আলোকপাত

এনবিএফআইয়ের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ পরিক্রমা

ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সংক্ষেপে এনবিএফআইয়ের ইতিহাস বাংলাদেশে খুব বেশিদিন আগের নয়। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের প্রায় এক দশক পর এ দেশে প্রথম ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ের অনুমতি লাভ করে এবং আক্ষরিক অর্থে বলতে গেলে ১৯৮২ সালে প্রথম ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। সে অর্থে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক

ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সংক্ষেপে এনবিএফআইয়ের ইতিহাস বাংলাদেশে খুব বেশিদিন আগের নয়। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের প্রায় এক দশক পর দেশে প্রথম ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ের অনুমতি লাভ করে এবং আক্ষরিক অর্থে বলতে গেলে ১৯৮২ সালে প্রথম ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। সে অর্থে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস খুব বেশি আগের না হলেও দেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে খাতটি। আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থায় নানা ধরনের আর্থিক কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে মূলত নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের পরিবর্তিত চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখেই। ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থ মূলধন বাজারে গঠনমূলক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসাধারণের চাহিদা এবং পছন্দের ব্যাপকতাও প্রসারিত করেছে। পেনশন, বিনিয়োগ, রিয়েল এস্টেট প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাড়া জাগানো ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রভূত অবদান রেখে চলেছে।

বাংলাদেশে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বলতে সেসব প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয় যেগুলো ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্যাক্ট ১৯৯৩ দ্বারা পরিচালিত এবং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। বলাবাহুল্য বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৪টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সচল আছে। ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩টি সরকারি, ১২টি দেশী বিদেশী যৌথ মালিকানায় এবং বাকিগুলো দেশী কিন্তু বেসরকারি এবং ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। বৃহৎ পরিসরে বলতে গেলে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশের বিদ্যমান আনুষ্ঠানিক কাঠামোগত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পড়ে। আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অন্তর্গত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সেসব যেগুলো সুনির্দিষ্ট আইন এবং বিশেষত সিকিউরিটিজ কমিশন, বীমা অথরিটি অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সে অর্থে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, ব্রোকারেজ হাউজ এবং মার্চেন্ট ব্যাংক, ক্ষুদ্র ঋণ বা মাইক্রো ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান দেশের আনুষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর ভেতর পড়ে।

অন্যদিকে দেশে প্রচলিত এমন কোনো প্রতিষ্ঠান যা সুনির্দিষ্ট আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কিন্তু বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সিকিউরিটিজ কমিশন ইত্যাদি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না সেসব প্রতিষ্ঠানকে আধা-আনুষ্ঠানিক (সেমিফরমাল) প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করা হয়। সেমিফরমাল গোত্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন, গ্রামীণ ব্যাংক, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন এবং অপরাপর নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বা এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝায়। সেদিক বিবেচনায় ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বৃহত্তর আর্থিক পরিষেবা কাঠামোয় আনুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত।

আর্থিক কাঠামোর নিরিখে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আমানত গ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (ডিপোজিটরি ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন বা ডিএফআই) মধ্যে তাত্ত্বিক প্রায়োগিক পার্থক্য রয়েছে। বিধিবদ্ধভাবে আমানত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান চার ধরনের। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে শুরু করে সঞ্চয় ঋণদান প্রতিষ্ঠান (সেভিংস অ্যান্ড লোন ইনস্টিটিউশন), সঞ্চয়ী ব্যাংক এবং ক্রেডিট ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত। সেদিক বিবেচনায় ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বেশকিছু আইনত   পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা এবং আমানত গ্রহণকারী  প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যেমন বাণিজ্যিক ব্যাংক যেখানে চেক ইস্যুর মাধ্যমে চেকিং অ্যাকাউন্টে নানা ধরনের আমানত গ্রহণ জমা রাখতে পারে, সেখানে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান চেক বই ইস্যু করতে পারে না। এছাড়া ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অপরাপর বিনিময় মাধ্যম যেমন পে-অর্ডার, ডিমান্ড ড্রাফট ইত্যাদি ইস্যু করতে পারে না। এনবিএফআই অন্যান্যের মতো বৈদেশিক বিনিময়ের মাধ্যমে ফাইন্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতায় ভোগে। ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম তিন মাস বা তদূর্ধ্ব মেয়াদি আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়ন (রি-ফাইন্যান্সিং), কল মানি মার্কেট এবং অপরাপর ধার (বন্ড অ্যান্ড সিকিউরিটাইজেশন) ইত্যাদি ফ্যাসিলিটি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থায়ন করে থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির একটি দেশে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাই আমানত গ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় যথেষ্ট পরিসর পায় না বাজার বিস্তৃতির দিক থেকে।

বাংলাদেশে বর্তমানে সচল পূর্ণ মাত্রায় ব্যবসা পরিচালনাকারী ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, ঠিক তেমনি তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও বেশ আশাজাগানিয়া। উদাহরণস্বরূপ, এসব প্রতিষ্ঠানের শাখা বিস্তৃতির কথাই ধরা যাক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১২ সালে ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সাকল্যে শাখা ছিল ১৬৮টি। সেখানে ২০১৮ সালে এসে ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের শাখার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬২টিতে। শতকরা হিসাবে বছরে প্রায় ৬০% নতুন শাখা খোলা হয়েছে। তবে এসব শাখার উল্লেখযোগ্য অংশই ঢাকা শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের অন্যান্য বড় শহর গ্রামগঞ্জের মানুষের কাছে এসব প্রতিষ্ঠান ততটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশে এনবিএফআইয়ের প্রবৃদ্ধি তাদের বিনিয়োগ পরিসম্পদের নিরিখেও বেশ গুরুত্ববহ। ২০০০ সালে দেশে পরিচালিত এনবিএফআইয়ের মোট পরিসম্পদ ছিল মাত্র ৭৪.৮৪ বিলিয়ন টাকা, সেখানে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬০ বিলিয়ন টাকায়, যা ঠিক ২০ বছরের মাথায় প্রায় সাড়ে এগারো গুণ বেশি। 

অতীব সম্ভাবনাময় ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি অন্যান্য খাতেও বিস্তর বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী এনবিএফআইয়ের মাধ্যমে তাদের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৪৬% শতাংশ হয়েছে শিল্প খাতে। একই সময়ে রিয়েল এস্টেটে প্রায় ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যে প্রায় ১৪, মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রায় ., কৃষিতে . শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে। এনবিএফআইয়ের মাধ্যমে এসব বহুধা বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়ের উর্বর ক্ষেত্র ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই তুলে ধরে।

প্রশ্ন হলো, প্রভূত সম্ভাবনাময় দেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় কী কী? অথবা অন্তরায়গুলোকে কি সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা করা যায়? যদিও সুনির্দিষ্ট করা যায়, সেক্ষেত্রে সমাধানই বা কী? এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এসবের খুব সহজ সমাধান আছে বলে মনে হয় না। প্রথমতই ধরা যাক, তহবিল জোগানের বিষয়টি। আইনত এনবিএফআই ডিমান্ড ডিপোজিট এবং সঞ্চয়ী আমানত সংগ্রহ করতে পারে না। এসব প্রতিষ্ঠান চেক বই ইস্যু করতে পারে না বিধায় সাধারণ জনগণের কাছ থেকে সর্বনিম্ন তিন মাস মেয়াদি আমানত ছাড়া অন্য প্রকার আমানত গ্রহণ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান যখন জনগণের কাছে আমানতের জন্য দ্বারস্থ হয়, তখন সাধারণ জনগণ তাদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে অপারগ হয়। বাধ্য হয়ে এনবিএফআই মেয়াদি আমানতে বেশি সুদ অফার করলে জনমনে উল্টো প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। জনমনে বিভ্রান্তি আসে যে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের চেয়ে কীভাবে বেশি সুদ অফার করে। এসব ভেবে অনেকেই এনবিএফআইয়ে আমানত রাখতে কার্পণ্য বোধ করে, আবার অনেকে ভয়ও পায় যা অনেক ক্ষেত্রে অমূলকও নয়।

উচ্চ তহবিল জোগান খরচ ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রকট সমস্যা বটে। প্রচলিত বাস্তবতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধ অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত ঋণদানের সুদের হারের সীমা (ফ্লোর অ্যান্ড সিলিং) নির্ধারণ করা আছে। সেক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধের দোহাই দিয়ে কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে। এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে এসব প্রযোজ্য না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে বাধ্য হয় (উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এনবিএফআইয়ের জন্যও আমানত সংগ্রহ এবং ঋণের সুদের হার বেঁধে দিয়েছে, তদুপরি তা বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ে বেশি) আবার তহবিল সংকটে অনেক এনবিএফআই বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে রি-ফাইন্যান্সিং করতে বাধ্য হয়, যা প্রচলিত আমানত হারের চেয়ে বেশি। এসব কারণে এনবিএফআইয়ের তহবিল জোগান খরচ বেশি এবং ব্যবসা বিকাশে অন্তরায়।

সম্পদ দায়ের বিনিয়োগ মেয়াদে অসামঞ্জস্যতা (অ্যাসেট-লায়াবিলিটি মিস-ম্যাস) ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খুব বড় একটি সমস্যা। এনবিএফআই অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটেড ঋণ, ব্রিজ ফাইন্যান্সিং, লিজিং বা প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মতো দীর্ঘমেয়াদি তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে ঋণ দিয়ে থাকে। অন্যদিকে তহবিল জোগানের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান খুব বেশি বৈচিত্র্যময় সুযোগ পায় না। প্রকারান্তরে এনবিএফআইয়ের বিনিয়োগ হয় তহবিল মেয়াদের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি, যা গোটা প্রতিষ্ঠানকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে।

মূলধন বাজারের (ক্যাপিটাল মার্কেট) ঝুঁকি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক বিকাশে একটি অনবদ্য ঝুঁকি বটে। বাংলাদেশে প্রচলিত মূলধন বাজারের গভীরতা ব্যাপ্তি উভয়ই স্বল্প। প্রয়োজনের সময় বন্ড অথবা শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান মূলধন বাজার থেকে যে মোটা অংকের তহবিল সংগ্রহ করবে, অনেকাংশেই তা বাস্তবিক হয়ে ওঠে না। দেশে মূলধন বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের প্রাক্কলন প্রক্ষেপণ উভয়ই ঝুঁকিপূর্ণ। নানাবিধ বিবেচনায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মতোই ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও মূলধন বাজারে আসতে ভয় পায় এবং মূলধনের অপ্রতুলতায় সীমিত পরিসরে ব্যবসা করতে বাধ্য হয়।

অন্যান্যের মধ্যে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনশক্তির অভাবও পরিলক্ষিত হয়। প্রচলিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন বাণিজ্যিক ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্ভাব্য চাকরিপ্রার্থীদের ঝোঁক একটু বেশিই দেখা যায়। আবার প্রাথমিকভাবে অনেক নবীন চাকুরে এনবিএফআইয়ে চাকরি নিলেও পরে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার কারণে খাতে মানবসম্পদের ঘাটতি থেকেই যায়।

আইনের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও বাংলাদেশে এনবিএফআইয়ের বিকাশে অন্তরায়। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর নং ধারা বলে এনবিএফআইয়ের ওপর ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এনবিএফআইয়ের জন্য আলাদা করে নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অর্ডার-১৯৮৯ জারি করা হয় এবং তারও পরে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্যাক্ট ১৯৯৩ পাস হয়, যেখানে মূল প্রতিপাদ্য ছিল এনবিএফআইয়ের বিধিবদ্ধ রিজার্ভ এবং যথাযোগ্য তারল্য নিশ্চিত করা। সময়ে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিপত্র জারি করলেও ব্যাংক অপরাপর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অসম প্রতিযোগিতা প্রশমন করে এর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি প্রশস্ততা নিশ্চিতকরণে অদ্যাবধি কোনো আইন প্রণয়ন হয়নি।

ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব সমস্যা বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করবে আশা করা যায়। সেই সঙ্গে সামাজিক জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। নিকট অতীতে এনবিএফআইয়ে ঘটে যাওয়া বেশকিছু আর্থিক দুর্নীতি খাতের প্রতি জনগণের আস্থা বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে। জনসাধারণকে আস্থায় আনার জন্য তাদের বোঝাতে হবে যে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও জনসেবায় নিয়োজিত এক একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। যত দ্রুত তা করা যায় ততই মঙ্গল।

 

. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক

আরও