আলোকপাত

ফোরক্লোজার: ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়ানোর নিয়ামক

ব্যাংকের প্রধান ব্যবসাই হলো আমানত সংগ্রহ করে তা ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করে সুদ বা মুনাফা আয় করা। ঋণ দেয়া মানে ঝুঁকি নেয়া। ব্যাংকার চায় যতটুকু সম্ভব ঝুঁকি কমাতে। আর ঝুঁকি কমানোর একটি জুতসই অনুষঙ্গ হলো জমি ও দালান বন্ধক রাখা। জমি ও দালানের বন্ধক প্রক্রিয়ায় ব্যাংকার যখনই জড়িত হয় তখন যেন শতসহস্র ঝুঁকি নতুন করে কাঁধে নেয়া হয়। কারণ দেশে

ব্যাংকের প্রধান ব্যবসাই হলো আমানত সংগ্রহ করে তা ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করে সুদ বা মুনাফা আয় করা। ঋণ দেয়া মানে ঝুঁকি নেয়া। ব্যাংকার চায় যতটুকু সম্ভব ঝুঁকি কমাতে। আর ঝুঁকি কমানোর একটি জুতসই অনুষঙ্গ হলো জমি দালান বন্ধক রাখা। জমি দালানের বন্ধক প্রক্রিয়ায় ব্যাংকার যখনই জড়িত হয় তখন যেন শতসহস্র ঝুঁকি নতুন করে কাঁধে নেয়া হয়। কারণ দেশে বন্ধকি জমি বিক্রি করে অর্থাৎ ফোরক্লোজার করে গ্রাহকের দেনা সমন্বয় করা মানে একটি দুর্গম গিরিপথে পাড়ি জমানো। -১০ বছর পথ চলার পরও ব্যাংকারের পথচলা শেষ হয় না, যা দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ফোরক্লোজারের অন্তহীন সমস্যার ফসল। ফলে ব্যাংক খাত ধুঁকছে অর্থনীতিও গুমরে মরছে।

দেনাদার দেনা শোধ করতে ব্যর্থ হলে লোনের জামানত হিসেবে প্রদত্ত বন্ধকি সম্পত্তি দখল বা বিক্রয়ের মাধ্যমে দেনা সমন্বয় প্রক্রিয়াকে ফোরক্লোজার বলা হয়। ব্যাংকার পাওনা আদায়ের জন্য শতচেষ্টা করে ব্যর্থ হলে সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে ফোরক্লোজারে যেতে বাধ্য হয়। আমাদের দেশে ব্যাংকার ফোরক্লোজারের প্রক্রিয়ায় গেলে তাকে অবশ্যই অর্থঋণ আদালত আইনের আওতায় তা সম্পন্ন করতে হয়।

বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রয় করে ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকার যখনই আদালতে যায় গ্রাহকের তখন যেন আনন্দের শেষ থাকে না, কারণ আদালতে যাওয়া মানে ব্যাংকারের জ্বালাতন থেকে একদিকে রেহাই পাওয়া হয়, অন্যদিকে মামলা নিষ্পত্তির জন্য কম সে কম এক যুগ সময় তো পাওয়া যাবে! আইনি প্রক্রিয়া জটিল দীর্ঘসূত্র হওয়ার কারণে ব্যাংকার আটঘাট বেঁধে বন্ধক নিয়ে থাকলেও সে সুফল ব্যাংকার সহজে পায় না। খেলাপি ঋণ বাড়তেই থাকে, ব্যাংকারের নাভিশ্বাস হয়, আর ঋণখেলাপি বীরদর্পে সম্মানের সঙ্গে নির্লিপ্ত জীবনযাপন করেন। আইনের জটিলতা থেকে ফোরক্লোজারকে স্বস্তি দেয়ার জন্য অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩- একটি যুগান্তকারী ধারা সংযোজন করা হয়, তা হলো ১২ ধারা। ধারায় বলা হলো—‘কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উহার নিজ দখল বা নিয়ন্ত্রণে থাকা বিবাদীর কোনো সম্পত্তি যাহা পণ বা বন্ধক রাখিয়া ঋণ প্রদান করা হইয়াছে এবং যাহা বিক্রয় করিবার আইনগত অধিকার বাদীর রহিয়াছে বা বাদীকে অর্পণ করা হইয়াছে, উহা বিক্রয় না করিয়া এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঋণ পরিশোধ বাবদ সমন্বয় না করিয়া অর্থঋণ আদালতে কোনো মামলা দায়ের করিবে না।

মনে হবে ওই ধারা ফোরক্লোজারের প্রক্রিয়া সহজ করে দিল। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। ওই ধারা মোতাবেক বন্ধকি সম্পত্তি ব্যাংকার সরাসরি বিক্রয়ের জন্য যখন নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেন তখন দেখা যায় হয় উচ্চ আদালতের আদেশে তা স্থগিত হয়ে যায়, না হয় ক্রেতার অভাবে নিলাম প্রক্রিয়া নিষ্ফলা হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকারকে ওই আদালতের সনাতনী প্রক্রিয়ায়ই যেতে হয়। ওই ১২ ধারার সুফল ঘরে তুলতে পারার নজির নেই বললেই চলে।

ওই নিলাম প্রক্রিয়া স্থগিত চেয়ে যখন উচ্চ আদালতে রিট করা হয়, তখন মাঝেমধ্যে দেখা যায় আদালত স্থগিত আদেশের সঙ্গে একটি শর্ত জুড়ে দেন, আগামী এত মাসের মধ্যে এত টাকা ব্যাংকে পরিশোধ করতে হবে। ধরনের আদেশ অনেকটা যুগান্তকারী হলেও তার সুফল ব্যাংকের ঘরে ওঠে না, কারণ ওই আদেশ বিবাদী না মানলে তার কী শাস্তি হবে তার কোনো বিধান থাকে না।

আর নিলাম প্রক্রিয়ায় ক্রেতা পাওয়া না যাওয়ার অনেক যুক্তিসংগত কারণ থাকে। যেমন নিলামে যদি উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ আসে, তখন নিলামে জমাকৃত জামানতের টাকা আটকে যায়; বড় সিকিউরিটি কেনার জন্য ক্রেতা থাকে না; ছোট সিকিউরিটি কেনার জন্য ক্রেতা থাকলেও হয়তো ওই সময়ে কেনার জন্য আগ্রহী ক্রেতার পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান থাকে না; আইনি জটিলতার কারণে সাধারণ লোকরা নিলাম ক্রয়কে ঝামেলাপূর্ণ মনে করে ইত্যাদি।

শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মামলাতেই যেতে হয় ব্যাংকারকে। আর মামলায় যাওয়া মানে ১০-১২ বছর ঝুলে থাকা। ১০-১২ বছর পর যদিও মামলাটা নিষ্পত্তি হয়, এর পরও কি সবকিছুর শেষ হয়? মোটেও তা নয়। আদালত নিলাম দিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। কয়েকবার নিলাম দেয়ার পর কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া না গেলে অথবা কোনো ক্রেতা পাওয়া না গেলে আদালত ওই সম্পত্তি ৩৩() ধারায় ব্যাংকারের কাছে ন্যস্ত করেন। অর্থাৎ সে দুর্গম গিরি ১০-১২ বছর পর পার হয়েও নিস্তার হলো না, আবার ঘুরেফিরে যেন কেঁচে গণ্ডুষ করা হলো। আদালতের সার্টিফিকেট মূলে ফোরক্লোজারের সম্পত্তির দখল ভোগের অধিকার এখন ব্যাংকারের আছে বটে, সম্পত্তি যতক্ষণ বিক্রি হচ্ছে না খেলাপি ঋণের লেজারের পাতা লালই রয়ে গেল, কালো আর হলো না।

৩৩() ধারা মোতাবেক ব্যাংকার সম্পত্তির দখল ভোগের অধিকার পাওয়ার পর কোনো কারণে সম্পত্তিটি বিক্রয় করা না গেলে ৩৩()() ধারা অনুযায়ী ন্যস্ত হইবার (ছয়) বছরের মধ্যে আদালতের কাছে লিখিত আবেদন করে উক্ত সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করা যাবে এবং তা না হলে (ছয়) বৎসর উত্তীর্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গেই উক্ত সম্পত্তিতে ডিক্রিদারের মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বর্তিত হবে। অর্থঝণ আদালতের এখানেই দায়িত্ব শেষ, কিন্তু শেষ হলো না ফোরক্লোজার, যার জন্য এত ঢাকঢোল পেটানো হলো প্রায় এক যুগ ধরে।

ব্যাংক বন্ধকি সম্পত্তির মালিক হওয়ার পর সে সম্পত্তি অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত ধরে রাখারও জো নেই। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ১০ ধারা বলছে, কোনো স্থাবর সম্পত্তি, উহা যেভাবেই অর্জিত হইয়া থাকুক না কেন, কোনো ব্যাংক কোম্পানি, উহা অর্জনের তারিখ হইতে সাত বৎসর বা এই আইন প্রবর্তনের তারিখ হইতে সাত বৎসর, যাহা পরে শেষ হয়, এর অধিক সময়সীমা অতিক্রান্ত হইবার পর স্বীয় অধিকারে রাখিবে না।

তাহলে উপায় কী। ফোরক্লোজারের শেষ পরিণতি কি ব্যাংকার জানে না। উন্নত দেশগুলোয় ঋণ আদায়ের জন্য মামলা-মোকদ্দমায় যেতে হয় না। ঋণখেলাপি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে অ্যাসেট হস্তান্তরকরত সঙ্গে সঙ্গে ঋণ সমন্বয় করে ফেলে। শক্তিশালী অ্যাসেট লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি থাকায় ওসব দেশে দীর্ঘকাল খেলাপি ঋণ নিয়ে ধুঁকতে হয় না। সবকিছু এখানে তৃতীয় পক্ষই করে। যার কাজ তারই সাজে।

এছাড়া উন্নত দেশগুলোতে ঋণের বীমা ব্যবস্থাও থাকে। ঋণ আদায় না হলে কিংবা গ্রাহক মৃত্যুবরণ করলে কিংবা গ্রাহক দেউলিয়া হয়ে গেলে বীমার কভারেজ থেকে বীমা দাবি পাওয়া যায়, যা দিয়ে ঋণ সমন্বিত হয়। আমাদের দেশে ধরনের বীমা ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি। ক্রেডিট কার্ডে ব্যাংক বীমা সুবিধা পায়। অন্য ঋণে বীমা সুবিধা চালু করলে বীমার বাজারও প্রসার লাভ করবে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণও কমবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পদের তুলনায় দেনার পরিমাণ বেড়ে গেলে ওই প্রতিষ্ঠান কিংবা পাওনাদাররা চ্যাপ্টার কিংবা চ্যাপ্টার ১১-এর আওতায় দেউলিয়া আদালতে যায়। আদালত ট্রাস্টি নিয়োগ করে। ওই ট্রাস্টি দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানের সব সম্পদ বিক্রয় করে পাওনাদারদের কাছে বণ্টন করে দেয়। আমাদের দেশে দেউলিয়াবিষয়ক আইন, ১৯৯৭ বলবৎ আছে। আদালতের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক নয়। দেউলিয়া আইন বা আদালতকে শক্তিশালী করা গেলে হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আর যে ফোরক্লোজারের জন্য ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে তারও অনেকটা সুরাহা হবে।

দেশে অনেক বড় বড় অংকের ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা করে ঋণ আদায়ের চেষ্টায় আছে। ওইসব ঋণের বিপরীতে বন্ধককৃত সম্পত্তির মূল্য অনেক কম। অর্থাৎ ওইসব গ্রাহক দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন অনেক আগেই। অথচ ব্যাংকগুলো ওইসব ঋণ পাহারা দিয়ে বসে আছে। ওইসব ঋণকে অবলোপন করা হলে ব্যাংকের শক্তি বাড়বে। তাই দেউলিয়া আইনকে ব্যাংকের উপযোগী করে সাজানো প্রয়োজন যাতে ফোরক্লোজার ত্বরান্বিত হয় এবং ব্যাংকের অনাদায়যোগ্য ঋণের একটা ফয়সালা হয়।

বর্তমানে অর্থঋণ আদালতে যে মামলা পেন্ডিং রয়েছে তার স্যুটভ্যালু প্রায় লাখ কোটি টাকা। ঋণ আদায় না হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে শত কোটি টাকার রাজস্ব, আমানতকারীরা হারাচ্ছেন সুদ বা মুনাফা, আর শেয়ারহোল্ডাররা বঞ্চিত হচ্ছেন কাঙ্ক্ষিত ডিভিডেন্ড থেকে। অথচ ফোরক্লোজারকে আধুনিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা গেলে ওই টাকা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

তাহলে করণীয় কী: অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পনিকে যদি বন্ধকি সম্পত্তি কেনার জন্য এবং বিক্রির জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় ফোরক্লোজারের জন্য ব্যাংকারকে আদালতে দৌড়াতে হয় না, আর স্বল্পসময়ের মধ্যে ফোরক্লোজার প্রক্রিয়া শেষ হতে পারে। ব্যাংক বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দিলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো নিলামে অংশ নেবেন এবং তারা মামলা বা ঋণ আদায় প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হবেন। ধরনের কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন পড়বে, আর তা সংগ্রহের জন্য সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তাছাড়া ঋণ প্রদানের সময় ঝুঁকি কভার করার জন্য বীমা প্রথা চালু করা অত্যাবশ্যক। কারণ গ্রাহকের মৃত্যুর কারণে অনেকে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে আছে যা বীমা দ্বারা আচ্ছাদিত করা যেত। আধুনিক ফোরক্লোজারের জন্য আইনের একটু সংস্কার দরকার। এতে দেশে রিয়েল এস্টেটের নতুন একটা বাজারও সৃষ্টি হবে। খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায় হবে, ব্যাংকের শক্তি বাড়বে, অর্থনীতি আরো দ্রুত সচল হবে এবং সর্বোপরি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নতুন একটা দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আদালতবহির্ভূত পন্থায় ফোরক্লোজারই হতে পারে ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়ানোর টার্নিং পয়েন্ট।   

 

. এসএম আবু জাকের: ব্যাংকার; নৈতিক ব্যাংকিংসহ একাধিক গ্রন্থের লেখক

আরও