হামের উপসর্গসহ মৃত্যুর সংখ্যা ৪৩২ বলা হচ্ছে। হামের জটিলতা নিয়ে অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। এখন যখনই কোনো শিশু মৃত্যুবরণ করে তখন এর কারণ হিসেবে নিউমোনিয়াও রয়েছে। দেশে অপুষ্টি, দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনকি দেরিতে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতাও এ সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে। মূলত অপুষ্টি এখানে বড় সমস্যা। নবজাতকের শরীরে প্রথম ছয় মাসে হামের অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়া মায়েদের পুষ্টিহীনতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুরাও অপুষ্টিতে ভুগছে। এজন্য হামের সংকটে অনেকগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে প্রভাব ফেলছে বলে মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে বিগত সময়ে টিকাদান কর্মসূচি নানাভাবে ব্যাহত হওয়ায় সমস্যা আরো বেড়েছে। করোনা মহামারীর সময় টিকাদান কর্মসূচি ও এর সার্বিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। টিকাদান কর্মসূচির যে চিত্র সংবাদমাধ্যম কিংবা কাগজে নথিতে মেলে মাঠপর্যায়ে তার চেয়ে অনেক কম ছিল। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তো টিকাদান কর্মসূচিই করা যায়নি। ওই সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দূরদর্শীভাবে বিষয়টি সামাল দিতে পারেনি। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি নানা কারণে ক্যাম্পেইনটি চালানো যায়নি। তবে ওই সময় টিকা দেয়া হলে আজ এমন সংকটের মুখে পড়তে হতো না।
এরই মধ্যে সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় এনেছে। দ্রুত টিকাদানের জরুরি সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে শুরু করে দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ টিকা কাভারেজ স্বাস্থ্য খাতের জন্য এক বিশাল সফলতা। ১৬ মার্চ হামে আক্রান্ত হয়ে প্রথম শিশুর মৃত্যুর পর থেকেই টিকাদানের কাজ শুরু হয়। এর পেছনে সম্মিলিত শ্রম ও উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবক এমনকি সাধারণ মানুষও নিজ নিজ জায়গা থেকে সহযোগিতা করেছে। এজন্য ক্যাম্পেইনটি দ্রুত শুরু করা গেছে। এক্ষেত্রে আরেকটি সফলতা হলো প্রায় চার সপ্তাহের মধ্যে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বা তার একটু বেশি বয়সী শিশুদের টিকা দেয়া গেছে। এটিকে স্বাস্থ্য খাতের সফলতা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এমনকি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষত ইউনিসেফ সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে। গাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স সাহায্য করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়ন করেছে। ওই সময় সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক টিকার মজুদ ছিল না। পরবর্তী সময়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গাভির মালিকানাধীন টিকা দেশেই আছে। ওই সময় গাভির সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে ইউনিসেফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাভি থেকে ২১৯ লাখ ডোজ হাম ভ্যাকসিন ধার হিসেবে নেয়া হয়। এ ভ্যাকসিন আবার ফেরত দেয়া হবে এ শর্তে ধার করা হয়। গাভিকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হবে। আগামী জুন-জুলাইয়ের রুটিন ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের জন্য তারা এ টিকাগুলো মজুদ রেখেছিল। তবে জরুরি মুহূর্তে ওই টিকাগুলো দিয়েই ক্যাম্পেইনটি চালাতে হয়েছে। এডিবির অর্থায়ন ও ইউনিসেফের প্রকিউরমেন্ট এজেন্ট ভূমিকা তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ক্যাম্পেইন সফল করতে সহযোগিতা করেছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অতীতেও অনেক জটিল রোগ থেকে মুক্ত হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা পোলিওমুক্ত হয়েছি। একসময় হামও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে হামমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করার কথাও ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের পর বৈশ্বিক নানা সংকটের কারণে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গতিশীল রাখা যায়নি। করোনা মহামারীর সময় হামের প্রাদুর্ভাব বিভিন্ন দেশেই বাড়তে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৫৪টি দেশে ১৮ শতাংশ হারে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। বাংলাদেশে কেন বেড়েছে তার কারণগুলো তো শুরুতেই বলা হয়েছে। তবে শুধু সরকারের এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নেয়াই মুখ্য কারণ নয়। এদিকে ২০২৪-২৫ সালের পর ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এটি এখন সবার কাছেই স্পষ্ট। কেন হয়নি সেগুলোও বহুবার আলোচনা করা হয়েছে এবং সংবাদপত্রেও এগুলোর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তার পরও এক্ষেত্রে আরো বিশদ অনুসন্ধান জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতো তৃতীয় কোনো স্বাস্থ্য খাতের পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান যদি এ নিয়ে তদন্ত করে তাহলে বোধ হয় বেশি ভালো হয়। সংস্থাগুলোকে তথ্য বা অন্যান্য সহযোগিতার জন্য সরকার প্রস্তুত রয়েছে। এমনটি হলে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। মানুষ নিরপেক্ষ ও স্বাধীন একটি সূত্র থেকে জানতে পারবে এক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা আসলে কোথায় ছিল। এর সঙ্গে আরেকটি ইতিবাচক বিষয়ও যুক্ত হয়। এ ব্যর্থতা থেকে আমরা কী শিখতে পেরেছি আসলে? এ শিক্ষা থেকে ভবিষ্যতে এমন কোনো সংকট এড়ানোর বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা নেয়াও অনেক সহজ হবে।
হামের শতভাগ টিকা কাভারেজের পরও প্রতিনিয়ত হাম ও হামজনিত উপসর্গ নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। টিকা কাভারেজ শতভাগ নিশ্চিত হলেও ক্যাম্পেইন এখনো চলছে। গত ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া ক্যাম্পেইনটি ২০ মে শেষ হবে। এখন টিকা দেয়ার তিন-চার সপ্তাহ পর শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। সে হিসেবে ২০ এপ্রিল যে শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে তার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে ২০ মে। এ মধ্যবর্তী সময়ে অর্থাৎ চার-পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিদিন ১১০০-১২০০ শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনটিই অন্তত দেখা যাচ্ছে। তবে টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর হামে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করবে। আগামী ২০ জুন পর্যন্ত আমরা তার হার দেখতে পাব। এর পরবর্তী সময়ে আমরা হাম নিয়ন্ত্রণের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব এমন সম্ভাবনা আছে।
তবে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে অনেকের মনে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। অসচেতনতাও একটি বড় বিষয়। কারণ অনেকে প্রকৃত সময়ে চিকিৎসা নিতে আসে না। আবার এখন নিউমোনিয়া, ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। অনেকে টিকার বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা রাখেন। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এ নিয়ে আতঙ্ক অনেক বেশি। যেকোনো ভাইরাস তার গতিপ্রকৃতি মিউটেশন বা অভিযোজনের মাধ্যমে পাল্টায়। এজন্য ভাইরাসের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। করোনা মহামারীও আমাদের সে শিক্ষাই দিয়েছে। এজন্য অভিভাবকদের এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। আতঙ্কিত হলে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথও সংকুচিত হয়ে যায়। এমনকি ভোগান্তিও বাড়তে শুরু করে। কোনো শিশুর মধ্যে যদি সাধারণ হামের চেয়ে ভিন্ন কোনো উপসর্গ দেখা যায় তাহলে তা দ্রুত স্বাস্থ্য দপ্তরকে জানানো দরকার। এতে ল্যাবে তা পরীক্ষা করে বোঝা যাবে ভাইরাসটির মিউটেশন হয়েছে কিনা। হামের কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেলে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। এ মুহূর্তে হামে আক্রান্ত ৫ থেকে ৮ শতাংশ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এ শিশুদের নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তা। কিন্তু এক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার বিকল্প নেই।
হাম একটি সংক্রামক রোগ। কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে অন্যদের শরীরে যেন তা ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য হামে আক্রান্ত শিশুকে আইসোলেটেড রাখা জরুরি। তবে ওই শিশুকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। শিশুর শরীরে জ্বর বাড়তে থাকলে কিংবা শ্বাসকার্যে ব্যাঘাত ঘটলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। আবার শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়া, ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ ও মেনিনজাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিলেও কোনো ধরনের বিলম্ব না করে শিশুকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসা না দিয়ে যদি ঘরেই বসে থাকা হয় তাহলে সংকট আরো বড় আকার নেবে। একদম শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে গেলে আর কিছু করার থাকে না। হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সতর্কতা অবশ্যই জরুরি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাত, সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ রয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও এ সময় কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিতে হবে। তাহলে হাম দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার: প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী