ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের গভর্নরের স্মৃতিকথা পাঠ পর্যালোচনা

এ বইয়ের প্রতিটি চ্যাপ্টারই পাঠের জন্যে অত্যন্ত আকষর্ণীয়। অনেক তথ্যসংবলিত যা গবেষণার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট প্রয়োজনীয়। ‘চাকরির শুরু ও পাকিস্তান ত্যাগ’ অংশে তিনি তার চাকরির ব্যাপক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি অর্থনীতি বিভাগে ‘প্রভাষক পদে’ যোগদান করেন। এর আগে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যোগদানের নিয়োগপত্রও পান তিনি।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশের গুণী মানুষের একজন। সম্প্রতি বাজারে আসা ‘গভর্নরের স্মৃতিকথা’ বইটি সত্যিই এক অনন্য প্রকাশনা। বইটির শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে তিনি শুধু গভর্নর থাকাকালীন স্মৃতির কথা বলেছেন। তা নয়। এতে তার পারিবারিক ও পেশাজীবনসহ দেশের অনেক ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে যা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। বইটিতে শুধু তার নিজের সম্পর্কেই নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলিও তুলে এনেছেন সহজ ও সাবলীল ভাষায়।

লেখক তার স্মৃতিকথায় পিতা সম্পর্কে লিখেছেন যে তিনি গ্রামের জায়গা-জমি বিক্রি করে আমাদের পড়ালেখার খরচ জুগিয়েছেন। আব্বা বলতেন, ‘জমি-জায়গা দিয়ে কী হবে, সন্তানরা যদি শিক্ষিত না হয়?’ তখনকার অভিভাবকদের চিন্তাভাবনা ছিল সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা দিতে হবে। এখনকার অধিকাংশ অভিভাবককে দেখা যায় টাকার পেছনে ছুটতে। শিশু বয়সে তিনি পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের জগাবাবুর পাঠশালার ছাত্র ছিলেন। তার নিজের ভাষায় জগদীশ বাবুর স্কুলে আমি অমনোযোগী ছাত্র ছিলাম। অংকে ফেল করেছিলাম। অংক পরীক্ষায় আমি পেয়েছিলাম ২২। অবশ্য ২ ঘণ্টার পরীক্ষা ১৫ মিনিট দিয়েই বেরিয়ে আসি।

বইটিতে পাতলা খান লেনের স্মৃতি অধ্যায়ে তিনি তখনকার ঢাকার অবস্থা তুলে ধরেছেন। সে সময় পান করার পানি আনা হতো মিউনিসিপ্যালিটির কল থেকে। বেশ কয়েকটি কলে নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত পানি সরবরাহ করা হতো। শিক্ষাজীবন অধ্যায়ে লিখেছেন—‘আমি নিজে প্রাইভেট পড়িনি, ওই সময় অন্যদেরও প্রাইভেট পড়তে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। স্যাররা ক্লাসে এমনভাবে পড়াতেন যে বাড়িতে গিয়ে কারো আর সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন হতো না।’ তখন শিক্ষকরা নিজ দায়িত্ববোধ থেকেই পড়াতেন। এখন বাণিজ্যের অংশ হয়ে গেছে শিক্ষা। বেতনের বাইরে টিউশনি করে টাকা উপার্জনের দিকেই শিক্ষকরা ঝুঁকে পড়েছেন বেশি। মাত্র দুই লাইনেই তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একাল সেকাল তুলে ধরেছেন। তিনি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৬৩ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ঢাকা কলেজে পড়াকালীন তিনি ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগেই। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল ও বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পেলেও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। তার এ সিদ্ধান্তেই দেশ একজন বড় মাপের অর্থনীতিবিদকে পেয়েছে।

বইয়ের ‘আন্দোলন ও রাজনীতিতে অংশ নেয়া’ অংশটি অত্যন্ত বড় গুরুত্বপূর্ণ। এ অংশে তৎকালীন ছাত্ররাজনীতি, আন্দোলন, মিছিলসহ শহীদ আসাদের ঘটনা ও শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কবিতার কথাও বলা হয়েছে, এ অংশে এনএসএফের গুণ্ডা পাচপাত্তুরদের সন্ত্রাসী কাহিনী উঠে এসেছে। ১৯৬৯-এ আসাদ পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার পর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। আইয়ুব খান আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পান। লেখক উল্লেখ করেছেন, ‘নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যায়। এর পেছনে ছিল দলের পক্ষ থেকে দেয়া পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিসংবলিত ছয় দফা। সর্বস্তরের বাঙালি তখন শেখ মুজিবুর রহমানকে পছন্দ করত। তিনি সে সময় বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। এ থেকে দেখা যায়, ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি নির্মোহ।

১৯৭০ সালে লিগ্যাল ফ্রেমওর্য়াক অর্ডারের অধীনে (এলএফও) নির্বাচন দেয়া হলো। ভাসানী বলেছিলেন নির্বাচন বর্জন করতে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বামপন্থীদের আন্দোলনের ফসলও আওয়ামী লীগের ঘরে উঠতে থাকে। আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এলেন। তিনি আরো লিখেছেন ‘শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতেন। আর বামপন্থীরা পরামর্শ করতেই দিনের পর দিন অতিবাহিত করেছেন।’ নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিভা ছিল অসাধারণ। অন্যের আন্দোলনের সুফল কীভাবে নিজের পক্ষে নিতে হয় তা তার ভালোভাবে জানা ছিল। একদমই যথার্থ বিশ্লেষণ। শেখ মুজিবুর রহমান জাতির নেতৃত্ব দেবেন, এটি ভাসানীও বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে অনেক পরামর্শও দিয়েছেন।

এ বইয়ের প্রতিটি চ্যাপ্টারই পাঠের জন্যে অত্যন্ত আকষর্ণীয়। অনেক তথ্যসংবলিত যা গবেষণার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট প্রয়োজনীয়। ‘চাকরির শুরু ও পাকিস্তান ত্যাগ’ অংশে তিনি তার চাকরির ব্যাপক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি অর্থনীতি বিভাগে ‘প্রভাষক পদে’ যোগদান করেন। এর আগে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যোগদানের নিয়োগপত্রও পান তিনি। পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের করাচি অফিসে যোগদানের আমন্ত্রণ পান। সেখানে বেতন ১ হাজার ৪০০ টাকা। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে বেতন ৪৫০ টাকা। তিনি লিখেছেন আমার সিএসপি হওয়ার ইচ্ছা ছিল। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে সিএসপি পরীক্ষা দিলাম এবং সিএসপি অফিসার হিসেবে ১৯৭১ সালে লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য যোগ দিলাম। সেবার পাকিস্তানের দুই অংশ মিলিয়ে ২১ জনকে নেয়া হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি ১২ জন আর বাঙালি ছিলাম ৯ জন। প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের লাহোরে পাঠানো হলো। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমাদের অপশন দেয়া হয়। আমরা কি বাংলাদেশে যাব নাকি পাকিস্তানে থাকব? আমরা বাংলাদেশকেই বেছে নিই। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের চাকরিচ্যুত করা হলো। তখনই আমরা পালিয়ে আসার চিন্তা করি। পালিয়ে আসার বর্ণনা পড়ে পাঠক চিত্তে কখনো কখনো ভয় ও আতঙ্ক জাগে। সত্যিই ভীষণ কঠিন ও দুর্গম ছিল সেই যাত্রা।

দেশে ফিরে ১৯৭২-এর ডিসেম্বরে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৭৩ সালের আগস্টের শেষ দিকে স্কলারশিপ নিয়ে কানাডায় চলে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে সেশন শুরু। আগস্টে যেতে বলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ছুটির আবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠায়। তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং অধ্যাপক ইউসুফ আলী শিক্ষামন্ত্রী। সে সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তেমন ছিল না। দ্রুত চূড়ান্ত অনুমোদন পান। সে সময় দেশে ডলার সংকট থাকায় বিদেশ ভ্রমণের জন্য পথ খরচ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র ২০ ডলার দেয়ার অনুমতি দেয়া হলো। তিনি যখন টরন্টো বিমানবন্দরে নামেন তখন তার পকেটে ছিল মাত্র ১০ ডলার। বাস ভাড়া ৫ ডলার ব্যয় হওয়ার পর তার কাছে থাকে মাত্র ৫ ডলার। ট্যাক্সি ভাড়া ৩ ডলার পরিশোধের পর মাত্র ২ ডলার ছিল।

‘মাটি ও মানুষের কাছে’—এ অংশটি তার পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর স্মৃতি। তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বশেষ সিএসপি অফিসার হিসেবে তিনি প্রথমে ঢাকার সহকারী কমিশনার এবং পরে ১৯৭৯ সালে পিরোজপুর মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব পান। পিরোজপুরে তিনি একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে এসেছেন। তিনি যে বাড়িটিতে থাকতেন তা ভেঙে পরবর্তী সময়ে নতুন বিল্ডিং করা হয়েছে। তিনি দুঃখ করে লিখেছেন যে পিরোজপুরের মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখতে গেলে লাল ভবনটির কথা আসবেই। কিন্তু তা সংরক্ষণ করা হয়নি।

তিনি লিখেছেন, ‘তখন মহকুমা প্রশাসকরা অনেক ক্ষমতাধর ছিলেন। এখন তো জেলা প্রশাসকরাও অনেকে দলের প্রভাবে কাজ করেন। তখন এ চর্চা ছিল না।’ এর মাধ্যমে এটি সুস্পষ্ট যে প্রশাসন চলত নিজের আইনে। মহকুমা কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভায় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত থাকতেন, কিন্তু প্রশাসনের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না।

একবার এক দুর্ঘটনার স্মৃতি তুলে ধরেছেন তিনি। ঝড়ের গতি বাড়ায় স্পিডবোট তীরে ভেড়ার পর একটি বাড়িতে গিয়ে উঠেছেন। গোলপাতার ছাউনি দিয়ে বানানো কুঁড়েঘর। একই ঘরে গরু ছাগলসহ মানুষের বাস। এমন মানবেতর জীবন আগে কখনো দেখেননি। নিজের পরিচয় দিলেন। তাকে যে বসতে দেবেন, সে রকম জায়গাও নেই। তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, এই যে আমরা এত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছি তার সুফল কি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে? তিনি নিজেই উপলব্ধি করেছেন—উন্নয়ন যা হয়েছে তা সুষমভাবে হয়নি। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়ার খাল খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেছেন। খাল কাটার উদ্দেশ্যটা মহৎ ছিল এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের প্রয়োজন হতো না। খালগুলো চালু থাকলে যাতায়াত ব্যবস্থাও সহজ ও সুলভ হতো। মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বলেই তার এ মূল্যায়ন।

তিনি লিখেছেন, জনপ্রশাসন দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের। সাধারণ মানুষের করের টাকায় তারা বেতন পান। সেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত দেখাবে কেন?

তিনি উল্লেখ করেছেন, সেই সময় মন্ত্রীরা সরকারি সফরে এলে প্রশাসনের নির্বাহীরা সরকারি কার্যক্রমে অংশ নিতেন। কিন্তু রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতেন না। আর এখন জেলা প্রশাসকদেরও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তাদের কি কেউ বাধ্য করে? কেউ কেউ দেখি বক্তৃতাও করেন। এ ব্যাপারে তাদের মনে কি কোনো প্রশ্ন জাগে না? তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রশাসনের দলীয়করণের ক্ষেত্রে তারা নিজেরাও দায়ী।

‘থ্যাংক ইউ আবেদ ভাই’ অংশে তিনি স্যার ফজলে হাসান আবেদ ভাইয়ের কিছু স্মৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানে যোগদান প্রসঙ্গে ফজলে হাসান আবেদ উল্লেখ করেছিলেন, আমিই তার প্রথম পিএইচডি ডিগ্রিধারী নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি লিখেছেন, তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা যেখানে শোষণ থাকবে না। তিনি নারীর ক্ষমতায়নে গভীর বিশ্বাস রাখতেন।

১৯৭২ সালে ব্র্যাকের সূচনা হয়েছিল একটি ছোট একমাত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেটি ১৫-২০ বছরের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হয়ে দেশের ৫০ শতাংশ মানুষকে মূলধারায় নিয়ে এসেছে। ব্র্যাক এখন বিদেশেও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ বইয়ে তার সর্বশেষ বিষয় হচ্ছে, ‘জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে বাদ দিয়ে দেশ নয়’। এ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘অনেকেই রাজনৈতিক বক্তব্যে দেশের স্বার্থে সবকিছু করার কথা বলেন। মনে রাখতে হবে, দেশ মানে মানুষ, মানুষের স্বার্থে কাজ করলে দেশের স্বার্থে কাজ করা হয়। মানুষকে বাদ দিয়ে দেশ নয়।’

এ স্মৃতিকথায় ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের একাধিক সাক্ষাৎকারসহ তার পারিবারিক ও পেশাজীবনের বেশকিছু ছবি বইটিকে আরো ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেছেন: অধিকাংশ শিক্ষক ছাত্রদের উসকানি দেয়, ছাত্রনেতাদের কাছে পোস্টিংয়ের জন্য তদবির করে। আমাদের সময়ে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ইসলামী ছাত্র সংঘ ছিল, আর এনএসএফ ছিল সরকারি। কেউ তো বলত না যে কাউকে হলে ঢুকতে দেবে না। সবাই ছিল হলে। একটা সহাবস্থান ছিল।

পরিশেষে বলব, গভর্নরের স্মৃতিকথা শুধু সুপাঠ্যই নয়, এটা এ দেশের সমাজ-জীবন, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হয়ে থাকবে। গবেষকরাও গবেষণাকাজে রেফারেন্স হিসেবে অনেক কিছুই এখান থেকে নিতে পারবেন।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাহেব যেমন অহংকারহীন এক সাধাসিধে আলোকিত মানুষ, তার লেখা গভর্নরের স্মৃতিও তাই। লেখককে এমন একটি বই উপহার দেয়ার জন্য পাঠক হিসেবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

পুনঃশ্চ: আপনি একজন প্রকৃত সৌভাগ্যবান অর্থনীতিবিদ। যিনি মাইক্রো থেকে ম্যাক্রো অর্থনীতির সমগ্র বিষয় নিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নিজে এর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূতিকাগার কুমিল্লা বার্ড এবং এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক, পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং সর্বশেষ দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার, নীতিনির্ধারণের বিরল সুযোগ আপনার হয়েছে। এছাড়া এমআরএ প্রতিষ্ঠা এবং এর প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন আপনার হাতেই হয়েছে। কাজেই পাঠক হিসেবে দাবি থাকবে এসব কাজের বিশদ বর্ণনা এবং নীতিনির্ধারণের কৌশল ইত্যাদির আদি বৃত্তান্ত আমাদের জানানোর—এসব বিষয় নিয়েও আরো একটি গ্রন্থ প্রত্যাশা করছি।

মো. মোশাররফ হোসেন: পরিচালক (অর্থ), বুরো বাংলাদেশ

আরও