অভিমত

রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারসহ উন্নয়নে প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও নবীনের শক্তি কাজে লাগাতে হবে

সম্রাট ও সাম্রাজ্য শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। কারণ সাম্রাজ্যের অধিপতি না হলে সম্রাট হওয়া যায় না। পাশাপাশি সম্রাটের জৌলুস বৃদ্ধি পায় সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ ধরে।

সম্রাট ও সাম্রাজ্য শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। কারণ সাম্রাজ্যের অধিপতি না হলে সম্রাট হওয়া যায় না। পাশাপাশি সম্রাটের জৌলুস বৃদ্ধি পায় সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ ধরে। বর্তমান জমানায় বিশ্ব মোড়ল ও তাদের সহযোগী আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো সেই একই কাজ সমাধা করে থাকে ছলে-বলে-কলাকৌশলে। প্রাচীনকালে সাম্রাজ্য বিস্তারের নিমিত্ত নেপোলিয়ন কিংবা আলেকজান্ডারের মতো মহামতি সম্রাটরা যখন তখন বিভিন্ন ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান পরিচালনা করত। যুদ্ধবিগ্রহের কারণে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হতো। সরাসরি হুমকির সম্মুখীন হতো সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসী এ মনোভাব সরাসরি বিশ্ববাসীর দৃষ্টিগোচর হতো। বিভিন্ন সম্প্রদায় তাদের ধিক্কার জানাত। তাই সময়ের আবর্তে পাল্টেছে তাদের আগ্রাসনের কলাকৌশল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাভাবনার এ ধরন অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। দেখা যায়, কখনো চলছে স্নায়ুযুদ্ধ আবার কখনো-বা চলছে কূটনৈতিক কৌশলের খেলা। এতে বন্ধু সেজেও প্রতিপক্ষ বা কাঙ্ক্ষিত একটি রাষ্ট্রকে অতি সহজেই বাগে আনা যায়। স্বাধীনতার ছদ্মাবরণে রাষ্ট্রটিকে পরাধীনতার শিকলে বন্দি রেখে সহজেই সিদ্ধি করা যায় নিজেদের স্বার্থ। আর যদি ওই রাষ্ট্রে পাওয়া যায় তেল-গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ, সহজলভ্য ও সস্তা জনবল কিংবা সেখানে মিলে যায় ভূরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহজ-সরল সমীকরণ তবে তো কথাই নেই। একেবারে সোনায় সোহাগা। আমার প্রিয় জন্মভূমি এ বাংলাদেশও বহু বছর ধরে এমন একটি হিসাব-নিকাশের বেষ্টনীতে আবদ্ধ আছে। বিশ্ব মোড়ল ও আঞ্চলিক উদীয়মান শক্তিগুলোর কঠোর নজরদারি দেশটির পেছনে ধাওয়া করছে।

এমন প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোকে অবলম্বন করতে হয় কতিপয় কৌশলী পন্থা। এর অন্যতম হচ্ছে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের যুব সমাজকে বিপথগামী করা। এ উদ্দেশ্য সাধনে সুকৌশলে হাতে নেয়া হয় সুনির্দিষ্ট কিছু এজেন্ডা। যেমন কোনো একটি জাতির যুব সমাজের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো, তাদেরকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে রাখা, জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম ধ্বংস করা, নেশা দ্রব্যাদির অবাধ ব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরনের অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসন ওই জাতির যুব সমাজের মাঝে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা যা বিগত বছরগুলোয় আমাদের দেশে অনেকটাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এরপর যেটি বাকি থাকে সেটি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের চোখে রঙিন চশমা পরিয়ে জীবনটাকে তাদের কাছে ফানুসের মতো উপভোগ্য করে দেখানো যা সাম্প্রতিককালে ভয়াবহ রূপে দৃশ্যমান। বিষয়গুলো এভাবে দিনের পর দিন ক্রমবর্ধমান থাকলে সভ্য ও শিক্ষিত একটি জাতি কালেভদ্রে নৈতিক স্খলনের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যায়। তখন অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় তাদের হিতাহিত জ্ঞান এবং মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ। মন্দের চাকচিক্য সেখানে কদর লাভ করে। পঞ্চ রিপুর তাড়নায় আবিষ্ট হয়ে তারা বিভোর থাকে শুধু দিবাস্বপ্ন পূরণ ও সাময়িক ভোগবিলাসের মেকানিজম প্রতিষ্ঠায়। অর্থবিত্ত, ক্ষমতার হাতছানি ও খবরদারির স্বাদ তাদের পুরোদমে পেয়ে বসে। গুরুজনদের তারা সমাজের অপাঙ্ক্তেও অংশ বলে বিবেচনা করে। সর্বক্ষেত্রে তারা আরোপ করতে চায় তাদের চেতনার বাণী। অনেক ক্ষেত্রে পরকাল কিংবা বিচার দিবসের কথাবার্তা তাদের কাছে কেবল হাসি-ঠাট্টার জোগান দেয়। তাদের বিশ্বাস আগে নগদ, পরে বাকির খাতার হিসাব। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবন বলতেও আদতে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। সামাজিক জীবনেও তারা করে বেড়ায় বিভিন্ন ধরনের অনাচার ও অরাজকতা। দেশের সরকার, প্রশাসনিক কাঠামো, বলবৎ আইন-কানুনসহ কোনো কিছুকেই তারা আর তোয়াক্কা করে না। তারা শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ জনতাকে বিভ্রান্ত করে বেড়ায় নিজেদের আখের গোছানোর উদ্দেশ্য নিয়ে। নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মতামতকেই তারা দেশের অলিখিত সংবিধান বলে চাপিয়ে দিতে চায়। নিজেদের মনে করে খুব চালাক এবং প্রতিপক্ষকে ভাবে খুব বোকা। সুযোগ বুঝে তাতে ইন্ধন জোগায় সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের দেশীয় কুশীলবরা। মূলত এগুলো মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস মাত্র। যে সমাজে গুরুজন ও বয়োজ্যেষ্ঠ গুণীর কোনো কদর নেই সে সমাজের পতন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়। ইতিহাস তাই-ই বলে আসছে। তদুপরি মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। মূলত এটাই মানুষের পঞ্চ রিপুপ্রসূত সহজাত প্রবণতা।

এর ফলে ক্রমবর্ধমান অরাজকতা থেকে এমন এক পরিস্থিতি জন্ম নেয় যে পদস্খলিত জনগণ এক সময় সরকার কিংবা রাষ্ট্র নেতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেকটা এমনই হয়েছিল আদ, সামুদ বা কওম-ই-লুতের (আ.) জামানায়, যখন আসমানি ও জমিনি বালা-মুসিবত আসা ফরজ হয়ে গিয়েছিল। এক সময় দেখা যায়, উদ্ধত জনতার ওপর সরকারি প্রশাসন যন্ত্র এবং আইন প্রয়োগকারী সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর মাধ্যমে বল প্রয়োগেও কোনো পরিবর্তন কার্যকর হয় না বরং হিতে বিপরীত কাণ্ড ঘটে। তখন প্রয়োজন হয়ে পড়ে বহির্বিশ্বের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার। আর তখনই শান্তির বার্তাবাহী বিশ্ব মোড়ল ও তাদের সহযোগী আঞ্চলিক সুপার পাওয়ারগুলো সুযোগটিকে পুরোপুরি লুফে নেয়। শুরু হয়ে যায় হালুয়া-রুটি ভাগ-বাটোয়ারার খেলা। এভাবেই বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে স্বাধীন ও সার্বভৌম বিভিন্ন রাষ্ট্রে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অজুহাতে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কিংবা গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধারের তকমা ব্যবহার করে তারা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে ফেলে দেয় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে। গত্যন্তর না দেখে নতজানু সরকারগুলোকেও এক সময় বেছে নিতে হয় নীরব ও শর্তহীন আত্মসমর্পণের পথ। এর ফলে দেশগুলোয় আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোর সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ অনেকটাই প্রশস্ত হয়ে যায়। সামরিক আগ্রাসনের মতো ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জিং পদক্ষেপ উপেক্ষা করেও এভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপনিবেশবাদ কায়েমে তাদের আর কোনো প্রতিবন্ধকতাই থাকে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর আগ্রাসনের এ ধারা অনেকটা সাধারণ একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। তাই বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোকে এ ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় লাখ লাখ মানুষের প্রাণ ও বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ মহান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিভিন্ন ঠুনকো অজুহাতে হতে পারে হুমকির সম্মুখীন যা কোনোভাবেই হতে দেয়া যাবে না।

তাই ক্রমবর্ধমান এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণকেই উদ্ভাবন করে নিতে হয়। রাষ্ট্র আমার, দেশ আমার, সমাজ আমার। কাজেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও আমার। নিজেরা সরব ও সচেষ্ট না হলে অন্য কেউ এসে নিজেদের দেশকে রক্ষা করবে না। কথায় বলে, সন্তান না কাঁদলে জন্মদাত্রী মাও তাকে দুধ দেয় না। তাই এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়ে দ্রুতগতিতে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর জনগণের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন সুস্থ পারিবারিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য উপযুক্ত কাউন্সেলিং ও প্রশিক্ষণ। তাদের বেড়ে উঠতে হবে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের প্রকৃত শিক্ষার মধ্য দিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য বিষয়ে সচেতন হওয়ার ওপর অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করা অপরিহার্য। পাশাপাশি সরকারিভাবে অব্যাহত রাখতে হবে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা। উপরন্তু সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের সহযোগিতায় তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও আবেগিক স্বাস্থ্য, তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ ও দেশাত্মবোধের উন্নয়নে বহুমুখী কাউন্সেলিং, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। এক্ষেত্রে স্মরণীয় যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একজন নাগরিককে প্রদত্ত সামরিক প্রশিক্ষণ ঠিক তখনই পুরোপুরি সফল হয় যখন পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি শিশু দেশাত্মবোধের প্রকৃত শিক্ষা ও চেতনায় বেড়ে ওঠে। অন্যথায় দেশপ্রেমের ফাঁকা বুলির আড়ালে অবচেতন মনে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে তারা দেশকে বিক্রিও করে দিতে পারে। উপযুক্ত কাউন্সেলিংয়ে কাজ না হলে প্রয়োজনে কোমলমতি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ছেলেমেয়ের কঠোর শাসনের আওতায় আনতে হবে যার কোনো বিকল্প নেই। গ্রাম্য প্রবাদে আছে, সোজা আঙ্গুলে কখনও ঘি ওঠে না।

অন্যদিকে জেনারেশন গ্যাপ বলে একটি বিষয় আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সমাজের প্রবীণদের পুরনো অনেক ধ্যানধারণার সংস্কার সাধন প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে বোঝাতে হবে যে আজকের নবীনরাই আগামী দিনের প্রবীণ। কাজেই গুরুজনদের অবজ্ঞা করলে জগতের চিরাচরিত নিয়মে আগামী দিনে একই পরিণতি তাদেরও বরণ করে নিতে হবে। অতএব রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারসহ যেকোনো উন্নয়নে প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও নবীনের উদ্যম এবং শক্তিকে সমন্বয় করে একযোগে কাজ করার বিকল্প নেই। এতে করে দেশ ও সমাজ দ্রুতগতিতে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। অবারিত শান্তির সদা বহমান ঝরনাধারা সেখানে বিরাজ করে। আর ঠিক তখনই স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রে জনগণ বৈষম্যমুক্ত পরিবেশে উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। অন্যথায় শকুনের কালো থাবা পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে করে দিতে পারে তছনছ।

ড. মো. এরশাদ হালিম: শিক্ষক ও গবেষক, সিন্থেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালস, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও