বিশ্লেষণ

মূল্যস্ফীতির অভিঘাত কাদের ওপর পড়ছে

অন্য দেশে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে কমার কোনো লক্ষণ নেই। বর্তমানে বেগবান মূল্যস্ফীতি ভবিষ্যতেও কমবে বলে আমরা মনে করি না। হ্যাঁ, কমতে পারে, যখন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে আরো অল্প ভোগের দিকে দৌড়াবে অথবা ওইসব দরিদ্র লোক যারা আগেই ভোগ কমিয়ে দিয়েছিল তারা তা আরো কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে। আর সেই অবস্থায় আমাদের অর্থনীতির রূপ কী

অন্য দেশে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে কমার কোনো লক্ষণ নেই। বর্তমানে বেগবান মূল্যস্ফীতি ভবিষ্যতেও কমবে বলে আমরা মনে করি না। হ্যাঁ, কমতে পারে, যখন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে আরো অল্প ভোগের দিকে দৌড়াবে অথবা ওইসব দরিদ্র লোক যারা আগেই ভোগ কমিয়ে দিয়েছিল তারা তা আরো কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে। আর সেই অবস্থায় আমাদের অর্থনীতির রূপ কী হবে? সবাই অল্প ভোগ আরম্ভ করবে আর দারিদ্র্যের সঙ্গে এ রকম চরম যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া মানুষের ঢল নামবে পথে-প্রান্তরে। সে অবস্থায় আমরা সবাই আরেক দফা গরিব হয়ে যাব। যে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে যায় সে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যায় এবং সে অর্থনীতিতে চাহিদাও কমে যায়, আর তখন যদি দ্রব্যমূল্য নাও বাড়ে তাতে কী? লোকজন তো এরই মধ্যে তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হয় সময়ের সঙ্গে অর্থের মূল্য পড়ছে না বাড়ছে তার ওপর ভিত্তি করে। অর্থ দিয়ে যেহেতু দ্রব্য ও সেবা ক্রয় করা হয় তাই অর্থের মূল্য পূর্ব সময়ের তুলনায় পড়ে গেলে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ঘটে। অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগে যত দ্রব্য কেনা যেত তা দিয়ে সমপরিমাণ দ্রব্য আর ক্রয় করা যাবে না। এখন ওই একই জিনিস কেনার জন্য আরো বেশি পরিমাণ অর্থের দরকার পড়বে। অনেক সময় অর্থনীতিতে সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সব জিনিসপত্রের সরবরাহ একসঙ্গে কমতে পারে না, কমে পণ্যভেদে।

তবে সব পণ্যের সরবরাহ একই সঙ্গে কমতে পারে যদি অর্থনীতিতে খরা চলে, অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং রিজার্ভ মুদ্রার অভাবের কারণে যদি সরকার বা ব্যক্তি খাত বাইরে থেকেও কিছু আনতে না পারে। সেই অবস্থা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তখন দেশে দুর্ভিক্ষ লাগে। মানুষ মরে যায়। তবে বর্তমানের পৃথিবীর ওই অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা কম, যদি অন্য দেশগুলো যাদের কাছে অর্থ ও পণ্য আছে তারা যদি বাকিতে হলেও পণ্য ও সেবা বিক্রি করে। যেসব অর্থনীতি গ্লোবাল সেক্টরের সঙ্গে ভালোভাবে কানেক্টেড ওইসব অর্থনীতিতে তীব্র অভাব সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। যা-ই হোক, আমরা স্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনা করি। মূল্যস্ফীতি কোনো ক্ষতি নয় যদি পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের কমতি না ঘটে এবং সমাজে সবার আয় সমভাবে বাড়তে পারে। সমস্যা হলো, সমাজের সব লোকের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রেখে সমানভাবে বাড়ে না। অতি সামান্য সংখ্যক লোকের আয় সমানভাবে বাড়ে বা মূল্যস্ফীতির হার থেকেও বেশি বাড়ে। মূল্যস্ফীতি কোনো দিন অতিধনীদের আয় কমাতে পারে না। অতিধনীদের আয় কমে সম্পদের মূল্য কমে গেলে, তবে তারা যেহেতু অতিধনী, তারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পদের মূল্য বাড়িয়ে নেয়। দুই দশকে বিশ্বে অতিধনীরা শুধু ধনীই হয়েছে, যদিও ওই সময়ে বিশ্বে ক্ষুধার্ত লোকের সংখ্যা বেড়েছে। এ কথা বাংলাদেশের ধনীদের ক্ষেত্রেও সত্য। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের স্থলে ১৫ শতাংশ হলেও ধনীদের কিছু আসে যাবে না। তারা তো শুধু ধনীই হতে থাকবে। তবে অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়লে তারাও ধাক্কা খাবে। কিন্তু তাদের ধাক্কা খাওয়াটা হবে কম আঘাতের। আঘাতপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বড় আঘাতের ধাক্কা খাবে গরিব, নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তরা। এরাই আয়ের ও ভোগের দিক দিয়ে অতিদ্রুত নিচে নেমে যাবে। দেশের অর্থনীতিতে আগে যদি দুই কোটি মানুষ অতিদারিদ্র্যের মধ্যে থাকত, মূল্যস্ফীতি অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকলে এদের সংখ্যা হবে চার কোটি, তারপর আরো বেশি। এদের অবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে আমরা চারদিকে চোখ বুলালেই বুঝতে পারব। তবে মূল্যস্ফীতি কি বহির্বিশ্বে যুদ্ধের কারণে ঘটতে থাকে নাকি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে ঘটতে থাকে, নাকি সরকারের আর্থিক অর্থায়নের ধরনের বা ত্রুটির কারণে ঘটতে থাকে সেসব ব্যাপারে আমাদের জানা দরকার। ঋণ করে ঘি খেলে সেই লোক বা সেই দেশের অর্থনীতি অবশ্যই পেছনে চলে যাবে। একদিন দেখা যাবে, ঋণ শোধ করতে করতে সেসব লোক বা সে ধরনের অর্থনীতি নিঃস্ব হয়ে গেছে। বাংলাদেশও ঋণ করে ঘি খেয়েছে, আর সেটার মূল্য দিতে শুরু করেছে এখন। শুধু অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই বাংলাদেশ সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ করেছে। আর আজকে সেই ঋণকে সুদ-আসলে ফেরত দিতে গিয়ে নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ করছে। এ নতুন ঋণের একটা বড় অংশ সরকার নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে, যে অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা ছাপিয়ে জোগান দিচ্ছে। অবস্থাটা হলো, একটা ঋণ আর একটা ঋণকে দৌড়াচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার কার্যকরভাবে তার ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারবে ততদিন অবস্থার উন্নতি হওয়ার কোনো কারণ নেই। অবস্থা শুধু খারাপের দিকেই যাবে। পুরনো ঋণ শোধ করার জন্য মুদ্রা ছাপিয়ে নতুন ঋণ নিলে সে প্রক্রিয়াকে বলে debt monetization। এর অর্থ হলো বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ বাড়বে। আর অতিরিক্ত মুদ্রা বাজারে চলে এলে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হতে বাধ্য। ওই অবস্থায় মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা শুধু কমতেই থাকবে। আর সমাজের নিম্ন আয়ের লোকেরা নিষ্পেষিত হতে থাকবে। মূল্যস্ফীতি সরবরাহের অব্যস্থাপনার ফলেও সৃষ্টি হতে পারে। বাজারকে যদি কিছু সরবরাহকারী নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে বাধ্য। কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে অতিমুনাফা করে সেই ধরনের বাজারের নাম হলো অর্থনীতিতে অলিগোপলি। বাজারের প্রতিযোগিতাকে ব্যাহত করা আমাদের আইনে বেআইনি। তবে আইন বইতে পড়লেও প্রয়োগ করা কঠিন বা প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অনেক দক্ষ নয়। সয়াবিন তেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালের ক্ষেত্রে বাজারের ধরন হলো অলিগোপলি, মানে কিছু সরবরাহকারী নিয়ন্ত্রিত বাজার। এজন্য আমাদের বাজারে ক্ষণে ক্ষণে এসব পণ্যের মূল্য অতি বেড়ে যায়। বিদেশে অনেক পণ্যের মূল্য কমে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ওইসব পণ্যের মূল্য কমছে না। এর মূল কারণ হলো ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য হ্রাস। ২০-২২ শতাংশ মূল্যহ্রাসটা অতি তাড়াতাড়ি ঘটেছে, মাত্র ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অর্থের চোরাচালান বা বহির্গমন একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে যখন ৯-১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হলো, তখন তো আর ডলার-টাকার বিনিময় হার আগের অবস্থানে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এখন আমাদের নতুন বিনিময় হারকেই মেনে নিতে হবে। আমাদের আশঙ্কা হয় সেই বিনিময় হারও কি টেকানো যাবে? আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি যেভাবে কমছে তাতে টাকা আরো মূল্য হারানোর ছকের মধ্যে থাকবে। একমাত্র উপায় হলো নতুন ঋণ না নেয়া এবং সরকারি আয়ে কৃচ্ছ্রতা আনা। মনে রাখতে হবে, অর্থনীতিতে মূল্যগুলো পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটির মূল্য বাড়লে অন্যটিরও মূল্য বাড়বে। জ্বালানি তেল হলো এমন একটা পণ্য যে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে অন্য মূল্যগুলো খুবই সম্পর্কযুক্ত। এজন্য যেকোনো দেশের নীতিনির্ধারকরা জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে অনেক ভেবেচিন্তে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ভাবনাটা ছিল না। কয়েকটা দিন বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১৩০-১৪০ ডলারে পৌঁছে তখন আমাদের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলে মূল্য বৃদ্ধি করা হলো গড়ে ৫০ শতাংশ। সেটি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথম অনুঘটক হিসেবে কাজ করল। আর এখন তো জ্বালানি তেলের মূল্য বিশ্ববাজারে ৮০ ডলারে নেমে এসেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে সরকার কি এই তেলের প্রোডাক্টগুলোর মূল্য কমাবে? কমাবে না। কারণ হলো, এখন তো সবাই যেমন ১০৭ টাকা দরে ডলার কিনছে, সরকারকেও সেই মূল্যে ডলার কিনে তেল আমদানি করতে হবে। যা-ই হোক, মূল্যস্ফীতি যে জায়গায় পৌঁছে গেছে ওই স্তর থেকে কমবে—এটা কেউ তেমন আশা করে না। আমাদের শঙ্কা হলো আমরা একটা দৌঁড়ানো মূল্যস্ফীতির ফাঁদে পড়ে যাই কিনা। আর সেই অবস্থায় ১-২ শতাংশ ধনী লোকের কিছু না হলেও অন্য সবাই আঘাতপ্রাপ্ত হবে। নিচের দিকের ১০-১৫ শতাংশ লোক সেই আঘাতে টিকতে পারবে কিনা তা নিয়ে চিন্তার বিষয় আছে।

আবু আহমেদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

আরও