নেপালে ২৬ আগস্ট একটি হিমবাহ গলে যাওয়ার পর ৫ দশমিক ২ রিখটার স্কেলের ভূকম্পন অনুভূত হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ফ্ল্যাশ ফ্লাডের কারণে কাদা ও ধ্বংসস্তূপে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এখন আতঙ্কের জনপদ। এ ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ কী হতে পারে বলে মনে করেন?
নেপালের পরিস্থিতি খুব দুঃখজনক। হিমালয়ের কাছের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটিই নেপাল। বলা হয়, পৃথিবীতে উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু—এ দুই জায়গায় বরফ পাওয়া যায়। এদিকে হিমালয়কে বলা হয় থার্ড পোল। অর্থাৎ এখানে প্রচুর পরিমাণ বরফ সঞ্চিত আছে। এ বিষয়টা বোঝা জরুরি। আমরা সুপেয় পানির কথা বলি। পৃথিবীর ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ পানিই লবণাক্ত। বাকিটুকু সুপেয়। আবার সুপেয় পানির ৭০ শতাংশই বরফ হয়ে আছে দুই মেরু আর একাধিক পর্বতমালার শৃঙ্গে। মাউন্টেন রেঞ্জের ওপর যত বরফ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে হিমালয়ে। যা-ই হোক, গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলএফও যাকে বলা হয় সেটাকে সোজা বাংলায় বরফের নদী বললেই ভালো হয়। বছরজুড়ে এসব বরফের নদী থেকে আমাদের নদীগুলো পানি পায়। তবে পানি পাওয়ার পরিমাণ অল্প হলে সমস্যা নেই। একটা ভারসাম্য থাকা জরুরি। জুন-জুলাইয়ের বৃষ্টিকে আমরা ওরোগ্রাফিক প্রিসিপিটেশন বলি। মানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বাষ্পীভূত পানি ধীরে ধীরে ওপরে উঠে যায়। সেটা ঘন হয়ে বৃষ্টি হয়। সিলেট, মেঘালয়—এসব জায়গায় বৃষ্টি হয়ে পানিটা ধীরে ধীরে আবার নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে ফিরে যায়। এভাবেই হিমালয়ের দক্ষিণে তিনটি মেজর রিভার সিস্টেম রয়েছে। একটি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র আরেকটি সিন্ধু নদী। এগুলোর সঙ্গে হিমালয়ের ওই বরফের সম্পর্ক রয়েছে। সারা বছরই বরফগলা পানি কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখে। বর্ষায় নিম্নচাপের জন্য কিছু জলীয় বাষ্প ওপরে উঠে আবার বরফ জমা হয়। এভাবেই ওপরে জমা হচ্ছে, নিচে আবার হিমবাহ হয়ে নেমে আসছে। এসেই তার ডগাটুকু গলে নদীতে ফিরছে। এগুলোর মধ্যে ভারসাম্য থাকলে অসুবিধা থাকে না।
তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এগুলো আজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হিমালয়ে ১০-১৫ হাজারের মতো বড় হিমবাহ আছে। আর ছোট হিমবাহ আছে ৫০-৫৪ হাজারের মতো। সবগুলোর ভারসাম্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানে যত বরফ জমছে তার চেয়ে বেশি গলছে। এগুলো অনেক জায়গায় জমাট বেঁধে আছে। একটি হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় তার মাথায় প্রচুর বালি-পাথর থাকে। হিমবাহ গলে গেলে তার পেছনে লেকের মতো কিছু পানি জমা হয়। এই যে একটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলো, সেটা খুব শক্ত না। আচমকা বিস্ফোরিত হতে পারে। ওই সময় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানি আচমকা নেমে আসে। নেপালের বন্যা খুবই ভয়াবহ। ওখানে কতটুকু বন্যার পানি আসছে তা জরুরি না। বরং পানির প্রবাহ বেশি থাকে। এই যে গতি তা সামনের সবকিছু ধসিয়ে নিয়ে যায়। ফলে এটাই সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অংশ।
নেপালের প্রতিবেশী বৃহৎ দুটো দেশ চীন ও ভারত, তাদের যে শিল্পায়ন, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের ফলে উষ্ণতা বাড়ছে। এজন্য হিমালয়ের বরফগুলো গলছে। ফলে আমরা নিয়মিত ঝুঁকিতে আছি। আমাদের অনেকগুলো নদী হিমালয় থেকে আসা পানির ওপর নির্ভর করে। সবদিক বিবেচনায় ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কেমন?
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি তো স্থানীয় কোনো বিষয় নয়। এটি আন্তঃসীমানার সমস্যা। হ্যাঁ, দূষণের ক্ষেত্রে বর্তমানে চীন সবার থেকে এগিয়ে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র বেশি দূষণ করত। তাই এসব দেশের দায় আছে। মূল সমস্যা হলো, হিমালয়ের বরফ গলার ক্ষতির পরিমাণ অন্যান্য অঞ্চল থেকে বেশি। হিমালয়ের দক্ষিণ দিকে ২০০ কোটি লোক বাস করে। তার মানে, পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগ লোক। আমরা বলি যে একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—কোথায় হলো? একটা ফাঁকা জায়গায় হলো। সেটার ক্ষতি ও ঝুঁকি আলাদা। কারণ কোনো এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো কিন্তু সেখানে মানুষ বেশি নেই, তাই ঝুঁকি কম। কিন্তু যেখানে অনেক মানুষের বাস সেখানে ঝুঁকি অনেক। হিমালয়ের যেকোনো ধরনের ক্ষতি দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
আরেকটা বিষয় হলো, চীন কিংবা ভারত আগাম সতর্কতা দিতে পারত। হিমবাহের কোথায় ফাটল ধরেছে বা কখন ধেয়ে আসতে পারে—এসব তথ্য তারা দিতে পারত। এখন প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে স্যাটেলাইটের মাধ্যমেই আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যায়। নেপালের সে অবকাঠামোগত সুবিধা নেই। তবে ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) ঠিকই তদারকি করছিল। তাদের কাছে এসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যেহেতু আছে, তাই অর্থের কথা চিন্তা না করে মানুষের উপকারের জন্য তথ্য আদান-প্রদান করতে পারত। এক্ষেত্রে চীনের সমস্যা বেশি। কারণ ওইদিকেও কিছু হিমবাহ আছে। তারা আগে থেকে পর্যবেক্ষণ করলেও নেপালের পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না। কারণ মানুষকে আগে থেকেই সতর্ক করা যেত। যারা নদীর খুব কাছাকাছি অংশে থাকে তাদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য তদারকি ব্যবস্থায় সারা পৃথিবীরই সহযোগিতা দরকার। বিশেষত বাংলাদেশকে যেহেতু এটি রাইপেরিয়ান দেশ। রাইপেরিয়ান বলতে গঙ্গা অববাহিকার মধ্যে পড়ে এমন দেশকে বোঝায়। পানি শেষ পর্যন্ত গঙ্গাতেই আসবে যার একটা অংশ আমাদের। নেপাল ও চীনও এ নদীর কিছুটা অংশের ভাগ পায়। এজন্য গঙ্গা অববাহিকার এ দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা থাকা দরকার। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি বড় বন্যার পর একটা ভূমিধস হয় তাহলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে। এজন্য এ বিষয়ে সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। নেপালে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমোড) নামে একটি ভালো ইনস্টিটিউশন আছে। তারা এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আরো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ বাড়ালে আগামীতে যেকোনো ঝুঁকি এড়ানোর সুযোগ আগামীতে পাব।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় থেকে আমাদের শেখার কী আছে? বিশেষ করে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে (যেমন হিলি বেল্ট বা রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকা) পাহাড়ধসে অনেক প্রাণহানি হয়েছে। একজন পুরকৌশলী হিসেবে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? পাহাড়ি অঞ্চলের আবাসন বা স্থাপত্য কেমন হওয়া উচিত?
প্রথমত, চট্টগ্রাম বা পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো হিমবাহ বা বরফ নেই। নেপালের দুর্ঘটনাটি ছিল মূলত হিমবাহ গলে সৃষ্ট হ্রদ বিস্ফোরণের ফল। কিন্তু এখানে প্রধানত ভারি বৃষ্টির কারণে সমস্যা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজকাল একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ক্লাউড আউটবার্স্ট’ (মেঘ বিস্ফোরণ)। বৃষ্টি যদি অল্প অল্প করে দীর্ঘ সময় ধরে হয়, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই। ধরা যাক, ঢাকা শহরে ১০ দিনে ১০ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হলো; এটি ড্রেনেজ ক্যাপাসিটির ভেতরে থাকে। কিন্তু একই পরিমাণ অর্থাৎ ১০ সেন্টিমিটার বৃষ্টি যদি মাত্র এক বা ৫ ঘণ্টায় হয়ে যায়, তবে তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। আজকাল দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক বৃষ্টির বদলে অল্প সময়ে অতিভারি বৃষ্টি হচ্ছে। এটি পাহাড়ের ঢালের (স্লোপ) স্থায়িত্ব এবং নদীর পানি ধারণক্ষমতার ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে। ক্লাউড আউটবার্স্টের মেকানিজমটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ওরোগ্রাফিক প্রিসিপিটেশনে জলীয় বাষ্প পাহাড়ি বাতাসে ওপরে উঠে ঘনীভূত হয় এবং মেঘ তৈরি করে। কিন্তু বর্তমানে আমরা পাহাড়ের গোড়ায় গাছপালা কেটে শহর গড়ে তুলছি। ফলে ওই অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। গরম বাতাসের প্রবণতা থাকে ওপরের দিকে ওঠার। ফলে মেঘটি সেখানে অবিলম্বে বৃষ্টি হিসেবে না ঝরে আরো ওপরে উঠে জলীয় বাষ্প সঞ্চয় করে আকারে বড় হতে থাকে। একপর্যায়ে মেঘের ওজন যখন আর ধরে রাখা সম্ভব হয় না, তখন হুট করে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে আছড়ে পড়ে। পাহাড় ও পার্বত্য অঞ্চলে স্লোপ স্ট্যাবিলিটি নষ্ট করার জন্য এ অতিভারি বর্ষণ অত্যন্ত ক্ষতিকর।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যা অতিরিক্ত হওয়ায় আমরা এমন সব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাড়ি বানাচ্ছি যেখানে বাড়ি বানানো মোটেই উচিত নয়। গাছ কেটে ফেলার কারণে পাহাড়ি ঢালের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খেয়াল করলে দেখবেন, চট্টগ্রামে যেসব পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই পাহাড়ের গোড়া কেটে বাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। প্রত্যন্ত এলাকায় গাছপালাসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পাহাড় সহজে ধসে পড়ে না; আর ধস হলেও ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। কিন্তু পাহাড় কেটে ভিত্তি দুর্বল করে ফেললে ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
চলতি মৌসুমে ভারি বর্ষণের কারণে রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম টানা কয়েকদিন জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ফলে শিল্প উৎপাদন ও জনজীবন ব্যাহত করেছে। প্রধান শহরগুলোতে এ সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতার মূল কারণ কী?
এ বিষয়টি নিয়ে আমি আগে বণিক বার্তায় লিখেছিও। চীনে বর্তমানে ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণার প্রয়োগ ঘটিয়ে নগর ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। নগর উন্নয়নের সময় যখন পুরো এলাকা কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হয়, তখন বৃষ্টির পানির মাত্র ১০ শতাংশ মাটির নিচে যেতে পারে; বাকি ৯০ শতাংশ সারফেস রান-অফ হয়ে ড্রেনে চলে আসে। ঢাকার ক্ষেত্রে মাটির নিচে পানি যাওয়ার হার আরো কম। ঢাকার বিশেষ সমস্যা এটি একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ দিয়ে ঘেরা। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানের (এফএপি) আওতায় কর্ডনড ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আবদুল্লাহপুর থেকে ধানমন্ডি, গাবতলী হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ এবং প্রগতি সরণির অংশ তৈরি করা হয়। এতে কমলাপুর ও আবদুল্লাহপুরে বাইরে থেকে পানি আসা ঠেকাতে স্লুইস গেট বা রেগুলেটর রাখা হয়। এ বাঁধ বাইরের পানি আটকায় ঠিকই, কিন্তু ভেতরের জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য তো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়া গোরান চটবাড়িতে একটি বড় পাম্প স্টেশন এবং জলাধার রয়েছে, যা দিয়ে পানি পাম্প করে বাইরে ফেলা হয়। কিন্তু দিনদিন শহরের পাকা আয়তন বাড়ায় বৃষ্টির পানির রান-অফ বাড়লেও পাম্প স্টেশনের ক্যাপাসিটি কিন্তু বাড়ানো হয়নি। গাবতলীর রিজার্ভার এলাকাও ছোট হয়ে গেছে। এর চেয়েও মারাত্মক বিষয় হলো, শহরের ভেতরের নালা ও পাইপলাইন প্লাস্টিক ও বর্জ্যে ব্লক হয়ে থাকায় বৃষ্টির পানি পাম্প স্টেশন বা জলাধার পর্যন্ত পৌঁছতেই পারে না। আমরা জলাবদ্ধতাকে হয়তো বছরে ৫-১০ দিনের সাময়িক অস্বস্তি মনে করি, কিন্তু এতে পেভমেন্ট ও রাস্তার অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জেনারেটরসহ নিচতলার সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পাহাড়ি ঢাল থাকায় পানি দ্রুত নদীতে নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে যুক্ত হয় জোয়ার-ভাটার প্রভাব। জোয়ারের সময়ে আসা পানি আটকাতে বিভিন্ন খালে যেসব রেগুলেটর বা গেট বসানো হয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা নেই। সেখানেও বর্জ্যের কারণে নালা ভরাট হয়ে আছে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হলেও সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেভাবে এরই মধ্যে বিপুল অবকাঠামো ও ঘনবসতি গড়ে উঠেছে, সেখানে ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা কতটুকু প্রয়োগ করা সম্ভব?
স্পঞ্জ সিটির মূল নীতিই হলো শহরকে যতটা সম্ভব ‘স্পঞ্জ’ বা ছিদ্রযুক্ত রাখা, যাতে মাটি পানি শুষে নিতে পারে। চীন ও জাপানে অবকাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে বহুতল ভবন বা স্কুলের খেলার মাঠের নিচের মাটি অপসারণ করে পাথর ও খোয়ার পর্যায়ক্রমিক স্তর তৈরি করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টি হওয়া মাত্র পানি দ্রুত নিচে নেমে ভেতরের রিজার্ভারে জমা হয়। চীনে এমনকি রাস্তার পেভমেন্টও পোরাস (ছিদ্রযুক্ত) করা হয়েছে এবং ফুটপাত বা পার্কিং লটে পারফোরেটেড ব্রিক (ছিদ্রযুক্ত ইট) ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও রাজউকের বিএনবিসি কোডে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) অনুযায়ী প্লটের ৪০ শতাংশ জায়গা খালি রাখার বিধান রয়েছে। এটি শুধু আলো-বাতাসের জন্য নয়, বৃষ্টির পানি মাটিতে রিচার্জ হওয়ার জন্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩০০-৪০০ ফুট নিচে নেমে গেছে, যা চরম বিপজ্জনক। ঢাকা ওয়াসা গভীর নলকূপের গভীরতা বাড়িয়ে সাময়িক সমাধান দিচ্ছে, যা কোনো স্থায়ী পথ নয়। অথচ ভবন মালিকরা সেই ৪০ শতাংশ খালি জায়গায় কংক্রিট ঢেলে পার্কিং বা দারোয়ানের ঘর বানিয়ে ফেলছেন, ফলে রিচার্জ বন্ধ হয়ে গেছে।
চারপাশে নদী ও জলাশয় থাকার পরও আমরা কেন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এত বেশি নির্ভর করছি? নদী বা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রযুক্তির দিকে কেন পুরোদমে এগোচ্ছি না?
ভূপৃষ্ঠের পানি শোধন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এখানে উৎসের পানির মান একটি বড় বিষয়। সায়েদাবাদে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থাকলেও মানুষ সেই সরবরাহকৃত পানি সরাসরি পানের ভরসা পায় না। নদী শোধনের জন্য অপরিশোধিত পানির ন্যূনতম একটি মান প্রয়োজন। কিন্তু বুড়িগঙ্গার পানির যে অবস্থা, তা পয়োবর্জ্যের ড্রেনের চেয়েও খারাপ। এমন পানি শোধন করতে হলে ‘টারশিয়ারি ট্রিটমেন্ট’ লাগবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে টয়লেটের ব্যবহৃত পানি শোধনের মতো চড়া খরচের শামিল। ঢাকা ওয়াসা এখন পদ্মা ও মেঘনা থেকে পানি আনার কথা ভাবছে। কিন্তু এগুলো রিঅ্যাক্টিভ বা নিরাময়মূলক পদক্ষেপ। আমাদের নীতি হওয়া উচিত ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’।
সরকারের পক্ষ থেকে তো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। বাইরে থেকে অনেক প্রজাতির গাছ এনে লাগানো হচ্ছে। এ বাণিজ্যিক বা কৃত্রিম বনায়ন কতটা টেকসই?
খালি জায়গায় গাছ লাগানো নিঃসন্দেহে ভালো, তবে এটি বনায়ন বিশেষজ্ঞতার বিষয়। অনেক সময় সরকার বাণিজ্যিক বনায়নের অংশ হিসেবে ইউক্যালিপটাস বা রাবার গাছ লাগায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে পাহাড়ি সংবেদনশীল এলাকায় এ বাণিজ্যিক বনায়নের পক্ষে নই। আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ ও রোপণ করা উচিত, এর কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে পাহাড়ের মানুষকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসিত করতে হবে, যেখানে ভূমির স্থায়িত্ব ভালো এবং প্লাবনের ঝুঁকি কম। মানুষকে যেখানে-সেখানে অবাধে ঘরবাড়ি বানাতে দিলে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। আমরা একদিকে গাছ কাটছি, অন্যদিকে কোথায় বাড়ি বানানো নিরাপদ সে জ্ঞান ব্যবহার করছি না। ঢালের কোথায় ঘর তৈরি করলে তা পাহাড়কে আনস্ট্যাবল করবে না—এসব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে পরিকল্পনা করা জরুরি। মোটকথা, সমস্যা দুটি: একটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক কারণ (ক্লাউড আউটবার্স্ট), আর অন্যটি আমাদের মানবসৃষ্ট স্থানীয় সংকট (পাহাড় ও গাছ কাটা)।
আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার যে বড় ঘাটতি রয়েছে, সেই নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
উন্নত বিশ্বে কোনো বাসাবাড়ির টয়লেট প্রডাক্ট বা স্যুয়ারেজ সরাসরি প্রাকৃতিক জলাশয়ে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বহু বছর আগে পুরান ঢাকার পাগলা এলাকায় লেগুনভিত্তিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করা হয়েছিল, যা পুরো শহরের মাত্র ৫ শতাংশ শোধন করতে পারে। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর সম্প্রতি দাশেরকান্দিতে একটি নতুন প্লান্ট করা হলো। তাহলে গুলশান-বনানীসহ নতুন ঢাকার স্যুয়ারেজ বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে? আইন অনুযায়ী প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক থাকার কথা এবং তা পূর্ণ হলে ওয়াসা বা কর্তৃপক্ষের এসে ক্লিনার দিয়ে তা সেফ ডিসপোজাল পয়েন্টে নেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে কি কেউ কোনোদিন ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের গাড়ি দিয়ে সেপটিক ট্যাংক খালি করতে দেখেছেন? বাস্তবে তা হয় না। সবাই অবৈধ পথে ওভারফ্লো পাইপ দিয়ে পাশের ড্রেনে বর্জ্য সংযোগ দিয়ে দিয়েছে। এছাড়া শিল্প-কারখানায় ইটিপি চালু না রাখা এবং চারপাশের নদীগুলো (এমনকি শীতলক্ষ্যাও) দূষিত করে ফেলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর প্রদেয় চাপ বাড়ছে। এ অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন একদিন বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
অতীতে ঢাকায় অনেক খাল, বিল ও ঝিল ছিল। আমাদের এ প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার করা কি আদৌ সম্ভব?
এটি নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির ওপর। রাষ্ট্রের হাত সবচেয়ে লম্বা; রাষ্ট্র চাইলে সবকিছুই পুনরুদ্ধার করতে পারে। চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ায় আগে ভরাট করা বা রাস্তার নিচে চাপা পড়া নদী ও লেক ভেঙে পুনরায় উদ্ধার করার নজির রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী খাস বা প্রাকৃতিক জলাশয় দখল করে রাখবে আর রাষ্ট্র তা উদ্ধার করতে পারবে না—এটি হতে পারে না। যদি না পারে, তবে বুঝতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জড়িয়ে আছে। খাল-বিল কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা নয়, এগুলো সরকারি খাসজমি। ঢাকা শহরকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে খাল ও জলাশয় উদ্ধার, ওয়াটার হোল্ডিং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আমূল আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে।