পর্যালোচনা

যশোরে অটোমোবাইল শিল্পের পাঁচ দশক

যশোর জেলার যশের অংশ হালকা প্রকৌশল শিল্প। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নিজের ঐতিহ্যের রক্ষক যারা নিজেরাই। যশ অর্জনের জন্য, ঐতিহ্য রক্ষার জন্য, এলাকাভিত্তিক ব্যক্তি উদ্যোগের বহু প্রচেষ্টা দেশে আজও চলমান। তেমনি ঐতিহ্যের ধারায়, যশোর শহরের মনিহার সিনেমা হলের সামনে থেকে শুরু করে যশোর-খুলনা মহাসড়ক ধরে দুই পাশে গড়ে উঠেছে

যশোর জেলার যশের অংশ হালকা প্রকৌশল শিল্প। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নিজের ঐতিহ্যের রক্ষক যারা নিজেরাই। যশ অর্জনের জন্য, ঐতিহ্য রক্ষার জন্য, এলাকাভিত্তিক ব্যক্তি উদ্যোগের বহু প্রচেষ্টা দেশে আজও চলমান। তেমনি ঐতিহ্যের ধারায়, যশোর শহরের মনিহার সিনেমা হলের সামনে থেকে শুরু করে যশোর-খুলনা মহাসড়ক ধরে দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অটোমোবাইল কারখানা। এসব ছোট-বড় কারখানায় নতুন-পুরনো মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪৫০টি বাস-ট্রাকের বডি নির্মাণ ইঞ্জিনের কাজ করা হয়। অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা দিয়ে দেশের মানুষের মন জয় করতে পারায় শিল্প আজ যশোরের যশের অংশ হয়ে গিয়েছে। এসব কারখানার হাত ধরে বিকশিত হয়েছে একের পর এক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। শিল্পের কারিগররা এক নজর পরখ করেই হুবহু তৈরি করতে সক্ষম যেকোনো যন্ত্র যন্ত্রাংশ। এভাবেই একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত অর্জিত দক্ষতা অভিজ্ঞতার ফসলের বিস্তার ঘটে চলেছে। তবে সীমিত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিস্তারে অর্জিত যশকে ধরে রাখা যায়নি। দেশের জনসংখ্যা চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার কারণে যশ কিছুটা হরণ হয়ে গিয়েছে। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা চাহিদামতো পাওয়া গেলে এলাকার মানুষের দক্ষতা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হূতযশ ফেরত আনা সম্ভব। ঐতিহ্য রক্ষা করা গেলে দেশ জাতি উপকৃত হবে। কথা শুধু যশোর অঞ্চলের জন্য নয়, সারা দেশের জন্যই প্রযোজ্য। সারা দেশে হালকা প্রকৌশল শিল্পের ভূমিকা বিশ্লেষণেই তা পরিষ্কার হয়।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে হালকা প্রকৌশল শিল্পের ব্যাপক বিস্তার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সারা দেশের একসময়কার ৫০-৬০টি কারখানা আজ ৫০ হাজার কারখানায় পরিণত হয়েছে। অতীতে অনেক যন্ত্র যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনা হলেও শিল্পের কারিগররা আজ তা দেশেই উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশে শিল্পের বাজার বার্ষিক প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো, যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার হালকা যন্ত্রাংশ স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়ে থাকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত প্রযুক্তি আর পুঁজির ব্যবস্থা করা গেলে পর্যায়ক্রমে হালকা প্রকৌশল খাতের চাহিদা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমেই পূরণ করা যেতে পারে। ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিসিকের মাধ্যমে কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ করার পর থেকেই খাতে বিকাশের সূচনা। প্রাথমিকভাবে ধোলাইখাল জিঞ্জিরায় প্রকল্প চালু করা হলেও পরবর্তী সময়ে পুনরায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে সারা দেশে তা চালু করা হয়। এখানে উদ্যোক্তাদের বন্ধক ছাড়া ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেয়া হয়, যার মধ্যে লাখ টাকার যন্ত্রপাতি এবং লাখ টাকা চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল। সময় শুধু যশোর জেলায়ই নতুন করে প্রায় ৪০টার মতো ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ব্যক্তিমালিকানায় প্রতিষ্ঠা পায়। এসব নতুন কারখানা স্থানীয় শিল্পের যন্ত্রাংশ সরবরাহের পাশাপাশি নিত্যনতুন যন্ত্র তৈরি করে মানুষের জীবন-জীবিকাকে সহজ করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

প্রাথমিক পর্যায়ে এসব কারখানায় পুরনো জরাজীর্ণ গাড়ির বডি মেরামত করে নতুন করার কাজ শুরু হয়। হাতের কাছে পাওয়া সাধারণ সহজলভ্য যন্ত্রপাতি দিয়ে শুধু নিজেদের অসাধারণ দক্ষতার কাজ অল্প সময়েই মানুষের নজরে পড়ে যায়। রাস্তার পাশে অস্থায়ী ছাপরা ঘরে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত শ্রমিকদের মেধা মননশীলতার সৃষ্টি অচিরেই দেশজুড়ে সুনাম অর্জন করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পাশের দেশ ভারত থেকে বেশকিছু বাস ট্রাকের চেসিস আসে। যশোরের অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ নামে খ্যাত কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি দিয়ে সে চেসিসের ভেতর তৈরি করে দেয় পৃথিবী বিখ্যাত গাড়ির আদলে পূর্ণাঙ্গ বাস ট্রাক। সেই থেকে পথচলা শুরু করে আজও বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ এবং তত্ত্বীয় জ্ঞান ছাড়াই শিল্পের শ্রমিকরা কাজ করে চলেছে। এখন তো এখানে অত্যাধুনিক ব্র্যান্ডের এয়ারকন্ডিশন বাসের বডি তৈরি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দামি গাড়ির মালিকরা বিদেশী ডিজাইনের হুবহু নকশায় সুন্দর ফিনিশিং দিয়ে তাদের গাড়ির বডি তৈরির জন্য যশোরের অটোমোবাইল ওয়ার্কশপগুলোতে নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে এসে থাকে। এতে ওয়ার্কশপগুলোর ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং শিল্পের দ্রুত বিকাশ দেখা যায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে সার্বিক বিবেচনায় যেখানে শিল্পের সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল সেখানে যুগ যুগ ধরে তার সঙ্গে করা হচ্ছে বিমাতাসুলভ আচরণ।

যশোরের হালকা প্রকৌশল শিল্পের ওয়ার্কশপগুলোর সিংহভাগের মালিকরাই সে ওয়ার্কশপের শ্রমিক। তারা নিজেরাই হাতে কালি-ঝুলি মেখে কাজ করে। সঙ্গে নিয়ে আসে পরিবারের লোকজনদের। আর পরিবারের বাইরে কোনো শ্রমিক নিয়োজিত হলেও সহজে তাকে শেখানো হয় না মূল কাজ, তারা সহযোগী হিসেবেই কাজে সাহায্য করে থাকে। তবে এরা স্ব-উদ্যোগে কাজটা শিখতে চেষ্টা করে এবং অল্প কিছু কাজ শেখার পর নিজেরাই অন্যখানে কারখানা করে মালিক হয়ে যায়। কারণে সম্পূর্ণ শিল্পক্ষেত্রেই দক্ষ শ্রমিকের সংকট দেখা যায়। তবে এখানে সবচেয়ে বড় সংকট শিশুশ্রমের যথেচ্ছ ব্যবহার। অল্প পারিশ্রমিকে দলে দলে শিশু শ্রমিক এসব ওয়ার্কশপে কাজ করে। তাদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতিনিয়ত এরা দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছে, অঙ্গহানি হচ্ছে, কিন্তু প্রতিকারের পথ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও এখানে অবাধে শিশুশ্রম চলমান, কারখানাগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে শিশুরাই কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি। আমাদের অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য মানসিকতার কারণে শিশুদের যখন বিদ্যালয়ে থাকার কথা, খেলার মাঠে থাকার কথা তখন তারা নিরাপত্তাহীন এক কাজের মধ্যে ডুবে আছে। একমাত্র আইনকে কাজির খাতা থেকে গোয়ালে আনার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া গেলেই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। দেশের বেকার যুবকদের কর্মক্ষেত্রে বেশি বেশি আনার পরিবেশ তৈরি করে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শিল্পে শ্রমিক সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।

হালকা প্রকৌশল শিল্পের মাধ্যমে এক সময়ের আমদানিনির্ভর বহু যন্ত্রাংশ এখন যশোরসহ সারা দেশে উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাসাশ্রয়ী এসব যন্ত্রাংশ মানসম্মত হওয়ায় দেশে ব্যাপকভাবে তা ব্যবহার করা হয়। ওয়ার্কশপগুলো যেকোনো যন্ত্রাংশ একবার দেখলেই হুবহু তৈরি করতে সক্ষম। শুধু যন্ত্রাংশ নয়, জীবনযাত্রাকে সহজ করার নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু যন্ত্রও কারখানাগুলো উৎপাদন করছে। শ্যালো মেশিনের ইঞ্জিনের বহুমুখী ব্যবহার দেশে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। গ্রামবাংলার পরিবহন নসিমন-করিমন, ইটভাঙা পাথরভাঙা মেশিন, ধানভাঙা, মসলা করা, নৌকায় ইঞ্জিন হিসেবে ইত্যাদি বহুবিধ কাজে শ্যালো মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। যশোরের আরেক যশ রেণু পোনা পরিবহনের সাশ্রয়ী উপায় তৈরি শিল্পের আর এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সাধারণভাবে এসব ছোট ছোট কাজ অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা হলেও জাতীয় জীবনে তা বিশাল ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তবে অনক্ষর-অনাহারি মানুষগুলোর অবদান আমাদের মর্যাদাশীল সমাজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এদের জন্য নীতি কৌশল গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। আর শ্রমিক থেকে মালিক হওয়ার কারণে দেশে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে যেসব যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ে তার কিছুই এদের থাকে না, ফলে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকই এদের ঋণ প্রদানে আগ্রহী নয়। ফলে শিল্পের যে কাঙ্ক্ষিত বিকাশ তা পুঁজির অভাবেই মাঠে মারা যায়। দেশের অধিকাংশ সম্ভবনাময় শিল্পেই ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা আছে। হালকা প্রকৌশল শিল্পে পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধিতে সামগ্রিক পৃষ্ঠপোষকতা আজ খুবই জরুরি।

হালকা প্রকৌশল শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নয়ন বিদেশী পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য কারখানাগুলোর আধুনিকীকরণ এবং যুগোপযোগী টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। অথচ নীতিনির্ধারকরা গ্রামবাংলার জনজীবনে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়া নসিমন-করিমনের সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করতে যতটা আগ্রহী ততটা আগ্রহী নয় উন্নত করতে, যুগোপযোগী করতে, নিরাপদ করতে। নীতিনির্ধারকরা গোষ্ঠীস্বার্থেই পরিবহনের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে চায়। একবারের জন্য গ্রামীণ জনজীবনে এর ভূমিকা বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখে না। অথচ পরিবহনের অবদান বিবেচনা করে কারিগরি ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা গেলেই তা নিরাপদ হিসেবে চলাচলের সক্ষমতা অর্জনে সমর্থ হতো। তাই উৎপাদিত যন্ত্র যন্ত্রাংশগুলোর মানোন্নয়নে প্রতিটা ক্ষেত্রে টেকসই প্রাযুক্তিক জ্ঞানকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম করার প্রশিক্ষণ জরুরি। জেলায় জেলায় টেস্টিং ল্যাব না থাকায় কাঁচামালের প্রকৃত মিশ্রণ তৈরি করা যায় না। এই মিশ্রণ যথাযথ না হলে উৎপাদনের জীবত্কাল পাওয়া যায় না। উৎপাদন মানসম্মত হতে পারে না। এখনো পর্যন্ত মালিকরা দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় কাজ করে উৎপাদিত পণ্যকে টেকসই করে। বিক্ষিপ্তভাবে সহযোগিতা কোনো কোনো সময় পাওয়া গেলেও তার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। তাই কারখানাগুলোতে মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের জন্য ধারাবাহিকভাবে এখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে শামিল হওয়ার দৌড়ে আছে। কিন্তু কৃষি-শিল্প কোনো কিছুকে পেছনে রেখেই উন্নয়ন অগ্রগতি রক্ষা করা যাবে না। দেশে দিনে দিনে কৃষি রুগ্ণ হচ্ছে, শিল্পও যে খুব ভালো আছে এমন দাবি করা যাবে না। অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিল্পায়নের বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। তাই দেশের শিল্পায়নের স্বার্থেই হালকা প্রকৌশল শিল্প গুরুত্ব পাওয়ার কথা। আমাদের দেশে হালকা শিল্প আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত যদি ফিডার শিল্পের ধারণায় শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হতো। ধরা যাক, একটা সাইকেল তৈরি করা হবে। মূল কিছু অংশ বাদে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সব ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ এলাকার হালকা প্রকৌশল শিল্পে মূল সংস্থার মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উৎপাদন করা হবে, যা দিনশেষে সবাই মূল সাইকেল শিল্পে জমা দিয়ে বিনিময় মূল্য নিয়ে চলে যাবে। মূল শিল্পের ফিডার হিসেবে কাজ করার ফলে অনেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, যা উৎপাদনকে মানসম্মত রেখে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। কিন্তু আমাদের মানসিকতা একাই সবকিছু করব, কাউকে ভাগ দেব না। স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের কোনো সমন্বিত উদ্যোগের শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শিল্পগুলো লোকসানের দায় ঘাড়ে নিয়ে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিল্পকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষার জন্য ফিডার শিল্পের সংস্কৃতি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভাবনা যুক্ত হলে দেশ জাতি উপকৃত হবে।

হালকা প্রকৌশল শিল্পে বর্তমানে ছয় লাখ দক্ষ প্রায় ১০ লাখ অদক্ষ শ্রমিক কাজ করে। খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে যদি হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশ ঘটানো হতো তাহলে এর তিন গুণ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো, জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা হতো, দারিদ্র্য বিমোচন ঘটত, জিডিপিতে বর্তমানে রাখা শতাংশ অবদানও শতাংশে বাড়ত। বৈদেশিক মুদ্রাও বাঁচত। আর যদি রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তবে তো কথাই নেই। তবে এসব করার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনার অভাবে শিল্প চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। পরিত্রাণের জন্য এলাকাভিত্তিক ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত শিল্প পার্ক শিল্পসংশ্লিষ্টদের অন্যতম চাহিদা। সুবিধা বিবেচনায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস বিদ্যুতের ব্যবস্থাসহ আমলাতন্ত্রের লাল ফিতা মুক্ত করে পুঁজি, প্রশিক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শিল্পের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটবে। আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলেই একমাত্র এসব পাওয়া সম্ভব। তাহলেই হালকা প্রকৌশল শিল্প গতি পাবে। দেশ জাতির প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে। সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে স্বস্তি দেবে, চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালকে হালকা প্রকৌশল পণ্য বর্ষ ঘোষণা করেছেন। করোনা মহামারী ২০২০ সালকে লণ্ডভণ্ড করে দিলেও আশা করা যায় শিল্প খাতের আঁতুড়ঘর হালকা প্রকৌশল শিল্প পণ্য বর্ষ ঘোষণার ফলে খাতের বিকাশে সময়ে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির কার্যক্রম হবে, পুঁজির প্রবাহ বাড়বে, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়া যাবে, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবে, সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা অভিজ্ঞতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, ন্যায়সংগত নীতি বাস্তবায়ন হবে। তবে এসবের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার মানসিকতার পরিবর্তন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশে উৎপাদিত পণ্যের প্রতি সর্বত্রই একটা বিরূপ মনোভাব দেখা যায়। ঢালাওভাবে মতামত প্রকাশ করা হয়ে থাকে যে দেশে উৎপাদিত পণ্যের মান বিদেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্যের চেয়ে নিম্নমানের। বিতর্কের খাতিরে তা স্বীকার করে নিলেও ব্যবহারকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা দক্ষতা সংমিশ্রণ ঘটালে মানসিকতা থেকে খুব তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসা সম্ভব হতো। কিন্তু খাতে এমনটা ঘটেনি। সংশ্লিষ্টরা বিদেশী যন্ত্রাংশনির্ভর থাকতেই তাদের অবস্থানকে শক্ত করেছে। শুধু মানসিকতার পরিবর্তন করা গেলেই স্বাধীনতার ৫০ বছরে হালকা প্রকৌশল শিল্প দেশের শতভাগ চাহিদা পূরণে সমর্থ হতো এবং এখন যে সীমিত আকারে রফতানি হয়ে থাকে তাকে পুষ্ট করতে সক্ষম হতো।

শিল্পের আঁতুড়ঘর হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিশ্বব্যাপী বিশাল সম্ভাবনাকে শুধু প্রধানমন্ত্রীর পণ্যবর্ষ ঘোষণার মধ্যে সীমিত রাখলেই হবে না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে সম্মান জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। প্রয়োজন শিল্পে পুঁজি, প্রশিক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এলাকার ঐতিহ্য বিবেচনাপূর্বক শিল্পপার্কের সহায়তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিশ্ববাজারে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা বাড়ানো। সরকারি নীতির কারণে স্ব-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কারখানাগুলোর সক্ষমতা দিনে দিনে কমছে। এক সময় কারখানাগুলো অনেক ক্যাপিটাল মেশিনারিজ তৈরি করত কিন্তু বর্তমানের কর-ভ্যাট আরোপের কারণে শিল্পমালিকরা সে বিষয়ে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। আমাদের দেশে সর্বত্র বিদেশ থেকে পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বেশি, তারা কষ্ট করে বানানো কোনো জিনিসে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়। সবাই বিশ্বাস করে ট্রেডিং ব্যবস্থায় লাভ বেশি, কষ্ট কম। তার প্রতিফলন দেখা যায় সর্বত্র। তাছাড়া দেশে তৈরি মূলধনি যন্ত্র আমদানি করা হলে তাতে মূল্য সংযোজন কর দিতে হয় না অথচ আমাদের কারখানায় তা উৎপাদন করলে মোটা অংকের মূসক দিতে হয়। শুল্কও একই পথে চলেছে। এতে করে প্রয়োজনীয় মেশিন আমদানি বাড়ছে, বিপরীতে আমাদের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বেকার হচ্ছে, দারিদ্র্য বাড়ছে, সাধারণের জীবিকা নির্বাহ কঠিন হচ্ছে। সরকার সদিচ্ছা নিয়ে হালকা প্রকৌশল শিল্পকে বিবেচনা করলে, বৈষম্যমূলক নীতি কৌশলমুক্ত হলেই একমাত্র শিল্পের দ্রুত বিকাশ সম্ভব।

 

এম আর খায়রুল উমাম: প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও