ব্লু ইকোনমি

সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে

সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বলতে বোঝায় সমুদ্র ও সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবিকা সৃষ্টি ও সামুদ্রিক প্রতিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ধারণা। পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ পৃষ্ঠ জুড়ে রয়েছে সমুদ্র, যা বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অপরিহার্য।

সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বলতে বোঝায় সমুদ্র ও সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবিকা সৃষ্টি ও সামুদ্রিক প্রতিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ধারণা। পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ পৃষ্ঠ জুড়ে রয়েছে সমুদ্র, যা বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অপরিহার্য। সুনীল অর্থনীতি কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি মানবসমাজ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় ও সমুদ্রসম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য এ খাত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় এক বিশাল সম্পদের ভাণ্ডার। সমুদ্র থেকে মৎস্য, খনিজ, প্রাকৃতিক গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটনসহ অসংখ্য খাত বিকশিত হতে পারে, যা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম।

বাংলাদেশের জন্য সুনীল অর্থনীতির গুরুত্ব আরো বেড়ে যায় ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রায়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা অর্জনের পর। এ সুবিশাল এলাকা মাছধরা, সামুদ্রিক খনিজ আহরণ, গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন, অফশোর জ্বালানি প্রকল্প, সামুদ্রিক পরিবহন ও পর্যটন খাতের সম্প্রসারণে সুযোগ এনে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মৎস্যপণ্যের চাহিদা ও মূল্য ক্রমবর্ধমান হওয়ায় বাংলাদেশ চাহিদা মেটানোর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। একইভাবে অফশোর উইন্ড ও সোলার এনার্জি প্রকল্প, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, জাহাজ ভাঙা ও নির্মাণ শিল্প, মেরিন বায়োটেকনোলজি গবেষণা ইত্যাদি খাতও দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিনিয়োগ, গবেষণা এবং সর্বোপরি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা।

সুনীল অর্থনীতির বিকাশে টেকসই উন্নয়নের নীতি অপরিহার্য। সমুদ্রসম্পদ সীমাহীন নয়, অতিরিক্ত আহরণ বা অব্যবস্থাপনা সমুদ্রের প্রতিবেশ ধ্বংস করে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অতিমাত্রায় মাছ ধরা অনেক প্রজাতির মাছের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। একইভাবে সমুদ্রের তলদেশ থেকে খনিজ আহরণ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে টেকসই মৎস্য আহরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন এবং গবেষণার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সুনীল অর্থনীতির পথচলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সামুদ্রিক দূষণ। বিশ্বের প্রায় সব সমুদ্রই এখন প্লাস্টিক, তেল, শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক ও জৈব বর্জ্যে দূষিত। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় আট মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে পড়ে, যা সামুদ্রিক প্রাণী হত্যা করছে এবং খাদ্যশৃঙ্খল দূষিত করছে। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা এখন সামুদ্রিক মাছের দেহে প্রবেশ করছে এবং সেই মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় এসে মানবস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি এবং এর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য নদ-নদী বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সমস্যা দৃশ্যমান হয়েছে, তা হলো সামুদ্রিক দূষণ। পৃথিবীর অন্যান্য উপকূলবর্তী দেশের মতোই বাংলাদেশও সামুদ্রিক দূষণের কারণে নানা রকম হুমকির মুখোমুখি। এ দূষণ কেবল পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, মৎস্যসম্পদ ও সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সামুদ্রিক দূষণের মূল উৎস হিসেবে কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করা যায়। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত শিল্প-কারখানা, বিশেষত বস্ত্র শিল্প, চামড়া শিল্প, কাগজ ও সিমেন্ট কারখানা প্রচুর পরিমাণে বর্জ্য উৎপন্ন করে। এসব বর্জ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত না করে সরাসরি নদীতে ফেলা হয়, যা পরে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশে। ফলে পানির গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হয় এবং সেখানে থাকা মাছসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিল্প বর্জ্যের পাশাপাশি গৃহস্থালি বর্জ্যও একটি বড় সমস্যা। প্রতিদিন হাজার হাজার টন প্লাস্টিক, পলিথিন, ধাতব বর্জ্য, এমনকি চিকিৎসা বর্জ্য নদীর পানিতে ফেলা হচ্ছে। এ সবশেষে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে জমা হয়ে তৈরি করছে ‘প্লাস্টিক দূষণ’ নামক ভয়াবহ সংকট।

বাংলাদেশে সামুদ্রিক দূষণের আরেকটি বড় উৎস হলো জাহাজ ভাঙা শিল্প। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় শত শত জাহাজ প্রতি বছর ভাঙা হয়। এসব জাহাজ থেকে বিপুল পরিমাণে তেল, রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু ও বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হয়ে সাগরের পানিকে দূষিত করে। যদিও জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে, কিন্তু পরিবেশগত দিক বিবেচনা করলে এ শিল্পের অপরিকল্পিত কার্যক্রম সমুদ্র ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

তেল দূষণও সামুদ্রিক পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম কারণ। সমুদ্রপথে প্রতিদিন শত শত ছোট-বড় জাহাজ চলাচল করে। এদের অনেকেই অপরিকল্পিতভাবে তেল ও জ্বালানি ফেলে দেয় পানিতে। কখনো কখনো বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে, যেমন জাহাজডুবি বা তেল ট্যাংকারের লিকেজ। তখন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণে তেল ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রে। তেলের স্তর পানির ওপর ভাসমান অবস্থায় সূর্যালোকের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে ফটোসিনথেসিস ব্যাহত হয় এবং প্ল্যাঙ্কটনসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এর প্রভাব ক্রমান্বয়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের কৃষিনির্ভরতা থেকেও সমুদ্র দূষণের উৎস তৈরি হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলে এসব উপাদান নদীর মাধ্যমে সাগরে গিয়ে মিশে। এগুলো পানির অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, যার ফলে পানিতে থাকা প্রাণীরা শ্বাস নিতে না পেরে মারা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ পানিতে জমে থেকে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও অম্লতা বাড়ছে, যার ফলে প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হচ্ছে এবং সামুদ্রিক জীবের বাস্তুসংস্থান বিপর্যস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ উপকূলীয় ও নিম্নভূমি হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সুনীল অর্থনীতি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা উচিত।

সামুদ্রিক দূষণের প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর গভীর আঘাত হানে। বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। উপকূলীয় অনেক মানুষ জীবিকার জন্য মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সামুদ্রিক দূষণের ফলে মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে, কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে, আবার অনেক মাছের মধ্যে বিষাক্ত পদার্থ জমা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি। দ্বিতীয়ত, দূষণের কারণে পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্ট মার্টিন—এসব উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যটকরা ভ্রমণে আসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু সমুদ্রের পানিতে দূষণ বৃদ্ধি পেলে সৈকতের পরিবেশ নষ্ট হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং সামুদ্রিক প্রাণী মৃত অবস্থায় তীরে ভেসে আসে। এতে পর্যটকদের আগ্রহ কমে যায় এবং দেশের পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তৃতীয়ত, দূষণ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানে। বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। এরা মাছ ধরা, নৌযান চালনা, নোনা পানির চাষাবাদ, লবণ উৎপাদন ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত। সমুদ্রের পানির মান নষ্ট হলে তাদের আয়-রোজগার হ্রাস পায়, দারিদ্র্য বাড়ে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়। চতুর্থত, সামুদ্রিক দূষণ দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে তীব্রতর করে। দূষিত পানির কারণে সাগরের প্রাকৃতিক কার্বন শোষণ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে এবং উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ যেহেতু একটি নিম্নভূমি দেশ, তাই এর জন্য ঝুঁকি আরো বেশি।

বাংলাদেশে সামুদ্রিক দূষণ রোধে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। পরিবেশ আইন রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগে ঘাটতি দেখা যায়। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না। জাহাজ ভাঙা শিল্পে পরিবেশবান্ধব নীতি মানা হয় না। প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে এবং কার্যকর পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সমস্যা দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন চুক্তি ও আইন রয়েছে, যেমন MARPOL (International Convention for the Prevention of Pollution from Ships) এবং লন্ডন কনভেনশন। এসব চুক্তি জাহাজ থেকে বর্জ্য ও তেল নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, সমুদ্রে প্লাস্টিক ফেলা নিষিদ্ধকরণ এবং সমুদ্রপথে বিপজ্জনক পণ্যের পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। তবে বাস্তবে এসব আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক দেশই পিছিয়ে আছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সরকার এরই মধ্যে ‘সুনীল অর্থনীতি নীতি’ প্রণয়ন করেছে এবং ‘সামুদ্রিক মৎস্য আইন’ ও ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন’ দ্বারা কিছু নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা, জনসচেতনতার অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও গবেষণার ঘাটতি সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। সুনীল অর্থনীতির সুফল পেতে হলে দূষণ নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, উপকূলীয় ও নদীমুখী শিল্প-কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এর কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাহাজ ভাঙা শিল্পে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং বিকল্প পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে। চতুর্থত, উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক পয়ঃশোধনাগার স্থাপন এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, পর্যটন এলাকায় কঠোর পরিচ্ছন্নতা নীতি চালু করে স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের সচেতন করতে হবে। এছাড়া সমুদ্র গবেষণা জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব সমুদ্র গবেষণা জাহাজ ও প্রশিক্ষিত সামুদ্রিক বিজ্ঞানী সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য, জলমান, মাছের মজুদ, তলদেশের খনিজ সম্পদ ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা করলে দূষণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে দূষণ মোকাবেলার নতুন উপায়ও বের করা সম্ভব হবে।

সুনীল অর্থনীতির সফলতা নির্ভর করে সমুদ্র ও উপকূলের সুস্থতার ওপর। যদি সমুদ্র দূষণে ভরে যায়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, তাহলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ রক্ষাকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেসব দেশ সুনীল অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, তারা পরিবেশগত সুরক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই আহরণ নীতিতে কঠোর ছিল। উদাহরণস্বরূপ, নরওয়ে মৎস্য আহরণে কোটা পদ্ধতি চালু করেছে, যাতে মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মালদ্বীপ পর্যটন শিল্পকে টেকসইভাবে পরিচালনা করছে, যাতে প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ থাকে। এসব উদাহরণ বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়।

সুনীল অর্থনীতির সাফল্য নির্ভর করছে এই প্রশ্নের ওপর—আমরা কি সমুদ্রকে শুধু অর্থ আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এর সুস্থতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করব? যদি আমরা দূষণ নিয়ন্ত্রণ, টেকসই আহরণ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারি, তবে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুগুণ সমৃদ্ধ করতে পারবে। কিন্তু যদি অব্যবস্থাপনা ও দূষণ চলতেই থাকে, তবে কয়েক দশকের মধ্যে অনেক সম্পদই হারিয়ে যাবে, যা পুনরুদ্ধার অসম্ভব হবে। অতএব, সুনীল অর্থনীতি শুধু অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি আমাদের পরিবেশ, সমাজ ও ভবিষ্যতের জন্য এক যৌথ দায়বদ্ধতার অংশ। বাংলাদেশ যদি এই দায়বদ্ধতা পালন করে, তবে সমুদ্র আমাদের খাদ্য, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু সুরক্ষার স্থায়ী উৎস হয়ে থাকবে, আর আমরা নিশ্চিত করতে পারব যে বঙ্গোপসাগরের নীল জল ভবিষ্যতেও প্রাণ ও সম্ভাবনায় ভরপুর থাকবে।

সবশেষে বলা যায়, সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য এক অমিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সর্বস্তরের জনসচেতনতা একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে। যদি আমরা সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বঙ্গোপসাগর শুধু আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক সমৃদ্ধ সম্পদভাণ্ডার হয়ে থাকবে।

ড. শফি মুহাম্মদ তারেক: অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ফেলো, রয়্যাল কেমিক্যাল সোসাইটি ও চার্টার্ড পরিবেশবিদ, যুক্তরাজ্য

আরও