চলতি
গ্রীষ্মে (যুক্তরাষ্ট্রে
জুন থেকে
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত
গ্রীষ্মকাল বলে
বিবেচিত) মার্কিন
ডলার অনেক
শক্তিশালী হয়েছে।
ডলারের বিপরীতে
জাপানি ইয়েন
ও ইউরোর
মূল্যমান রেকর্ড
মাত্রায় কমেছে।
বিশেষ করে
ডলারের বিপরীতে
দীর্ঘদিন শক্তিশালী
থাকা ইউরো
এখন প্রায়
সাম্যাবস্থায় চলে
আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ইউএস ফেডারেল
রিজার্ভের বিস্তৃত
বাণিজ্য-ভারিত
ডলার ইনডেক্স
২০২০ সালের
মার্চে কভিড
মহামারীর আতঙ্কে
যে পর্যায়ে
পৌঁছেছিল, সেই
পর্যায়ে আবার
প্রায় পৌঁছেছে।
প্রকৃতপক্ষে, দেশটি
এবং তার
বাণিজ্য অংশীদারদের
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে
সমন্বয় করলে
দেখা যাবে
এরই মধ্যে
ডলারের মান
মূল্যস্ফীতি হারের
চেয়ে বেশি।
আশ্চর্যের বিষয়
হলো চার
দশকের মধ্যে
বার্ষিক সর্বোচ্চ
মূল্যস্ফীতি হারের
রেকর্ড এবং
বৈশ্বিক আর্থিক
সংকটের সময়
থেকে যুক্তরাষ্ট্রের
সবচেয়ে খারাপ
বাণিজ্য ভারসাম্য
সত্ত্বেও বাড়ছে
মুদ্রাটির মূল্যমান।
প্রশ্ন উঠছে,
সামনে কি
ডলারের মূল্যমান
আদৌ কমার
সম্ভাবনা আছে?
এ প্রশ্নের
উত্তরের জন্য
আমাদের কিছু
বিষয় খতিয়ে
দেখতে হবে।
বিনিময় হার
ব্যাখ্যা বা
অনুমান করা
ভীষণ কঠিন
হলেও আমার
মনে হয়
চারটি বড়
ফ্যাক্টর বিশ্বের
প্রধান মুদ্রাগুলো
ওঠানামার ক্ষেত্রে
প্রভাবিত করছে।
এর মধ্যে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ফ্যাক্টর হলো
ফেডের নীতি
হস্তক্ষেপ। ফেড
এরই মধ্যে
সুদহার বাড়ানো
শুরু করেছে
এবং মার্কিন
অর্থনীতি যেহেতু
কোথাও না
কোথাও সত্যিই
মন্দার দিকে
যাচ্ছে, সেহেতু
নীতি সুদহার
আরো কঠোর
করার এখনো
যথেষ্ট পরিসর
আছে তাদের।
ইউরোপের ক্ষেত্রেও
সমরূপ নীতি
দৃশ্যমান। সমানভাবে
উচ্চ মূল্যস্ফীতি
সত্ত্বেও সেখানে
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয়
ব্যাংক (ইসিবি)
আরো সতর্ক
হচ্ছে। আংশিকভাবে
এ কারণে
যে ইউরো
অঞ্চলের অর্থনীতির
অবস্থা বেশ
নাজুক। অঞ্চলটির
অর্থনৈতিক চিত্র
অনেকটা নিষ্প্রভ।
ইসিবি ইতালির
উচ্চ ঋণমাত্রা
সম্পর্কে বেশ
উদ্বিগ্ন, তবে
প্রতিষ্ঠানটি এও
বিশ্বাস করে
জ্বালানি দামজনিত
মূল্যস্ফীতির বর্তমান
হার আর
বাড়বে না।
চীনের মতো
জাপান অবশ্য
ততটা তাত্পর্যপূর্ণ
মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন
এখনো হয়নি।
স্বভাবত শিগগিরই
দেশটির কেন্দ্রীয়
নিয়ন্ত্রক সংস্থা
ব্যাংক অব
জাপানের কঠোর
নীতি নেয়ার
সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে ব্যাংক
অব চায়না
আগস্টে নীতি
সুদহার কমিয়েছে।
ডলার শক্তিশালী
হওয়ার পেছনে
ভূরাজনীতিও একটা
গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
রাশিয়া-ইউক্রেন
যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের
চেয়ে ইউরোপে
বেশি তাত্ক্ষণিক
ঝুঁকি তৈরি
করেছে। আবার
তাইওয়ানের ওপর
চীনের সামরিক
হুমকি সবার
জন্য যে
বড় ঝুঁকি
তৈরি করেছে,
তার প্রায়
সবটাই পড়ছে
প্রতিবেশী জাপানের
ওপর। মন্দা
হোক না
হোক, ইউরোপ
ও জাপান
উভয়কেই তাদের
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
তাত্পর্যজনকভাবে পুনর্গঠন
করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সামরিক
ব্যয়ের জন্য
বাড়াতে হবে
বাজেট।
ডলার শক্তিশালী
হওয়ার পেছনে
চীনের অর্থনৈতিক
সংকোচনও কাজ
করেছে। দেশটিতে
এখন চলছে
অর্থনৈতিক অধোগতি।
এটা যুক্তরাষ্ট্রের
চেয়ে ইউরোপ
ও জাপানকে
অনেক বেশি
ভোগাবে। চীনে
প্রবৃদ্ধি হ্রাসের
মূল কারণগুলো
(যেমন জিরো
কভিড লকডাউন,
অতস্ফীিতির লিগ্যাসি,
প্রযুক্তি খাতে
ধস এবং
অর্থনৈতিক ক্ষমতার
অতিকেন্দ্রীকরণ প্রভৃতি)
নিয়ে আমি
বিভিন্ন সময়ে
মন্তব্য করেছি
এবং এ
মুহূর্তে সংকট
থেকে দেশটির
কোনো টেকসই
ঘুরে দাঁড়ানো
দেখছি না।
চূড়ান্তভাবে ডলারের
মূল্যমান বৃদ্ধিতে
জ্বালানি মূল্যের
প্রভাবও কম
নয়।
জ্বালানির দাম
এখনো খুব
বেশি হলেও
তা যুক্তরাষ্ট্রের
জন্য দুশ্চিন্তার
কারণ নয়।
কেননা যুক্তরাষ্ট্র
জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
অন্যদিকে ইউরোপ
ও জাপান
জ্বালানির বড়
আমদানিকারক। ডলার
ব্যয় করে
তাদের বিপুল
জ্বালানি আমদানি
করতে হয়।
সব মিলিয়ে
ডলারের মূল্যমানে
ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
বিরাজমান।
কেউ কেউ
হয়তো বলবে,
ইউরোপ ও
জাপানের চেয়ে
যুক্তরাষ্ট্র তো
তুলনামূলক নিরাপদ
আশ্রয়স্থল। এটা
সত্য হতে
পারে, যদিও
যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই
একটা শীতল
গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে
যাচ্ছে। ইউরো
অঞ্চলের একীভূতকরণ—যা
যেকোনো সংকট
থেকে উত্তরণের
প্রতিশ্রুতি দেয়—ব্যাপকভাবে
পরীক্ষার মুখে
পড়বে, যদি
বৈশ্বিক প্রকৃত
সুদহার কখনো
বাড়তে শুরু
করে। জার্মানিতে
মূল্যস্ফীতি ৭০
বছরের মধ্যে
সর্বোচ্চে পৌঁছার
পথে রয়েছে।
এদিকে ইসিবির
আগ্রাসী সুদহার
বৃদ্ধি ইতালিতে
সরকারি ঋণের
ব্যাপক বিস্তার
ঘটাতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির
ওপর ডলারের
আজকের শক্তিমত্তার
বহুমাত্রিক গভীর
প্রভাব রয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের
একটা বড়
অংশের (সম্ভবত
অর্ধেক) মূল্য
নির্দেশিত হয়
ডলারে। আরো
বড় ব্যাপার
হলো, অনেক
দেশের আমদানি
ও রফতানি
কার্যক্রম মার্কিন
মুদ্রাটির মাধ্যমে
পরিচালিত হয়।
স্বভাবত অর্থনীতিবিদদের
গবেষণায় উঠে
এসেছে, বিশ্বে
ডলার যতটা
আমদানিতে হ্রাস
ঘটাবে, পরিসংখ্যানগতভাবে
বিশ্ব বাণিজ্যের
ওপর এর
তাত্পর্যজনক নেতিবাচক
প্রভাবও ততটা
বেশি হবে।
অধিকন্তু বিশেষ
করে উদীয়মান
বাজার এবং
উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে
শক্তিশালী ডলার
ভয়াবহ বিরূপ
প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি
করে। কারণ
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের
কাছ থেকে
ঋণ গ্রহণকারী
ওইসব দেশের
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
এবং ব্যাংকগুলো
কেবল ডলারেই
তা ভালোভাবে
করতে পারে।
আরো দুঃখজনক,
উচ্চতর মার্কিন
সুদহার দুর্বল
ঋণ গ্রহণকারীদের
অসামঞ্জস্যভাবে সুদের
বোঝার দিকে
ঠেলে দেয়।
তাদের সুদের
দায় বিপুল
হারে বাড়ায়।
প্রকৃতপক্ষে, ব্রড
ডলার ইনডেক্স
এমনকি আরো
বেড়ে যেত,
যদি অনেক
উদীয়মান বাজারের
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
জাতীয় মুদ্রার
ওপর মহামারীসৃষ্ট
নিম্নমুখী চাপ
রোধে সক্রিয়ভাবে
সুদের হার
না বাড়াত।
তবে এ
ধরনের কঠোরতা
অবশ্যই তাদের
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে
ভোগাবে।
এখানে একটা
বিষয় মনে
রাখতে হবে,
বড় উদীয়মান
বাজারগুলো যতটা
সম্ভব বড়
মাত্রায় উচ্চ
সুদহারের প্রভাব
ঠেকাতে পেরেছে
এবং শক্তিশালী
ডলার তাদের
কাছে একটা
প্রীতিকর বিস্ময়
হিসেবে আবির্ভূত
হয়েছে। তবে
সামনে তা
আর কতটা
প্রীতিকর থাকবে,
তা নিয়ে
সংশয় থেকে
যায়। যদি
ফেড আরো
আগ্রাসী কঠোর
নীতির পথ
অনুসরণ করে;
বিশেষ করে
চীনের অধোগতি,
যুক্তরাষ্ট্র ও
ইউরোপে প্রতিধ্বনির
সঙ্গে যদি
যুগপত্ভাবে পণ্যমূল্য
আরো পড়ে
যায় (যেমনটা
হার্ভার্ডে আমার
সহকর্মী জেফরি
ফ্র্যাঙ্কেল সতর্ক
করেছে)।
স্বল্পমেয়াদে শক্তিশালী
ডলার বাণিজ্য
অংশীদারদের তুলনায়
যুক্তরাষ্ট্রকে কম
ঝুঁকিতে ফেলবে।
এর প্রধান
কারণ মার্কিন
বাণিজ্যের প্রায়
সবটাই ডলারে
ইনভয়েস করা।
কিন্তু দেশটিতে
ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী
থাকা ডলার
একটা দীর্ঘমেয়াদি
প্রভাব রেখে
যাবে। কারণ
এতে উৎপাদনের
জন্য দেশটি
আপেক্ষিকভাবে আরো
ব্যয়বহুল হয়ে
উঠবে। এটা
বৈদেশিক পর্যটন
চাঙ্গা করার
বিষয়টিও ব্যাহত
করবে। ২০১৯
সাল থেকে
যা এখনো
লক্ষণীয়ভাবে নিম্নমুখী।
অন্য
প্রধান মুদ্রাগুলোর
বিপরীতে ডলারের
সাম্প্রতিক উল্লম্ফন
কি নিম্নগামী
হতে পারে?
সত্যি বলতে
কি, গত
শতকের আশির
দশক এবং
চলতি শতকের
শূন্য দশকসহ
ডলারের মূল্যে
আগের কিছু
বড় ধরনের
উল্লম্ফন শেষ
পর্যন্ত লক্ষণীয়
অধোগতিতে পর্যবসিত
হয়েছিল। কিন্তু
আবারো উল্লেখ
করব যে
এমনকি এক
বছরের জন্যও
বিনিময় হারের
গতিপ্রকৃতি অনুমান
করাটা বেশ
কঠিন। মার্কিন
ডলারের বিপরীতে
ইউরো ও
ইয়েনের আরো
১৫ শতাংশ
মূল্যপতন পুরোপুরি
অসম্ভব, বিশেষ
করে যদি
ভূরাজনৈতিক সংঘাত
বিশ্বকে আরেকটা
খারাপ পরিস্থিতির
দিকে ঠেলে
দেয়। সেক্ষেত্রে
নিশ্চিতভাবে শুধু
এটিই বলা
যায় যে
২০১৪ সালে
শুরু হওয়া
ডলারের বিনিময়
হারের স্থিতিশীলতার
ব্যতিক্রমী সময়
এখন ইতিহাস।
স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
কেনেথ রগফ:
সাবেক
মুখ্য অর্থনীতিবিদ,
অর্থনীতি ও
পাবলিক পলিসির
অধ্যাপক, হার্ভার্ড
বিশ্ববিদ্যালয়
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির