, অর্থনীতি রাজনীতির সূচকে আমাদের তুলনায় অনেক অগ্রসর ছিলেন।

তো গেল ব্রিটিশ ভারত পাকিস্তান আমলের কথা। এবার চোখ ফেরাতে চাই স্বাধীন বাংলাদেশে। আলোচ্য দুই খাতে কী হচ্ছে এবং কী চলছে সেদিকে। আমাদের সোনার বাংলায় যখন যারাই সরকারে থাকেন, তারাই বড় গলায় নানান কিসিম কৃতিত্বের সঙ্গে - দাবি করেন যে তারা দেশবাসীর জন্য কৃষি শিক্ষা ক্ষেত্রে বাঁধভাঙা সাফল্য বয়ে এনেছেন। তবে জমিনের বাস্তবতা সবসময়ই একটু ভিন্ন।

প্রথমে দেখা যাক কৃষিতে এখন কী হচ্ছে। আমার বিবেচনায় খাতে বেশকিছু নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে এবং একটি ভীষণ বড় সাফল্যও আছে। গত ৫০ বছরে দেশে ধান-গম উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে দ্বিগুণের বেশি জনসংখ্যার খোরাক জোগাতে আজকাল বাংলাদেশের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আর এতে ধারাবাহিকভাবে সব সরকারেরই অবদান রয়েছে। নেতিবাচক দিকের প্রথমটি হলো, সংরক্ষণ সুষ্ঠু বাজারজাত ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা তাদের উদ্বৃত্ত পণ্যের উপযুক্ত ন্যায্যমূল্য পান না। গ্রামের হাটবাজারে -কড়া -কড়া দামে মৌসুমি তরিতরকারি বিক্রি হয়, অথচ ওইসব পণ্যই শহরের লোকজন চড়া দামে কিনে খান। দ্বিতীয়ত, ঘরে ঘরে যখন নতুন ধান ওঠে তখন কৃষকরা বাড়তি ফসল বিক্রি করে দুই পয়সা কামাই করতে চান। ঠিক তখনই ব্যবসা-সিন্ডিকেট নীতিনির্ধারকদের অশুভ যোগসাজশে চাল আমদানি করে বাজারে সয়লাব বইয়ে দেয়া হয়। এতে কৃষকরা মারাত্মকভাবে আশাহত হন, মুনাফাবঞ্চিত হন। তৃতীয়ত, অন্য সময় আবার এই একই কুচক্রী গোষ্ঠী, কৃত্রিম উপায়ে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কোনো কোনো পণ্য যেমন পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল ইত্যাদির দাম বাড়িয়ে দেন। আবার রোজা ঈদ উপলক্ষে আগে থেকেই বিশেষ বিশেষ কৃষিপণ্য যথা ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, খেজুর, মসলা, বেগুন, কাঁচামরিচ ইত্যাদির দাম প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। অবশ্য এজন্য বিক্রেতা ভোক্তা দুই দলই সমানভাবে দায়ী। একদিকে ভোক্তারা বেহিসাব কেনাকাটা করে চাহিদাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলেন। অন্যদিকে বিক্রেতারা মজুদদারির মাধ্যমে সরবরাহ সংকুচিত করেন। ফলে দাম বাড়ে হু-হু করে। এসব সমস্যার সমাধানে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা জনসচেতনতা দুটোর ওপরই সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।

এবার শিক্ষার অবস্থা নিয়ে দুই কথা বলতে চাই। প্রাথমিক মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিনা মূল্যে বই বিতরণ একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ বিরাট কামিয়াবির আলামত। কিন্তু খবরে যখন দেখি, বইগুলো ভুলে ভরা, তখন মনটা খারাপ হয়ে যায়। এছাড়া সংক্ষেপে যদি বলতে চাই, প্রাথমিক পর্যায়ের মূল সমস্যা হলো শিক্ষার্থীদের অকালে ঝরে পড়া। মাধ্যমিকের প্রধান সংকট সুশিক্ষিত প্রশিক্ষিত শিক্ষকের দারুণ অভাব। কলেজের সমস্যাএখানেও যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এছাড়া আছে লাগামহীন ছাত্ররাজনীতি নিজেদের মধ্যে মারামারি। ইদানীং রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার কারণে সরকারও শিক্ষা খাতে একটি লেজে গোবরে অবস্থা তৈরি করে ফেলেছে। যেমন কয়েক বছর আগে হেফাজত-এর চাপে পড়ে বইয়ের বিষয়বস্তুতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হলো। সম্প্রতি শুনছি, সেটা আবার আগের জায়গায় চলে গেছে। এতে নীতিনির্ধারকদের মনে একটি অস্থিরতা দোদুল্যমানতা লক্ষ করা যায়। সব শেষে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অসুবিধার কথা কী আর বলবএখানে বিশ্বের সব সমস্যাই বিরাজমান। অসহনীয় শিক্ষক-রাজনীতি তাদের খিস্তিখেউড়, শিক্ষা গবেষণা কাজে অধ্যাপকদের দায়বদ্ধতার অভাব, ভারসাম্যহীন ছাত্ররাজনীতির একপেশে অবস্থাসরকারদলীয় কতিপয় ছাত্রের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাস্তানি ইত্যাদি গোটা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে জিম্মি করে ফেলেছে। ইদানীং কভিড-১৯ এসে বাংলাদেশের নাজুক শিক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে একাডেমিক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটেছে তার অভিঘাত সামাল দেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা আজ অবধি জাতির সামনে পেশ করতে পারেনি। মাদ্রাসাশিক্ষাও আমাদের জাতীয় জীবনের একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, কিন্তু আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মন্তব্য করা থেকে আপাতত বিরত রইলাম।

সত্ত্বেও একথা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষা খাতের অবশ্যই সম্প্রসারণ হয়েছে। এখন বাজার ব্যবস্থাপনা শিক্ষার মানের দিকে নজর দেয়াটা অতি আবশ্যক। এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে আর গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই।

আমার আজকের গল্পটি এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত, কিন্তু মনে পড়ে গেল নয় বছর আগের একটি ঘটনা; যা ঘটেছে দেশ থেকে ১২ হাজার মাইল দূরে, ন্যাশভিলে আমার কলেজ ক্যাম্পাসে। কাহিনী আজকের আলোচনার জন্য কোনোমতেই অপ্রাসঙ্গিক নয়। ২০১২ সালের জুলাইয়ের এক অগ্নিঝরা মধ্যাহ্নে আমাদের বিজনেস স্কুলের ক্যাফেটেরিয়ায় একটি বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কৃষিশিক্ষা সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা তার অন্তর্নিহিত রহস্য। এবার শুনুন সেদিন আমাদের ক্যাফেটেরিয়ায় কী ঘটেছিল। যখনকার কথা বলছি তখন আমাদের বিজনেস স্কুলের শিক্ষক ডিন . টিল্ডেন কারি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৪০ বছর ধরে। তার মধ্যে তিনি কলেজের ডিন ছিলেন একাধারে ২৭টি বছর। আমিই তাকে ওই পদে দায়িত্বরত পেয়েছি ২০ বছর। তার অবসরে যাওয়া উপলক্ষে সেদিন আয়োজন করা হয়েছিল অনাড়ম্বর বেদনাভারী এক অনন্য বিদায় সংবর্ধনার।

টিল্ডেন কারির আরেকটি পরিচয় আছে। আপনাদের অনেকের মনে থাকতে পারে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার পর আমেরিকা যখন আফগানিস্তান আক্রমণ করে, তার কয়েক দিনের মধ্যেই কাবুলে এক মার্কিন তরুণী স্বেচ্ছাসেবী কর্মী তালেবানদের হাতে আটক হন। খবরটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের গণমাধ্যমে চাউর হয়ে যায়। আমরা তখন প্রতিদিন সেই তরুণীর চাঞ্চল্যকর খবর আমেরিকান মিডিয়া থেকে জানতে পেতাম। ওই বন্দি তরুণীর বাবা হলেন আমাদের ডিন কারি এবং তরুণীর নাম ড্যানা কারি। ড্যানা যখন মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এলেন তখন হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়রের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাকে তার বাবাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই খবর ফলাও করে সংবাদমাধ্যমে এসেছিল এবং এটা আমাদের জন্য ছিল একটি চাঞ্চল্যকর বড় খবর।

বিদায় সংবর্ধনায় লোকসমাগম খুব একটা বেশি হয়নি এবং লম্বা লম্বা বক্তৃতাও খুব ঝাড়া হলো না। বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা সংক্ষেপে বিদায়ী ডিনের কাজের মূল্যায়ন করে বক্তব্য রাখলেন। সবাই তার বিভিন্ন গুণাবলির কথা বললেন। . কারির অমায়িক ব্যবহার, কথাবার্তা ভাবনায় নতুনত্ব, চিন্তায় কাজে ধীরস্থির স্বভাব, গতিশীল নেতৃত্বের সঙ্গে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলা ইত্যাদি গুণের ওপর একেকজন একেকভাবে আলোকপাত করলেন। সব শেষে ডিন তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে দীর্ঘ ২৭ বছরের কাজের একটি ফিরিস্তি দিলেন। এত দিনে কলেজ কোন অবস্থা থেকে কোন অবস্থায় এসেছেকথামালা দিয়ে তিনি তার একটি চুম্বক ছবি আঁকলেন। সচরাচর সবাই যা বলে থাকেন, তিনি তা- বললেন। তার নাতিদীর্ঘ বয়ানে তিনি ২৭ বছরে কলেজের জন্য যা অর্জন করেছেন, তার কৃতিত্বের মালাখানি অকাতরে সহকর্মীদের কাঁধে তুলে দিলেন এবং যেটুকু কাজ বাকি ছিল, তার দায়ভার নিঃসংকোচে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে বললেন, তিনি যা যা করতে পারেননি তার এজেন্ডা আরো অগ্রসর করে নেয়া এখন আমাদের দায়িত্ব এবং তার অসম্পূর্ণ কাজ আমরা যত সুষ্ঠু সুন্দরভাবে করব, তাতে আমাদের প্রতি তার ঋণ ততই বাড়বে। এসবই গতানুগতিক চিরাচরিত কথা। আমি কোনোটাতেই নতুনত্ব কিছু খুঁজে পাইনি এবং মুগ্ধও হইনি।

তবে এরপর তিনি যে কথাটি উচ্চারণ করলেন, তা আমার হূদয়-মনকে তাত্ক্ষণিক আবেগ-আপ্লুত করে দিল! মুহূর্তের মধ্যে আমি নিঃশব্দে বহুদূর এক স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করতে লাগলাম! উপস্থিত অনেকে তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, এরপর কী? অর্থাৎ অবসর জীবনে তিনি কী করবেন? অত্যন্ত স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ডিন কারি বললেন, কেন, যেখান থেকে এসেছি, সেখানেই ফিরে যাব। যে কাজ দিয়ে শুরু করেছিলাম, নতুন উদ্যমে সে কাজে আবার গিয়ে যোগ দেব। এতে কারো কাছে কিছুই পরিষ্কার হলো না। রহস্যের ধূম্রজাল বরং আরো ঘনীভূত হলো। সবাই জানেন, তিনি তার চাকরিজীবন শিক্ষকতা দিয়েই শুরু করেছিলেন। শুরুতে ফিরে যাবেন, তার মানে অবসর নেয়ার পর তিনি কি আবার পড়াতে যাচ্ছেন? ডিন কারির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঠিক কোনো ইশারা পাওয়া গেল না। কয়েকজনকে দেখলাম মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন, আমি তো কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না। 

এরই মধ্যে ডিন কারি তার কথার ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন, পৃথিবীতে সবকিছুই তার মূলের দিকে ধাবিত হয়। মানুষও জীবনসায়াহ্নে এসে প্রকৃতির নিয়মে তার উৎসমূলের দিকে সাবলীল গতিতে ছুটে চলে। আমি কৃষিকাজ করিনি, আমার পিতাও করেননি, পিতামহও না, তার পিতাও কৃষক ছিলেন না। কিন্তু সবার মতো আমার পূর্বপুরুষরা দেশে এসে সংসার শুরু করেছিলেন কৃষিকাজ দিয়েই। আমি ৪০ বছর শিক্ষকতা জীবন শেষ করে সগৌরবে ফিরে যাব আমার পূর্বপুরুষদের সেই পেশাসব মানুষের আদি পেশাকৃষিকাজে। কৃষিসেবা করে আমার জীবনের সব অপূর্ণতাকে আমি পূর্ণতা দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে চাই। বাহ, কী চমত্কার কথা, কী মর্মস্পর্শী বাণী! যে শিক্ষক শিক্ষকতা থেকে কৃষিতে বেশি গৌরববোধ করেন, কৃষিতেই যিনি জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পানএমন একজন শিক্ষক, এমন একজন ডিন, এমন একজন ভাবগম্ভীর অসাধারণ নেতা হলেন . কারি। এমন নীতিমান দার্শনিক পুরুষ আমার জীবনে আমি খুব কমই দেখেছি। এখানেই আমি পেলাম কৃষির সঙ্গে শিক্ষার এক নতুন, অনবদ্য অভিনব সম্পর্ক। আমি নতুন করে আবিষ্কার করলাম মাটির সঙ্গে মানুষের সংসর্গ। সম্পর্কই আসল, এটাই আদি, দীর্ঘস্থায়ী এবং এটাই খাঁটি। জগতের সব শিক্ষক ডিন কারির মতো হোনআজকের দিনে এটাই আমার ঐকান্তিক প্রার্থনা।

পুনশ্চ: অনুষ্ঠানে খাওয়াদাওয়া ছিল। টেবিলে খেতে বসে দেখলাম, পানির বোতলে একটি সাদা লেবেল সাঁটা, যাতে লেখা রয়েছে—‘I don’t want to, I don’t need to, I don’t have to...I am retired! এমন সুন্দর কথা আমার নজরে আগে কখনো পড়েনি!

 

আবু এন এম ওয়াহিদ: অর্থনীতির অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ

[email protected]

আরও