বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বিস্তারে পতিত সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো অভাব রাখেনি। শিক্ষার প্রসারের কথা বলে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ঢাল-তলোয়ারবিহীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি দিয়েছিল তারা। গত ২ নভেম্বর এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক কমিটি ও ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের যৌথ উদ্যোগে এক জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করা হয়। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ‘যুব কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থানীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক তথ্য উঠে আসে। আয়োজনে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে বেহাল দশা তুলে ধরা হয়েছে তাতে দক্ষ জনশক্তি বা মানসম্মত শিক্ষা যে সোনার হরিণ তা নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে। দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির সরকারি প্রচার ও প্রসারের আওয়াজ যে ফাঁকা তা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা খুব ভালোভাবে বুঝে যাওয়ায় দিনে দিনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অভাব ফুটে উঠছে সরকারি বা বেসরকারি সর্বত্র।
মুক্তিযুদ্ধে যে স্বপ্ন সাধারণ জনগণ দেখেছিল তার ধারে-কাছে পৌঁছাতে আমাদের মসনদে বসা মানুষগুলো শতভাগ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের কথা ভুলে অভিজাত সমাজ সৃষ্টি করেছে। হাতে মাটির পরশ থাকা কৃষক, পোশাকে তেল কালিমাখা শ্রমিক এদের সৃষ্ট সমাজে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে চিহ্নিত। বর্তমান সমাজ একজন ঘুসখোর দুর্নীতিবাজকে যে সম্মান দিয়ে থাকে তার শতগুণ ঘৃণা করে হাতে মাটি-তেল-কালিমাখা মানুষ। অথচ সামান্য পেছনে ফিরে তাকালে যে কেউ দেখতে পাবে এসব মানুষের শ্রম-ঘামই দেশের প্রকৃত চালিকাশক্তি। এদের কাঁধে ভর করেই অভিজাত জীবন নিশ্চিত করতে সবাই ব্যস্ত। এদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতেই কৃষক শ্রমিকের জীবন এখন যন্ত্রে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে।
সামাজিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতায়ই দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। এক ভদ্রলোক পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে এসআই পদে পুলিশে চাকরি পান। কিন্তু তার বাবা এমএ পাস না করিয়ে ছেলেকে চাকরি করতে দিতে রাজি হন না। তাদের গ্রামের বেশ কয়েকজন এমএ পাস থাকায় তিনিও এমএ পাস সন্তানের গর্বিত পিতা হিসেবে নিজেকে দেখতে চেয়েছেন। পিতার ইচ্ছাপূরণে ষাটের দশকে এমএ পাস করে সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ভদ্রলোক। বাবা গর্বিত ও খুশি হলেও সন্তানের ভাগ্য আদু ভাইয়ের মতো হয়ে যায়। চাকরিজীবনে একটা মাত্র পদোন্নতি কপালে জোটে। সারা জীবন তিনি এক অতৃপ্তি নিয়ে শিক্ষকতা করে গেছেন। জানি না একজন অতৃপ্ত শিক্ষক তার ছাত্রদের জীবনে কতটুকু অবদান রাখতে পেরেছেন। অভিভাবকদের এমন মানসিকতার সুযোগ নিয়ে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা দেশ ও জাতির কল্যাণে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেননি। আর সরকারের কোনো মানবসম্পদ পরিকল্পনা না থাকার সুযোগ নিয়ে শিক্ষিত বেকার সৃষ্টির সব রকম ব্যবস্থা করে রেখেছে।
মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাবে দেশে শিক্ষার সঙ্গে কর্মের কোনো মিল নেই। একজন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে শিক্ষা নিয়ে জ্ঞান লাভ করছে আর সারা জীবন কর্মক্ষেত্রে কোথায় সেই জ্ঞানের প্রয়োগ করছে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ থাকলেও এ অবস্থা উত্তরণের কোনো বাস্তব ব্যবস্থা দেশে নেই। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী একজন প্রকৌশলী দেশ ও জাতির কল্যাণে গঙ্গা ব্যারেজ কোথায় করলে, কীভাবে করলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হওয়া যাবে তার পরিকল্পনা করবেন, ডিজাইন করবেন এবং শিক্ষক হয়ে বাস্তবায়নকারীদের শিক্ষা দেবেন। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী স্বপ্নের গঙ্গা ব্যারেজ বাস্তবায়নে মধ্যম স্তরের কারিগরি জনশক্তি হিসেবে কাজ করবেন, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের সৃষ্ট দক্ষ জনশক্তি সামগ্রিক কার্যক্রমে সেতুবন্ধ হিসেবে তত্ত্বাবধান করবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের কারিগরি কর্মক্ষেত্রের পুরো পরিবেশ ভিন্ন গতিতে চলমান। দেশের প্রকৌশলীরা মনু ব্যারাজ থেকে শিক্ষা নিয়ে তিস্তা ব্যারাজ যেমন করতে পারেননি, তেমনি গঙ্গা ব্যারাজ করতে পারবেন না। এরা যেমন যমুনা সেতু দেখে পদ্মা সেতু করতে বা লালন সেতু করতে পারেননি, তেমনি মিল-কলকারখানাও তৈরি করতে পারেননি। দেশের প্রকৌশলীদের পুরো দায়িত্বটা বিদেশনির্ভর করে গড়ে তোলা হয়েছে। আর প্রকৌশলীরা নিজেদের এক স্তর নামিয়ে বাস্তবায়নের তদারকি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। উন্নয়নের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যয় কারিগরি কর্মকাণ্ডে হয়ে থাকায় এবং এ কর্মকাণ্ডের ৯৯ শতাংশই তদারকি ও মেরামতে সীমাবদ্ধ থাকায় প্রকৌশলীরা এখানেই তাদের লাভ খুঁজে পেয়েছেন। তাই দেশের অভিজাত সমাজ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রকৌশলীরা বোধকরি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা ডিগ্রিধারী হবেন কিন্তু শিক্ষা অনুযায়ী কর্ম করবেন না। মজার বিষয় হচ্ছে, এহেন ব্যবস্থায় কোনো প্রকার সম্মানহানিও হচ্ছে না জনগণের করের টাকায় শিক্ষা গ্রহণকারী প্রকৌশলীদের।
দেশে মানবসম্পদ পরিকল্পনা করে যদি একমুখী প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা যায় তাহলেই একমাত্র বিরাজিত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। দেশ ও জাতির প্রয়োজন অনুসারে কারিগরি কর্মক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি পাওয়ার জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনা করতে হবে। তারপর সংখ্যায় নয় শিক্ষার মান উন্নয়নে বাস্তব ব্যবস্থা করা দরকার। পতিত সরকার জোর করে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে দ্বিগুণ শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করেছিল, কিন্তু তা করেছিল শিক্ষক নিয়োগ না দিয়েই। সে সময়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ঢাল-তলোয়ারবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় বিবেচনায় পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলোয় যেকোনো বয়সে, যেকোনো প্রকারে পড়া ও পাসের সুযোগ রয়েছে। কমিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষার সময়কাল। যে প্রতিষ্ঠানগুলোয় ৮০ শতাংশ শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখান থেকে মানসম্মত দক্ষ জনশক্তি প্রত্যাশা করাকে সোনার হরিণের পেছনে ছোটা ছাড়া আর কী-ইবা বলা সম্ভব?
আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক কিছুদিন আগে নিজ প্রতিষ্ঠানে ১০-১৫ জন মধ্যম স্তরের কারিগরি জনশক্তি নিয়োগের লক্ষ্যে বিজ্ঞপ্তি দেন। দুই শতাধিক আবেদন পেয়ে নিজের কাজের প্রয়োজন বিবেচনায় খুব সাধারণ কিছু প্রশ্নের ওপর পরীক্ষা নিলে দেখা যায় একজন মাত্র ৩৪ নম্বর পেয়ে পাস করেছে। ৫০ জন পরীক্ষার্থী শূন্য পেয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৪ জন আবার প্রথম বিভাগে পাস করেছে। তাই শুধু নয়, তাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশলী ডিগ্রি পাসের সার্টিফিকেটও রয়েছে। দেশের শিক্ষার মান এ পর্যায়ে থাকার পরও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব বলছেন দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা থাকলেও তারা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে সক্ষম। দেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে যদি দেশের মানুষ জর্ডানে গিয়ে কাজ করতে পারে তাহলে বাংলাদেশে কেন করতে পারবে না—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। আসলে দেশের দায়িত্ববানরা শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে পড়ে থাকেন, পেছন ফিরে দেখে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন না। তাহলে দেখতে পেতেন দেশে শিল্প, কৃষি, চিকিৎসাসহ প্রতিটি সেবায় দক্ষ জনশক্তির অভাবে বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পলিটেকনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় হাতে-কলমে শেখানোর জন্য বিএসসি পাস ট্রেনার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যে ট্রেনার নিজেই শিক্ষাজীবনে লেদ মেশিন, লেভেল মেশিন দেখেনি সে কীভাবে এই মেশিনে কাজ করতে শেখাবেন শিক্ষার্থীদের? তার ওপর চাকরি বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন নেই। অথচ দেশ দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সক্ষম বলে সব পরিসংখ্যানেই দাবি করা হচ্ছে। আর অন্যদিকে শিক্ষা ব্যবস্থার এমন বেহাল দশার কারণে কারিগরি শিক্ষায় ক্রমশ শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাধারণ জনগণের দাবি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ে রূপান্তর করা হোক। দেশের ও জাতির প্রয়োজন বিবেচনায় জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা জনগণের সামনে নিয়ে আসা হোক। মানসম্মত দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কারিগরি শিক্ষার বাজেট বৃদ্ধি করা হোক। দেশ-বিদেশের চাকরির বাজার সমীক্ষা শেষে পাঠ্যক্রম পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে আধুনিকায়ন করা হোক। শিক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে আধুনিক যন্ত্রপাতি, ব্যবহারিক কাঁচামাল, শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও শূন্যপদ পূরণ নিশ্চিত করা হোক। শিক্ষা অনুযায়ী কর্মের উদ্যোগ নেয়া হোক। সামগ্রিক বিচারে শিক্ষাকে একমুখী করা হোক।
এম আর খায়রুল উমাম: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)