রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা চাই

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন এবং বাধ্য হয়ে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী ও মানবিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায় তাদের জন্মভূমি রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার জান্তা সরকারের হত্যা, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার মুখোমুখি হলে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনা ছাউনিতে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের হামলার অজুহাতে সেনাবাহিনী নির্বিচার গণহত্যা ও নির্যাতন চালায়। ২০১৬ সালের শেষ ভাগ থেকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর কয়েক মাস ধরে সহিংসতা চালায়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, আগে থেকেই বৈষম্যের শিকার এ জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর তীব্রতর হয়। রোহিঙ্গা জনপদে অগ্নিসংযোগ, নির্বিচারে গুলি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনী এবং উগ্রবাদীদের হামলায় প্রায় ১০ হাজার লোক নিহত হয়। ওই সময় জীবন বাঁচাতে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে গত শতাব্দীর নব্বই দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকারের গণহত্যা ও নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে আরো তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে এসে অবস্থান করেছিল। ওই সময় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ফেরত পাঠানো গেলেও অনেকেই আশ্রয় শিবিরে থেকে যায়। ২০১৭ সালের পর আট বছর ধরে রাখাইন থেকে উদ্বাস্তু হিসেবে আসা, আগে থেকে শিবিরে অবস্থান করা এবং শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেয়া শিশুসহ প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল এক অস্থির বাস্তবতার মুখোমুখি। এ অঞ্চলে রয়েছে নিরাপত্তা হুমকি, জীবিকা সংকট, মাদক ও মানব পাচার, পাহাড় কাটা ও বন উজাড়সহ নানা মানবিক ও পরিবেশ বিপর্যয়।

বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ চলছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন অঞ্চল আরাকান আর্মির দখলে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার জান্তা ও আরাকান আর্মি উভয়েরই হামলা, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার। ফলে এরা দেশ থেকে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আরাকান আর্মির এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচারে গত ১৮ মাসে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। ক্রমবর্ধমান বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের চাপে আশ্রয় শিবিরগুলোতে বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তায় কুলাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ওপর তাদের খাদ্য সংস্থানের চাপ বাড়ছে। কারণ জাতিসংঘের রিফিউজি বিষয়ক হাইকমিশনসহ অন্যান্য সাহায্যকারী রাষ্ট্র ও সংস্থা বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জীবনধারণের জন্য ত্রাণসামগ্রী তো বাড়াচ্ছেই না, বরং কমিয়ে দিয়েছে।

দুই.

রোহিঙ্গাদের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এরা শতাব্দীর পর শতাব্দী রাখাইনে বসবাস করে আসছে। খ্রিস্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে চন্দ্র বংশীয় রাজারা আরাকান শাসন করতেন। কথিত আছে, ৭88-৮১০ খ্রিস্টাব্দে আরব দেশ থেকে আগত বেশ কয়েকটি বাণিজ্য জাহাজ রামব্রি দ্বীপের তীরে সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। জাহাজের আরবীয় আরোহীরা তীরে অবতরণ করলে রাজা তাদের উন্নততর আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে আরাকানে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। আরবীয় মুসলমানরা স্থানীয় রমণীদের বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এছাড়া তৎকালীন সময়ের আগে থেকেই বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল হতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত আরব বণিকদের যোগাযোগ থাকার প্রমাণ ইতিহাসে রয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বসবাসকারী জনগণের অনেকেই নিজেদের আরব বংশোদ্ভূত বলে মনে করেন। তবে আরাকানের রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর জনগণ কোনোভাবেই ভারত কিংবা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে ওখানে বসতি স্থাপন করেনি। এরা মিয়ানমারের ১৩৫টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরই একটি মুসলিম জাতি যারা উত্তর রাখাইনের মংদু, বুথিডং এবং রাথিডং এলাকায় বসবাস করে।

শতসহস্র বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করলেও রোহিঙ্গা মুসলিম নৃগোষ্ঠীকে বৌদ্ধশাসিত মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালের আইনে নাগরিকত্বহীন হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে এরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় এবং সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়। অবশ্য এর আগে থেকেই তারা নির্যাতিত হয়ে আসছিল।

তিন.

২০১৭ সালের ব্যাপক অনুপ্রবেশের পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং চীনের মধ্যস্থতায় কয়েকবার ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ওআইসির উদ্যোগে কয়েকবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রত্যাবাসন প্রস্তাব গৃহীত হলেও মিয়ানমার এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি।

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নিয়মিত কাজ করার জন্য প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা বিষয়ক একজন হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ (পরে উপদেষ্টা) নিয়োগ করেন। রোহিঙ্গা বিষয়ক উপদেষ্টা ও তার সহযোগীরা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করেছেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব ২০২৫ সালের ১৩-১৫ মার্চ বাংলাদেশ সফরের সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব মনে করেন রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিয়ানমারের সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চাপ বৃদ্ধি করা আবশ্যক।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা আগামী ঈদ নিজ দেশ মিয়ানমারেই উদযাপন করবেন।’ দীর্ঘদিন থমকে থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তার এ ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা ও নাটকীয় অগ্রগতি হিসেবে মনে করেছিল দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহল। এ ঘোষণার পর দুটি ঈদুল ফিতর পার হয়ে গেলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি শূন্যের কোঠায়।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার দপ্তরের হিসাব মতে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচর—সব মিলিয়ে ৩৪টি শিবিরে বর্তমানে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৭১ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। এছাড়া গত দুই বছরে নতুন করে অনুপ্রবেশ করেছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। তবে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে মিলিয়ে এবং বাংলাদেশের জন্মগ্রহণকারী রোহিঙ্গা শিশুদেরসহ ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে রোহিঙ্গা সমস্যা একটি বড় মানবিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

চার.

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের ব্যাপক গণহত্যা স্মরণ করে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’ পালন করে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গা সংকটকে আরো জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য কক্সবাজারের ‘বে ওয়াচ হোটেলে’ সেদিন থেকে তিন দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সংলাপ ‘স্টেকহোল্ডারস ডায়ালগ: টেকঅ্যাওয়ে টু দ্য হাই লেভেল কনফারেন্স অন দ্য রোহিঙ্গা সিচুয়েশন’ শুরু করা হয়। এ সংলাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন ও বাস্ত্যুচ্যুতি থামাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি সংকট সমাধানে ৭ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক দাতাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের ফাঁকে ৩০ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এ সম্মেলনে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের আশা করা যায়।

জাতিসংঘের সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের ওই সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘গণহত্যা শুরুর আট বছর পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অব্যাহত রয়েছে। উপরন্তু আন্তর্জাতিক অর্থায়নে ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমার থেকে। এর সমাধানও সেখানেই হতে হবে। মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে দ্রুত প্রত্যাবাসনের কাজ শুরু করা যায়।’

গত ১৯ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিষয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এতে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে নতুন করে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যৌথভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করলে ১০৫টি দেশ এ প্রস্তাব সমর্থন করে। তবে প্রস্তাব গ্রহণের সময় রাশিয়া, চীন ও ভারতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন না।

পাঁচ.

রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের অভিযোগে আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করে। কানাডা, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, মালদ্বীপ, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য আইসিজেতে করা মামলাটি সমর্থন করেছিল। ওআইসি মামলাটিতে গাম্বিয়াকে সহযোগিতা করছে। মামলাটির প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমার সরকার সব অভিযোগ অস্বীকার করে। প্রাথমিক শুনানিতে অংশ নিয়ে তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি গাম্বিয়ার জাতিগত নিধনের অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

এ বছর (২০২৬) জানুয়ারিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ায় করা মামলার আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হয়েছে। এই প্রথম রোহিঙ্গাদের প্রতি হওয়া ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক আদালতে করা গাম্বিয়ার মামলা আদালতের স্বীকৃতি পেয়েছে। মামলার শুনানিতে গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো বলেন, ‘রোহিঙ্গারা সহজ-সরল মানুষ। তারা শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখতেন। মিয়ানমার জান্তা তাদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। তারা এমন নৃশংস সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছেন যা কল্পনাতীত।’ শুনানীতে রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কথাও শোনা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সমর্থন ও নৈতিক স্বীকৃতি পেয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল মানবিক ইস্যু নয়, এটি কক্সবাজার অঞ্চলের পরিবেশ, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আশ্রয় কেন্দ্রে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মিশে অপরাধ ও অসামাজিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান মানবিক সমস্যা ছাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তার গভীর সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর অগ্রাধিকার ও দৃষ্টি অন্যদিকে সরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যও ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। রোহিঙ্গা শিবিরের খাদ্যভাতা ১২ ডলার থেকে বর্তমানে ১০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এ অংকে একটি পরিবারের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিবিরগুলোতে বসবাসকারী মানুষ এখন খাদ্যনিরাপত্তা সংকটে পড়েছে। সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানব পাচার, মাদকসংশ্লিষ্টতা ও চোরাচালান চক্রে যুবকদের টেনে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

ছয়.

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে প্রশংসিত হয়েছে, কিন্তু প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার জীবন-জীবিকার চাপ বাংলাদেশ তীব্রভাবে অনুভব করছে। এটি এখন কেবল বাংলাদেশেরই সমস্যা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জ। শুরু থেকেই বাংলাদেশ বলে আসছে যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, তাদের নিজভূমিতে ফিরে যেতে হবে। তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তিনটি শর্ত যথা নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন না হলে রোহিঙ্গারা ফিরবে না, কিংবা বাংলাদেশ জোরপূর্বক তাদের ফেরত পাঠাতে পারবে না। রোহিঙ্গারা চায় মিয়ানমার সরকার তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক।

সাত.

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ চাইলেও মিয়ানমার সরকার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় কিংবা বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি কিছুটা দেখা দিলেও আবার পিছিয়ে যায়।

মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরো জটিল করে তুলেছে। আরাকান আর্মিসহ অভ্যন্তরীণ উপদলগুলোর সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও টানাপড়েনের মধ্যে রোহিঙ্গা সমস্যা গুরুত্ব পাচ্ছে না। সম্প্রতি সাবেক সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। অনেকে মনে করেন, তিনি প্রত্যাবাসনে তেমন উৎসাহী হবেন না।

আট.

বাংলাদেশের সদ্য অতীত অন্তর্বর্তী সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্ব দিলেও আশাপ্রদ ফলাফল পাওয়া যায়নি। সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার দেশ শাসনভার গ্রহণের পর প্রায় দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকারে নিতে হবে। অতীতে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিএনপি সরকারের সাফল্য রয়েছে। ১৯৭৮-পরবর্তী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯০ দশকের ব্যাপক অনুপ্রবেশ বেগম খালেদা জিয়ার সরকার শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ ও রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অংশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। বর্তমানে মিয়ানমার ও এর ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে রাশিয়া, চীন ও ভারত মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে মনে হয়। এ তিন দেশ বাংলাদেশেরও ভালো বন্ধু হতে পারে। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক কালের তিক্ত সম্পর্ক বর্তমান সরকারের সময়ে সুসম্পর্ক হবে মর্মে প্রত্যাশা করা যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দেশের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি অগ্রাধিকারে রাখলে এবং আগের ন্যায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এ সমস্যার সমাধান হবে আশা করা যায়। যেকোনো উপায়ে এ ব্যাপক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রত্যাবাসন করাতে পারলে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশগত সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরও