প্রয়োজন কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বাস্তব সক্ষমতা। এ পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। বহু বছর ধরে এ শিল্পই দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি, শিল্পায়নের মুখ ও লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। ফলে নতুন অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পোশাক শিল্পের জন্য কেমন বাজেট প্রয়োজন?
নতুন সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সরকারকে এক ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রচলিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে সরকার নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন করেছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে শিল্প খাতকে কেন্দ্র করেই এগোতে হবে। শিল্প খাতের মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পকে বাদ দিয়ে সে পরিকল্পনা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ শিল্প বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। ফলে এবারের বাজেট শুধু একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি হবে আগামী কয়েক বছরের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশের দিকনির্দেশনা।
জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা সবচেয়ে বড় যে সংকট হয়ে শিল্প খাতকে ভোগাচ্ছে। প্রায় দেড় দশক ধরে শিল্প-কারখানাগুলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প এবং এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতে (সুতা, কাপড়, ডায়িং ও অ্যাকসেসরিজ) উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন জ্বালানি সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি রফতানিনির্ভর শিল্পের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতা। তাই এবারের বাজেটে জ্বালানি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর না করে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা নেয়া জরুরি। বহু বছর ধরে দেশে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। এখন সময় এসেছে সে স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাবনা ব্যাপক। কিন্তু বর্তমানে সোলার পিভি সিস্টেম স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে যে উচ্চহারে শুল্ক ও কর রয়েছে, তা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। এসব যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী হবে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, শিল্পে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসবে।
জ্বালানির পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণ। বর্তমানে শিল্পঋণের সুদহার অনেক ক্ষেত্রেই ১৪ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এমন চড়া সুদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শুধু পোশাক শিল্প নয়, সামগ্রিক ব্যবসা খাতই এর চাপে রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগে অনেকেই সাহস পাচ্ছেন না। তাছাড়া রফতানিমুখী শিল্পের জন্য কার্যকর মূলধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে সময়মতো কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু ঋণের ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে। তাই বাজেটে শিল্পঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নয়ন, জ্বালানি দক্ষতা ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে বিশেষ স্বল্পসুদি তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ এখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের দোরগোড়ায়। সরকার হয়তো আরো কিছু সময়ের জন্য ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করছে। বাস্তবতা হলো, একসময় না একসময় এ উত্তরণ ঘটবেই। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা ও নগদ প্রণোদনার অনেক কিছুই থাকবে না। কয়েক বছর ধরেই নতুন বাজারে রফতানির জন্য দেয়া প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা ধীরে ধীরে কমানো হয়েছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কীভাবে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখবে? এখানে প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকানো জরুরি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তাদের রফতানি খাতকে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা, অবকাঠামোগত সহায়তা ও কর সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থা ও বিদেশী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ফলে বাংলাদেশ যদি নীতিগত সহায়তা কমিয়ে দেয়, তাহলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এ বাস্তবতায় করনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদ্যোক্তারা চাইছেন করপোরেট ট্যাক্স ১২ শতাংশে রাখা হোক এবং উৎস কর শূন্য দশমিক ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকুক। একই সঙ্গে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে করের চাপ কমানো প্রয়োজন। কারণ মূল পোশাক শিল্পকে শক্তিশালী করতে হলে স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদনকারী শিল্পগুলোকেও টিকিয়ে রাখতে হবে। অন্যথায় আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে।
শুধু করনীতি নয়, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করাও জরুরি। বর্তমানে বন্দর জট, কাস্টমস জটিলতা, বন্ড সুবিধা পাওয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং এইচএস কোড-সংক্রান্ত সমস্যায় শিল্প-কারখানাগুলোকে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহেও অপ্রয়োজনীয় বাধা তৈরি হয়। এসব সমস্যা সমাধানে পুরো কাস্টমস এবং বন্ড ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও সমন্বিত কাঠামোয় নিয়ে আসতে হবে। লজিস্টিক খাতের দুর্বলতাও শিল্পের বড় বাধা। বন্দরে কনটেইনার জট কমানো, দ্রুত পণ্য খালাস ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু কম দামে পণ্য চান না; তারা সময়মতো ডেলিভারি ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও চান। ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন এখন বিলাসিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা এখন টেকসই উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে। তাই ইটিপি, ডব্লিউটিপি, আরও প্লান্ট ও অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক রেয়াত অব্যাহত রাখা জরুরি। নতুন প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা গেলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আরো গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
বর্তমান সরকার বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইতিবাচক। এসব প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের জন্য আর্থিক ও নীতিগত সহায়তার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে তা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে উৎপাদন আবার চালু করতে সহজ শর্তে ঋণ, করছাড় ও পুনর্গঠন সুবিধা দিতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা। আগামী ৫-১০ বছরের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে একটি বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এজন্য সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে, যেখানে শিল্পমালিকদের পাশাপাশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত, শ্রমিক প্রতিনিধি, পরিবহন খাত, অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
পোশাক শিল্প কেবল রফতানি আয়ের উৎস নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। এ শিল্পে যত বিনিয়োগ বাড়বে, তত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় বাড়বে, অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী হবে এবং অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল হবে। তাই এবারের বাজেট শুধু সংখ্যার না হয়ে একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক বার্তা হোক। বাংলাদেশ শিল্পায়নের পথেই এগোতে চায়। সে যাত্রার অগ্রভাগে থাকবে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প।
আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ