অভিমত

কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ কেবল ‘খসড়া আইন’ যেন না থাকে

পনেরো বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত ‘ভূমি ব্যবহার ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত হয়েছে। উত্থাপনের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ এ অধ্যাদেশ পাস করলে এটা আইনে পরিণত হবে।

মহাপ্রতাপশালী ভূমিদস্যুদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে হয়তো এ অধ্যাদেশকে আটকে দেয়ার। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার ও বিরোধী দলের কাছে এ দেশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ আইনটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে এ আশাবাদ সবার। এ আইন বাস্তবায়নে লাগবে সংসদ ও সরকারের সাহসী পদক্ষেপ।

মহান সংসদে কত রঙের আইন-অধ্যাদেশ অতি দ্রুততার সঙ্গে পাস হলেও বাংলাদেশের ফসলি জমি বাঁচানোর ইস্তাহারটা ‘খসড়া আইন’ হিসেবে বন্দি হয়ে ছিল গত ১৫ বছর। কার্বন সিকোয়েস্টেশন, জলবায়ু অভিযোজন, খাদ্যনিরাপত্তা, ও সবুজায়নের জন্য কৃষিজমির সুরক্ষা, যত্ন ও ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরি। তবু আইনপ্রণেতাদের সহানুভূতি পেতে ব্যর্থ হয়েছে খসড়া বিগত তিনটি সংসদের মেয়াদকালে কি এক অদৃশ্য কারণে সংসদের বারান্দায় ঘুরছে কৃষিজমি সুরক্ষা খসড়া আইনটি, সংসদে ঢুকতে পারেনি আইনটি। কি নির্লিপ্ততা, কি নির্মমতা আমাদের। মাত্র ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন হেক্টর ফসলি জমি আমাদের। এ জমি না বাঁচলে ১৮ কোটি মানুষ বাঁচবে কীভাবে। সবাই জানে জমি কেনা-বেচাতে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে বেশি লাভজনক। এত মুনাফা মাদক-অস্ত্রের ব্যবসায়ও নেই। কালো টাকা, সাদা টাকা সবকিছুই চলে যাচ্ছে সবুজ ফসলি জমি গ্রাস করার মহোৎসবে। ভূমিদস্যুদের বুভুক্ষা বেড়ে গেছে বহুগুণ। কৃষিজমি সুরক্ষা আইন পাস ও প্রয়োগে বিলম্ব হওয়ায় ১৫ বছরেও হারিয়ে গেছে আরো অন্তত ৭-১০ লাখ হেক্টর ফসলি জমি। আর কালক্ষেপণ নয়, ফসলি জমি বাঁচানোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই।

উর্বর কৃষিজমি রক্ষায় কোনো কার্যকর আইন না থাকায় নানামুখী ঝুঁকিতে পড়েছে আমাদের কৃষি, জীবন ও খাদ্যনিরাপত্তা কৃষিজমি ব্যবহার আইন তৈরির কাজ শুরু করেছিল ভূমি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর পর থেকে কত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল আলোচনা হয়েছে। অতিগুরুত্বপূর্ণ কৃষিজমি ব্যবহার আইনটি দ্রুততার সঙ্গে নবম সংসদে পাস করার কথা থাকলেও দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদেরও পাস হয়নি আইনটি। নির্বাচনী ইশতাহারে যে উন্নয়নের কথা, সমৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে তা দুঃস্বপ্ন হয়ে যাবে, যদি মৃত্তিকা মরে যায়, হারিয়ে যায় সোনাফলা ফসলি জমি। আগামীর খাদ্যনিরাপত্তা, সুস্থ পরিবেশ ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আইনটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

এ দেশের ফসলি জমির মালিকানা প্রান্তিক ধানচাষীর হাত থেকে চলে যাচ্ছে ভূমিদস্যু ব্যাবসায়ীর হাতে। ফসলি জমি রাতারাতি হয়ে উঠছে হলিডে রিসোর্ট, হাউজিং প্রজেক্ট, শিল্প পার্ক। জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া উদ্ভ্রান্ত কৃষক তার পিতা-পিতামহের পেশা ছেড়ে হয়ে যাচ্ছে নির্মাণশ্রমিক, গার্মেন্টস কর্মী, ভ্যানচালক অথবা রেলস্টেশনের কুলিমজুর।

কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১০, কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৫, কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৯ (খসড়া), কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০২১ (খসড়া), কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০২৪ (খসড়া)— এভাবে বেড়েছে খসড়া সংখ্যা। সর্বশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে গত ১৮ জানুয়ারি ভূমি ব্যবহার ও কৃষিজমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি হয়েছে। প্রণয়নের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এ আইনের লক্ষ্য হলো উর্বর ফসলি জমির অননুমোদিত ব্যবহার বন্ধ করা, অকৃষি খাতে জমির রূপান্তর রোধ করা এবং কৃষির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আইনটি অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

কৃষিজমি সুরক্ষা আইনে যেকোনো ধরনের চাষযোগ্য জমি, মাঠ ফসল, উদ্যান ফসল বা মৎস্য পালন ক্ষেত্রকে কৃষিজমি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। খসড়া আইনে বলা হয়েছে কৃষিজমির শ্রেণী পরিবর্তন (যেমন পুকুর খনন, ঘরবাড়ি নির্মাণ) করা যাবে না। এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ‘‌বাংলাদেশ ভূমি জোনিং ও ভূমি সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ’ নামে সরকার একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করবে। কৃষিজমির অপব্যবহার বা ধ্বংসের ক্ষেত্রে আইনানুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। শিল্পের আগ্রাসনসহ বিভিন্ন কারণে আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। এর মধ্যে আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষিজমির অযৌক্তিক ব্যবহার। পাশাপাশি রাতারাতি ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল-বিল, ডোবা-নালা। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণেই আশঙ্কাজনকভাবে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষিজমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতে আইন হচ্ছে দেশে। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, আবাসন, নদী, সেচ, নিষ্কাশন, পুকুর, জলমহাল, মৎস্য এলাকা, বনাঞ্চল, সড়ক ও জনপথ এবং রেলপথ, হাটবাজার, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা, চা, রাবার ও হর্টিকালচার এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল, পর্যটন এলাকা, চরাঞ্চল, পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকা এবং অন্যান্য অঞ্চল এ আইনের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দেয়া হবে।

আইনের মাধ্যমে কৃষিজমি সুরক্ষা করতে হবে এবং কোনোভাবেই তার ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। কৃষিজমি নষ্ট করে আবাসন, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অনুর্বর, অকৃষি জমিতে আবাসন, বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা স্থাপনের কথা বলা হয়। যেকোনো শিল্প-কারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবন, বাসস্থান এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমির ঊর্ধ্বমুখী ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য থাকবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। কৃষিজমি যে কেউ ক্রয়-বিক্রয় করতে পারলেও তা আবশ্যিকভাবে শুধু কৃষিকাজেই ব্যবহার করতে হবে। একাধিক ফসলি জমি সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো অবস্থায়ই অধিগ্রহণ করা যাবে না। তবে আবাসিক উদ্দেশ্যে কৃষিজমি ক্রয় ও ব্যবহার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কৃষিজমি চিংড়ি মহাল হিসেবে ঘোষণা করাও যাবে না।

বাংলাদেশে ফসলি জমির স্বাস্থ্যের অবস্থা ক্রমক্ষয়িষ্ণু। নিবিড় চাষাবাদের চাপ সইতে হয় ফসলি জমিকে। বদলে যাওয়া হাইড্রোলজি ও রিভারাইন বিহেভিয়ার এ দেশের সমতল ভূমিকে আরো বিপন্ন করে তুলেছে। ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন পলি মাটি বহন করে ৫৪টি ট্রান্সবাউন্ডারি নদী। বাংলাদেশে বর্তমানে ফসলি জমি প্রায় ৭ দশমিক ২৯ মিলিয়ন হেক্টর। পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১০ শতাংশ জায়গায় ফসল আবাদ হলেও বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৬০ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার দক্ষতা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। নিবিড় চাষাবাদের হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে একেবারে প্রথম সারিতে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও নগরায়ণের জন্য মাটির ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। আমাদের আবাদি জমি কমে যাচ্ছে অব্যাহতভাবে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ধোঁয়া তুলে, সমৃদ্ধ আগামীর কথা বলে তিন ফসলি কৃষিজমি চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছে শিল্পপতির উদরে। ক্রমবর্ধমান বঙ্গসন্তানের অন্ন জোগাতে মাটি আজ ক্লান্ত।

বাংলার মৃত্তিকার ‘কার্বন ক্রেডিট ভ্যালু’ কত কেউ কী হিসাব করেছেন? নিবিড় চাষাবাদের ফলে মৃত্তিকা কার্বন হ্রাস পাচ্ছে অব্যাহতভাবে। জৈব পদার্থের আশঙ্কাজনক মাত্রায়ও থেমে নেই নিষ্ঠুর পীড়ন। পুষ্টি ও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ ‘টপ সয়েল’ আমাদের অমূল্য সম্পদ। নগরায়ণের আগ্রাসনে এ অমূল্য টপ সয়েল চলে যায় ইটভাটার চিতানলে। দরিদ্র কৃষককে দুটো কাঁচা পয়সার প্রলোভন দেখিয়ে ইটভাটার মালিক বস্ত্র হরণ করে ফসলি জমির। ইটভাটার দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় পুষ্টিসমৃদ্ধ উর্বর টপ সয়েল। নির্জীব মাটি অভিশাপ দিয়ে যায় সভ্যতাকে, মানুষকে, মনুষের নির্লিপ্ততাকে।

পৃথিবীর অনেক দেশেই শক্ত কৃষিজমি সুরক্ষা আইন আছে, আইনের প্রয়োগ আছে। এখন প্রশ্ন হলো আইনগুলো বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষক ও জনগণের অংশগ্রহণ কতটা কার্যকর হবে। কারণ আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল হলে কৃষিজমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে যায়। তাই আইন পাস হওয়ার পর এ আইন বাস্তাবায়নের ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে। যাদের অদৃশ্য হাতের ইশারায় কৃষিজমি সুরক্ষা আইনটি বিলম্বিত হয়েছে, সেই মহাশক্তিধর হস্ত নিবৃত করার শক্তি সাহস অর্জন না করতে পারলে কৃষিজমি সুরক্ষা আইনটি হয়ে থাকবে কাগুজে বাঘ। বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছে। এ মেগা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নেও কৃষিজমি সুরক্ষা আইনটির প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে। তাই ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস হোক কৃষিজমি সুরক্ষা আইনটি। এ প্রত্যাশা সবার।

ড. মো. রওশন জামাল: কৃষিবিদ ও পরিচালক (গবেষণা ও উন্নয়ন), বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেইনিং সেন্টার

আরও