পর্যালোচনা

সর্বজনীন পেনশন প্রকল্প এবং কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়

কখনো কখনো কোনো বিষয় হরষ বিষাদে রূপান্তর হয়। আমাদের ভয়, লাখ লাখ সম্ভাব্য বাংলাদেশী যারা সরকারের ঘোষিত সর্বজনীন পেনশন ফান্ডে চাঁদা দিয়ে ভবিষ্যতের নিশ্চিত আর্থিক সমর্থন পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন—শেষ পর্যন্ত তাদের খুশি বিষাদে রূপান্তর হয়! আমরা প্রার্থনা করব সেই রকমটা না হোক। শুনতে অবশ্য ভালো লাগবে—শেষ পর্যন্ত সরকারই তাদের ব্যাপক জনগণকে অবসরে আর্থিক নিরাপত্তার

কখনো কখনো কোনো বিষয় হরষ বিষাদে রূপান্তর হয়। আমাদের ভয়, লাখ লাখ সম্ভাব্য বাংলাদেশী যারা সরকারের ঘোষিত সর্বজনীন পেনশন ফান্ডে চাঁদা দিয়ে ভবিষ্যতের নিশ্চিত আর্থিক সমর্থন পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন—শেষ পর্যন্ত তাদের খুশি বিষাদে রূপান্তর হয়! আমরা প্রার্থনা করব সেই রকমটা না হোক। শুনতে অবশ্য ভালো লাগবে—শেষ পর্যন্ত সরকারই তাদের ব্যাপক জনগণকে অবসরে আর্থিক নিরাপত্তার ছাতা পেনশন প্রকল্পের আওতায় আনতে সচেষ্ট হয়েছে। কিন্তু সরকারের এ নিরাপত্তা ছাতা প্রদানের সামর্থ্য আছে কি? কিংবা ভবিষ্যতেও হবে কি? অনেকেই মনে করতে পারেন, ব্যক্তির চাঁদার ভিত্তিতে পেনশন ফান্ড গঠন হলে সরকার এ কাজে ব্যর্থ হবে কেন। আসলে সরকার বা এক্ষেত্রে পেনশন ফান্ড ম্যানেজার সরাসরি ব্যর্থ হবে না, ব্যর্থ হবে অন্য অবয়বে। একটা পর্যায়ে এ নিয়ে অনেকে অনেক প্রশ্ন তুলবে যেগুলোর উত্তর এখনই ভেবে দেখা দরকার। কারা এই পেনশন ফান্ডের চাঁদা নেবে? সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ? এ কর্তৃপক্ষ আইন দিয়ে গঠন হয়েছে নাকি সরকারি হুকুমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি শাখা বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট হিসেবে কাজ করছে।

আইন দিয়ে পেনশন কর্তৃপক্ষ গঠন হলে এর কাজের ধরন হবে অনেকটা স্বাধীন এবং সেখানে পরিচালক/কমিশনার ইত্যাদি পদের লোকজন নিয়োজিত হবে যারা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন। আর সরকারের একটা দপ্তর যদি পেনশন কর্তৃপক্ষ হয় তাহলে তো সেটাতে আজ অমুক চেয়ারম্যান/মেম্বার, কাল অমুক চেয়ারম্যান/মেম্বার, যার প্রায় সবাই হবেন সরকারি আমলা বা কর্মকর্তা। আর এমন একটা সংস্থার পক্ষে এমন লোকদের দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার পেনশন ফান্ডকে ব্যবহার করা এবং ব্যবহারের আয় থেকে চাঁদা প্রদানকারীদের পেনশন দেয়া মোটেই সম্ভব হবে না। আমাদের স্মরণে পড়ে না আইন দিয়ে একটি স্বতন্ত্র পেনশন কর্তৃপক্ষ গঠন হয়েছে কিনা। আইন হলেই কেবল বিধির কথা আসবে। আইন বা বিধি ব্যতিরেকে সরকার জনগণ থেকে চাঁদা নিলে বিষয়টিতে স্বচ্ছতার অভাব অবশ্যই থাকবে। মানুষ জানতে চাইবে পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কে, কারাই বা সদস্য। তাদের অর্থ ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতা আছে কিনা। 

লক্ষ কোটি টাকা যদি পেনশন ফান্ডে জমা পড়ে সেই অর্থ হবে সরকারের জন্য হিসাববিজ্ঞানের পরিভাষায় দায়। দায় যদি সম্পদে রূপান্তর না হয় তাহলে একটা সময় পেনশন কর্তৃপক্ষ দায় নিয়ে জনগণের যারা পেনশন ফান্ডে অনেক বছর ধরে চাঁদা দিয়েছে তাদের পাওনা মেটাতে পারবে না। পেনশনে প্রদেয় চাঁদা হবে পাবলিক ফান্ড বা জনগণের অর্থ। এ অর্থকে সরকারের আয় (রিভিনিউ) হিসেবে দেখা যাবে না। 

এ অর্থের মালিক যারা চাঁদা দিয়েছে তারা এবং তারা ভবিষ্যতে বর্ধিত আকারে আয় পাবে ভেবেই আজকে ওই ফান্ডে চাঁদা দেবে। এখানে ফান্ডের নিরাপত্তার বিষয়টি অতিগুরুত্বপূর্ণ। মানুষ ভাবে, সরকার থেকে বেশি নিরাপত্তা অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা তাদের প্রদেয় ফান্ডের ক্ষেত্রে বেশি নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সেই জন্য এই ফান্ডে চাঁদা অনেকেই দিতে চাইবে। অবসরে বা ৬০ বছর পর একটু আর্থিক নিরাপত্তা কে না চায়। আগে এ ধরনের কোনো স্কিম ছিল না। ফলে পেনশন প্রত্যাশীরা ইচ্ছা থাকলেও চাঁদা দিতে পারেনি। অন্য কথা হলো, নিজের টাকা নিজে জমিয়ে এবং ব্যবস্থাপনা করে কি তারা আর্থিক নিরাপত্তাটা অর্জন করতে পারত না? এটা অধিকাংশ লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের ফান্ডে সঞ্চয় থাকলে সেই সঞ্চয় ব্যয়ে চলে যায়। আর অন্য কথা হলো, সবাই তো ভালো আর্থিক ব্যবস্থাপক হতে পারেন না। তাই তো বিশ্বব্যাপী দেখা যায়, অনেক লোক আর্থিক নিরাপত্তা খুঁজতে গিয়ে নিজের জমানো অর্থ অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে। এতে অনেকেই ঠকছে, আবার অনেকে সামান্য লাভ পেয়েও থাকেন। তবে সমস্যা হলো, নিজের অর্থ অন্যে ম্যানেজ করলে লাভ কমই পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে লাভ করে বেশি ওইসব মধ্যস্থকারীরা যারা জনগণ থেকে অর্থ নেয়। সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ক্ষেত্রে একটা বড় প্রশ্ন আসবে—নেয়া অর্থ ম্যানেজ করবে কে? না কর্তৃপক্ষ ব্যাংকে টাকা রেখে নিরাপদে সুদ আয় করবে? বিশ্বের অন্যত্র সুদ আয় বড় কোনো উৎস নয়। ওইসব দেশে সুদের হারও অতিনগণ্য। তাই বাংলাদেশেও ভুলে যেতে হবে এ উৎস থেকে আয় করে পেনশন ফান্ড চালানো যাবে। ধরে নিলাম, আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং বিধি দিয়ে চালিত একটা পেনশন কর্তৃপক্ষ গঠন হলো। কিন্তু কর্তৃপক্ষ গঠন হলেই কি সংগৃহীত ফান্ড আপনা আপনি ম্যানেজ হয়ে যাবে? ওই বিশাল ফান্ডকে পাহারা দেবে কে? বিশ্বে যত দেশেই পাবলিক থেকে চাঁদা নিয়ে পাবলিক ফান্ড গঠন হয়েছে ওইসব দেশে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য স্বতন্ত্র বোর্ড থাকে যারা ফান্ডকে পাহারা দেয়।

পেনশন কর্তৃপক্ষ ফান্ডকে নয়ছয় করছে কিনা তা স্বতন্ত্র একটা বডি দেখে, যার নাম দেয়া হয় ট্রাস্টি বোর্ড। ট্রাস্টিদের কাজ হলো পাবলিক ফান্ডের হেফাজত করা। বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশন ফান্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন হয়েছে কি? তার পরও কথা থেকে যায়, ট্রাস্টি বোর্ড যদি হয়ও, ওই অর্থ কোথায় গচ্ছিত থাকবে, পাবলিক ফান্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র কাস্টোডিয়ান সার্ভিস লাগে। কোন সংস্থা এক্ষেত্রে ওই সেবা দেবে? এ ব্যাপারগুলো কি সম্ভাব্য চাঁদা প্রদানকারীদের জানানো হয়েছে? সবচেয়ে বড় কথা, পেনশন কর্তৃপক্ষ তো হবে একটা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, এ সংস্থার অধীনে অন্য অনেক বিভাগ ও দক্ষ লোকবল থাকতে হবে। ওই সংস্থার থাকতে হবে পোর্টফোলিও ম্যানেজার, যারা হবে বিনিয়োগে দক্ষ এবং কোথায় বিনিয়োগ করলে কত রিটার্ন আসতে পারে এবং ওইসব বিনিয়োগে ঝুঁকি কেমন তা কেবল দক্ষ, শিক্ষিত, অভিজ্ঞ পোর্টফোলিও বা বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবে। পেনশন কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকতে হবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি পরিমাপ করার জন্য একটি গবেষণা বিভাগ।

 গবেষণা বিভাগের কাজ হবে বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের গবেষণার ফল সরবরাহ করে সাহায্য করা। পেনশন ফান্ড ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা আসবে বিনিয়োগের সুযোগ ও ক্ষেত্রগুলোর অভাব থেকে। ফান্ড সংগ্রহ করলেই হলো না, ফান্ডকে তো ব্যবহার করতে হবে। লক্ষ কোটি টাকার ফান্ড ব্যবহার করার জন্য বিনিয়োগের সুযোগ বাংলাদেশে আছে কি? অন্য দেশে পেনশন ফান্ডের একটি বড় অংশ পুঁজিবাজারে ব্যবহার করা হয়। পুঁজিবাজার বলতে ইকুইটি ও বন্ড বাজার উভয়কেই বোঝানো হয়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে গভীরতা ও বর্তমান অবস্থা সবারই জানা আছে। এ বাজারে বড়জোর কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে পারে। লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য এ বাজার অবশ্যই নয়। তাহলে কর্তৃপক্ষ এত টাকার ফান্ড অন্যত্র কোথায় বিনিয়োগ করবে। আমাদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত না সরকার তার প্রকল্প অর্থায়নের জন্য এ ফান্ডের দিকে নজর দেয়! সরকার যদি বলে যে লাভের বিনিময়ে অমুক অমুক প্রকল্পে এই ফান্ড থেকে অর্থ দেয়া হোক। তাহলে ফান্ড কর্তৃপক্ষ কি তাতে সায় দেবে? দেয়ার কথা নয়। তবে বাংলাদেশে আর্থিক খাতের এখন যে অবস্থা তাতে সবই সম্ভব। আমরা এও আশঙ্কা করি, এই ফান্ড থেকে সরকার পাছে তার ঘাটতি বাজেট মেটানোর জন্য অর্থ নিতে থাকে। তাহলে তো এই ফান্ডে ট্রাস্টি কর্তৃক পাহারাকৃত কোনো ফান্ডই থাকবে না। এটা হয়ে পড়বে সরকারের জন্য নন-ট্যাক্স রাজস্ব আহরণের আর এক নাম। হ্যাঁ, কোনো কোনো প্রকল্পে লাভের ভিত্তিতে এই ফান্ড থেকে অর্থ দেয়া যেতে পারে, তবে সেই লাভটাকে হিসাব করতে হবে ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মতিতে ফান্ড কর্তৃপক্ষকে। এজন্য বড় রকমের গবেষণা লাগবে। 

প্রকল্প থেকে যদি রিটার্ন না আসে তাহলে ওই সম্ভাব্য অর্থায়নের বিপরীতে জামানত দেবে কে? এসব প্রশ্ন আসবেই। অন্য দেশের পুঁজিবাজার যেমন অনেক বড়, সেসব দেশে বিনিয়োগের জন্য বিকল্পও অনেক বেশি। অন্য দেশে দেশে কোনো বড় রকমের বিদেশী বিনিয়োগ হলে কিংবা দেশের ব্যক্তি খাতের মাধ্যমেই বড় বিনিয়োগ হলে সরকার একটা অংশ রাখে মালিক হিসেবে। অন্য কথায়, ওইসব দেশে সরকার প্রকল্পের পুঁজিতে অংশীদারত্ব নেয়। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ তেমন নেই। যে গুটিকয়েক কোম্পানিতে সরকারি শেয়ার ছিল সেগুলো থেকেও সরকার শেয়ার বিক্রি করে উঠে এসেছে। আজ পেনশন ফান্ডের অর্থ লাভজনক কোম্পানির ইকুইটিতে বিনিয়োগ করা যেত। সব মিলিয়ে লক্ষ কোটি টাকার পেনশন ফান্ডের অর্থ ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুযোগ অতিসীমিত। বিনিয়োগের সুযোগগুলো বিবেচনায় না নিয়ে এত বড় পেনশন ফান্ডকে উন্মুক্ত করা ঠিক হয়নি বলেই আমাদের ধারণা। অন্য বিষয় হলো, আজকে জনগণ যা ভাববে ও কালকে যারা ভাববে, তা হলো যে অর্থ ৩০-৪০ বছর ধরে চাঁদা হিসেবে দেবে ওই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা তাদের প্রদেয় অর্থের প্রকৃত মূল্য পাবে কিনা। বিষয়টাকে আরো পরিষ্কার করা দরকার। ৩০-৪০ বছরের ব্যবধানে অর্থনীতিতে কী পরিমাণ মূল্যস্ফীতি হয় তা কেউ বলতে পারে না। সহজ হিসাব হলো, ৩০-৪০ বছর পর তারা প্রতি মাসে যে পেনশন পাবে তা অবশ্যই ইনফ্লাশন অ্যাডজাস্টমেন্ট অর্থ হতে হবে। টাকার অংকে একটা অর্থ তাদের হাতে ধরিয়ে দিলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। এজন্য বলব, জনগণ থেকে এই ফান্ডে চাঁদা নেয়ার আগে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বলতে হবে তাদের প্রদেয় টাকার প্রকৃত মূল্য হিসাব করে তাদেরকে পেনশন দেয়া হবে। এটা না করা হলে পেনশন হবে একটা ঠকবাজির হাতিয়ার। চাঁদা গ্রহণ করার আগেই কর্তৃপক্ষকে বলতে হবে তারা চাঁদার টাইম ভ্যালু রক্ষা করবে। এ ব্যাপারে যারা চাঁদা দেবে তাদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের একটা চুক্তি থাকতে হবে। অর্থের টাইম ভ্যালু একটা অতিগুরুত্বপূর্ণ উপাদান। 

যে অর্থ পেনশনধারীরা ৩০-৪০ বছর পর হাতে পাবে সেই অর্থের ক্রয়ক্ষমতা তাদের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশের সরকার জনগণ থেকে অর্থ নিয়ে তাদের ঠকায় অর্থের মূল্যকে কমিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। লক্ষ কোটি টাকার ফান্ড নিয়ে কর্তৃপক্ষ যদি ঠিকমতো বিনিয়োগ করতে না পারে তাহলে একপর্যায়ে সেই ফান্ডকে মুদ্রায়ণ করা হবে নতুন করে অর্থ ছাপিয়ে এবং অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করে। তখন অবশ্য জনগণ মূল্যস্ফীতির আঘাত থেকে শাস্তি পাবে। এসব ঘটনা অন্য অনেক দেশেই ঘটছে। এই যদি ঘটে তাহলে সেটা হবে কৌশলে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা।

আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

আরও