২০২৫ সাল প্রায় শেষ। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলাতে না বদলাতেই আমরা হঠাৎ টের পাই, একটি পুরো বছরকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি। বছরটি যেন শুধু সময়ের একটি টুকরো নয়; বরং রাজনৈতিক টানাপড়েন, আন্তর্জাতিক সংঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, বাজারের উত্থান-পতন, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা আর মানুষের জীবনের হাহাকারের সমষ্টি। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের মতোই অনিশ্চয়তার ঢেউ বাংলাদেশকেও আঘাত করেছে। তবে আমাদের ক্ষেত্রে সেই ঢেউয়ের সঙ্গে মিশেছে ভেতরের বহুদিনের সঞ্চিত দুর্বলতা ও অস্থিরতার স্রোত।
২০২৫ সালের অর্থনীতিকে তাই আমি দেখি এক দুরূহ পরীক্ষার বছর হিসেবে। এর একদিকে সংকটের আঁধার, অন্যদিকে সম্ভাবনা ও পুনর্গঠনের ক্ষীণ আলো। দীর্ঘমেয়াদি ঝড়ের পর সমুদ্র শান্ত হয়েছে বটে, কিন্তু সামনে এগোনোর জন্য যে পাল, যে দাঁড়, যে নাবিক; সবই যেন খানিকটা ক্লান্ত, ছিন্ন আর অনিশ্চিত। অর্থনীতি ডুবে যায়নি বটে, ভেসে আছে। তবে এখনো সাঁতরে কূলে উঠতে পারেনি। এ ভেসে থাকা আর এগিয়ে যাওয়ার মাঝামাঝি কোথাও যেন আমরা অবস্থান করছি।
একজন অর্থনীতির ছাত্র এবং ব্যাংকার হিসেবে আমি যখন ২০২৫-কে ফিরে দেখি, তখন কোনো একক সূচক কিংবা এক লাইনের সারসংক্ষেপ যেন যথেষ্ট মনে হয় না। কারণ প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, দারিদ্র্য, ব্যাংক সংকট; এসব প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে কিছু মুখ, কিছু গল্প, কিছু ক্ষত, কিছু স্বপ্ন। অর্থনীতি তখন আর কেবল জিডিপির গ্রাফ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের গায়ে গায়ে লেখা এক দীর্ঘ বিবরণী।
বছরের শুরুটা অস্থিরতার ঢেউয়ে, শেষ সতর্ক স্থিতিতে
২০২৫ সালের শুরুটা ছিল একেবারে ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাষ্ট্রপর্যায়ের রদবদল, ক্ষমতার নাটকীয় পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বাজারে ছিল এক ধরনের অদৃশ্য কাঁপুনি। ব্যবসায়ীরা ‘পরিস্থিতি দেখি’ মনোভাব নিয়ে অপেক্ষারত। কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইছেন না। কেউ কেউ পুরনো পরিকল্পনায় বিরতি টানছেন। বিদেশী অংশীদাররা চুপচাপ পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়। তারা চুপ করে আছেন, কিন্তু তাদের এ নীরবতা বলে দেয় অনেক কিছু।
বছরের প্রথমার্ধে আমরা ব্যাংকাররা ভেবেছিলাম ডলার মিলবে তো? আমদানিকারকরা পণ্য ছাড়াতে পারবে তো? সরবরাহ শৃঙ্খলের কোনো একটা দুর্বল জায়গা হঠাৎ ভেঙে পড়ে পুরো শৃঙ্খলকে ভেঙে দেবে না তো? আর সাধারণ মানুষ ভেবেছে একেবারেই অন্য লেভেলে। মাসের বাজার কীভাবে হবে, বাড়ি ভাড়া কীভাবে শোধ হবে, সন্তানদের ফি দেবে কীভাবে?
বছরের প্রথম ছয় মাস তাই ছিল কঠিনতম। অর্থনীতি যেন ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে পথ খুঁজছিল। দাম বাড়ছিল, আয় বাড়ছিল না। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিটে ‘লস’ শব্দটি যেন স্থায়ী বাসা বেঁধে ছিল। গ্রামে-শহরে, রিকশাচালক থেকে মাঝারি ব্যবসায়ী; সবাই একই কথা বলছিল, ‘জীবনটা আর আগের মতো নেই।’
কিন্তু বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে দৃশ্যপট পুরোপুরি না হলেও খানিকটা বদলাতে শুরু করে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু হওয়ায় ডলারের তীব্র ঝাঁকুনিটা কমে। রেমিট্যান্স বাড়তে থাকে। কঠোর মুদ্রানীতির কারণে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতির গ্রাফ নিচের দিকে নামতে শুরু করে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা থিতু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যও একপ্রকার ‘জরুরি অবস্থা’ থেকে বেরিয়ে আসে।
তবু আমরা পুরোপুরি স্বাভাবিকতায় ফিরিনি। বলতে গেলে সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছি, কিন্তু এখনো সতর্ক অবস্থানে আছি। আতঙ্ক কমেছে, কিন্তু আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি।
প্রবৃদ্ধির গল্প: সম্ভাবনার দেশ কেন থমকে দাঁড়াল?
বাংলাদেশ দুই দশক ধরে এক উজ্জ্বল ধারায় ছিল। ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যেন হয়ে গিয়েছিল খুবই স্বাভাবিক। সেই ধারাবাহিকতার মাঝখানে ২০২৫-এর ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যেন একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অর্থনীতির গায়ে কোথাও যেন একটা গুরুতর ফাটল তৈরি হয়েছে।
এ পতনের পেছনে যে বড় কারণ, তা হলো বেসরকারি বিনিয়োগের গভীর মন্দা। অর্থনীতিকে আমরা অনেক সময় রক্তপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা করি; সেই রক্তপ্রবাহই হলো বিনিয়োগ। ২০২৫ সালে সেই রক্তপ্রবাহ ছিল প্রায় শুষ্ক নদীর মতো।
মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ২২ শতাংশ কমে যাওয়া এ খরার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক। উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য তৈরির পরিকল্পনা; সবই বন্ধ রেখেছেন। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ থেমে গেলে মূলত ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি আগাম সংকুচিত হয়ে যায়। ২০২৫-এর প্রবৃদ্ধি তাই একদিকে যেমন বর্তমানের প্রতিবিম্ব, তেমনি আবার ভবিষ্যতের পূর্বাভাসও। এ বিনিয়োগ-স্থবিরতার পেছনে একাধিক সুস্পষ্ট কারণ ছিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ঘাটতি, ডলারের অস্থিরতা, তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়া বা পরিমাণ মতো ঋণ না পাওয়া, আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরাজমান সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি। ব্যবসা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে পূর্বানুমানযোগ্যতাকে। ২০২৫ সালে সেই পূর্বানুমানযোগ্যতা ছিল অর্থনীতির সবচেয়ে অনুপস্থিত উপাদান।
অর্থনীতির এক পুরনো সত্য হলো বিনিয়োগ মূলত আস্থার সিদ্ধান্ত। উদ্যোক্তারা যখন ভবিষ্যৎ দেখতে পান না, যখন নীতি বদলে যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে থাকেন, যখন ব্যাংকের ভেতরের অবস্থা নিয়ে তারা সন্দিহান, তখন তারা হিসাব করে দেখেন, ‘ঝুঁকি নেব, নাকি আপাতত অপেক্ষা করব?’ ২০২৫ সালে অধিকাংশ উদ্যোক্তার উত্তর ছিল—অপেক্ষা। এখন মাটি একটু নরম, একটু ভেজা, একটু কাঁপা। এমন জায়গায় কেউ বীজ পুঁততে চায় না। ২০২৫ সালের বিনিয়োগ-মন্দা ঠিক সেই ধরনের মাটির গল্প।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কঠোর মুদ্রানীতি। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়িয়েছে; যা সামষ্টিকভাবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর কড়াকড়িতে ঋণপ্রবাহ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ শতাংশের কোটায়। মূল্যস্ফীতি কমানোর বিনিময়ে বিনিয়োগে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা প্রবৃদ্ধির পায়ের কাছে বেঁধে দিয়েছে অদৃশ্য ওজন।
আরেক পাশে ছিল জ্বালানি খাতের অসংগতি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে হাঁপিয়ে তুলেছে। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারেনি। কেউ কেউ লস করে, কিন্তু বন্ধ করতেও সাহস পায়নি। অর্থনীতির ভাষায় এ অবস্থাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
ফলাফল খুব পরিষ্কার। উৎপাদন কমেছে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, আয় বৃদ্ধি থেমে গেছে, আর বিনিয়োগ চলে গেছে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ জোনে। প্রবৃদ্ধির গ্রাফ তাই স্বাভাবিকভাবেই মাঝপথে থেমে গেছে।
মূল্যস্ফীতি কাগজে কমে, জীবনে কমে না কেন?
একটা সময় গোটা দেশ একটি কথাই বলত—দাম কমবে কবে? ২০২৫ সালে ছবিটা একটু পাল্টেছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে ৩৭ মাস পর মূল্যস্ফীতি অবশেষে ৮ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে মানুষের মুখের ভাষা শুনলে বোঝা যায়, এ পরিসংখ্যান যেন বাস্তবের সঙ্গে এক ধরনের সূক্ষ্ম দূরত্ব রেখে চলেছে।
খাদ্যমূল্য বছরজুড়ে ছিল উচ্চ। চাল, ডাল, সবজি, ডিম, মাংস—সবকিছুর দাম আগের তুলনায় বেশি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ফলে ‘মূল্যস্ফীতি কমেছে’ এ ঘোষণার পরও বাজারের ব্যাগ হালকা হচ্ছে না, ক্রেতার কপালের ভাঁজও কমছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস্তব মজুরি না বাড়ার কষ্ট। মাস শেষে হাতে থাকে আগের চেয়ে কম টাকা। আয় যতটুকু বাড়ে, তার চেয়ে বেশি দ্রুত বাড়ে খরচ। অনেক পরিবার এখন দুইবারের বাজার একবার করে। কেউ কেউ ভাত কমিয়ে ডাল বাড়িয়ে দেয়। এ সব ছোট ছোট পরিবর্তনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বড় সংকটের চিহ্ন।
অন্যদিকে শহুরে জীবনে বাড়ি ভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন, স্কুল-কলেজের ফি—সব মিলিয়ে ব্যয়ের চাপ বহুগুণে বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ‘কমেছে’ কথাটা অনেকের কানে যেন এক ধরনের তীব্র ব্যঙ্গের মতো শোনায়। এ কারণেই ২০২৫ সালে আমরা দুই ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখেছি; একটি কাগজে, আরেকটি মানুষের জীবনে। কাগজে মূল্যস্ফীতি কমলেও মাঠ পর্যায়ে—অর্থাৎ যে মূল্যস্ফীতি মানুষ অনুভব করে, তা ছিল অনেক বেশি তীব্র। সংখ্যা তাই এক কথা বলেছে, আর মানুষের অভিজ্ঞতা বলেছে অন্য কথা।
দারিদ্র্যের বিস্তার: বছরের সবচেয়ে নীরব অথচ গভীর সংকট
২০২৫ সালের অর্থনীতি নিয়ে যত কথা হবে, তার ভেতরে সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীরতম সংকট হলো নতুন দারিদ্র্যের উত্থান। এটি এমন এক সংকট, যা টক শোতে খুব বেশি আলোচ্য নয়। এটা হেডলাইন হয় না, কিন্তু যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের ভেতরে, রান্নাঘরে, স্কুলছুট শিশুদের চোখে, তরুণ বেকারদের দীর্ঘশ্বাসে।
মাত্র তিন বছরে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি সামাজিক স্থিতির জন্য বিপজ্জনক সিগন্যাল।
গ্রামে কৃষিশ্রমিকদের আয় প্রায় স্থবির। ধানের দাম কিছুটা বাড়লেও মজুরি সে অনুপাতে বাড়েনি। তাদের জীবন দাঁড়িয়ে আছে ‘আজ চলল, কাল দেখা যাবে’—এ অনিশ্চিত বাক্যের ওপরে। শহরে গার্মেন্টস ও সেবা খাতে কাজের সুযোগ কমেছে। অনেকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন, কেউ কেউ মাসের পর মাস কাজের অপেক্ষায় আছেন। এর ফলে মধ্যবিত্তের একটি অংশ নিচে নেমে নতুন দরিদ্র শ্রেণীতে মিশে গেছে। মধ্যবিত্তের দীর্ঘদিনের সুরক্ষা-কুশন ছিল সঞ্চয়। ফিক্সড ডিপোজিট, ছোট ছোট সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক ব্যালান্স; এগুলোই একটু বিপদে বাঁচাত।
২০২৫ সালে সেই সঞ্চয় গলেছে দ্রুত। অনেকেরই এখন সঞ্চয় ভেঙে মাস চলে, না হলে ঋণ নিয়ে মাসের হিসাব মেলাতে হয়। ব্যাংকগুলোর রিটেইল লোন ও ক্রেডিট কার্ডের স্থিতি বৃদ্ধি সেটারই সাক্ষ্য দেয়।
কয়েকটি নিরীহ শব্দ ‘খরচ কমানো’; এর ভেতরেও আছে ভয়াবহ বাস্তবতা। অনেক পরিবার প্রথমেই কমিয়েছে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ব্যয়, টিউশনি, কোচিং, ভালো স্কুলে পাঠানোর স্বপ্ন। স্বাস্থ্য ব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেকে ঋণের ফাঁদে ঢুকেছেন। একজন সদস্য অসুস্থ হলে পুরো পরিবার দারিদ্র্যের দিকে পিছলে গেছে। এসব পরিবর্তন একসঙ্গে আমাদের সামনে প্রশ্ন তুলে—সামাজিক কাঠামোর যে স্থিতি এতদিন বাংলাদেশের বড় শক্তি ছিল, তা কি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে?
দারিদ্র্য কখনো শুধু অর্থের অভাব নয়। এটি আশা কমিয়ে দেয়। ভবিষ্যৎকে ছোট করে দেয়। একটি প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসকে ক্ষয়ে দেয় অদৃশ্যভাবে। ২০২৫ সে ছায়াটাকেই আরো ঘন করেছে।
রিজার্ভ ও ডলার বাজার: আশ্বস্তির আলো, আশঙ্কার ছায়া
২০২২-২৩ সালের তীব্র ডলার সংকটের পর ২০২৫ সালে ডলার বাজার অনেকটাই শান্ত। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু হওয়ায় কৃত্রিমতা কমেছে, রেমিট্যান্স ও রফতানির প্রবাহে রিজার্ভ স্থিতিশীলভাবে ৩০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ঘুরেছে। এটি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটা স্পষ্ট স্বস্তি। কিন্তু এর উল্টোপিঠও আছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং সংকোচনও রিজার্ভ সুরক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে নতুন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির জন্য সুখবর নয়। অর্থাৎ রিজার্ভ স্থিতিশীল হয়েছে, কিন্তু অংশত তার বিনিময়ে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কিছু অংশ বন্ধক রাখা হয়েছে।
ব্যাংক খাত: ঝুঁকির চূড়ান্ত নাম
২০২৫ সালের আরেকটি নির্মম সত্য হলো, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল লিংক। খেলাপি ঋণের অংক ৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন টাকা। মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে দুর্দশাগ্রস্ত। এটি এশিয়ার অন্যতম সবচেয়ে খারাপ চিত্র।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমানতকারীর আস্থা কমে যাওয়া। কিছু ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে গ্রাহকরা বিপাকে পড়ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চলছে ভয়াবহ তারল্য সংকট। যে প্রতিষ্ঠানের মূলধন হলো মানুষের বিশ্বাস, সেখানে সেই বিশ্বাসেই যখন ফাটল ধরে, তখন পুরো ব্যবস্থাই কাঁপতে থাকে।
পাঁচ দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ একটি সাহসী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও বাস্তবে এটি অনেকটা ভাঙা পাঁচটি ঘর জোড়া দিয়ে একটি মজবুত বাড়ি বানানোর মতো কাজ। এ কাজ কেবল তখনই সফল হবে, যখন এর ভেতরে থাকবে কঠোর সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা।
২০২৫ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে অর্থনীতির দেহে ব্যাংক খাত হলো রক্তবাহী নালি। আর সেখানে রক্ত যদি জমাট বাঁধে তাহলেই সবচেয়ে বড় বিপদ। আর সেই বিপদ এখন কেবল কল্পনায় নয়, বাস্তবের দরজায় কড়া নাড়ছে।
অর্থ পাচার ও আর্থিক অপরাধ: অপ্রকাশিত, কিন্তু গভীর ক্ষত ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারবিরোধী কিছু পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়েছে। এর মধ্যে সম্পদ জব্দ, তদন্ত, আলোচিত কেলেঙ্কারির উন্মোচন ইত্যাদি অন্যতম। এগুলো জনগণের একাংশকে আশ্বস্ত করেছে এভাবে যে কমপক্ষে কিছু পদক্ষেপ তো নেয়া হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যও ভয়ংকর। অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে, শ্রমিক বেকার হয়েছে। ব্যাংকের ওপর আস্থা কমেছে। বিনিয়োগকারীরা আরো ভয় পেয়েছেন। অর্থনীতির কোনো অংশ থেকেই অপরাধকে মেনে নিলে সেটি পুরো ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে।
২০২৫ আমাদের কী শিখিয়েছে?
বছর শেষে দাঁড়িয়ে তাই এ কথাগুলো স্পষ্টভাবে বলা যায় যে অর্থনীতি কিছুটা স্থিতি পেয়েছে, কিন্তু গতি পায়নি। সামষ্টিক সূচক কিছু ক্ষেত্রে ভালো, কিন্তু মানুষের জীবন এখনো চাপে, অনিশ্চয়তায়। ব্যাংক খাতের সুশাসন ছাড়া কোনো টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন কেবল কাগজে থাকেই, বাস্তবে আসে না।
২০২৫ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে সংকটের পর স্থিতি আসতে পারে, কিন্তু উন্নতির পথ ধরতে হলে দরকার তিনটি জিনিসের সমন্বয়—আস্থা, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন। এ তিনের মধ্যে কোনো একটাও যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে অর্থনীতি ভেসে থাকবে ঠিকই, কিন্তু সামনে এগোনোর মতো শক্তি অর্জন করতে পারবে না।
আশানুর রহমান: ব্যাংকার ও লেখক