সন্দেহজনক ভ্রমণে বিমানবন্দর থেকে ফেরত ৮১,৫০০ বিদেশগামী

বিশ্বমঞ্চে সুনাম রক্ষা ও প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তায় ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশ ভ্রমণ থামাতে হবে

এসবির বরাতে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সমস্যাটি একমাত্র জাল ভিসা বা জাল কাগজপত্রের নয়। কোথাও বন্ধ শ্রমবাজারে বিকল্প পথে প্রবেশের চেষ্টা, কোথাও মানব পাচারের সম্ভাবনা, কোথাও ভিসার শর্তভঙ্গ, আবার কোথাও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের অসংগতি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি ভিত্তির একটি হচ্ছে রেমিট্যান্স। প্রবাসী শ্রমিকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর শ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত টাকা দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। অথচ কয়েক যুগ পেরিয়েও শৃঙ্খলা আসেনি এ খাতে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, তদারকি ও শৃঙ্খলার অভাবে যাওয়ার পথে যেমন নানা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, তেমনি ওই দেশে গিয়ে নানা ধরনের বিপদের মুখোমুখি হন। প্রতি বছর যাওয়ার পথে, প্রবাসে মারা যাচ্ছেন শত শত এবং বিভিন্ন দেশের জেলখানায় আটক ও নিখোঁজ হচ্ছেন সহস্রাধিক। নিরাপদ প্রবাসযাত্রা নিশ্চিতে সরকারের সব বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের বিমানবন্দর থেকে ৮১ হাজার ৫০০ বিদেশগামীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে ২ কোটি ৯১ লাখের বেশি বাংলাদেশী বিদেশে গেছেন। বিদেশযাত্রার সামগ্রিক প্রবাহের তুলনায় ফেরত পাঠানোর সংখ্যা খুব বড় না হলেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত উপেক্ষা করার মতো নয়। কারণ বিমানবন্দরে আটকে যাওয়া প্রতিটি যাত্রার পেছনে থাকে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, কয়েক মাসের প্রস্তুতি, অনেক ক্ষেত্রে ঋণ করে জোগাড় করা অর্থ এবং বিদেশে একটি নতুন জীবনের প্রত্যাশা। কেউ প্রতারণার শিকার হয়ে থাকলে তার ক্ষতি শুধু ওই মুহূর্তের যাত্রা বাতিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ঋণের বোঝা, দালালের কাছে দেয়া অর্থ, চাকরি হারানোর ঝুঁকি এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হয়। তাই বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানোর পরিসংখ্যানকে শুধু ইমিগ্রেশন পুলিশের কার্যক্রমের সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও দুর্বলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

এসবির বরাতে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সমস্যাটি একমাত্র জাল ভিসা বা জাল কাগজপত্রের নয়। কোথাও বন্ধ শ্রমবাজারে বিকল্প পথে প্রবেশের চেষ্টা, কোথাও মানব পাচারের সম্ভাবনা, কোথাও ভিসার শর্তভঙ্গ, আবার কোথাও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের অসংগতি। এর বিপরীতে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অযৌক্তিক জিজ্ঞাসাবাদ বা হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা এবং যাত্রীর ন্যায্য অধিকার—দুই বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করতে হবে। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো একজন বিদেশগামী নাগরিককে যদি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে গিয়ে প্রথমবারের মতো জানা যায় যে তার ভিসা সন্দেহজনক, গন্তব্যের শ্রমবাজার বন্ধ, কিংবা তার কাগজপত্রের কোনো অসংগতি রয়েছে, তাহলে আগের ধাপগুলোর যাচাই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা কতটা? বিমানবন্দর মূলত চূড়ান্ত যাচাইয়ের জায়গা হতে পারে; কিন্তু বিদেশযাত্রার ঝুঁকি শনাক্ত ও নিরসনের প্রধান জায়গা হওয়া উচিত নয়। বিএমইটি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইমিগ্রেশন পুলিশ, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের লেবার উইং এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা কর্তৃপক্ষ—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্যের আলাদা অংশ রয়েছে। কিন্তু একটি সমন্বিত ডিজিটাল যাচাই কাঠামো না থাকলে এ বিচ্ছিন্ন তথ্য ব্যবস্থাই জালিয়াত চক্রের সুযোগ তৈরি করে।

এ অবস্থায় প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় ভিসা ও অভিবাসন যাচাই ব্যবস্থা। বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় চাকরির চাহিদাপত্র, নিয়োগকর্তা, রিক্রুটিং এজেন্সি, ভিসা, বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স ও ইমিগ্রেশন—প্রতিটি ধাপের তথ্যকে একটি নিরাপদ ডিজিটাল প্লাটফর্মে যুক্ত করতে হবে। কোনো কর্মীর জন্য একটি ইউনিক ডিজিটাল রেকর্ড থাকবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট নথির উৎস ও যাচাইয়ের অবস্থা সংরক্ষিত থাকবে। ফলে একই ভিসা বা অনুমোদনপত্র একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহারের মতো জালিয়াতি শনাক্ত করা সহজ হবে।

এখানে প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু তথ্য সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঝুঁকিভিত্তিক ‘রেড ফ্ল্যাগ’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কোনো দেশের শ্রমবাজার বন্ধ বা সীমিত, কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ রয়েছে, একই নথি একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে, কোনো রুটে মানব পাচারের প্রবণতা বাড়ছে কিংবা ভিসার ধরন ও ঘোষিত ভ্রমণ উদ্দেশ্যের মধ্যে অস্বাভাবিকতা রয়েছে—এ ধরনের তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে যুক্ত করে স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা তৈরি করা যেতে পারে। তবে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদেশযাত্রা বাতিলের কারণ না হয়; বরং তা অতিরিক্ত যাচাইয়ের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে বিমানবন্দরে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সন্দেহের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে বৈধ যাত্রী হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের জন্যও অভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রয়োজন। শুধু ইমিগ্রেশন পর্যায়ে সংস্কার করলেই হবে না, বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো ব্যবসায়িক শৃঙ্খলকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য একটি ঝুঁকিভিত্তিক পারফরম্যান্স রেকর্ড তৈরি করা যেতে পারে। কোনো এজেন্সি কত কর্মী পাঠিয়েছে, তাদের কত গন্তব্যে পৌঁছেছেন, কত ফেরত এসেছেন, কতটি অভিযোগ হয়েছে এবং জাল নথি বা প্রতারণার ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা—এসব তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার। ধারাবাহিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে অতিরিক্ত যাচাই, লাইসেন্স পর্যালোচনা কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

অভিবাসন ব্যবস্থায় দালালনির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগে সরকারি প্লাটফর্ম থেকেই যেন জানতে পারেন তার ভিসা বৈধ কিনা, নিয়োগকর্তা অনুমোদিত কিনা, এজেন্সি বৈধ কিনা, চাকরির চাহিদাপত্র সঠিক কিনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশে ওই ধরনের কর্মী নিয়োগ চালু আছে কিনা। বিদেশে যাওয়ার প্রকৃত খরচ, নিয়োগকর্তার নাম, চাকরির শর্ত এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিও একই প্লাটফর্মে দেয়া যেতে পারে। তথ্যের এ স্বচ্ছতা তৈরি হলে দালাল চক্রের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর লেবার উইংকেও আরো কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। বিদেশযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন বৈধ যাত্রীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় বাধা তৈরি না হয়, সেটিও মনে রাখা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ অভিবাসনের সাফল্য পরিমাপের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা। কত কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়েছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র সূচক নয়। কতজন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছেন, কতজন প্রতারণার শিকার হয়েছেন, কতজন ফেরত এসেছেন, কতজন চাকরির শর্ত অনুযায়ী কর্মসংস্থান পেয়েছেন এবং কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যার চেয়ে নিরাপদ ও টেকসই অভিবাসন ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিমানবন্দরে একটি যাত্রা থেমে যাওয়ার দৃশ্যের পেছনে তাই কেবল একজন যাত্রীর হতাশা থাকে না। থাকে একটি পরিবারের হিসাব, ধার করা অর্থ, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা এবং কখনো কখনো কয়েক মাসের প্রস্তুতি। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে—যে ঝুঁকি বিমানবন্দরে শনাক্ত হচ্ছে, সেটি কেন তার আগেই শনাক্ত হলো না? বিদেশে যাওয়ার জন্য কোনো নাগরিক যখন বিএমইটি, রিক্রুটিং এজেন্সি, দূতাবাস ও অন্যান্য ধাপ অতিক্রম করেন, তখন প্রতিটি পর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি শেষ মুহূর্তে এসে জালিয়াতি ধরা পড়ে, তাহলে সমস্যাটি কেবল যাত্রীর নয়; পুরো ব্যবস্থার।

বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মী ও অন্যান্য যাত্রীর জন্য তাই এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে প্রতারক ও পাচারকারী আগেই শনাক্ত হবে, জাল নথি আগেই ধরা পড়বে এবং বৈধ যাত্রী বিমানবন্দরে গিয়ে অপ্রত্যাশিত বাধার মুখে পড়বেন না।

আরও