আস্থা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ চান ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা

বেসরকারি উদ্যোগে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশ অগণতান্ত্রিক ধারায় চলেছে, যার অবশ্যম্ভাবী ফল জনগণের আস্থাহীনতা। আইনের শাসন থেকে শুরু করে দেশের আর্থিক ও ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা নেই অধিকাংশের।

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশ অগণতান্ত্রিক ধারায় চলেছে, যার অবশ্যম্ভাবী ফল জনগণের আস্থাহীনতা। আইনের শাসন থেকে শুরু করে দেশের আর্থিক ও ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা নেই অধিকাংশের। যদিও দেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু এ আশার সঙ্গে সংশয়েরও যোগ রয়েছে। প্রত্যাশা রয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রের সংস্কার ঘিরে আর সংশয় রয়েছে ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কার্যক্রম কতটা এগিয়ে নিতে পারবে আর রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হবে তা নিয়ে নানা মহলে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।

তবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সর্বস্তরের মানুষ এই নতুন বছরে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশা করছেন, বিশেষত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। সম্প্রতি বণিক বার্তা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাছে নতুন বছরের প্রত্যাশা জানতে চাইলে মোটাদাগে তারা জনগণের আস্থা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর জোর দেন। তাদের ভাষ্যে, ২০২৪ সাল ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। তাদের প্রত্যাশা আইন-শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে এমন একটা পরিবেশ যেখানে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে, শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটবে না। সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর হবে এবং মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া আরো বাড়বে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে সরকার এবং ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক ছাড়া সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাছাড়া এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার সক্ষমতা রাখে। এজন্য বেসরকারি উদ্যোগে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে গণতান্ত্রিক চর্চা ও আস্থা পুনরুদ্ধার।

আস্থা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ উন্নয়নের এমন ভিত্তি তৈরি করে যেখানে সুশাসন, ন্যায়বিচার ও সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। জনগণ ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকলে সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। কারণ জনগণ তাতে সাড়া দেয় না। যে কারণে কর ফাঁকি, আইন অমান্য করা ও নাগরিক দায়িত্বে অবহেলার মতো সমস্যাগুলো প্রকট রূপ ধারণ করে। আবার এ আস্থাহীনতা তৈরি হয় অগণতান্ত্রিক পরিবেশের কারণে। এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণের মতামত ও অধিকারকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে, যা সমাজে বৈষম্য তৈরি করে। জনগণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধার ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যতীত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে পুরো রাষ্ট্র দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে ঘুরপাক খেতে থাকে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-উদ্যোগে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও ব্যবসায় অংশীজনরাও এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিমাণ কমে আসে এবং বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। অনেক সময় ভূ রাজনৈতিক উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়, যা আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য বেসরকারি খাতের বিকাশবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বদা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে এ খাতে দেশের ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

বিগত সরকারের আমলে এক প্রকার কোণঠাসা হয়ে ছিল বেসরকারি খাত। এ সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণনির্ভরতার কারণে ঋণবঞ্চিত হয়ে আসছে খাতটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-এর অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩০ শতাংশে, যা গত ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২১ সালের মে মাসে সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। আবার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বহুদিন ধরেই বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদনের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। এছাড়া রাজনৈতিক মদদে কতিপয় অলিগার্ক ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে, যাদের হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। তারাই মূলত দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থও পাচার করেছে। এছাড়া ভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে নতুনভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগে থেকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট তো রয়েছেই। আর দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে এ খাতে নতুন বিনিয়োগের মাত্রাও কমেছে। বিশেষত বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে ৮ শতাংশের বেশি। সব মিলিয়ে এক ধরনের ধুঁকে ধুঁকে চলছে খাতটি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দিতে হবে।

এর অন্যতম সমাধান হতে পারে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এতে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাসহ জনমনে আস্থা ফেরানো সহজ হতে পারে। তাদের মনে সংশয় রয়েছে, পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার হিসেবে কোন দল দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এর সঙ্গে নীতি-ধারাবাহিকতার প্রসঙ্গটি জড়িত, যা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নীতি ধারাবাহিকতার অভাব দেশে ব্যবসার অন্যতম অন্তরায়। তবে নির্বাচনের প্রস্তুতি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এক্ষেত্রে অবশ্যই সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ মানুষের বেশি আকাঙ্ক্ষা সংস্কার ঘিরেই। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয় সেজন্য নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। পরে সে মোতাবেক এমন নীতি-কৌশল নিতে হবে সরকারকে যা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে ও বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটাবে। এতে আশা করা যায় জনমনেও স্বস্তি ফিরবে। কারণ বেসরকারি খাত চাঙ্গা হলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়াবে। কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে, যা বেকারত্বের হার কমাবে।

কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। উপরন্তু গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা-অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। বলা বাহুল্য, এমন পরিস্থিতিতে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ আরো সংকুচিত হয়েছে। বেসরকারি খাতের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে সে পথ প্রশস্ত করা হোক। সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করায় সরকারের মনোযোগ কাম্য। শিল্প উৎপাদনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে, বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের টেকসই কোনো সমাধান বেরিয়ে আসুক- এটিই প্রত্যাশা।

আরও