বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্য দূর করার কাজ খুব জরুরি, আর এটা অনেক কঠিন। ১৯৯০-এর পর থেকে বিগত কয়েক দশকে দরিদ্র পরিবারের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু অপশাসনের সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেক সমস্যা আবার আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে। পতিত সরকারের ভ্রান্তনীতি, কুশাসন আর সীমাহীন দুর্নীতির সঙ্গে করোনা মহামারী, বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধি আর মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭, আর ৫ শতাংশ জনগণের অবস্থান ছিল চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে (মানে প্রতিদিন তাদের আয় ২ দশমিক ১৫ ডলারেরও কম)। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে এ চরম দারিদ্র্য হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে, যার অর্থ আরো প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে। দারিদ্র্যের এ উচ্চহারের বহুবিধ কারণ রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো হঠাৎ করে চাকরি হারানো, একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু অথবা কঠিন রোগে ভোগা, আর সর্বোপরি খাদ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি।
গণতন্ত্রকামী সব দলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের জন্য ৩১ দফার একটা বড় পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সেখানে বলা হচ্ছে, শুধু আয় কম থাকলেই কেউ দরিদ্র হয় না—দারিদ্র্যের পেছনে অনেক গভীর কারণ থাকে। যেমন দুর্নীতি, এককেন্দ্রিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আর সবাইকে অর্থনীতিতে সমভাবে অংশগ্রহণ করতে না দেয়া। এ পরিকল্পনায় বিএনপি বলছে, প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে দেশকে নতুনভাবে গঠন করতে হবে এবং দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। এর জন্য দরকার: স্থানীয় সরকারকে ঢেলে সাজিয়ে স্থানীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত করা ও অধিক ক্ষমতা দেয়া, শাসনে জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা, আর গ্রাম-শহরের নারী-যুবকসহ সবাইকে নিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বিএনপি বিশ্বাস করে, স্থানীয় সরকারকে অর্থ ও প্রশাসনের ক্ষমতা দিলে তারা দরিদ্র মানুষদের ভালোভাবে চিনে তাদের যুগোপযোগী সেবা দিতে পারবে। এখন যেভাবে কিছু ক্ষমতাবান লোক সব সুযোগ দখল করে রাখে, তা দূর হবে। কারণ তারা গণবিচ্ছিন্নতার কারণে দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ তহবিল নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমাতে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে দুর্নীতির কারণে। বিদেশী দাতারা অনেক প্রকল্পে টাকা দিলেও ভুলভাবে চালানো, অপরিপক্বতা, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবস্থার কারণে সে প্রকল্পগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। দুর্নীতি রুখতে স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী কমিশন, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার আর স্বচ্ছ নজরদারি ব্যবস্থা গড়া দরকার—যেন দারিদ্র্য কমানোর জন্য যে টাকা বরাদ্দ হয়, সেটা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছেই পৌঁছে। না হলে প্রকল্পগুলো দুর্বল আর ফাঁকফোকর ভরা থেকে যায়। তখন এসব উদ্যোগ আসলে দরিদ্রদের জন্য সহায়তা নয়, বরং কিছু প্রভাবশালীর সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
দারিদ্র্য থেকে মানুষকে টেকসইভাবে বের করতে হলে চাকরি আর আয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় সহায়তা দিতে হবে, কৃষি খাতকে আধুনিক করতে হবে, গ্রামীণ এলাকায় ছোট শিল্প গড়তে হবে, আর দরিদ্র মানুষদের কাজের উপযোগী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া ৩১ দফার কাঠামোর আলোকে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিএনপি একটি নতুন সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা চালু করতে চায়—‘পরিবারভিত্তিক ইলেকট্রনিক কার্ড’। প্রতিটি দরিদ্র পরিবার (চারজনের সমান ধরে) এ কার্ড পেলে তারা নিকটবর্তী নির্দিষ্ট দোকান থেকে কম দামে বা বিনা দামে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করতে পারবে। ফলে পরিবারগুলোর খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, খাদ্যদ্রব্য কেনার খরচ কমবে। ফলে প্রতি মাসে পরিবারটির কিছু টাকা সঞ্চয় হবে। এ সঞ্চয় দিয়ে তারা প্রোডাক্টিভ অ্যাসেট বাড়াতে পারবে এবং ছোট ব্যবসা শুরু করতে পারবে। এ প্রক্রিয়ায় পরিবারটি ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে। এতে শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর না করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ তৈরি হবে। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রামীণ অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে গ্রামীণ পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দারিদ্র্যের বেড়াজালের মধ্যে আর না পড়ে।
বর্তমান সরকারের দেয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট মূলত প্রায় আগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য এ বাজেটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলন নেই। তারা শুধু বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৯৫ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু ভাতা (বয়স ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা) একটু বাড়ানো হয়েছে, আর কিছু নতুন মানুষকে সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। তবে এ ব্যবস্থাগুলো এখনো আগের মতোই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাভিত্তিক, কাগজপত্রনির্ভর, আর অনেক ধরনের জটিলতা ও দুর্নীতির মধ্যেই আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু টাকা দিয়ে কিছু মানুষকে সাহায্য করবে কিন্তু দরিদ্র মানুষকে স্বনির্ভর করার পথ দেখাবে না। অথবা কাজ শেখানো, শিক্ষা-চিকিৎসা সুবিধা দেয়া বা ব্যবসার সুযোগ তৈরির মতো কিছু করবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো বর্তমান মূল্যস্ফীতির কারণে ভাতায় পাওয়া টাকা খুব একটা প্রয়োজন মেটাবে না। টাকার পরিমাণের বিপরীতে পাল্লা দিয়ে জিনিসের দাম আরো বেশি বাড়ছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো আগের ধারাবাহিকতায় খাবার, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা পেতে হিমশিম খাবে।
যেকোনো সরকার দারিদ্র্য কমাতে চাইলে অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে সরকারের রাজস্ব আয় তুলনামূলকভাবে খুব কম—জিডিপির মাত্র ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশের মতো আসে কর থেকে। এর কারণ—কর ফাঁকি, কর আদায়ে দুর্বলতা এবং রাজস্ব বোর্ডের সীমিত ক্ষমতা। সরকার প্রতি বছর অনেক টাকা দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ করে। আবার অবকাঠামো, ভর্তুকি আর ঋণ পরিশোধেও প্রতি বছর অনেক টাকা খরচ করে। ফলে গরিব মানুষের জন্য যে প্রকল্প দরকার, সেগুলো করার মতো বাজেট দেয়ার মতো অর্থ থাকে না। এ ব্যবস্থা নিরসনের জন্য দরকার কর ব্যবস্থার সংস্কার, আয় রাজস্বের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য সঠিক পরিকল্পনা এবং অর্থ খরচের ক্ষেত্রে দক্ষতা আর স্বচ্ছতা। এছাড়া বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর আরো কিছু বড় ধরনের সমস্যা আছে—একাধিক মন্ত্রণালয়ের ওভারল্যাপিং দায়িত্ব, কারা ভাতা পাবে সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজ নেই, সেই সঙ্গে সুবিধাভোগী পরিবার বাছাইয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। ফলে অনেকে প্রকৃত দরিদ্র হয়েও বাদ পড়ে যায়, আর এ সুযোগে প্রভাবশালী লোকজন সুবিধা নিয়ে নেয়।
বিএনপি একটি প্রযুক্তিভিত্তিক জাতীয় সামাজিক রেজিস্ট্রি গঠনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যার তদারকি করবে স্বাধীন অডিট প্রতিষ্ঠান। এতে প্রকৃত গরিবদের খুঁজে বের করে তাদের উপযুক্ত সহায়তা দেয়া যাবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়ানো হবে, যাতে তারা নিজের এলাকার মানুষকে শনাক্ত করে দ্রুত ও যথাযথ সেবা দেয়ার সক্ষমতা রাখে।
সবশেষে বলা যায়, শুধু ভাতা বা সহায়তার পরিমাণ একটু বাড়ালেই চরম দারিদ্র্য কমবে না। বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা পরিকল্পনা জাতীয় উন্নয়নের একটি রূপরেখা, যেখানে কাঠামোগত সংস্কার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি আর সবার জন্য উন্নয়ন নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় আছে। বর্তমান সরকারের বাজেট হয়তো কিছু সময়ের জন্য সাময়িক সাহায্য দেবে, কিন্তু সেটি দারিদ্র্যের মূল কারণ দূর করবে না। যদি আমরা আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করি, প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের গুণগত মান বাড়াই আর দরিদ্র মানুষদের ক্ষমতায়ন করি তবে এসব উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্য দূর করতে পারবে। বিএনপির কাঠামোগত পরিকল্পনাকে স্বল্পমেয়াদি সহায়তার সঙ্গে একত্র করে যদি একটি সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই চরম দারিদ্র্যমুক্ত, ন্যায্য ও অংশগ্রহণমূলক একটি সমাজে পরিণত হতে পারবে।
ড. জিয়াউদ্দীন হায়দার: বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা