১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পথচলা শুরু হয় ফ্রান্সে ১০ হাজার পিস শার্ট ১ লাখ ৩০ হাজার এফএফ-এ রফতানির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল এক নতুন বাংলাদেশের পথচলা, শুরু হয়েছিল কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের এক নতুন অধ্যায়।
কৃষি উৎপাদন ছাড়া শিল্পায়ন বলতে সে সময়ে পাটশিল্প ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে পাটশিল্পও হারিয়ে যায়। একদল উদ্যোক্তার অপরিসীম পরিশ্রম এবং লাখ লাখ মেহনতি মানুষের ঘামের বিনিময়ে পোশাক শিল্প ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে। অর্থনৈতিকভাবে দেশ খুব একটা সমৃদ্ধ না হওয়ায় শিল্পটির এগিয়ে চলার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। পোশাক শিল্পের বিকাশে প্রচুর অর্থনৈতিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল। শিল্পের সামনে ছিল অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা। এসবের মধ্য দিয়ে শিল্প এতটা দূর আসবে, সেসময়ে কেউ তা আশাও করেনি।
শুরুর দিকে পোশাক শিল্পকে দর্জির পেশার সঙ্গে তুলনা করা হতো। শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো শিক্ষিত লোকবলের অভাব ছিল, যার ফলে বিভিন্ন জটিলতার মাঝেও বিদেশী লোকবলের ওপর নির্ভর করতে হতো। শিল্পের কাঁচামালের জোগান ছিল আরেকটি অন্যতম অন্তরায়। যেহেতু আমাদের দেশে তখন কিছুই তৈরি হতো না, তাই আমদানিনির্ভর হয়েই চলতে হতো। সম্বল বলতে ছিল শুধুই শ্রমজীবী মানুষের শ্রম আর উদ্যোক্তাদের অদম্য প্রত্যয়।
পোশাক শিল্পই যেহেতু ছিল একমাত্র ভরসা, তাই ব্যবসা সহজীকরণের জন্য একের পর এক উদ্ভাবন শুরু হয়। উল্লেখযোগ্য যুগান্তকারী সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবস্থা এবং বিজিএমইএ দ্বারা ইউডি ইস্যুকরণ ব্যবস্থা। যেহেতু প্রযুক্তির ব্যবহার তখন খুব বেশি শুরু হয়নি, তাই প্রথম দিকে কিছুটা সস্তা কাপড়ে ভরসা ছিল। অন্যান্য অবকাঠামো তখনো মজবুত না হওয়ায় উদ্যোক্তাদের বিদেশে গিয়ে কষ্ট করে অর্ডার নিয়ে আসতে হতো এবং একইভাবে নিজেদের কাজের মান বাড়াতে হতো। প্রথম প্রজন্মের জন্য এসব কাজ যে সহজ ছিল না, তা বলাই বাহুল্য।
ধীরে ধীরে এ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ব্যাংক, বীমাসহ আরো অনেক সহযোগী শিল্প। শিল্পের পরিধির সঙ্গে বাড়তে থাকে কর্মসংস্থান। এ শিল্পে আজ ৫০ লক্ষাধিক লোক সরাসরি কাজ করছে এবং দুই কোটিরও বেশি লোক পরোক্ষভাবে জড়িত। শিশুশ্রম অপসারণ, পরিবেশের প্রতি প্রতিশ্রুতি, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী নিরাপদ শিল্প গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণসহ আরো অনেক সংকট, যেমন করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারীর বিপদ মোকাবেলা করতে হয়েছে, হয়েছে ইউক্রেন-রাশিয়ার মতো যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হজম করতে, যাতে পুরো বিশ্বের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ ইস্যু মোকাবেলা করে শিল্প আজ বর্তমান অবস্থানে এসেছে। শিল্পটি আজ শুধু টাকা উপার্জনের মাধ্যমই নয়, বরং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল নারী গোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের পেছনেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজ গ্রামে-গঞ্জে দেখা যায় আমাদের নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তাদের সন্তানরাও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বড় বড় পদে কাজ করছেন, তাদের সন্তানরাও উদ্যোক্তা হচ্ছেন। সুতরাং শুধুই এ শিল্পকে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের শিল্প হিসেবে দেখলে চলবে না, দেখতে হবে এ দেশের উন্নতিতে এবং অর্থনীতিতে এর সামগ্রিক প্রভাব কতটা গভীর।
শিল্পের পরিধির সঙ্গে অন্যান্য প্রয়োজনীয়তাও বাড়তে লাগল। শুরু হলো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ উন্নয়ন, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ এবং সেই সঙ্গে নিজেদের উন্নয়ন তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। শিল্পকে বাদ দিয়ে যদি আজ দেশের এ উন্নয়ন ও অবস্থানকে বিচার করা হয়, তবে তা হবে প্রশ্নবিদ্ধ। আর এ উন্নয়নের পেছনে শ্রমিক ভাইবোনদের পরিশ্রমের সঙ্গে সমানভাবে অনেক উদ্যোক্তা ভাইবোনের ত্যাগ ও তিতিক্ষা রয়েছে।
সময়ের পরিক্রমায় শিল্প আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এ সময়ে শিল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের অন্যান্য সহযোগী ও পশ্চাৎপদ শিল্পও সমানতালে এগিয়ে গেছে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পার করে একজন উদ্যোক্তাকে এ অবস্থানে আসতে হয়। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো প্রতিটি ব্যবসাতেই লাভ-লোকসান থাকে, কিন্তু এ শিল্পে যেন লোকসান করা মহাপাপ, যা একজন উদ্যোক্তা করতেই পারেন না। বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে লোকসান হলে উদ্যোক্তার বেরিয়ে যাওয়ারও রাস্তা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে যেন এ এক গোলকধাঁধা, এখানে বেরোনোর কোনো পথ নেই।
আগে শিল্পে অনেক বিদেশী নাগরিক কাজ করতে আসতেন, বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আমাদের শিক্ষিত লোকজন এ শিল্পে কাজ করছেন, আমাদের নতুন প্রজন্মও অনেক উৎসাহ নিয়ে শিল্পে যুক্ত হচ্ছে। তৃতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা আজ আসছেন যারা শুধু সততার সঙ্গে তাদের উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এবং তার পূর্ব প্রজন্মের দুর্দশা দেখে আজ তারা শিল্পবিমুখ হচ্ছেন, যা শিল্পের ভবিষ্যৎ গন্তব্যের জন্য হুমকির শামিল। একজন উদ্যোক্তা তার সবকিছু বিনিয়োগ করেন তার শিল্পকে আগলিয়ে রাখতে, তবে বর্তমান সময়ের প্রতিযোগিতা এমন অবস্থানে পৌঁছেছে যে টিকে থাকা মুশকিল। আমাদের দেশে দুর্বল জ্বালানি অবকাঠামো আমলাতান্ত্রিক, ব্যাংকিং জটিলতা ও প্রতিযোগিতায় প্রভাব রাখা অন্যান্য দুর্বলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা মাঝে মধ্যেই বিফল হন, তবে তা কখনই ইচ্ছাকৃত হতে পারে না। আবার অনেক উদ্যোক্তা সফলতার চরম শিখরে পৌঁছে দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন, অন্যান্য শিল্পে বিনিয়োগ করছেন। নিয়মের বেড়াজালে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে থাকে, তা মানতেই হবে। তবে সেটি সমগ্র খাতের প্রতিফলন নয়।
সরকারকে এমনভাবে নিয়ম করতে হবে যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ না পায় এবং ভালো ব্যবসায়ীরাও দুর্ভোগে না পড়েন। আমরা শুধু একজন উদ্যোক্তার বাড়ি ও গাড়ি দেখি, কিন্তু দেখি না পেছনের ইতিহাস। কতটা ঘাম ঝরে যায় একজন উদ্যোক্তার এ পর্যায়ে আসতে, কত ঝুঁকি নিতে হয় তাকে! অনেক সময় দেখা গেছে, প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক উদ্যোক্তা রাতারাতি সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তায় ঘুরছেন, মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এক্ষেত্রে সরকারকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে, করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাসহ তাদের জন্য নিরাপত্তা। এসব উদ্যোক্তাকে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে, যাতে তারা পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারেন এবং তাদের পরের প্রজন্ম একই ব্যবসায় আসতে উৎসাহ পায়। এদের দিতে হবে বিশেষ সম্মানের ব্যবস্থা, যাতে অন্যরাও বিভিন্ন শিল্পে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ পায়। নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে কী পরিমাণ ত্যাগের ফলে পোশাক শিল্প আজ এ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যাতে তারাও উৎসাহ পায়।
আজ শুধু বিলিয়ন বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি দিয়ে পোশাক শিল্পকে মূল্যায়ন করলে চলবে না, এ শিল্পের ফলে অন্যান্য অর্জনও মূল্যায়ন করতে হবে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকার পেছনে এ শিল্পের অবদান অনেক। কারখানার একজন শ্রমিকের পেটে ক্ষুধা রেখে উদ্যোক্তা শান্তিতে থাকতে পারেন না। শ্রমিক যেমন ক্ষুধার্ত অবস্থায় তার মেশিন চালাতে পারেন না, ঠিক তেমনি উদ্যোক্তা ও শান্তিতে থাকতে পারেন না। একটি কারখানার উদ্যোক্তার কাছে তার কারখানা যেন তার বাসা এবং শ্রমিকরা তার পরিবার। ভুলের জন্য যেমন শাস্তি প্রাপ্য, ঠিক তেমনি দেশ গড়ার কারিগরদের সম্মানও প্রাপ্য। একজন শ্রমিক যেমন সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন, ঠিক তেমনি একজন উদ্যোক্তা ও তার প্রাপ্য সম্মান পাওয়ার আশা রাখেন। আগামীর পৃথিবী আরো প্রতিযোগিতামূলক ও কঠিন হবে। এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতার বিকল্প নেই।
মো. মহিউদ্দিন রুবেল: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক