কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারী এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে হয়তো এমনতর দুঃসময় আর আসেনি। বিশ্বব্যাপী সমাজ, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে একটি আমূল পরিবর্তন এনেছে যা মানুষকে সামাজিকভাবে সতর্ক থাকার পাশাপাশি আর্থিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।
এই সময়ে পৃথিবীব্যাপী সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দ “Social distance” মূলত এটি “physical distance”, যা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশের মত সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই distancing নিশ্চিত করা যেমন দুরূহ তেমনি অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। শারিরীকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেঁচে থাকাটা কনশাস লিভিং ভদ্র সমাজের জন্য। হ্যান্ডশেক কোলাকুলি যুগের অবসান হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রজেশ্বর চরিত্রের শুচিবায়ুতা এখন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটি বড় ভূমিকা রাখছে এবং সামাজিক অনুষ্ঠান নিত্য ভ্রমণ হ্রাস পেয়েছে। সামাজিকতার প্যারাডাইম শিফট হয়েছে। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য, পরিবেশ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, বিনোদন, শিল্প সাহিত্য সবকিছু যাপন এবং উদযাপনের প্রক্রিয়া পাল্টে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধ কমে গেছে।
মানুষের মূল্যবোধ, চেতনা, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ সর্বোপরি মানবতাবোধের জায়গা থেকে মানুষ যদি সরে যায় কিম্বা দূরত্ব যদি মানবিকবোধকে রহিত করে তবে এই বৈশ্বিক বিপর্যয় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে বাধ্য। মানুষ আশাবাদী হয়তো দূরত্ব মানবিক বোধের আরো উন্নয়ন ঘটাবে আর আগামী বিশ্ব হবে আরো বেশি মানবিক।
এতদিন বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল শিল্প উৎপাদন। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল কৃষি। বিশ্ব অর্থনীতি এই মুহূর্তে বিপর্যস্ত এটি বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের দেশের মতো জনবহুল ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশের অর্থনীতির গতি অনেকটাই কমে যাবে। আমাদের দেশের শিল্পবিপ্লব তেমনভাবে না ঘটলেও বিগত চল্লিশ বছরে গার্মেন্টস শিল্প বিকাশ লাভ করেছে। যেখানে বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিদেশে রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব ইন্ডাস্ট্রি ক্রমে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে, বিশেষ করে ছোট ছোট কারখানাগুলো। বিদেশে থাকা এক কোটি জনগোষ্ঠী ফেরত এলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। আর এই অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগান এবং কর্মসংস্থান একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে দেশের জন্য। করোনার কারণে এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝার শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
এছাড়াও যোগাযোগ, পরিবহন, সিনেমা, শিল্পজগতসহ অন্যান্য খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো ব্যবসায়িক মবিলাইজেশন না হওয়ায় উচ্চবিত্ত ছাড়া মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের হাতে টাকা নেই। বেসরকারি খাতে ইতিমধ্যে চাকরিচ্যুতি শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টর অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। এই খাতের লোকেরাও সুবিধাজনক অবস্থানে নাই। এই মুহূর্তে আমাদের দেশে বিপুল পরিমান লোকের খাদ্য সরবরাহ করা প্রধান কাজ। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে যে চিকিৎসা ব্যবস্থা বলে কিছু নেই তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। আপামর জনগণের চিকিৎসা সুবিধা প্রদান বর্তমানে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
করোনা পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে কৃষিখাতকেই প্রাধান্য দিতে হবে। কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বীজ, সার, সেচ, জমি চাষ ও ফসল মাড়াইয়ের যন্ত্রপাতি বিতরণ ও সরবরাহকৃত বৃদ্ধি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। ঢাকার রিকশাওয়ালাগুলো কর্মশূন্য হলে কৃষি শ্রমিকের অপর্যাপ্ততা কমে যাবে। আমাদের দেশে বরিশাল এবং সিলেট অঞ্চলে অনেক জমিদার তাদের জমি অনাবাদি ফেলে রাখে। এক্ষেত্রে আইন করে সব জমি আবাদের আওতায় আনতে হবে। উৎপাদিত ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
সেই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সুদে কৃষিঋণ প্রদান করতে হবে। বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র বযবসায়ীদের দিকে সরকারের দৃষ্টি দিতে হবে। তাদের জন্য ভর্তুকি কিম্বা স্বল্পসুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা তাদের ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করতে পারে এবং ক্ষুদ্র আয়ের মানুষেরা কাজ ফিরে পায়।
বস্ত্রখাতকে পেট্রোনাইজ করার এখনি সময়। কারণ ভারতীয় এবং চীনা বস্ত্রের দাপটে আমাদের দেশী বস্ত্রশিল্প কখনই বিকাশ লাভ করতে পারেনি। এখনই সময় এই খাতকে উজ্জীবিত করার। এছাড়া টয়লেট্রিজ, চিনি ও প্যাকেজিং জাতীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়টি এই সময়ে প্রাধান্য পেতে পারে। বিভিন্ন অবকাঠামোসহ ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তা ইত্যাদি খাতে ব্যয় কমিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যখাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা প্রয়োজন এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। অন্য সবকিছুর চেয়ে চিকিৎসা এবং জনগণের স্বাস্থা সুরক্ষা করা এখন জরুরি।
মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড় এবং আশাবাদী। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ এই করোনা সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে এবং পরিবেশবান্ধব একটি অর্থনীতির সূচনা করবে। সেখানে শিল্পপতি, ধনী কিম্বা তথাকথিত লুটেরা শ্রেণি নয়- কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র চাকরিজীবী এবং স্বল্প আয়ের মানুষগুলো তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে। সমাজের একটি অংশের উন্নয়ন প্রকৃত উন্নয়ন নয় যখন একটি দেশের আপামর জনগণ তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, যাতায়াত, বাসস্থানের সুরক্ষা পাবে তখনই প্রকৃত উন্নয়নের সূচনা হবে।
আয়েশা সিদ্দিকা শেলী
অতিরিক্ত কর কমিশনার