নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা একদম জিরো টলারেন্স, আইন না মেনে ভবন করার কোনো সুযোগ নেই

মো. রিয়াজুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এইবি) সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজউকের বর্তমান কর্মসূচি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন ও সুস্মিতা হোসেন

দীর্ঘদিন ধরে রাজউকের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। রাজউকের সেবার মান বৃদ্ধি ও শৃঙ্খলতা ফেরাতে কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে?

১৯৫৩ সালের একটি আইন দ্বারা ১৯৫৬ সালে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) গঠন হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজধানী ঢাকার পরিকল্পিত নগরায়ণ হিসেবে গড়ে তোলা। সেটাই পরবর্তী সময়ে রাজউকে পরিণত হয়েছে। তবে সত্যিকার অর্থে, যে কারণেই হোক রাজউকের পক্ষে তার দায়িত্বটা পুরোপুরি পালন করা সম্ভব হয়নি। এর পেছনে রাজউকের দুর্বলতার পাশাপাশি আমাদের দেশের জনগণের আইন না মানার প্রবণতাও একটি বড় কারণ। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ জায়গাগুলোয় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। সেজন্য চলমান বা আন্ডার-কনস্ট্রাকশন ভবনগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছি যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্ল্যান না মেনে বাড়ি করার সাহস না পায়।

ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা বা প্ল্যান না মানার প্রবণতার মূল কারণ কোথায়?

রাজউক কিন্তু নিজে প্ল্যান তৈরি করে না, শুধু অনুমোদন দেয়। প্ল্যান তৈরি করে ল্যান্ড ডেভেলপার বা জমির মালিকের নিয়োগকৃত ইঞ্জিনিয়াররা। সেই প্ল্যানের মধ্যে সাধারণত কোনো ত্রুটি থাকে না, বিচ্যুতি ঘটে ভবন নির্মাণের সময়। রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা এবং বাড়ির মালিকদের বাড়তি জায়গা বা ফ্লোর পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কারণে তারা একটি অনৈতিক সমঝোতায় আসে, যেখান থেকেই দুর্নীতির শুরু হয়।

ভবন নির্মাণে নকশা না মানার বিচ্যুতি রোধে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

এ প্রথা ভাঙার জন্য আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভবন আংশিক ভেঙে দেয়া এবং বিভিন্ন সার্ভিস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর চলমান বা আন্ডার কনস্ট্রাকশন সাড়ে আট হাজার বাড়ির লিস্ট করেছি। আমি চিন্তা করলাম, যেগুলো ২০-৩০ বছর আগে হয়ে গেছে, সেগুলো ভ্রাম্যমাণ আদালত করে ভাঙতে গেলে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই এখন যেগুলো তৈরি হচ্ছে সেগুলোর ওপর জোর দিয়েছি। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার বাড়িতে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। আমরা এখন আংশিক বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিচ্ছি এবং তাদের বিদ্যুৎ মিটার নিয়ে আসছি। এরপর বাড়ি মালিকরা অঙ্গীকারনামা দিচ্ছেন যে তারা বিধি মোতাবেক ভবন ঠিক করবেন। নতুন বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আমরা একদম জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। এখন থেকে বিধি মোতাবেক আইন না মেনে বাড়ি করার কোনো সুযোগ নেই।

জমি হস্তান্তর বা রাজউকের স্টেট শাখার কাজে মানুষের অনেক ভোগান্তি হতো। এ সেক্টরে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?

রাজউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিস্টেম ছিল—যেকোনো হস্তান্তরের জন্য রাজউকের অনুমতি লাগবে। স্টেট শাখায় আগে ফাইল আটকে রাখা বা স্লো করার মাধ্যমে পয়সা নেয়ার একটি সংস্কৃতি ছিল। প্রচুর দুর্নীতি হতো। কিন্তু আমরা সেই পদ্ধতি তুলে দিয়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছি—এখন থেকে জমি হস্তান্তর, হেবা দলিল বা নামজারি করার জন্য আর রাজউকে আসার প্রয়োজন নেই। তালিকাভুক্ত থাকলে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা এসি ল্যান্ড অফিসেই কাজ সম্পন্ন করা যাবে। এটি রাজউকের ইতিহাসে একটি বড় সংস্কার। যার ফলে বড় জনভোগান্তি দূর করেছে।

ড্যাপ (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান) এবং হাইরাইজ বিল্ডিং অনুমোদন নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সে সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? এবং ভবন নির্মাণের নকশা জমা দেয়ার ক্ষেত্রে নতুন নিয়মগুলো কী?

ড্যাপ নিয়ে ২০২২ সাল থেকে একটা জটিলতা ছিল। আবাসন ব্যবসায়ী, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে বিভিন্ন মতবিরোধ ছিল। আমি আসার পর সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে সপ্তাহে তিন-চারদিন মিটিং করে আলোচনার মাধ্যমে সেটাকে একটি জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের মাথায় রাখতে হয় যে ঢাকা শহরে লোক ঢুকতে বাধা দেয়া যাচ্ছে না, তাই তাদের ঘুমানোর জায়গা দিতে হবে। আবার একই সঙ্গে আলো-বাতাস, ফায়ার ব্রিগেড বা অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার জায়গাও নিশ্চিত করতে হবে। এ দুইয়ের সমন্বয় করেই আমরা প্ল্যান করছি। এখন থেকে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু আর্কিটেকচারাল প্ল্যান দিলে হবে না; বরং আর্কিটেকচারাল প্ল্যানের পাশাপাশি স্ট্রাকচারাল, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল এবং প্লাম্বিং ড্রয়িং দেয়াও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে কাজের সুবিধার্থে শুরুতে আর্কিটেকচারাল ড্রয়িংয়ের ভিত্তিতে সাময়িক অনুমোদন নিয়ে পরে বাকি ড্রয়িং জমা দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন নিয়মে পাঁচ কাঠার ওপরে বাড়ির ক্ষেত্রে এখন এসটিপি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে পানি শোধন করে ছাড়া হয়।

পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্প নিয়ে অনেক দিন ধরেই জটিলতা ছিল। বর্তমানে সেগুলোর পরিস্থিতি কী?

পূর্বাচল দীর্ঘদিন সচল করতে পারছিলাম না, কেননা এটা নিয়ে সীমানা ও প্রশাসনিক জটিলতা ছিল। এটি নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা—তিন জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পূর্বাচল প্রকল্প ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর—এ তিন জেলার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রশাসনিক ও পুলিশি সেবায় অনেক সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। পুলিশকে ডাকলে ডিএমপি বলত এটা তাদের এলাকা না। আবার একটা প্লট হয়তো দুই ডিস্ট্রিক্টে পড়ে গেছে। সেটি রোধ করতে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে বর্তমানে পুরো পূর্বাচল এলাকাকে ঢাকা জেলা ও ডিএমপির আওতায় আনা হয়েছে। ফলে সেখনকার পুলিশি সেবা বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সহজ হবে। আমরা পূর্বাচল ও ঝিলমিলে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের মতো নিজস্ব স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল করার পরিকল্পনা করছি, যাতে মানুষ সেখানে থাকতে উৎসাহিত হয় এবং দ্রুত জনবসতি গড়ে ওঠে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী নিজে ঝিলমিল প্রকল্প নিয়ে নির্দেশনা দেয়ায় সেখানকার কাজও ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।

পরিবেশ রক্ষায়, বিশেষ করে গুলশান ও হাতিরঝিল লেকের দূষণ বন্ধে রাজউক কী করছে?

হাতিরঝিল ও অন্য লেকগুলো রাজউকের হলেও সেখানে ওয়াসার বা সিটি করপোরেশনের ড্রেন দিয়ে ময়লা এসে পড়ছে। লেকগুলোতে বর্জ্য পড়ার বিষয়টি তাই ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের দেখার কথা। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বর্তমানে আমাদের ৩০টি টিম নিয়মিত কাজ করছে, যাতে ভবন মালিকরা সরাসরি লেকে ময়লা না ফেলে নিজস্ব সেপটিক ট্যাংক ব্যবহার করেন। আমরা সরজমিনে দেখছি যে বেশির ভাগ বাড়ির সেপটিক ট্যাংক বা সোক ওয়েল নেই, তারা সরাসরি ময়লা লেকে দিচ্ছে। আমরা এখন নিয়ম করেছি যে পাঁচ কাঠার ওপর যাদের বাড়ি, তাদের জন্য নিজস্ব এসটিপি (স্যুয়ায়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা পয়ঃশোধনাগার) করা বাধ্যতামূলক। এটি বিশাল কোনো প্লান্ট নয়, বরং ২০-২৫ লাখ টাকার মধ্যে একটি ছোট প্রযুক্তি, যা ময়লা পানিকে শোধন করে বের করবে। সাময়িকভাবে আমরা ময়লা সরানোর জন্য ডাইভারশন লাইন ও গার্বেজ ট্রান্সফার সিস্টেমের ব্যবস্থা করছি, যা দিয়ে ময়লা সরাসরি দাসেরকান্দি শোধনাগারে যাবে। এভাবে জনগণকে একটি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ উপহার দেয়া যায়। দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ওয়াসার মূল প্রজেক্ট শেষ হলে দাসেরকান্দি চালু হলে লেকগুলো পুরোপুরি দূষণমুক্ত হবে এবং মানুষ স্বচ্ছন্দে সেখানে সময়ও কাটাতে পারবে।

রাজধানীর গেন্ডারিয়া পুকুর উদ্ধারের পর আবার দখল হচ্ছে। এ পুকুরের মালিক আসলে কে?

গেন্ডারিয়া পুকুর রক্ষার বিষয়ে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত সুষ্পষ্ট; আমরা সেখানে এরই মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি এবং যেহেতু এর মালিকানা নিয়ে বর্তমানে একটি আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, তাই আদালতের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত রাজউক বা কোনো ব্যক্তি বিশেষের সেখানে কোনো ধরনের কাজ করার অধিকার নেই। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমরা লক্ষ করেছি যে একটি পক্ষ বেগম খালেদা জিয়ার নাম ব্যবহার করে পুকুরটি পুনরায় দখল ও পাড় ভরাটের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা আমি জানার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছি। আমার মূল লক্ষ্য হলো পুকুরটিকে তার আদি অবস্থায় টিকিয়ে রাখা; আর সেই লক্ষ্যে এটি যাতে বারবার বেদখল না হয়, সেজন্য আমি সেখানে একটি ওয়াকওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে পাড়গুলো সুরক্ষিত থাকে এবং কোনোভাবেই কেউ এটি ভরাট করতে না পারে। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে পুকুরটি পুকুর হিসেবেই থাকবে—মালিকানা যে পক্ষই পাক না কেন, রাজউক বা অন্য কারোরই এটি ভরাট করার কোনো সুযোগ আইনত নেই।

নতুন অধ্যাদেশে রাজউকের এলাকাধীন ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার প্ল্যান পাসের ক্ষমতা নিয়ে কিছু সমালোচনা শোনা যাচ্ছে যে এতে রাজউককে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

একটা প্ল্যান দেয়ার কারিগরি সক্ষমতা ইউনিয়ন পরিষদের নেই। এটি নতুন কিছু নয়, বরং ১৯৮৭ সাল থেকে চলা বিধিমালারই ধারাবাহিকতা। আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি যে রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিতে পারবে না, কারণ তাদের সেই কারিগরি সক্ষমতা বা ইঞ্জিনিয়ার নেই। এটি একটি টেকনিক্যাল কাজ এবং সুশৃঙ্খল নগরায়ণের স্বার্থেই রাজউককে এ দায়িত্ব পালন করতে হয়। রাজউকের এলাকার বাইরে আমরা যাই না, কিন্তু রাজউকের সীমানার ভেতর শুধু রাজউকের অনুমোদনই লাগবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজউকের কর্মকর্তাদের প্রতি আপনার বার্তা কী?

রাজউকের দুর্নীতির পেছনে থার্ড পার্টি বা দালালের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। সাধারণ মানুষ সরাসরি রাজউকে না এসে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে চায়। এ দালালরা কাজের জন্য বড় অংকের টাকা দাবি করে এবং মানুষকে বোঝায় যে এ টাকা রাজউক নিচ্ছে। আসলে এ প্রক্রিয়ায় লেনদেন হওয়া টাকার বড় অংশ দালালরাই হাতিয়ে নেয়, যা রাজউকের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। এছাড়া অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আমি নিয়মিত বিভাগীয় মামলা দিচ্ছি এবং সাসপেন্ড করছি। তাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে যেমন মোটিভেট করি, আবার দুর্নীতি কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করলে শাস্তির ভয়ও দেখাই। এখন তো সরকারি বেতন যথেষ্ট ভালো, তাই দুর্নীতির প্রয়োজন নেই—এ নীতি আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। দুর্নীতি মূলত থার্ড পার্টি বা দালালের মাধ্যমে হয়। জনগণ যদি সরাসরি রাজউকের সেবা নেয়, তবে এ দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। রাজউক এখন আগের থেকে অনেক বেশি ভাইব্রেন্ট এবং সেবা অনেক সহজ হয়েছে।

আরও