স্থাপত্য ভাবনা

স্বাস্থ্যসেবার মান শুধু ওষুধে নয়, ভবনের নকশাতেও

বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভিত্তি হলো কমিউনিটি ক্লিনিক। দেশের লাখো মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃসেবা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার জন্য এসব ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু একটি প্রশ্ন খুব কমই আলোচনায় আসে—যে পরিবেশে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, সেই পরিবেশ কতটা স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও আরামদায়ক?

আমাদের (ড. সজল চৌধুরী, রিজওয়ানা ইসলাম, সজিব পাল এবং রাদিয়া নিজাম পরিচালিত) একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলিত বিষয় সামনে এনেছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের গবেষকদের পরিচালিত এ গবেষণার শিরোনাম ‘User Perceptions of Environmental Design in Community Clinics: Evidence from Chattogram, Bangladesh’। গবেষণাটি ২০২৫ সালে সম্পন্ন হয় এবং এর ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পিয়ার-রিভিউড গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশ হয়েছে।

এ গবেষণায় চট্টগ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিবেশগত নকশা, ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মানের ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে উঠে এসেছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণাটি দেখায় যে ক্লিনিকের ভবন, আলো-বাতাস, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্থান বিন্যাস সরাসরি রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক কমিউনিটি ক্লিনিকে এখন পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই। ফলে গরমের সময় কক্ষগুলো অসহনীয় গরম হয়ে ওঠে, আবার শীতকালে পর্যাপ্ত সূর্যালোকের অভাবে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বাধ্য হয়ে দরজা-জানালা বন্ধ রাখেন। কারণ বাইরে থেকে ধুলাবালি, দুর্গন্ধ বা পোকামাকড় প্রবেশ করে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও নদী-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত কিছু ক্লিনিকে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রভাব দেখা যায়। কোথাও জোয়ারের পানি ক্লিনিকে ঢুকে পড়ে, কোথাও ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, কোথাও ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। এর ফলে শুধু অবকাঠামোর ক্ষতিই হয় না, চিকিৎসা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা। অনেক ক্লিনিকে সীমানা প্রাচীর না থাকায় নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করেন না। কিছু স্থানে সাপ, ইঁদুর বা অন্যান্য প্রাণী ভবনের ফাটল ও ভাঙা ভেন্টিলেটর দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এসব সমস্যা স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি মানসিক চাপ তৈরি করে। স্থান সংকটও একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্লিনিকে অপেক্ষমাণ রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা নেই। চিকিৎসা কক্ষ, ওষুধ সংরক্ষণের স্থান এবং টিকাদান কার্যক্রম একই কক্ষে পরিচালিত হয়। ফলে রোগীর গোপনীয়তা নষ্ট হয় এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানে বিঘ্ন ঘটে। কোথাও কোথাও চিকিৎসাসামগ্রী বিছানা বা মেঝেতে সংরক্ষণ করতে দেখা গেছে, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

গবেষণাটি শুধু সমস্যার চিত্র তুলে ধরে না; কিছু ইতিবাচক উদাহরণও সামনে এনেছে। যেসব ক্লিনিকে উঁচু মেঝে, বড় জানালা, খোলামেলা বারান্দা এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রয়েছে, সেসব স্থানে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা তুলনামূলক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ, গাছপালা ও ছায়াযুক্ত খোলা স্থান মানুষের মানসিক প্রশান্তি বাড়ায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অনেক স্বাস্থ্যকর্মী মনে করেন, ক্লিনিকের চারপাশে গাছ লাগানো হলে শুধু সৌন্দর্যই বাড়বে না, গরমও কমবে। একই সঙ্গে রোগী ও স্বজনদের জন্য আরামদায়ক অপেক্ষার স্থান তৈরি করা সম্ভব হবে। কোথাও শিশুদের জন্য ছোট খেলার জায়গা, কোথাও মায়েদের জন্য আলাদা স্তন্যদান কক্ষের প্রস্তাব এসেছে।

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—স্বাস্থ্যসেবা শুধু ডাক্তার, নার্স বা ওষুধের ওপর নির্ভরশীল নয়; ভবনের নকশা ও পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি অন্ধকার, গরম, স্যাঁতসেঁতে ও অনিরাপদ পরিবেশ রোগীর মানসিক চাপ বাড়ায় এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের দক্ষতা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে একটি পরিচ্ছন্ন, আলোকিত ও বায়ু চলাচলসমৃদ্ধ পরিবেশ স্বাস্থ্যসেবাকে আরো কার্যকর ও মানবিক করে তোলে।

বাংলাদেশ সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এখন সময় এসেছে এ ক্লিনিকগুলোর পরিবেশগত মানোন্নয়নের দিকে আরো গুরুত্ব দেয়ার। নতুন ক্লিনিক নির্মাণ বা পুরনো ক্লিনিক সংস্কারের সময় স্থানীয় জলবায়ু, বন্যা ঝুঁকি, প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ, সাংস্কৃতিক চাহিদা এবং ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু-সহনশীল নকশা, উন্নত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো, নিরাপদ সীমানা প্রাচীর, উন্নত স্যানিটেশন ও সবুজায়ন—এ কয়েকটি পদক্ষেপ কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিবেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে। গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরো কার্যকর ও মানবিক করতে হলে শুধু চিকিৎসা সরঞ্জাম নয়, চিকিৎসার পরিবেশের গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সুস্থতার পথ শুরু হয় একটি নিরাপদ, আরামদায়ক ও সম্মানজনক পরিবেশ থেকে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের সেই বাস্তবতাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু চিকিৎসা প্রযুক্তি বা চিকিৎসা কর্মীর দক্ষতা নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা ভবনের পরিবেশগত নকশাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষত উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ু বিশিষ্ট অঞ্চলে অবস্থিত ক্ষুদ্র-পরিসরের স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনা—যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক, গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র, মাতৃসদন কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট—এসব প্রতিষ্ঠানের নকশাগত গুণমান সরাসরি ব্যবহারকারীদের শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য, মানসিক সুস্থতা এবং স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ দেশ উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ুর অন্তর্ভুক্ত। এ জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ তাপমাত্রা, অধিক আর্দ্রতা, মৌসুমি ভারি বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল। ফলে স্বাস্থ্যসেবা ভবনের নকশায় তাপীয় আরাম (থার্মাল কমফোর্ট), প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত দিবালোকের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা না করা হয়, তবে ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে এবং রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী উভয়ের জন্যই নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। পরিবেশগত নকশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল। উষ্ণ-আর্দ্র অঞ্চলে ক্রস-ভেন্টিলেশনভিত্তিক নকশা ভবনের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এবং বদ্ধ পরিবেশের অস্বস্তি কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। যথাযথ স্থানে জানালা, ভেন্টিলেটর ও খোলা বারান্দা পরিকল্পনা করলে বায়ু প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং যান্ত্রিক শীতলীকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমে। একই সঙ্গে সংক্রামক রোগের বিস্তার কমাতে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সর্বোপরি, উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ুতে ক্ষুদ্র পরিসরের স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনার পরিবেশগত নকশা কেবল স্থাপত্যিক নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, ব্যবহারকারীর সুস্থতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। জলবায়ু-সংবেদনশীল, ব্যবহারকারীকেন্দ্রিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত নকশা স্বাস্থ্যসেবা ভবনকে আরো কার্যকর, টেকসই ও মানবিক করে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত নকশাকে একটি মৌলিক পরিকল্পনা গত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা সময়ের দাবি।

ড. সজল চৌধুরী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এবং ভবন পরিবেশ, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক

আরও