আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিসরের নানা পর্যায়ে অদক্ষতা, শৈথিল্য ও জন-হয়রানি বিরাজমান। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়ে আসছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাবিষয়ক সর্বসাম্প্রতিক প্রতিবেদন তাতে বাড়তি গতি সঞ্চার করেছে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রশাসনিক অক্ষমতাকে বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়ার প্রেক্ষাপটে সরকারি প্রশাসনকে ঢেলে না সাজালে দেশে ব্যবসার জন্য অনুকূল ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়। সুতরাং বিরাজিত অন্তর্নিহিত দুর্বলতা-ত্রুটিগুলো দূরীকরণে রূপান্তরমূলক প্রশাসনিক সংস্কারের সময় এসেছে।
সত্য যে স্বাধীন হলেও প্রশাসনের ঔপনিবেশিক কাঠামোটি পরিবর্তন করা যায়নি। আমাদের এ অঞ্চলটি বিভিন্ন সময়ে নানা ঔপনিবেশিক জাতিগোষ্ঠী কর্তৃক শাসিত হলেও সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন। বণিকী বেশে এসে ব্রিটিশরা পরবর্তী সময়ে রাজক্ষমতা কুক্ষিগত করে প্রায় দুইশ বছর শাসন করে। মূলত পুঁজি লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তারা একটি নিবর্তনমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল। ঔপনিবেশিক এ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকাশিত হতো এক ধরনের দাস-মালিক সম্পর্ক। ফলে মানুষের মনে প্রশাসন মানেই একটা ভীতিকর চিত্র ভেসে উঠত। ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপে এ অঞ্চলটি ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রে ভাগ হলো। পরবর্তী সময়ে অসম কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের বহুমাত্রিক বৈষম্যের জেরে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীনতার অন্যতম প্রতিফলন হিসেবে দেশীয় ধাঁচে প্রতিটি রাষ্ট্রে একটি জনবান্ধব প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠনের প্রশ্ন থাকে। অথচ গত ৫০ বছরেও আমাদের দেশে এ ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এত বছর অতিক্রান্তের পরও এখনো অনেকটা পুরনো কাঠামোতেই চলছে দেশের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে বিষয়টি গভীরভাবে পুনর্বীক্ষণ প্রয়োজন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ১৯৭২ সালে গঠিত এক কমিটি পরের বছর সংস্কারসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করে। তাতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো ছিল—একটি একক শ্রেণীবিহীন গ্রেড-কাঠামোর আওতায় সব সরকারি চাকরিকে ১০টি গ্রেডে বিন্যাস করা; প্রশাসনের সব পর্যায়ে গণতন্ত্রায়ণ জোরদার করা; নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের এখতিয়ারে ক্ষমতা প্রত্যর্পণসহ জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা টানা। এছাড়া কমিটির সুপারিশে মহকুমাগুলোকে জেলায় রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। দুঃখজনকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর তত্পরতা, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় ব্যস্ত থাকার কারণে তত্কালীন সরকার কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ঘাতকদের হাতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নৃশংসভাবে খুন হলে সুপারিশগুলো বরং চাপা পড়ে যায়। কিছুদিন শাসনগত অদল-বদলের পর জিয়াউর রহমানের আমলে সুদৃঢ় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠনের উদ্দেশ্যে সিভিল সার্ভিস পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সামান্য পরিবর্তন-সংশোধন বাদ দিলে ওই সিভিল সার্ভিস কাঠামোই এখনো বলবৎ রয়েছে। এরপরে এরশাদের আমলে গঠিত সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশের আলোকে থানাকে উপজেলা এবং মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। সরকারের বিভিন্ন অফিস ও আদালত স্থাপনের ফলে উপজেলাগুলো প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মহকুমা জেলায় উন্নীত হওয়ায় জেলার সব সুযোগ-সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় চলে আসে। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর ছোট পরিসরে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ ছাড়া তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের তুষ্ট রাখতে ওই সব সংস্কার উদ্যোগে বেতন-ভাতা ও অন্য সুযোগ-সুবিধাসংক্রান্ত বিষয় প্রাধান্য পেলেও প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। ফলে প্রশাসনিক অদক্ষতাগুলো যেমন রয়ে গেছে, তেমনি হয়রানিমূলক ব্যবস্থারও অবসান হয়নি।
বৈশ্বিকভাবে দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটছে। ব্যক্তি খাত এখন অর্থনীতির মূল চালকে আসীন। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের নানা সমর্থনমূলক প্রচেষ্টায় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু প্রশাসনিক অদক্ষতা ও সেবাবান্ধব সংস্কৃতির অভাবে বিনিয়োগ উদ্যোগগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতির নবতর উল্লম্ফনে সুযোগগুলো কাজে লাগাতে তাই একটি জন ও সেবাবান্ধব সুদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য চাই ব্যাপকতর সংস্কার উদ্যোগ।
আমরা দেখছি যে প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে আসে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়টি। শুধু প্রশাসনিক নয়, যেকোনো ধরনের সংস্কার প্রচেষ্টা বাস্তবায়নের পেছনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার মূল চালিকাশক্তি। আগের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বলে যে প্রশাসনিক সংস্কারে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যথেষ্ট দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার অভাব রয়ে গেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর সেগুলো কমই বাস্তবায়ন করেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাঁচ বছরের স্বল্পমেয়াদি হিসাব-নিকাশ দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করায় বড় প্রশাসনিক সংস্কারের তাত্ক্ষণিক রাজনৈতিক ঝুঁকি নেয়ার সাহস করে না তারা। এছাড়া, বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থ দ্বারা রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলো আবেষ্টিত থাকে, যা সংস্কারগুলো থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিচ্যুত করার জন্য অনেকাংশে দায়ী। সরকারের সক্ষমতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত সামর্থ্য দেখাতে না পারলে সংস্কার এজেন্ডাগুলো এগিয়ে নেয়া কঠিন। প্রকৃতপক্ষে, সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। তদুপরি আছে আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ। অধিকাংশ আমলাই বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর প্রতি একটি সংরক্ষণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তারা সংস্কারকে নিজেদের পদমর্যাদা, ক্ষমতা, অবস্থানের অবনমন হিসেবে দেখে। ফলে সংগত কারণেই সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অনেক আমলার মধ্যে প্রশাসনে নিজেদের প্রভাবের ক্ষেত্র আরো সংহত করার প্রবণতা দৃশ্যমান। আন্তঃপ্রশাসনিক কোন্দল বা বিভক্তিও একটি বড় ইস্যু। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিবর্তে উপর্যুপরি সরকারগুলো আমলাতন্ত্রে বিরাজমান কোন্দলগত বিবাদ কাজে লাগিয়েছে। ফলে আমলাদের বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের স্বার্থ হাসিলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে দেন-দরবারে তত্পর থাকে। এ জায়গা থেকে যেকোনো সংস্কার কর্মসূচি ব্যাহত করতে তারা মরিয়া। আছে দুর্নীতির প্রসঙ্গও। দেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় ধরনের দুর্নীতিতে জর্জরিত। মূলত নিজেদের দুর্নীতি জিইয়ে রাখতে আমলাতন্ত্র সংস্কার চায় না। প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণও এক্ষেত্রে দায়ী। উন্নয়নশীল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে কম-বেশি থাকলেও রাজনৈতিকীকরণ এখানে আশঙ্কাজনক মাত্রায় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর একটি ভূমিকাও আছে এখানে। সহায়তানির্ভর হওয়ায় তাদের নির্দেশিত সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এ ধরনের চাপে থাকে। এটিও দেশীয় বাস্তবতা উপযোগী বড় সংস্কারের পথে বাধা। বলা চলে, উল্লিখিত বাধাগুলোর প্রেক্ষাপটে দেশে একটি ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রবল সদিচ্ছা থাকলে অন্য সব বাধা অবশ্যই ডিঙানো সম্ভব। এর প্রতিফলনই এখন জরুরি।
একুশ শতকে শুধু উন্নত নয়, উন্নয়নশীলগুলোও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। অন্য দেশগুলোর সমান্তরালে হলে এগিয়ে যেতে আমাদেরও কাজটি করতে হবে। বৈশ্বিক পরিসরে আজকাল এক্ষেত্রে দুটি অ্যাপ্রোচ নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। একটি নিউ পাবলিক ম্যানেজমেন্ট (এনপিএম) অ্যাপ্রোচ। এ অ্যাপ্রোচের সারকথা হলো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সরকারের ভূমিকা সীমিত করে সেবাগুলো ব্যক্তি খাতের দিকে স্থানান্তর। এশিয়ায় এর সফল উদাহরণ সিঙ্গাপুর। এনপিএম প্রবর্তনের ফলে দেশটিতে রাষ্ট্রীয় সেবার মানে যেমন উন্নতি ঘটেছে, তেমনি দুর্নীতি, অর্থের অপচয় কমার পাশাপাশি একটি সুদক্ষ, স্বচ্ছ-জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা পৃথিবীতে সুবিদিত। আরেকটি অ্যাপ্রোচ হলো নিউ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনপিএ)। এটি মূলত গতানুগতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা অধিক পদানুক্রম-বিরোধী আন্দোলনেরই ফল। এ অ্যাপ্রোচের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত সাড়া প্রদান, অভ্যন্তরীণ সুশাসন, নাগরিক সেবা প্রদানকে প্রশাসনের প্রধান মনোযোগে, কম স্তরায়িত সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি, অধিক নমনীয় ও স্বস্তিদায়ক প্রশাসনিক বিন্যাস, বহুশাস্ত্রীয় দক্ষতার সমন্বয় প্রভৃতি। দুঃখজনকভাবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণভাবে দেশের অর্থনীতিতে নানা পরিবর্তন ঘটলেও আমাদের এখনো ব্রিটিশ ধাঁচের অদক্ষ মাথাভারী প্রশাসন রয়ে গেছে। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো, অদক্ষতা রোধ, সেবাপ্রদানে হয়রানি এর বদল জরুরি। এক্ষেত্রে উপরোক্ত অ্যাপ্রোচ দুটি সহায়ক হতে পারে। স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা মাথায় রেখে দুটি অ্যাপ্রোচের সমন্বয়ে দেশে ব্যবসা-অনুকূল ও সেবাবান্ধব একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়া তোলার এখনই সময়। এক্ষেত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিকল্প নেই।
হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক