বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ২০২৫ সাল ছিল একটা বাঁক বদলের বছর। এ বছরের শেষার্ধে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরই এ খাতের যাবতীয় ওপেন সিক্রেটগুলো প্রকাশ হতে শুরু করে। দেশের ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা, গণমাধ্যম ও সচেতন সাধারণ মানুষই কেবল জানতেন ব্যাংক খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্য কেমন ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরোপুরি এ সচেতনতা ছিল না। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিশেষ কিছু ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা যখন পলাতক কিংবা কারাগারে, কিছু ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীও যখন গা ঢাকা দিয়েছেন কিংবা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, এমনকি স্বয়ং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানও যখন নিরুদ্দেশ, এ রকম পরিস্থিতিতে সংকটাপন্ন ১৪টি ব্যাংকের (দেশের মোট ব্যাংকের ২৩ শতাংশ) পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে শুরু নতুন করে অনিশ্চয়তা। এক কথায় সমগ্র ব্যাংক খাতজুড়ে চলতে থাকে এক ধরনের অস্থিরতা। বাণিজ্যিক ব্যাংক ছাড়াও বিদায়ী বছরে আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে না পারা, উচ্চখেলাপি ঋণ এবং মূলধন ঘাটতির কারণে নয়টি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
২০২৫ সালে এসে সেই বাঁক বদলের ধারাটি আরো স্পষ্ট হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যেখানে খেলাপি ঋণের শতকরা হার ছিল সর্বনিম্ন ৬ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশের ঘরে, সেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ হার এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। তারপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এ হার আরেক দফায় বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ ছুঁই ছুঁই করছে। ডিসেম্বরের পর এ হার ৪০-৪৫ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেপ্টেম্বরে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। তার সঙ্গে অবলোপনকৃত ঋণের অংক যোগ করলে এ পরিমাণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কিছু কিছু ব্যাংকে এ হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। খেলাপি ঋণের আশঙ্কাজনক উচ্চহারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। থলের বেড়ালের মতো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেরিয়ে আসা শুরু হয়েছে বছর।
বিগত দীর্ঘ ১৫ বছরের একটানা শাসনামলে নজিরবিহীনভাবে ঘটেছে নির্দিষ্ট একটি গ্রুপের ব্যাংক দখলের ঘটনা, দুর্বল নজরদারি ও অব্যবস্থাপনার সুযোগে হয়েছে ব্যাপক লুণ্ঠন ও অর্থপাচার, সরকারের ব্যবসায়ী তোষণের কারণে লাগামহীন বেড়েছে খেলাপি ঋণ এবং নানান কৌশলে চাতুরীবিন্যাস করে সেই খেলাপি ঋণকে লুকিয়ে রেখে দেখানো হয়েছে একটা ঠুনকো স্বাস্থ্যকর চিত্র। সর্বোপরি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অধিকাংশ ব্যাংকে সুশাসন ছিল সুদূরপরাহত একটা ধারণা মাত্র। ফলে ব্যাংক খাত হয়ে পড়েছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর ও নড়বড়ে।
২০১৮ সালে নির্বাচনের পর তৎকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, খেলাপি ঋণ আর ১ টাকাও বাড়বে না। তার কথা রেখেছিলেন তিনি। শর্ত শিথিল করে এবং সংজ্ঞা পাল্টে দিয়ে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীদের পূর্ণ সহায়তা দিয়ে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানোর সব দরজা খুলে দেয়া হয়েছিল তখন। পরের বছর শেষে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে গেলে তিনি দাবি করেন, ১৯৯১ সালে মোট ব্যাংক ঋণ ১৯ হাজার কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ছিল ৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৯ সালের শেষে মোট ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা, তার মধ্যে খেলাপি ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ১২ শতাংশ। এ হিসাবেই আমাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ না বাড়ার দাবি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন মন্ত্রী। খেলাপি ঋণ বাড়ার পক্ষে আরেকটা অদ্ভুত তত্ত্ব তিনি হাজির করেছিলেন যে ব্যাংক ঋণের বিপরীতে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ আরোপ হয় বলে সুদের হার অনেক বেশি আসে। এ কারণেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমছে না। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো, খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ার কারণেই সুদের হার বেশি রাখতে হয় ব্যাংকগুলোকে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ব্যাংকিংয়ের ইতিহাসে সবসময়ই চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ আরোপ করা হয়। প্রভাবশালীরা ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না, সাংবাদিকদের এমন এক মন্তব্যের জবাবে মন্ত্রী এমনও বলেছিলেন, বাংলাদেশে যারা ব্যবসা করেন তারা সবাই প্রভাবশালী। তারা অর্থনীতির ৮২ শতাংশ। তারা প্রভাব না খাটালে দেশে অগ্রগতি হবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। তাদের বাদ দিয়ে ১৮ শতাংশ নিয়ে অর্থনীতি সাজানো সম্ভব নয়। তাদের ব্যবসা করতে সব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। এ মন্তব্যের পরোক্ষ অর্থ, প্রভাবশালীদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
দীর্ঘদিনের এ গভীর সংকটের প্রকৃত চিত্র চূড়ান্তভাবে উন্মোচন হয় ২০২৫ সালে। তাই এ বছরটি ছিল সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টার একটি বছর। নানামুখী সংস্কারের উদ্যোগ, কঠোর কিছু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার পর একমাত্র ব্যাংক খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর একটা লক্ষণ খুব দূরবর্তী হলেও দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে এ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল বলার সময় আসেনি এখনো।
ব্যাংক খাতের এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে বহু বছর পর বাংলাদেশ ব্যাংক তার কাঙ্ক্ষিত কর্তব্য পালনে তৎপর হয়। ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জারি হয় ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫। এ আইনে দুর্বল ও অকার্যকর ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ, পুনর্গঠন এবং অবসায়নের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। আইনটির প্রধান লক্ষ্য আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা এবং সমস্যাকবলিত ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করার জন্য যাতে করদাতাদের অর্থ বিনিয়োগ করতে না হয়। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে দেউলিয়া ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তর, প্রশাসক নিয়োগ, ব্রিজ ব্যাংক গঠন এবং প্রয়োজনে শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারমূল্য শূন্য করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যায়। এ সংস্কার প্রক্রিয়ায় পাঁচটি ইসলামী শরিয়াভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে একটি সরকারি ব্যাংকে রূপান্তর করার কাজ শুরু হয়েছে। একথা সবারই জানা, এ পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে চারটির মালিকানা এককভাবে স্বনামে ও বেনামে ছিল বিতর্কিত একটি গ্রুপের হাতে, আরেকটির মালিকানা ছিল ব্যাংক মালিকদের একচ্ছত্র এক বিতর্কিত নেতার হাতে।
এ আইনের পাশাপাশি জারি হয় আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫। এ অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা সাধারণ আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও তাদের আস্থা বৃদ্ধি করা। এ আইনের অধীনে গঠন করা হবে আমানত সুরক্ষা তহবিল, যাতে প্রয়োজনে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেয়া যায় এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকটের কারণে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। এ আইনে ব্যাংক খাতে আর্থিক সংকট বা ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষুদ্র ও সাধারণ আমানতকারীদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।
তবে পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের এ উদ্যোগ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তাদের কারো মতে, অনেকগুলো দুর্বল ব্যাংক একত্র হলেও কখনো তারা শক্তিশালী হতে পারবে না। কারণ এসব ব্যাংকের ভেতরের অবস্থা এতটাই খারাপ যে একত্রীকরণের পর ব্যাংকটিকে কতদিন ধরে টেনে যেতে হবে সেটা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। সুতরাং একদা দেশের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে এ পতনোন্মুখ ব্যাংকগুলোকে জুড়ে দিয়ে সরকারি ব্যাংকে রূপান্তরিত করলেও বিশেষ কোনো ফায়দা হবে না। উপরন্তু যেখানে ইসলামী ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ সর্বশেষ (সেপ্টেম্বর ২০২৫) হিসাবে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৭০ হাজার কোটি টাকাই স্বনামে ও বেনামে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। এ ঋণ আদায় যে প্রায় অসম্ভব, সেটা বোঝার জন্য ব্যাংক জানতে হয় না। তাছাড়া ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা। তার পরও একীভূত সরকারি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক স্থাপন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।
এ পদক্ষেপের ফলে একীভূত ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের বিশেষ করে বড় আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টার কোনো দ্রুত সুরাহা হচ্ছে না। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচাইতে বড় প্রকল্পটি সম্পর্কে এখনই খুব আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই।
ব্যাংক খাতের এমন দৈন্যদশার মধ্যেও দেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক উৎপাদন ছিল। ২০২৫ সালে প্রবাসী আয়ে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে প্রায় ২ হাজার ৯৫৩ কোটি ডলার, ২০২৪ সালের পুরো বছরে যা ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের মতো। প্রবাসী আয়ের এ উল্লম্ফন ব্যাংক খাত ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় এনে দিয়েছে বড় ধরনের স্বস্তি। এ উল্লম্ফনের পেছনের বড় ভূমিকা পালন করেছে পাচার রোধ ও হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমে যাওয়া, সরকারি প্রণোদনা এবং ব্যাংকগুলোর উন্নত মানের সেবা।
প্রবাসী আয় বাড়ার সঙ্গে রফতানি আয়েও ঘটেছে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। ফলে ২০২৫-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে দেশের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৩৭ কোটি ডলার, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যা ছিল ২ হাজার ৬২০ কোটি ডলার। আইএমএফ নির্দেশিত পন্থায় হিসাব করলেও ২০২৫ সালের শেষে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৮৮ কোটি ডলার। অন্যদিকে ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে এবং আইএমএফের নির্দেশনায় বাজারভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নীতি অনুসরণের পরও ডলার টাকার বিনিময় হারও স্থিতিশীল হয়ে ১২৩ টাকার কাছাকাছি গিয়ে স্থির রয়েছে। এমনকি ডলার-টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাজার থেকে ব্যাপক হারে ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এ ধারায় মোট ২৮০ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অবশ্য ডলারের ওপর চাপ কমা ও রিজার্ভের স্থিতি বাড়ার মূল কারণ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দা ও বেসরকারি বিনিয়োগে ভাটা। নির্বাচিত সরকার আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে রিজার্ভের এ পরিমাণ কিংবা ডলার টাকার বিনিময় হার স্বস্তিকর অবস্থায় থাকবে না।
ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের পুরোটাই ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কঠোর কৃচ্ছ্রর চেষ্টা। কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ, সুদহার বাড়িয়ে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে আনার কারণে এ বছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো চাপের মধ্যে থাকলেও বছর শেষে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।
গত বছরে যে সংস্কার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে, তার সঙ্গে আরো একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক যুক্ত হবে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত পরিবর্তন আনা যায়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক লাভ করবে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন। তবে বিষয়টা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কিনা সে বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে। ভারতের কথা বাদ দিলেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও রয়েছে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন। সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানকে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি পরিচালনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণের সীমা নির্ধারণ নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ এবং একচেটিয়া কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেখাশোনা করার জন্য পাকিস্তান ব্যাংকিং কাউন্সিল বিলুপ্ত করা ফলে সরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও পরিচালক নিয়োগ ও অপসারণের পূর্ণ কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। আমাদের দেশেও এ স্বায়ত্তশাসন চালু হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক সংস্কারে হাত দিতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অবসান ঘটবে দ্বৈত শাসনের।
তবে কেবল ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করার মধ্যে এ খাতের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। খেলাপি হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য ঋণ অনুমোদন থেকে নজরদারি ও আদায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও সুশাসনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পরিস্থিতি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সমস্যাকবলিত দুর্বল ব্যাংকের সংখ্যা এত বেশি এবং ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা এত কম যে বর্তমান খেলাপি ঋণের চক্র থেকে পুরো খাতকে টেনে তোলা অত্যন্ত কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদি একটা প্রক্রিয়া হবে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ কমাতে না পারলেও হার কমানোর একটা বিকল্প পন্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, ঋণের নামে লোপাটকৃত কিংবা সরাসরি লুণ্ঠিত অর্থ এবং বেনামি বলে প্রমাণিত ঋণ হিসাবকে প্রকৃত খেলাপি হিসাব থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। প্রথমোক্ত দুই শ্রেণীর ঋণ যেহেতু আদায়ের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, এগুলোকে আলাদা করে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে তছরুপ কিংবা প্রটেস্টেড বিল হিসেবে সরিয়ে নেয়া যায়। কারণ এ শ্রেণীর বকেয়াকে ঋণ বলে চিহ্নিত করার অবকাশ নেই। তারপর এসব লুণ্ঠন ও বেনামি ঋণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এ পন্থায় যতটুকু সম্ভব উদ্ধার করতে হবে লুণ্ঠিত অর্থ। বাকি অংশ ধীরে ধীরে অবলোপন করতে হবে। এ পন্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটোই কমবে।
অন্যদিকে প্রকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার এবং খেলাপিদের সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা খর্ব করতে হবে। তাদের পরিচয় প্রকাশ্য করার উদ্যোগ নিলেও উল্লেখযোগ্য সুফল আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। অন্তর্বর্তী সরকার বহু সাহসী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু খেলাপিদের বিরুদ্ধে উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলোর মাধ্যমে জনগণের কাছে সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর সংস্কারের অঙ্গীকারের প্রমাণ রাখার সুযোগ এখনো রয়ে গেছে।
ফারুক মঈনউদ্দীন: ব্যাংকার ও লেখক