আরেকটি অস্থিতিশীল বছর থেকে আমরা বলতে পারি, বিশ্ব অর্থনীতি একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে। আমরা চারটি বড় চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে আছি: জলবায়ু পরিবর্তন, ভালো কর্মসংস্থান সমস্যা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংকট এবং বিশ্বায়নের একটি নতুন ও ভালো কাঠামোর অনুসন্ধান। আমাদের প্রত্যেকেরই চিন্তা-ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত পুরনো পদ্ধতি বাদ দিয়ে অবশ্যই নতুন সৃজনশীল কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে এ প্রচেষ্টা সমন্বয়হীন এবং পরীক্ষামূলক হিসেবে স্বীকৃত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন সবচেয়ে ভীতিকর চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষতির বিনিময়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে দীর্ঘ সময় ধরে উপেক্ষা করা হয়েছে। যদি আমরা বিশ্বকে প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয় থেকে মুক্ত করে সুন্দর বিশ্ব গড়ে তুলতে চাই তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিকে কার্বনমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একটি বিষয় আমরা দীর্ঘকাল ধরেই জানি, আমাদের পরিবেশকে অবশ্যই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং পরিবেশ উপযোগী নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এছাড়া অতীতের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে পরিবেশের যে স্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে এটা স্পষ্ট যে বৈশ্বিক সহযোগিতা বা অর্থনীতিবিদদের অনুকূল নীতির মাধ্যমে তা খুব কমই অর্জন করা সম্ভব।
প্রত্যেক দেশ তার নিজস্ব গ্রিন এজেন্ডা গঠন করে এগিয়ে যাবে, তারা এমন নীতিগুলো বাস্তবায়ন করবে যা তাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার জন্য সর্বোত্তম জবাবদিহিতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এরই মধ্যে তা করছে। ফলে নির্গমন সীমা, কর প্রণোদনা, গবেষণা ও উন্নয়ন সহায়তা এবং অন্যান্য দেশের জন্য স্বল্প বৈশ্বিক সংহতি এবং অনিয়মিত ব্যয়ের সঙ্গে গ্রিন শিল্পনীতির একটি জগাখিচুড়ি হবে। এটা হতে পারে অগোছালো ও জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য সমন্বয়হীন। তবে এ ধাক্কাটিই হতে পারে সর্বোত্তম এবং আমাদের জলবায়ু উন্নয়নে সত্যিকার আশাবাদ সৃষ্টি করবে। কিন্তু আমাদের ভৌত পরিবেশই একমাত্র হুমকি নয়, যার মুখোমুখি আমরা নিয়মিত হই। অসমতা, মধ্যবিত্তের পতন এবং শ্রমবাজারের মেরুকরণ আমাদের সামাজিক পরিবেশেরও সমানভাবে অবনতি ঘটাচ্ছে। এর পরিণতি এখন ব্যাপকভাবে স্পষ্ট। দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, আঞ্চলিক ও সামাজিক ব্যবধান প্রসারিত হচ্ছে, উদার গণতন্ত্র (যে মূল্যবোধ এটিকে সমর্থন করে) হ্রাস পাচ্ছে বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে। বিদেশবিদ্বেষী, কর্তৃত্ববাদী পপুলিস্টদের জন্য ক্রমবর্ধমান সমর্থন এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত করছে। সামাজিক রূপান্তর ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র সাহায্য করতে পারে, তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকদের জন্য ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা, যারা তাদের কাছে প্রবেশাধিকার হারিয়েছে।
আমাদের প্রয়োজন আরো বেশি উৎপাদনশীল ও ভালো পারিশ্রমিক সম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া শ্রমিকরাও পাবেন মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি। এ ধরনের কর্মসংস্থান সরবরাহের ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় জোরালো পদক্ষেপের প্রসারই যথেষ্ট নয়, আরো প্রয়োজন পরিষেবার জন্য শিল্পনীতির জন্য একটি নতুন ব্র্যান্ড, যেখানে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের একটি বৃহৎ অংশ তৈরি হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনকাজের অনুপস্থিতি বৃহৎ স্বয়ংক্রিয়তা ও শক্তিশালী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা উভয়কেই প্রতিফলিত করে। এ দুই কারণ থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলো মুক্ত নয়।
অনেকেই অকাল শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে: নিয়মমাফিক শ্রমিকদের শোষণ, উৎপাদনশীল উৎপাদন ব্যবস্থা খুবই সীমিত, তার মানে রফতানিভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, যা পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য কয়েকটি দেশে কার্যকর হয়েছে। জলবায়ু চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি, স্বল্প আয়ের দেশগুলোয় প্রবৃদ্ধি কৌশলের এ সংকট একটি সম্পূর্ণ নতুন উন্নয়ন মডেল দাবি করছে।
উন্নত অর্থনীতির মতো, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান উৎস হবে পরিষেবা। কিন্তু এ অর্থনীতিতে বেশির ভাগ পরিষেবায় ক্ষুদ্র ও বিধিবহির্ভূত উদ্যোগের আধিপত্য রয়েছে। প্রায়ই একক মালিকানা এবং প্রতিযোগিতা করার জন্য পরিষেবা নেতৃত্বাধীন উন্নয়নের কোনো প্রস্তুত মডেল নেই। শ্রম শোষণকারী পরিষেবাগুলোয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সংমিশ্রণে সরকারগুলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।
পরিশেষে, বিশ্বায়নকেই পুনরায় উদ্ভাবন করতে হবে। ১৯৯০-পরবর্তী অতিবিশ্বায়নের মডেলটি মার্কিন-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার উত্থান এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক, অর্থনৈতিক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উদ্বেগের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। আমরা জানি, বিশ্বায়নকে একটি নতুন বোঝাপড়ার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে হবে, যা জাতীয় চাহিদা এবং একটি সুস্থ বিশ্ব অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তাগুলোকে পুনরায় ভারসাম্যপূর্ণ করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশী বিনিয়োগকে সহজতর করে।
সম্ভবত সব দেশের (শুধু বড় শক্তি নয়) চাহিদাকে স্বীকার করে নতুন বিশ্বায়নের মডেলটি কম অনুপ্রবেশকারী হবে, যা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও জাতীয় নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতাগুলো মোকাবেলায় আরো বেশি নীতিগত নমনীয়তা চায়।
ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীন তার নিরাপত্তা প্রয়োজনের বিষয়ে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রাধান্য (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে) বা আঞ্চলিক আধিপত্য (চীনের ক্ষেত্রে) চাইবে তারা। এর ফলাফল হবে অস্ত্রায়ণের অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এবং উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে জিরো-সাম গেম হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে আরো অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, যেখানে উভয় শক্তি তাদের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, স্বীকার করতে হবে যে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো আবাসন ও সহযোগিতার মাধ্যমে আরো বেশি উপযোগী হবে। এ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে ভালোভাবে কাজ করতে পারে। কারণ এটি অতিবিশ্বায়নের তুলনায় কম হতে পারে। যেমনটা ব্রেটন-উডস যুগ দেখিয়েছিল, বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগের একটি উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ বিশ্বায়নের একটি দুর্বল মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে দেশগুলো যথেষ্ট নীতিগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার ফলে দেশে সামাজিক সংহতি এবং অর্থনৈতিক বিকাশকে উৎসাহিত হয় এবং দেশগুলো যথেষ্ট নীতিগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার পাশাপাশি দেশে সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করা যায়। প্রধান শক্তিগুলো বিশ্ব অর্থনীতিকে যে সবচেয়ে বড় উপহার দিতে পারে তা হলো তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে ভালোভাবে পরিচালনা করা।
এ চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য নতুন ধারণা এবং কাঠামো প্রয়োজন। আমাদের প্রচলিত অর্থনীতিকে বাইরে ফেলে দেয়ার দরকার নেই। কিন্তু প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য অর্থনীতিবিদদের অবশ্যই তাদের বাণিজ্যের সরঞ্জামগুলোর উদ্দেশ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রয়োগ করা শিখতে হবে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ও সহানুভূতিশীলতায় হতে হবে উন্মুক্ত, যদিও সরকার এমন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় যা অতীতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
[ভাষান্তর: দিদারুল হক]
ড্যানি রডরিক: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক