আর্থিক খাত

মন্দ ঋণের শিক্ষা, নিরীক্ষকের ডায়েরি থেকে

আমার অডিট জীবনের হাতেখড়ি ১৯৯০ সালে। এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে অডিটর প্রভাত গুপ্ত মনে করেছিলেন আমাকে দিয়ে অন্য কিছু ট্রেজারি রিভিউ করানো যেতে পারে। তিনি আমাকে মুম্বাই ট্রেজারি রিভিউ টিমের সদস্য করেছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে এফবিসিসিআই এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক গঠিত বৃহৎ ঋণ পুনর্গঠনের জন্য বাছাই কমিটিতে কাজের সুযোগ হয়েছিল। তার আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে প্রায় ৩৫ বছরের অধিক ঋণঝুঁকি পর্যালোচনা, ঋণ অনুমোদন, নিরীক্ষণ, মন্দ ঋণ পুনর্গঠন ও আদায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার সুযোগ হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রায় সবক’টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সহায়তায় রাত-দিন কাজ করে আমরা প্রায় ৩৫০টি বৃহৎ ও মন্দ ঋণ পুনর্গঠনে সক্ষম হই। তবে অতীব আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে, হয় বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিশ্রুতি মোতাবেক গ্রাহকের কাছ থেকে ডাউন পেমেন্ট পায়নি কিংবা গ্রাহক এখনো তাদের শ্রেণীকৃত ঋণকে সচল ঋণে রূপান্তরের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। এরই মধ্যে আবার ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অনেকটা যেন কোনো দাওয়াইই কাজে আসছে না। মন্দ ঋণ যে শুধু বাংলাদেশেই তা কিন্তু নয়। অনেক দেশেই একই চিত্র দেখেছি, তবে বেশির ভাগ দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাওয়াই কাজে এসেছে এবং মন্দ ঋণ কমে এসেছে।

আমার অডিট জীবনের হাতেখড়ি ১৯৯০ সালে। এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে অডিটর প্রভাত গুপ্ত মনে করেছিলেন আমাকে দিয়ে অন্য কিছু ট্রেজারি রিভিউ করানো যেতে পারে। তিনি আমাকে মুম্বাই ট্রেজারি রিভিউ টিমের সদস্য করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্রুপ অডিটপ্রধান মাইক হার্ট সম্ভবত আমাদের স্থানীয় কান্ট্রি ম্যানেজার জেফ উইলিয়ামসের পরামর্শে আমাকে হংকংয়ে ‘লার্জ চায়না করপোরেট’ অডিট টিমের সদস্য বানিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের এশীয় করপোরেট ব্যাংকিং প্রধান ইউলিন গোহ, এশীয় অডিটপ্রধান রবার্ট গ্রিন, এশীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাপ্রধান শেইন নেলসন, সিটিব্যাংক এনএর দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা কান্তিক দাশগুপ্তা, এশীয় করপোরেট ব্যাংকিং ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাপ্রধান আমার বিন্দ্রার সৌজন্যে আমি এশিয়ার অনেক দেশে, ইউরোপের দু-তিনটি দেশে ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে অডিট, ডিউ ডিলিজেন্স এবং পোর্টফোলিও রিভিউতে জড়িত হয়েছি। তাছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, গণচীন ও তুরস্কে আমার নিয়োগকারী ব্যাংকের পক্ষে স্থানীয় কিছু ব্যাংকের অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও আমি জড়িত ছিলাম। তবে ঋণ পোর্টফোলিও বা অ্যাকাউন্টের সম্যক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমি সবচেয়ে বেশি শিখতে পেরেছি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ‘লার্জ চায়না করপোরেট’ অডিটে ক্লিয়ারার মাইকেল চেং এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ১৯৯৮ সালে করপোরেট অডিট ফেইলের পর রিপিট বা পুনরায় অডিট করতে আসা টিমের প্রধান বিনায়ক বহুগনা এবং অ্যাকাউন্টিবিলিটি বা দায়ভার রিভিউ করতে আসা আঞ্চলিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হেমন্ত জেতওয়ানি থেকে।

ইন্দোনেশিয়ায় ঋণ কর্মকর্তার বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর বা মুদ্রা বিনিময় হার ওঠানামার ঝুঁকি বুঝতে না পারার ব্যর্থতায় অনেক ঋণকে মন্দ হতে দেখেছি। মেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়নের কাজে স্বল্পমেয়াদি চলতি ঋণের ব্যবহার মালয়েশিয়ায় অনেক ঋণ মন্দ হতে দেখেছি, এ পরিস্থিতি অনেকটাই বাংলাদেশের মতো। তাইওয়ানে অনেক মিডেল মার্কেট লোন মন্দ হয়ে গিয়েছিল, কারণ ছিল ট্রেড সাইকেলের তুলনায় ঋণ পরিশোধে সময় কম দেয়া। ভারতে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে জামানতে ঘাটতি নিয়েও ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়েছে। পূর্ব আফ্রিকার বেশির ভাগ ঋণ মন্দ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ের ঝুঁকি নিরূপণের দক্ষতার অভাব। এজন্য ঋণগ্রহীতারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে মোটা অংকের অর্থ তুলে নিয়ে যায়।

আমরা বাংলাদেশেও দেখেছি কীভাবে শিল্প ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। পাকিস্তানে ‘নেম লেন্ডিং’ বা ‘ইনফ্লুয়েন্সড লেন্ডিং’ অনেক ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। অনেক সময় চাপ এসেছে এমনকি সরকারপ্রধান থেকেও। এক্ষেত্রে লাতিন আমেরিকার ঘটনাগুলো আবার বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাসংশ্লিষ্ট, যখন ইউরোপ এমনকি উত্তর আমেরিকার ঘটনাগুলো সংশ্লিষ্ট অন্তর্নিহিত সম্পত্তি মূল্যের চরম পতনের সঙ্গে, যা সেখান থেকে বের হয়ে আসাকে প্রায় অসম্ভব করে দেয়।

বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে, নদী দূষণ করা যাবে না—কর্তৃপক্ষের এ ধরনের বাধ্যবাধকতা না মানার কারণেও ঋণ মন্দে পরিণত হতে দেখা যায়। এসব নিয়ম না মানলে সামাজিক গোষ্ঠীগুলো এসব কারখানা বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করে বা করতে পারে। তার অনেক উদাহরণ আমরা দেখতে পেয়েছি ভারতে। ভারতে মানেকা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিবেশ আন্দোলন গোষ্ঠী প্রয়োজনীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় কাবেরী নদীর মৎস্যসম্পদ বিনষ্ট করছে—এ অভিযোগে একটি বৃহৎ টেক্সটাইল মিল বন্ধ করতে বাধ্য করে। ভুল ভূমি অধিগ্রহণ, যেমন স্কুল বা প্রার্থনার জায়গা নিয়ে কারখানা স্থাপন করতে গেলে বাধা আসতে পারে। এর ফলে কোম্পানিকে কারখানা অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হতে পারে, ফলে অবধারিতভাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। এছাড়া মূল ব্যক্তির মৃত্যু হলে এবং তার কোনো যোগ্য উত্তরসূরি না থাকলে কিংবা উত্তরসূরিদের মধ্যে মনভিন্নতা থাকলে অনেক ঋণই ঝুঁকিতে পড়ে। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া এমনকি ভারতেও আমরা এগুলো হতে দেখেছি। এমনকি বাংলাদেশেও স্কুলের জমি জামানত রেখে একই মালিকের পোলট্রি খামারে দেয়া ঋণ অনাদায়ী হলে ব্যাংক স্কুলের জমি বিক্রি করতে গেলে আদালতের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়।

থাইল্যান্ডে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিয়ে বিরাট অংকের টাকা রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে লগ্নি করে। ডলারের বিপরীতে থাই বাথের মূল্য পড়ে গেলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময় এসবের মধ্যে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানই দেউলিয়া হয়ে যায়। ইতালির ‘পারমালাত’ নামক প্রতিষ্ঠানে ঋণ প্রদানের আগে একটি বিরাট ব্যাংক জামানত হিসাবে প্রদত্ত মেয়াদি আমানত পরীক্ষা করার ধার ধারেনি। পূর্ব আফ্রিকা, উত্তর বা দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এমনকি ইউরোপেও ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের দুর্বলতার কারণে বা সেখানে যোগ্য ব্যক্তি না থাকায় কিংবা থাকলেও ঋণ অনুমোদনের শর্তগুলো ঠিক সময়ে নজরদারিতে না আনার ফলে অনেক ঋণ অনাদায়ী হয়ে যায়।

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে ঋণ সাধারণত মন্দে পরিণত হয়: এক. ঋণ দেয়ার আগে করা দুর্বল মূল্যায়ন অথবা পদ্ধতিগত দুর্বলতা দুই. যে খাতে ঋণ দেয়া হচ্ছে সেখানকার অন্তর্নিহিত ঝুঁকি সম্পর্কে বুঝতে না পারায় ঋণ কর্মকর্তার ব্যর্থতা তিন. ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোনকে অনেকটা খামখেয়ালিভাবে টার্ম লোনে পরিণত করা চার. চাপের কারণে দেয়া ‘নেম লেন্ডিং’ অথবা ‘পুশ লেন্ডিং’ পাঁচ. রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক, এমনকি কিছু বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংকের রাজনৈতিক এমনকি সামাজিক চাপে ‘ডিকটেটেড’ বা ‘ম্যানেজড লোন’ ছয়. নজরদারির অভাব এবং এজন্য পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ব্যর্থতা। নব্বইয়ের দশকে শিপ ব্রেকিং বা জাহাজ ভাঙার জন্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আনা প্রদত্ত ঋণ পরিশোধের মেয়াদকাল নিয়ে বাধ্যবাধকতা না থাকায় মন্দ হয়ে পড়ে। বেশকিছু ব্যবসায়ী গ্রুপের একটি নির্দিষ্ট খাতে নেয়া ঋণ অন্য খাতে সরিয়ে নেয়ার কারণেও অনেক ঋণ অনাদায়ী হয়ে যায়।

অতীতে বিরাট অংকের অনাদায়ী ঋণকে কিছুটা নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে আমাদের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং আর্থিক খাতে সংস্কার প্রকল্প পরিচালনার জন্য বিশ্বব্যাংক, উভয়ই কমবেশি ধন্যবাদ প্রাপ্য। উভয়ই আমাদের সাহায্য করেছে আর্থিক খাতে ঋণ নজরদারি বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন জোরদার, ঝুঁকির ভিত্তিতে সুদহারের পার্থক্য করতে এবং এরা যে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা দিয়েছে তা ব্যাংক খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতিকে বেশকিছুটা উন্নত করেছে। তবে আমাদের প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আরো অনেক শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এমনকি ঋণ আদায়ের আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। এ-সংক্রান্ত আদালতগুলোকে কার্যকর করতে হবে। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ন্যূনতম আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক সরকারকে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর হতে হবে।

মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও