চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন

অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাঠামো এবং কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে রূপান্তরকাল (ট্রানজিশন) পার করছে। এটি নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। তবে রূপান্তর বিষয়টা খুব সহজ নয়। আমরা পরবর্তী পর্যায়ে কোথায় যাব তা নিয়ে আলোকপাত করা দরকার।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে রূপান্তরকাল (ট্রানজিশন) পার করছে। এটি নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। তবে রূপান্তর বিষয়টা খুব সহজ নয়। আমরা পরবর্তী পর্যায়ে কোথায় যাব তা নিয়ে আলোকপাত করা দরকার। আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কৌশল (স্ট্র্যাটেজি) হতে হবে আমরা যেন আগের অবস্থানে ফেরত না যাই। অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে গেলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কৌশল হচ্ছে ‘চোর’ ধরা যন্ত্র। অর্থনীতি অবশ্যই আস্থার ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। অর্থনীতি, ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য এগুলোর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে। পূর্ণ আস্থা না থাকলে অর্থনীতি সহজে ঘুরে দাঁড়াবে না।

অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। প্রথমত আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কাঠামোয়। দেশে বিপুলসংখ্যক নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রম তদারকি বা তাদেরকে দায়বদ্ধ করার মতো কোনো উপায় একেবারেই নেই। একজন শিক্ষক হিসেবে বলব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক না। ইউজিসির দায়বদ্ধতা কে নিশ্চিত করবে? তাই আস্থা ফেরানো এবং পরিবর্তনের অংশ ‍হিসেবে প্রতিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা খুবই জরুরি। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও এটি প্রয়োজন।

খেয়াল করলে দেখবেন, একটি বেসরকারি খাত জমি ভরাট করলে তা দোষের হয়। কিন্তু রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যখন একই কাজ করে তখন কি পরিবেশের ক্ষতি কম হয়? তা না। সুতরাং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যেন স্বচ্ছ হয় সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ইনসেনটিভ মেকানিজম—আমরা জানি যে আমাদের ট্যাক্স জিডিপি রেশিও খুবই কম। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি এখন সাড়ে চারশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আমরা প্রত্যাশা করছি, ২০৩৫ সালে এ অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। এমন একটি অর্থনীতি যদি প্রত্যাশা করি, তার পেছনে কিছু পরিবর্তন দরকার। মনে রাখতে হবে ২০২৪ সালে আমাদের আন্দোলনের মূল কারণ ছিল কর্মসংস্থান। আমাদের অর্থনীতির যে প্রবৃদ্ধি ছিল তা ছিল কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। সুতরাং কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিন্তু কৌশলের প্রধান উপজীব্য হতে হবে। এখানে একটি বিষয় খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোয় (ইপিজেড) একটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে কিন্তু ১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা লাগে। তার মানে হচ্ছে বড় শিল্পগুলোয় খুব বেশি কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এজন্য বড় শিল্পগুলোর সঙ্গে ছোটগুলোর সংযোগ স্থাপনে পলিসিগত পরিবর্তন আনা দরকার। এসব বিষয় আমাদের জানা। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছি না।

এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরেকটি উদাহরণ দিই। আমার পরিচিত একজন হঠাৎ করে ১০ বছর আগের গ্যাস বিল পেয়েছেন। তিতাস কর্তৃপক্ষ বলেছে, তিনি ১০ বছর আগে থেকে গ্যাস বিল পরিশোধ করেননি। তিনি তথ্যপ্রমাণসহ তিতাসে গিয়ে জানিয়েছেন যে গত ১০ বছরের গ্যাস বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিতাসের ভাষ্য ছিল, গ্যাস বিল পরিশোধ করা হলেও ব্যাংক তাদেরকে দেয়নি। তাই তাকে পুনরায় গ্যাস বিল পরিশোধ করতে বলে। এমন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় অর্থনীতিকে গতিশীল করা খুবই কঠিন কাজ। কারো দায়বদ্ধতা নেই। দুঃখজনকভাবে দেশের সরকারি সংস্থাগুলো এখনো সেই দায়বদ্ধ হওয়ার মতো রূপান্তরের মুখোমুখি হয়নি। কিন্তু অর্থনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে তাদের দায়বদ্ধ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।

এর আরেকটি উদাহরণ হলো রাজউক। সম্প্রতি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাড়ির মালিকের কাছে বাড়ি বানানোর কাগজপত্র আছে কিনা যাচাই করতে দেখা গেছে। কিন্তু সেসব নথিপত্র কি রাজউকের কাছে নেই? রাজউকই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। তাহলে তার কাছে কেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে না? রাজউক কেন দায়বদ্ধ হচ্ছে না? এসব কারণে ভুল দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এতে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যাচ্ছে। আমরা আস্থাভিত্তিক অর্থনীতিতে যেতে চাইলে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্রিটিশ শাসনামলে এ দেশে যখন জমিদারি প্রথা চালু হয়েছিল তখন জমিদাররা সরকারের পক্ষে কর আদায় করত। ব্রিটিশ সরকার কি চেয়েছিল? তারা এমন কিছু লোক চেয়েছিল যারা কর আদায় করবে। কর আদায়ের ফর্মুলা ছিল—আদায়কৃত করের ৮৯ শতাংশ ব্রিটিশ সরকারকে দিতে হবে এবং ১১ শতাংশ জমিদাররা নেবেন। অর্থনীতি জাহান্নামে যাক, কর আদায় করতে হবে। বর্তমানে আমাদের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) সে জায়গায় চলে গেছে। এখন কর আদায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সরকারের যা খরচ হবে তা কর আদায়ের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। কিন্তু অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য কর ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। আগামী দিনে যেসব পরিবর্তন দরকার সেগুলোর মধ্যে একটি হলো রেগুলেটরি ফ্রেমে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার এবং অন্যটি হচ্ছে কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি দরকার।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে কথা বলছি। আমাদের অর্থনীতিতে লবিস্ট সমস্যা আছে। আমরা প্রত্যেকেই অর্থনীতির চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এখান থেকে সরে আসা প্রয়োজন। কারণ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যেমন অনেক ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি প্রচুর নেতিবাচক দিকও আছে। তবে আমরা যেন শুধু নেতিবাচক দিকটি না দেখি, ইতিবাচক দিকটিও যেন দেখি।

অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)

[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘‌ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতি’ শিরোনাম উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে]

আরও