রাজস্ব বাড়াতে না পারলে বড় বাজেটের সুফল পাওয়া যাবে না

ড. মোস্তফা কে মুজেরী, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক। ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি বর্তমান সরকারের কার্যক্রম, আসন্ন বাজেট, মূল্যস্ফীতি, আর্থিক নীতিসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা এক ধরনের উন্নয়ন চিন্তা দেখেছি, যার সুফল জনগণ সেভাবে পায়নি। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়াস নিয়েছিল, যদিও বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিগত সরকারগুলোর বিভিন্ন উন্নয়ন চিন্তার প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

১৯৭১-এ স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের উন্নয়নের একটি ধারা ছিল, যা নব্বইয়ের দশক থেকে কিছুটা হলেও দ্রুত গতিসম্পন্ন হয়েছে। আশির দশকের তুলনায় নব্বই দশকে আমরা মোটামুটি একটা প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়েছি এবং সেই সঙ্গে আমাদের দারিদ্র্য কমেছে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক উন্নয়নেও বেশকিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। আবার আমরা যদি পরে সময়টা ভাগ করে দেখি, তাহলে দেখব যে ২০১৫-১৬ সালের পর থেকে আমাদের উন্নয়নের গতি কাগজে-কলমে কমেনি, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি দেখেছি। অর্থ পাচার, অর্থ আত্মসাৎ থেকে আরম্ভ করে সামগ্রিকভাবে দেশে একটা দুর্বৃত্তায়নের অর্থনীতির ধারা লক্ষ করেছি। সেই ধারার পরিণতি হলো চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন। এ সরকার দেশের শাসনভার নেয়ার পর রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি খাতের সংস্কার চেয়েছিল। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কমিশন করা হয়েছিল এবং সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল অর্থনীতির সংস্কার। কেননা এ সরকার একটা সমস্যাসংকুল অর্থনীতি পেয়েছিল। আর এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলো দূর করা এবং অর্থনীতিকে তার স্বাভাবিক গতিপথে ফিরিয়ে আনা।

সেসময় মূল্যস্ফীতি, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত, নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃজন না হওয়াসহ অর্থনীতিতে নানা সমস্যা ছিল। এসব সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকার খুব একটা সফল হয়েছে বলা যায় না। উদাহরণ হিসেবে মূল্যস্ফীতির হারের কথাই বলা যায়। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়েছে, কিন্তু এর খুব একটা সুফল পাওয়া যায়নি। বর্তমান সরকার যখন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এল তখন কিন্তু অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিতে গুণগত তেমন পরিবর্তন হয়নি এবং যে সমস্যাগুলো আগে থেকে বিদ্যমান ছিল, সে সমস্যাগুলোই তারা পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আরো গভীরতর হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়া এবং সে ধারা বজায় থাকার বহু কারণ রয়েছে বলে আপনি উল্লেখ করেছেন। কারণগুলো বিস্তারিত জানতে চাই। একই সঙ্গে জানতে চাই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী প্রচেষ্টার পরও কেন এটি নিয়ন্ত্রণে আসছে না?

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সবার আগে এর কারণগুলো জানতে হবে এবং এবং সেগুলো যদি দূর করা যায় তাহলে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা যাবে। সাধারণভাবে যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। এজন্য বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও এটাই একমাত্র কৌশল। এ মুদ্রানীতি নেয়ার ফলে অতিরিক্ত চাহিদা কমে আসবে এবং অতিরিক্ত চাহিদা কমলে মূল্যস্ফীতির হারও কমে আসে। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি শুধু চাহিদাজনিত কারণে ঘটে না বা ঘটেনি। এর আরো কারণ রয়েছে। যে কারণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বা নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ, এটা অনেক উচ্চ। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর মাধ্যমে মূলস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়নি। এক্ষেত্রে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে আরো কিছু সহযোগিতামূলক নীতি নেয়ার প্রয়োজন ছিল। যেমন রাজস্বনীতি, মুদ্রা বিনিময় হারের নীতিও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হতো। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও দূর করা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে মূল্যশৃঙ্খল বা ভ্যালু চেইন ব্যবস্থাপনাকে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করা প্রয়োজন ছিল।

এ ধরনের আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন, সরবরাহ সংকট ও বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। তার পরও কোন সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না?

এখানে মূল বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সমাজে এমন কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজেদের স্বার্থে বাজার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে। তারা ব্যবসায়ী হোক বা অন্য কোনো গোষ্ঠী—তাদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ও স্বার্থের সম্পর্ক থাকে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। সেই অঙ্গীকারের অভাব আমরা দেখেছি।

বিগত সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা দেখেছি, বাজার তদারকির ক্ষেত্রে মূলত খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপরই চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে গিয়ে মূল্যতালিকা আছে কিনা বা খুচরা বিক্রেতা বেশি দাম নিচ্ছে কিনা—এসব বিষয় দেখেছে। কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ বড় আড়তদার বা শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায়নি। অথচ তারাই বাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। ফলে সমস্যার মূল জায়গায় হাত না দিয়ে শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই বিষয় দেখা গেছে। যদিও তাদের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তুলনামূলক কম ছিল। চাইলে তারা আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ আমরা দেখিনি। কী কারণে সেটা হয়নি, সেটা বলা কঠিন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ব্যবহার করে, অর্থাৎ নীতি সুদহার বাড়িয়ে, এমন একটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় যেখানে সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার কাঠামোর বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।

বর্তমান সরকারের সময় মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বেড়েছে এবং এর পেছনে কিছু বহিরাগত কারণও কাজ করছে, যেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিভিন্ন নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। কাজেই মূল্যস্ফীতির ওপর এ বৈশ্বিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বর্তমানে মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। যদি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী মাসগুলোয়ও দেশে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব প্রশমনে কী ধরনের নীতি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে? একই সঙ্গে আগামী বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

সামগ্রিকভাবে যদি আমরা বাজেটের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাচ্ছে বর্তমান সরকার একটি বড় আকারের বাজেট দেয়ার পরিকল্পনা করছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ এটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে চাইবে। আমরা যেটুকু জানতে পারছি, তাতে বাজেটের আকার সম্ভবত ৯ লাখ কোটি টাকার আশপাশে হতে পারে। তবে একটা বিষয় হচ্ছে, শুধু টাকার অংক দিয়ে বাজেটের বড়ত্ব বিচার করলে হবে না। যদি জিডিপির অনুপাতে দেখি তাহলে বাজেটের আকার হয়তো ১৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। অথচ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেটের আকার আরো বড় হওয়া দরকার। এটা ২০-২২ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। কারণ বর্তমানে আমরা উন্নয়নের যে পর্যায়ে আছি, সেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ প্রায় সব খাতেই অর্থের ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এখনো জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দও আমরা দিতে পারছি না। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ২ শতাংশের নিচে, যেখানে এটি অন্তত ৪-৫ শতাংশ হওয়া উচিত। কাজেই আমরা যদি সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে বড় বাজেটের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এখানে মূল সীমাবদ্ধতা হচ্ছে অর্থায়ন। শুধু ইচ্ছা করলেই বড় বাজেট করা যায় না। এর অর্থের উৎসও থাকতে হবে।

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রাজস্ব আদায় অত্যন্ত কম। বর্তমানে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশেরও নিচে, যেখানে এটি ১৫-১৭ শতাংশ হওয়া উচিত। নেপালের মতো দেশেও এ হার ১৬-১৭ শতাংশ। অথচ অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে আমরা নেপালের চেয়ে এগিয়ে। কাজেই রাজস্ব আহরণ না বাড়াতে পারলে বড় বাজেটের সুফল পাওয়া যাবে না। তখন সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। বৈদেশিক ঋণ যেমন বাড়ে, তেমনি ব্যাংক খাত থেকেও ঋণ নিতে হয়। ফলে ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। আমরা এরই মধ্যে দেখছি বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে বাজেটের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে। যদি ঋণনির্ভরতা আরো বাড়ে, তাহলে উন্নয়ন ব্যয়ের জায়গা সংকুচিত হবে।

যতদিন পর্যন্ত রাজস্ব আদায় বাড়ানো না যাবে, ততদিন বড় বাজেটও খুব কার্যকর হবে না। কিন্তু রাজস্ব খাত নিজেই নানা দুর্বলতায় আক্রান্ত। দুর্নীতি, ফাঁকফোকর, কর ফাঁকি—সব মিলিয়ে এ খাত অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর সমাধানে করজাল বিস্তৃত করতে হবে এবং রাজস্ব আদায়ে যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। কর ব্যবস্থায়ও গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। তবে এটাও সত্য যে রাজস্ব সংস্কার রাতারাতি ফল দেবে না। এটা সময়সাপেক্ষ।

সেক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে সরকার কী করতে পারে, বিশেষ করে আগামী বাজেটে কোন ক্ষেত্রগুলোয় জোর দেয়া উচিত বলে মনে করেন?

আমার মনে হয়, শুধু বাজেটের আকার বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে বাজেটের গুণগত মান বৃদ্ধির দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। আমাদের রাজস্ব ব্যয়ে প্রচুর অপচয়, অদক্ষতা ও দুর্নীতি রয়েছে। অনেক ব্যয় আছে যেগুলো প্রয়োজন না হলেও করা হচ্ছে। যদি এসব অপচয় কমানো যায়, তাহলে একই অর্থ দিয়েও বেশি কাজ করা সম্ভব হবে। একই বিষয় উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক প্রকল্প রাজনৈতিক বা অন্য কারণে নেয়া হয়েছে, যেগুলোর জরুরি প্রয়োজন নেই। আবার প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোর মধ্যেও অনেক অপ্রয়োজনীয় উপাদান থাকে। যেমন বিদেশ সফর, অতিরিক্ত অবকাঠামো ব্যয় বা এমন কিছু খাত থাকে যেগুলো ছাঁটাই করলেও প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এক্ষেত্রে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রতিটি প্রকল্প ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। প্রকল্পগুলোর মধ্যে যেসব অপ্রয়োজনীয় অংশ আছে, সেগুলো বাদ দিতে হবে। এতে উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান বাড়বে। একই সঙ্গে অল্প ব্যয়ে বেশি অর্জন করা সম্ভব হবে। তবে রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কারে সময় লাগবে, কিন্তু ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ দ্রুত করা সম্ভব। বর্তমান বাজেটে যদি সরকার এ জায়গাগুলোয় গুরুত্ব দেয়, তাহলে সীমিত সম্পদ দিয়েও অনেক বেশি ফল অর্জন করা সম্ভব হবে। এতে সরকারের বিভিন্ন অঙ্গীকার বাস্তবায়নও সহজ হবে।

আসন্ন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ৭৪ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দের একটি প্রস্তাব এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

থোক বরাদ্দকে একেবারে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। মূল বিষয় হচ্ছে, এ বরাদ্দ কোন উদ্দেশ্যে রাখা হচ্ছে এবং সেটার ব্যবহার কতটা কার্যকরভাবে করা হবে। অনেক সময় সরকার এমন কিছু অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করে, আবার হঠাৎ কোনো দুর্যোগ বা জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলেও এ ধরনের বরাদ্দ কাজে লাগতে পারে। অর্থাৎ থোক বরাদ্দের একটি বাস্তব প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ঠিক আছে কিনা এবং ব্যয় থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে কিনা। তাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত ব্যয়ের গুণগত মানের দিকে।

সরকার গঠনের দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সামনে বাজেটও আসছে। দেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারকে কী ধরনের সুপারিশ দেবেন?

আমরা যখন উন্নয়ন বা বাজেটের কথা বলি, তখন আর্থিক খাতের গুরুত্ব আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়। কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে আর্থিক খাতই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কৃষি, শিল্প বা সেবা—যে খাতের উন্নয়নই করতে চান না কেন, আর্থিক খাতকে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। বিনিয়োগের জন্য ঋণ প্রয়োজন, সঞ্চয়ের নিরাপদ ব্যবস্থা প্রয়োজন, অর্থের প্রবাহ প্রয়োজন—এসবই আর্থিক খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কাজেই একটি দক্ষ, শক্তিশালী ও কার্যকর আর্থিক খাত ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আমাদের দেশের আর্থিক খাতের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে ব্যাংক খাত। কারণ পুঁজিবাজার বা বন্ড মার্কেট এখনো খুব দুর্বল। ফলে অর্থায়নের প্রধান দায়িত্ব ব্যাংকগুলোকেই বহন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিগত সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংক খাত অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক ব্যাংক কার্যত ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে। বর্তমান সময়েও সেই পরিস্থিতির খুব একটা মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। যেমন পরিচালনগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সমস্যাকে আড়াল করার প্রবণতা। খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে বলে যে তথ্য দেয়া হয়, সেটার বড় অংশই এসেছে শর্ত শিথিলের মাধ্যমে, প্রকৃত আদায়ের মাধ্যমে নয়। ফলে এটাকে বাস্তব উন্নতি বলা কঠিন। আমার মনে হয়, যদি সত্যিকার অর্থে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে এসব মৌলিক সমস্যার সমাধানে যেতে হবে। কারণ ব্যাংক খাতকে সুস্থ না করে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান—কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়।

আমাদের আর্থিক নীতির কেন্দ্রে মূলত ব্যাংক খাত রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য দেশে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট প্রধানতম অর্থায়নের উৎস। বাংলাদেশের আর্থিক নীতিতে অতিরিক্ত ব্যাংকনির্ভরতা থেকে বের হওয়া প্রয়োজন কিনা?

অবশ্যই। যেকোনো কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থায় পুঁজিবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থায়ন পুঁজিবাজারের মাধ্যমে হওয়া উচিত। যেমন শিল্প খাতে বড় বিনিয়োগ, অবকাঠামো বিনিয়োগ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের কাজ হচ্ছে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও কার্যকরী মূলধনের চাহিদা পূরণ করা। কিন্তু আমাদের দেশে পুঁজিবাজার দুর্বল হওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের দায়িত্বও বহন করছে। এটা ব্যাংক খাতের জন্যও চাপ তৈরি করছে। কারণ ব্যাংকের আমানত মূলত স্বল্পমেয়াদি, কিন্তু সেই অর্থ দিয়েই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়া হচ্ছে। ফলে সম্পদ ও দায়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। কাজেই ব্যাংক খাতকে তার স্বাভাবিক ভূমিকায় ফিরিয়ে আনতে হলে পুঁজিবাজারকেও শক্তিশালী করতে হবে। স্টক মার্কেট, বন্ড মার্কেটসহ পুরো পুঁজিবাজার ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। তবে এটাও সত্য, এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। পুঁজিবাজারের সমস্যাও দীর্ঘদিনের এবং বেশ জটিল।

তাই আমার মনে হয়, পুরো আর্থিক খাতকে সামগ্রিকভাবে সংস্কার করতে হবে এবং সেটিকে বাস্তব অর্থনীতির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। না হলে নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের যে চিন্তা এসবই বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। যত দ্রুত এ সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে, ততই দেশের জন্য ভালো হবে।

আরও