আলোকপাত

নির্বাচিত সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করে বিএনপির দলীয় সরকার গঠন করা হয়েছে। নতুন সরকার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

কাজেই উত্তরাধিকার সূত্রে এ সরকার কী কী সমস্যা পেয়েছে তা আগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু অনুকূল অর্থনৈতিক অবস্থা পেয়েছে। আবার কিছু মন্দ বা খারাপ অবস্থাও পেয়েছে। বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থনীতির যেসব ভালো দিক পেয়েছে তার মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতি। আওয়ামী লীগ সরকার চলে যাওয়ার পর পরই একপর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অস্বাভাবিকভাবে কমেছিল। নানাভাবে চেষ্টার ফলে বিশেষত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মুদ্রা মানের অবমূল্যায়নের প্রেসক্রিপশন অনুসরণের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রফতানি বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতি ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে স্বস্তিদায়ক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতি পেয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ সব অনিশ্চিত করে দিয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান নতুন সরকার খারাপ যেটা পেয়েছে তা হলো আইএমএফ প্রদত্ত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ যখন পড়বে তখন রিজার্ভের স্ফীতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। অবমূল্যায়নের জন্য চাপ আরো বাড়তেও পারে। সব আমদানি দ্রব্যের দাম অনেক বেশি বেড়েছে, ফলে ‘কস্ট পুশ’ ইনফ্লেশনের চাপও বর্তমানে বেশি। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ভালো অবস্থায় থাকার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি ব্যয় মেটাতে হয়তো আশু অসুবিধা হবে না, কিন্তু যখন বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ পড়বে তখন অসুবিধা হতে পারে। সুতরাং বর্তমান নতুন সরকার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা এবং ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়ে গেলে এ চাপ আরো বেড়ে অসহনীয় হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের একটি আশঙ্কা ও অস্বস্তি সরকারের মধ্যে আছে!

আওয়ামী লীগ সরকার যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় দীর্ঘকাল ধরে অগণতান্ত্রিকভাবে আসীন ছিল, তখন তারা ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের আওতায় নানা দুর্নীতি ও লুটপাটের একটি ফ্রি স্টাইল আবহাওয়া সৃষ্টি করেছিল, যার মাত্রা পরবর্তী সময়ে কিছুটা প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ পরিমাপের চেষ্টা ‘শ্বেতপত্রে’ অর্থনীতিবিদরা করেছিলেন। বছরে ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার পাচারের কথাও আমরা শুনেছি। সেই প্রবণতা সহজে দূর হওয়ার নয়। কারণ এর পক্ষে সমাজে বিদ্যমান কায়েমি স্বার্থের ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামো এখনো দৃঢ় কোনো আঘাত করা বা ভাঙা সম্ভব হয়নি। দেশের অর্থনীতিতে লুটপাট ও অল্প কিছু লোকের মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া স্বাধীনতার পর থেকেই কম-বেশি চালানো হয়েছিল। সবসময় রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদ লুটপাট ও অপচয় করার বিষয়টি নানা কায়দায় অব্যাহত ছিল। সরকার সমর্থিত কতিপয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ আমলা ও উচ্চ রাজনৈতিক আসনে আসীন ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা তাদের ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় খাত, বাজার, মেগা প্রকল্প ও ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটপাট সবসময়ই কম-বেশি চালিয়ে আসছিলেন।

১৯৭২ থেকে ৭৫ সালেও নব্য ধনিক শ্রেণীর উদ্ভবের কথা বামপন্থীরা বলতেন। কিন্তু শ্রেণী হিসেবে তারা সুসংগঠিত হাউজে বা ক্রোনি গোষ্ঠীর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর। যখন থেকে ব্যক্তিগত মালিকানা ও সম্পদের সব সিলিং পুঁজিবাদী বিকাশের আওতায় সম্পূর্ণ উঠিয়ে দেয়া শুরু হয়। নব্য চীনের/রাশিয়ার মতো বলা শুরু হয় ‘get rich’। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে ব্যাংক খাত। সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যাংকে সাধারণ মানুষের টাকা জমা রাখা হয়, সরকার ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এসব ব্যাংকের মালিক। তারা তাদের টাকা ধার নেন ও ধার দেন এবং তা দিয়ে তাদের আয় হয়, কিন্তু টাকাটা তারা শোধ করেন না। এটা বিশেষত রাঘব বোয়ালরাই করেন এবং ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামো ব্যবহার করে শাস্তি এড়িয়ে যান। ব্যাংক খাতে লুটপাট চালানোর জন্য তারা দুটি কাজ করেছিল। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংক খাতকে নিয়ন্ত্রণ করে তাই তারা চেষ্টা করেছিল কীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের বোর্ডকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করেছেন। তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি তাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকে তাহলে রাজনৈতিক রাঘব বোয়ালরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সহজে বিনা শাস্তিতে খেলাপি হতে পারবে না। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সেই সংস্কার প্রচেষ্টা সফল হয়নি বা আংশিক সফল হয়েছিল মাত্র। এ সরকার ব্যাংক খাতকে স্বাভাবিক ধারায় নিয়ে আসার জন্য খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা করে। কিস্তু আমরা দেখেছি তারা খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে পারেনি। হাসিনার আমলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে এ নিয়ে অনেক অকার্যকর প্রস্তাব তারা অনেক দিয়েছেন ও বিস্তর লিখেছেন!

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নানা ধরনের আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখার চেষ্টা করা হতো। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে সেই লুকানো খেলাপি ঋণ মাপার ক্ষেত্রে আইএমএফের পদ্ধতি ব্যবহার করা শুরু হয়। ফলে এ ঋণের প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশ্যে চলে আসে। ফলে খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি বলে প্রতিভাত হয়। অবশ্য একটি ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত আপত্তিকর কাজ করেছে। জাতীয় নির্বাচনের তিন মাস আগে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দুই বছরে গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দেয়া হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপিদের এমন সুযোগদানের বিষয়টি পুরনো ত্রিভুজ কাঠামোকেই বহাল রাখতে সহায়ক হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নানা মহলে তা আশা ভঙ্গ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ আমলে আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। ঋণখেলাপিদের এ ধরনের সুযোগ দেয়ায় তারা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ লাভ করে এবং তখনই এর ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছিল।

গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ১০৭ কোটি টাকায়। একই সময়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৮৫ কোটি থেকে কমে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকায় নেমে আসে। বিদেশী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ একই সময়ে ৩ হাজার ২৩৯ কোটি থেকে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকায় হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। ব্যাপকভাবে পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দেয়ার কারণেই ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনপেক্ষ পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা কমে গেলেও আসলে কার্পেটের তলে তা থেকেই গিয়েছে। এটাকে প্রকৃত সুশাসন না বলে দুঃশাসনের কাছে পরাজয় বলাই ভালো।

বর্তমান নতুন সরকারকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এ আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ‘ত্রিভুজ-খেলাপি ঋণের’ সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনা না গেলে ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। বর্তমান সরকার অমীমাংসিত এবং ক্রমবর্ধমান ব্যাংক সমস্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধান করে দ্রুত এ খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন সরকারের প্রাথমিক তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের সমস্যা যেভাবে সমাধান করতে চেয়েছিল নতুন সরকার সেভাবে সমাধান করতে চাইছে না। আগের সরকার চেয়েছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংক গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদকে সাংবিধানিক পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। কিন্তু নতুন সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা শুদ্ধ রাজনীতির কথা বলছেন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্তৃত্বের দ্বারা সব সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে দাবি করছেন।

তবে এরই মধ্যে বর্তমান সরকার একটি বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণের প্রশ্নে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে কর্মচারীদের বিক্ষোভকে (হয়তো তা ন্যায়সংগতও হতে পারে!) ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরকে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বাধ্য করল। এটা এভাবে কখনই কাম্য ছিল না। যেহেতু বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত একটি সরকার তাই তারা জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ এবং অপসারণ-সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়ন করতে পারত। সেই আইনের বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ করা যেত। কর্মচারীদের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক হয়নি। সরকারের এ পদক্ষেপ পুরো ব্যাংক খাতকে স্তম্ভিত করেছে। আগামীতে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। ড. আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ করে যাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তার যোগ্যতা এবং দক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে, যিনি ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো জানেন তাকে নিয়োগ দেয়াটাই ছিল কাঙ্ক্ষিত। আমি বলব, খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে এ সরকার শুরুতেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অবশ্য চূড়ান্ত বিচারে বৃক্ষের পরিচয় পাওয়া যাবে তার ফলে। আমি ভুল প্রমাণ হলে খুশিই হব। তবে আমি মনে করি রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ও উপরে ব্যবসায়ী হাউজগুলোর প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে গভর্নরের স্বাধীনতার মাত্রা।

আমার দৃষ্টিতে নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনীতিতে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। ভোট ধরে রাখতে হলে আগামী পাঁচ বছরে ঠিকমতো সেবা বা সার্ভিস সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। বেশকিছু দিন ধরেই দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি মোটেও ভালো যাচ্ছে না। গত (২০২৪-২৫) অর্থবছরে আমাদের জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আর কখনই এতটা কম হয়নি। সেই বছর ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হয়েছিল জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব মতে, চার বছর ধরেই জিডিপির অনুপাতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হ্রাসকে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির দ্বারা কমপেনসেট করা না গেলে প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে না। প্রবৃদ্ধির হার না বাড়লে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম শুধু ট্র্যান্সফার পেমেন্টের মাধ্যমে সফল করা যাবে না। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে শ্রমঘন ক্ষুদ্র-মাঝারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা। তাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা। সরকারি রাজস্ব উদ্বৃত্ত সৃষ্টি ও তার যথাযথ ফলপ্রসূ বিনিয়োগ সাধন।

বিনিয়োগ একটি মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই কেউই অনিশ্চিত দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশে বিনিয়োগ করতে চাইবে না। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা যদি প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ না করে তাহলে বিদেশী বিনিয়োগ আশা করা যায় না। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা হচ্ছেন, ‘শীতের অতিথি পাখির মতো।’ শীতের অতিথি পাখি যেমন কোনো জলাশয়ে পর্যাপ্ত খাবার এবং নিরাপত্তা না পেলে আশ্রয় গ্রহণ করে না তেমনি বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও কোনো দেশে পর্যাপ্ত মুনাফা এবং পুঁজির নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য জীবনের সুযোগ না পেলে বিনিয়োগ করতে সম্মত হয় না। কিন্তু আমরা তাদের শুধু সুবিধাই দিলাম, নিজের জন্য কোনো সুবিধা নিলাম না, তাহলে চলবে না। দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বহুপক্ষীয় দরকষাকষি না করে খাল কেটে কোনো কুমির ডেকে আনা ঠিক হবে না।

অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু অনির্বাচিত সরকার ছিল, তাই দেশীয় বিনিয়োগকারীরা সেই অনিশ্চিত সময়ে নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ছিলেন দ্বিধান্বিত। তবে সুযোগসন্ধানী বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ছিলেন স্ট্র্যাটেজিক বিনিয়োগে (বন্দর খাতে) অতি তৎপর। এখন নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সব প্রকার বিনিয়োগকারী বর্তমানে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জাতীয় দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত দরকষাকষির ক্ষমতা অর্জন করে তা প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার স্টেশনগুলোয় অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আইন মেনে বিনিয়োগ করতে হবে কিন্তু তাদের যাতে আমলাতান্ত্রিক হয়রানি করা না হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা বিরাজমান রয়েছে। তাদের প্রধান অভিযোগ ছিল অধিক উচ্চ সুদের হার ও সংকোচনশীল মুদ্রানীতি। তবে একটি শুভ লক্ষণ এই যে দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিতর্ক থাকলেও অনুষ্ঠিত নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে এটা বলা যেতে পারে। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলেও ভোটাররা বহু বছর পর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। আন্তর্জাতিকভাবেও নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে। যে ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে, তার কাছেও নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের নিকটও নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে। ফলে সরকার ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু আবার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান সংঘাত চলছে। এতে বিদেশী বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতে পারে। তার পরও বলা যেতে পারে, নির্বাচিত সরকার ভালো স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে সাফল্য প্রদর্শন করতে পারবে—যদি উল্লিখিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে সজাগ ও সচেতন থাকে। তবে সঞ্চয় (সরকারি ও বেসরকারি) আহরণের জন্যও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা যদি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তাদের উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ না করেন তাহলে বিদেশী বিনিয়োগও আসবে না। সরকার যদি উদ্বৃত্ত রাজস্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো তৈরি না করতে পারেন তাহলেও বিনিয়োগ বাড়বে না।

বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে আবার বিতর্কও রয়েছে। যেমন জ্বালানি খাত এবং বন্দর এ দুই স্ট্র্যাটেজিক খাতে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এগুলো কৌশলগতভাবে একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ও বন্দর ব্যবস্থাপনা যাদের হাতে থাকবে তারা সব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ব্যাংক খাতের জন্যও কথাটি প্রযোজ্য। এগুলো যদি শর্তহীন অবাধ মুক্ত বিনিয়োগ ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। প্রথমেই দেখতে হবে এসব খাতে বিনিয়োগের জন্য কারা আসছে? তাদের অন্য কোনো গোপন ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা? দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে এসব খাতে যারা বিনিয়োগের জন্য আসছেন তারা কী শর্তে বিনিয়োগের জন্য আসছে সেটা বিবেচনা করা। শর্তগুলো আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে কিনা। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দর লাভজনকভাবে চলছিল। লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের হাতে দিলে লাভটা আর আমরা পাচ্ছি না। তাহলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের হাতে দেয়া হবে কেন? আমরা যদি একটি প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে চালাতে না পারি তাহলে লাভজনকতা অর্জনের জন্য দক্ষ বিদেশী কোনো কোম্পানির হাতে পরিচালনার ভার দেয়া যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় ছিলেন বিশ্বব্যাংক তখন আমদজী জুট মিল বিরাষ্ট্রীয়করণের জন্য চাপ দিয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান তাতে তখন সম্মতি দেননি। তিনি বলেছিলেন, আদমজী যেহেতু লাভজনকভাবে চলছে তাই আমরা একে বিরাষ্ট্রীয়করণ করব না। পরবর্তী সময়ে এরশাদ ক্ষমতায় এসে আদমজী জুট মিলকে নানাভাবে অবদমিত করার পর তা বিরাষ্ট্রীয়করণ করেন। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়েও এ ধরনের খেলা আমরা লক্ষ করছি। চট্টগ্রাম বন্দর লাভজনকভাবে চলছে। তার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শেষ মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশী কোম্পানির কর্তৃত্বে ছেড়ে দেয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ করেছি। বামপন্থী রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি উত্থাপিত হলে শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশীদের কর্তৃত্বে তুলে দিতে পারেনি। বিদেশী বিনিয়োগ আমাদের প্রয়োজন। তবে সবার আগে দেখতে হবে যে বিনিয়োগ আসছে তা জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে কিনা। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেসব খাত আছে সেখানে বিদেশী বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় সংসদে আলোচনা হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। বিদেশী বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে আলোচনার বিষয়টি শেখ হাসিনার আমলে ছিল না। এরশাদ সরকারের আমলেও ছিল না। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা নিয়ে পুরোপুরি উন্মুক্ত আলোচনা হয়নি। নন-ডিসক্লোজার শর্তের অজুহাতে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। স্থানীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আগে ব্যাংক ঋণের সুদহার কম ছিল। বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারত। কিন্তু এখন ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। তাই চাইলেই উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছেন না। বিশেষ করে যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তারা কি বেশি সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে টিকে থাকতে পারবে? বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যদি আস্থা ফেরাতে হয় তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এসব দেশ ব্যাংক ঋণের সুদের হারকে পরিপূর্ণভাবে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি। যেসব শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বিদেশী আমদানিকে প্রতিস্থাপিত করে অথবা রফতানি বৃদ্ধি এবং বিস্তৃত লিংকেজ এফেক্ট সহায়ক অথবা যেসব শিল্প অধিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে সেসব শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম হওয়াটাই কাম্য। কনসেশন শুধু পোশাক শিল্পকে দিলে চলবে না, রফতানি বহুমুখীকরণ ও নির্বাচিত নিয়মবদ্ধ প্রণোদনা অন্য শিল্পকেও দিতে হবে। আমাদের দেশেও চীন ও পূর্ব এশিয়ার মতো এমন একটি কালো-সাদা বিড়ালের মিশ্র ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যাতে তা প্রকৃতই ইঁদুর মারতে পারে। গভর্নেন্স ঠিক রেখে কনসেশন দিতে হবে যাতে সঠিক জায়গায় কনসেশনটা পৌঁছে এবং তার উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেশপ্রেমিক, স্বাধীন ও সুবিবেচক ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের কথা বলেছেন। শিক্ষা খাতে কিছু কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যান্য ক্ষেত্রেও যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন শুরু হবে খুব শিগগিরই। এসব কাজ করা এবং প্রশাসন চালানোর জন্য সরকারের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে। এজন্য রাজস্বনীতিতে প্রগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন পদ্ধতি চালু করতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে অধিক পরিমাণে ট্যাক্স আদায়যোগ্য করে তুলতে হবে। সম্পদ করের কথা সরকার ভাবতে পারেন। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। এটা কোনোভাবেই চলতে দেয়া যায় না। আমাদের রাজস্ব আদায় বাড়াতেই হবে। এটা করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যতেও বিদেশী ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় বলা যেতে পারে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের চ্যালেঞ্জ বহুমুখী। এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল সমস্যা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে সম্পদ সংগ্রহ করা এবং তা সঠিকভাবে সুশাসনের মাধ্যমে উন্নয়নের কাজে তা ব্যবহার করা।

ড. এমএম আকাশ: অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক

আরও