১৯৮২ সালে বহুল আলোচিত ওষুধ নীতি ঘোষিত হওয়ার পর থেকে এ দেশে উৎপাদনরত বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই ক্রমান্বয়ে এখান থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে প্রায় সবাই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতে এ দেশে স্থানীয় বিনিয়োগে ওষুধ শিল্প গড়ে ওঠার যে ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়, তারই ফল হচ্ছে ওষুধের ক্ষেত্রে একসময়ের প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ কর্তৃক ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৯৪৭ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ওষুধ রফতানি। ধারণা করা যায়, আগামী এক দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় ওষুধ অন্তত শীর্ষ তিনে উঠে আসতে সক্ষম হবে। তবে অকপটে স্বীকার করে নেয়া ভালো যে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ওষুধসহ সব শিল্পেই সব ধরনের বিনিয়োগ ও বিকাশের ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, তার রেশ কাটিয়ে ওঠা মোটেও সহজ হবে না।
বৈদেশিক বিনিয়োগ শিরোনামের আওতায় আলোচনা করতে যেয়ে ওষুধ শিল্পের প্রসঙ্গ টানা এ কারণে যে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও সব খাতেই এটি ঢালাওভাবে কাম্য নয়। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপযুক্ত নীতিকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পরিণামে তা দেশের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে, যেমনটি ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এ অবস্থায় নিকট ভবিষ্যতের বৈদেশিক বিনিয়োগনীতির প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়কে অবশ্যই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে অতীতে কোন ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগ কী ধরনের ফলাফল দিয়েছে, সেটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা উচিত হবে। কিন্তু সেটি না করে নিছক তাৎক্ষণিক আবেগ ও অনুমানের ভিত্তিতে হাতের কাছে বা সামনে পাওয়া যেকোনো বিনিয়োগ প্রস্তাবকে কোনোরূপ যাচাই-বাছাই ছাড়াই লুফে নেয়াটা মোটেও উচিত হবে না বলেই মনে করি। আর তেমনটি করার কারণেই অনেকটা হতাশার সঙ্গে লক্ষ করতে হচ্ছে যে গত পাঁচ দশকে এ দেশে যত বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে, তার একটি বড় অংশই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো উপকার বয়ে আনতে পারেনি। বরং ওই সব বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ঔপনিবেশিক আমলের মতোই একচেটিয়া মুনাফা লুটে সে অর্থ নিজ দেশে বা অন্যত্র নিয়ে গেছে।
উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী বিদেশী মোবাইল ফোন অপারেটিং কোম্পানিগুলোর কথাই ধরা যাক। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-নিরক্ষর, শহুরে-গ্রামীণ ইত্যাদি সব শ্রেণীর লোকজনকে অপ্রয়োজনীয় সময়ে বা কাজে মোবাইল ফোনের নেশায় বুঁদ বানিয়ে এ গরিব দেশ থেকে তারা কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার করে নিয়ে গেছে। মোবাইল ফোনের নানা উপকারিতার কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এর অপরিমিত ব্যবহার বা অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অপারেটর কোম্পানিগুলো যেভাবে একচেটিয়া মুনাফা লুটেছে ও লুটছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। তারা সরকারকে কর ফাঁকি দিয়েছে, গ্রাহকের কাছ থেকে অযৌক্তিক হারে অতিরিক্ত সেবামূল্য আদায় করেছে এবং অধিক সময় ধরে মোবাইল ফোন ব্যবহারে আসক্ত করে তোলার লক্ষ্যে অনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে গ্রাহককে শৃঙ্খলাবিহীন জীবনের পথে প্ররোচিত করেছে। এতকিছুর পরও তাদের কাছ থেকে বড় অংকের বিজ্ঞাপন পেয়ে অধিকাংশ গণমাধ্যম এসব অন্যায়ের খবর প্রচার করা থেকে দিব্যি বিরত থেকেছে। অন্যদিকে এসব বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল আমলা ও রাজনীতিকরা মিলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি টেলিটককে অনেকটাই পথে বসিয়েছে, যেমনটি জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রাখার জন্য ১৯৬৩ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত এ দেশে আর কোনো জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপিত হয়নি বা হতে দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে আবার এমনও হতে পারে যে আপাতদৃষ্টে স্টারলিংকের বিনিয়োগকে লাভজনক বলে মনে হলেও অনুপুঙ্খ সমীক্ষান্তে হয়তো দেখা যাবে, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য এটি মোটেও আগ্রহোদ্দীপক নয়। অতএব সুনির্দিষ্ট সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার আগেই জনগণকে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থাকার বিষয়ে ইতিবাচক ও জনপ্রিয় ধারণা দেয়ার জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কতটা উচিত হবে, তা ভেবে দেখা দরকার। আর এমনটি করা হলে তা হবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা যেমন তদন্তের ফলাফল অগ্রিম বলে দেন, তেমন কিছু। ইলোন মাস্কের সঙ্গে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রধান উপদেষ্টার ভার্চুয়াল বৈঠকের এক মাস পেরুনোর আগেই সরকারের পক্ষ থেকে গত ৮ মার্চ জানানো হয় যে স্টারলিংক এরই মধ্যে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা শুরু দিয়েছে, যা বস্তুতই এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। এখন কেউ যদি এ প্রশ্ন তোলেন যে কোনো ধরনের নিয়মকানুন ও আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালন ছাড়াই একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাজ করতে দেয়াটা ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতিত্বের শামিল কিনা, তাহলে এর জবাবে সরকারের কি কিছু বলার থাকবে? কিংবা কোনোদিন যদি প্রমাণিত হয় যে বিশেষ উদ্দেশ্যেই স্টারলিংককে এ সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এর জবাবে কী বলবেন?
স্পষ্ট করার জন্য বলি, উপরোক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে কোনোভাবেই বাংলাদেশে স্টারলিংকের বিনিয়োগের বিরোধিতা করা হচ্ছে না। বরং শুধু এটি বলতে চাওয়া যে যেকোনো বৈদেশিক বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে সেটি যেন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এবং আনুষঙ্গিক সব নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করে এগোয়। কিন্তু তেমনটি না করার ফলে অতীতে রাষ্ট্রস্বার্থের পরিপন্থী কী কী ঘটেছে, সেসবের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত সবার চোখের সামনেই রয়েছে। নিকট ও স্বল্প দূরত্বের অতীতে জনগণ স্পষ্টতই দেখতে পেয়েছে যে গৌতম আদানির সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর পরই বাংলাদেশে বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে তাদের বিনিয়োগ রাতারাতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিংবা ১৯৮০-এর দশকের সামরিক শাসকের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে কাফকো চুক্তি অনায়াসে সই হয়ে গেছে। প্রধান উপদেষ্টার আগ্রহ ও উৎসাহের ব্যাপারে এ প্রবন্ধের মাধ্যমে এখানে বিন্দুমাত্র কোনো নেতিবাচক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে শুধু বলতে চাওয়া যে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের লোভে ও আবেগের বশে যেন এমন কোনো কাজ করা না হয় যাতে প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে।
সব মিলিয়ে কথা হচ্ছে, বৈদেশিক বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে সেটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ ও প্রয়োজনকে বিসর্জন দিয়ে নয়। বরং অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু বৈদেশিক বিনিয়োগ বিসর্জন দিতে হবে, যেমনটি ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির মাধ্যমে করা হয়েছিল এবং করে লাভবান হওয়া গিয়েছিল। এ অবস্থায় পুনরাবৃত্তি হলেও বলি, ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা খাতকে আরো দক্ষ ও সম্প্রসারিত করতে হলে রাষ্ট্রের স্বার্থে টেলিটককেই সর্বাগ্রে জোরদার করতে হবে এবং বেসরকারি খাতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অনুরূপ আরো দক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহ ও সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু আগে সেগুলো না করে সরাসরি স্টারলিংকের বিনিয়োগের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ খুব স্বাভাবিকভাবেই বহুলাংশে বিঘ্নিত হবে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বার্থেই বিশেষ অদৃশ্য শক্তির যোগসাজশ ও অঙ্গুলি হেলনে টেলিটক এতদিনেও একটি দক্ষ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি।
লেখার শিরোনামের জবাব হিসেবে বাংলাদেশের নিকট ভবিষ্যতের বৈদেশিক বিনিয়োগের বিষয়ে কতিপয় প্রস্তাব উত্থাপনের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরের এ আলোচনা শেষ করা যেতে পারে। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে: এক. বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে উৎপাদন শিল্পকে; দুই. বৈদেশিক বিনিয়োগকে যতটা সম্ভব স্থানীয় উদ্যোক্তার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে করার চেষ্টা নিতে হবে; তিন. সম্ভাবনাময় স্থানীয় শিল্পগুলো যাতে সম্পূরক সুবিধা পায় এমন সংযোগ শিল্পকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে; চার. বৈদেশিক বিনিয়োগকে ঢালাওভাবে আমন্ত্রণ না জানিয়ে কোন কোন খাতে একে উৎসাহিত করা যেতে পারে সে বিষয়ে গভীরতাপূর্ণ সমীক্ষার ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য তালিকা তৈরি করা যেতে পারে; পাঁচ. বৈদেশিক বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা (স্বচ্ছতার সঙ্গে কর-শুল্ক পরিশোধ, ন্যায্যতার সঙ্গে সেবামূল্য নির্ধারণ, আইনি কাঠামোর আওতায় থেকে মুনাফার প্রত্যাবাসন ইত্যাদি) পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত করতে হবে; ছয়. বৈদেশিক বিনিয়োগ বলেই সীমিত ভূমির এ দেশে কাউকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি বরাদ্দ দেয়া যাবে না এবং সাত. দেশের অর্থনীতিতে গত পাঁচ দশকের বৈদেশিক বিনিয়োগের ফলাফল নিরূপণের জন্য একটি ব্যাপকভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে এ বিষয়ে একটি দশসালা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
পরিশেষে, এ আলোচনা কারো পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত দেয়ার জন্য নয়। বরং বৈদেশিক বিনিয়োগের উপযোগকে কীভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য আরো অধিক দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে একটি কার্যকর উপায় ও কৌশল অনুসন্ধানই এর মূল লক্ষ্য। তদুপরি এখানে উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোও শুধু অন্তর্বর্তী সরকারকে ধারণায় রেখে প্রণীত হয়নি। বরং ভবিষ্যতের নির্বাচিত স্থায়ী সরকার যাতে এগুলোকে ব্যবহার করে লাভবান হতে পারে, সে বিষয়টিকেও চিন্তায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ প্রস্তাবগুলোর মধ্য থেকে কে কোনটি বা কোনগুলো কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবহারে উৎসাহী হবেন, সেটি একান্তই তাদের নিজস্ব বিবেচনার বিষয়।
আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি ও সাবেক পরিচালক, বিসিক
শিল্প মন্ত্রণালয়