প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিটি নির্বাচনী আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছে সরকার। শিক্ষায় বরাদ্দকৃত বাজেট কি শেষ পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণেই রূপ নেবে?
বাজেটে রেকর্ড বরাদ্দ অবশ্যই সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার একটি ইতিবাচক দিক। তবে কৌশলগত পরিবর্তন না এলে এ বিপুল বরাদ্দ হবে অতীতের বাহ্যিক ও ভৌতিক অবকাঠামোমুখী শিক্ষা উন্নয়ন মডেলের পুনরাবৃত্তি। প্রতিটি নির্বাচনী আসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভবন তৈরি শিক্ষা সংযোগের বিকেন্দ্রীকরণ মনে হলেও সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমানের উচ্চশিক্ষার অনিয়ন্ত্রিত প্রসারজনিত বেকারত্বের সংকটকে অস্বীকার/উপেক্ষা করে ৩০০টি নির্বাচনী আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা বিএনপি সরকারের ‘ভ্যালু ফর মানি এবং রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ নীতির পরিপন্থী। একইভাবে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্পের আওতায় গ্যাজেট বিতরণ করা রাজনৈতিকভাবে দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু আমার ২০২৫ সালের আইসিটি হোয়াইট পেপার টাস্কফোর্স রিপোর্টের মূল্যায়ন বলছে—একটি সুনির্দিষ্ট ‘জবাবদিহিতা ও সাম্য কাঠামো’ ছাড়া কেবল শিক্ষা খাতে ডিজিটালাইজেশন কর্মসূচি কার্যকারিতাহীন এক শূন্য আধুনিকায়ন প্রকল্পে রূপ নেয়। ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’-এর মতো মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। একদিকে যেমন এর পেছনের মূল শক্তি অর্থাৎ শিক্ষকের প্রস্তুতি, শিক্ষাদান পদ্ধতি আধুনিকায়ন ও দক্ষ জনবল তৈরি ছিল অবহেলিত, অন্যদিকে অনুপস্থিত ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন ও জবাবদিহিতা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) যদি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের চেয়ে পুঁজিবহুল অবকাঠামো নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেয়া অব্যাহত রাখে, তবে এ রেকর্ড বর্ধিত বরাদ্দ কেবল রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের পকেট ভারী করবে এবং করদাতাদের অর্থের অপচয় ঘটাবে। চূড়ান্ত বিচারে এটি শহুরে উচ্চবিত্ত এবং প্রান্তিক গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বিদ্যমান বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।
শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে নির্বাচিত নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কি হওয়া উচিত?
নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ‘আনন্দের সাথে শিক্ষা’র মতো জনতুষ্টিমূলক স্লোগান থেকে বেরিয়ে এসে মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের ওপর জোর দিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা। ২০২০ সালের কভিড মহামারী থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জলবায়ু ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট শিক্ষাদানের ঘাটতি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি নীরব জরুরি অবস্থার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে আমার প্রত্যাশা ছিল নতুন বাজেটে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে শিখন পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা; ত্বরান্বিত শিক্ষণ কৌশলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেড-স্তরের সক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রকল্পের ঘোষণা। পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার কত, সেই রাজনৈতিক হিসাব বাদ দিয়ে ‘গুণগত মান’-এর পরিমাপ হতে হবে বাস্তবসম্মত ফলাফলের ভিত্তিতে। যেমন ২০৩০ সালের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণীর ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী যেন তাদের বয়সোপযোগী পাঠ্য অনুচ্ছেদ অন্তত পড়তে পারে, এমন সময়াবদ্ধ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোপরি, শিক্ষায় আমাদের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের প্রকৃত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের পিআইএসএ বা টিআইএমএসএসেএর মতো স্বাধীন বৈশ্বিক মানদণ্ডে জাতীয় পারফরম্যান্সকে যাচাই করার সাহস দেখাতে হবে।
নতুন যুগের প্রয়োজনে আমাদের শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর দাবি দীর্ঘদিনের। নতুন শিক্ষা কমিশন গঠন কতটুকু জরুরি বলে মনে করেন?
একটি নতুন এবং স্বাধীন ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। তবে শর্ত হলো, একে দলীয় রাজনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে। অতীতে আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনাগুলো অনেক সময় গবেষণালব্ধ প্রমাণের তোয়াক্কা না করে কেবল রাজনৈতিক ইশতাহার বাস্তবায়নের চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকার গঠনের প্রথম ৩০ দিনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে ১২ দফা এবং তিন ধাপের সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে তা সাহসী মনে হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা উপেক্ষা করে এ ধরনের ঘোষণা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরে রূপ নেয়ার ঝুঁকি থাকে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা, বিশেষ করে সাধারণ ও মাদরাসা শিক্ষার মধ্যকার দেয়াল ভেঙে ফেলা এবং সনাতন শিক্ষাদান পদ্ধতির পরিবর্তে একটি আধুনিক, পেশাদার ইকোসিস্টেম তৈরি করতে একটি বিশেষায়িত কমিশন প্রয়োজন। রাজনৈতিক রূপরেখাকে একটি তথ্য-প্রমাণভিত্তিক বাস্তবায়ন রোডম্যাপে পরিণত করতে এ কমিশন গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অন্তত ৬০ দিন মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র যাচাই ও অংশীজনদের মতামত নেয়ার কর্মসূচি হাতে নেয়া উচিত।
বাংলা ও ইংরেজির বাইরে আরেকটি ভাষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বর্তমান সরকার। যেখানে আমাদের বেশির ভাগ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করছে সেখানে তৃতীয় ভাষায় দক্ষ করার ক্ষেত্রে কেমন চ্যালেঞ্জ দেখছেন? উতরাতে করণীয় কী?
এটি মূলত আমাদের প্রাথমিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ‘আকাঙ্ক্ষা-ভিত্তিক’ অতি-প্রসারণের একটি উদাহরণ। বৈশ্বিক গিগ ইকোনমি বা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য বহুভাষিকতা অত্যন্ত উপকারী হলেও মাধ্যমিক স্তরে তৃতীয় কোনো ভাষা (যেমন জাপানি বা ফ্রেঞ্চ) বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করা প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষা বাংলায় একটি সহজ অনুচ্ছেদ পড়তে পারে না এবং সাধারণ গণিতে ক্রমাগত খারাপ করছে। অধিকাংশ সরকারি মাদরাসা ফাংশনাল আরবি ভাষা শিক্ষাদানেও ব্যর্থ। এ পরিস্থিতিতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করা একটি ব্যয়বহুল বিভ্রান্তি মাত্র। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা সরকারের পরিসংখ্যান ও নথিপত্রে ‘ত্রৈভাষিক’ হলেও বাস্তবে কার্যকারিতাহীন ও কর্ম-অনুপযোগী এক প্রজন্ম তৈরির নতুন ঝুঁকিতে পড়বে। এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে আমাদের নীতিটি সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হবে। রাষ্ট্রের ‘প্রথম বিনিয়োগ’ হওয়া উচিত মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা নিশ্চিত করা। একটি দুর্বল বুনিয়াদের ওপর প্রশাসনিকভাবে বাধ্যতামূলক করার চেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক বা কারিগরি স্তরে তৃতীয় ভাষাকে বাজারচাহিদাসম্পন্ন একটি ঐচ্ছিক দক্ষতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা বহুধাবিভক্ত। বৈষম্য ও সামাজিক বিভক্তির বীজ বপন হচ্ছে প্রাথমিকেই। এ সংকট নিরসনে করণীয় কী?
প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কাঠামোগত বিভাজন আমাদের সমাজের একেবারে ভিত্তিস্তরে বৈষম্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন ভিন্ন আর্থসামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ডের শিশুরা সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় হয়, তখন আমরা জাতীয় সংহতি তৈরির বদলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামাজিক বিভাজনকে উসকে দিই। এ সংকট নিরসনে রাষ্ট্রকে অবশ্যই সব ধারার শিক্ষার জন্য একটি ‘কমন মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড’ বা ন্যূনতম অভিন্ন মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে কোনো মাধ্যমের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য মুছে ফেলা হবে; বরং নিশ্চিত করতে হবে—একটি শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইংলিশ মিডিয়াম বা গ্রামীণ মাদরাসার যেখানেই পড়ুক না কেন, সে যেন সমমানের মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে। বিশেষ করে মাতৃভাষায় প্রাথমিক সাক্ষরতা, অপরিহার্য সংখ্যাজ্ঞান এবং বুনিয়াদি ডিজিটাল স্কিলের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলবে না। প্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বা স্বীকৃতি এ ন্যূনতম শিখন ফল অর্জনের শর্তের সঙ্গে কঠোরভাবে যুক্ত করতে হবে।
সরকার কারিগরি শিক্ষায় জোর দেয়ার কথা বলছে। বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে অনীহা দেখাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। সেখানে নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক, পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা এবং তার কারিকুলাম সেকেলে। কারিগরি শিক্ষাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে নতুন সরকারকে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে?
মূল সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে ঐতিহাসিকভাবে কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর বা অন্ধগলির পথ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ কাঠামোগত কুসংস্কারের সঙ্গে সেকেলে কারিকুলাম, শিক্ষক সংকট এবং অচল ল্যাব যন্ত্রপাতি যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে অনীহা দেখায়। কারিগরি শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে নতুন সরকারকে এ প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল ভাঙতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (বিটিইবি) সমন্বয়ে ‘ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স’ চালু করতে হবে, যা কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ উচ্চশিক্ষার মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করবে। ফলে কারিগরি লাইনে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পথ আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে—এ ভীতি দূর হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও ল্যাববিহীন নতুন নতুন ফাঁপা সরকারি কেন্দ্র নির্মাণ না করে, বেসরকারি খাতকে ট্যাক্স রেয়াত দেয়ার মাধ্যমে একটি ‘বাজারচাহিদাসম্পন্ন কারিকুলাম’ যৌথভাবে ডিজাইন করতে হবে। শিল্প-কারখানার ভেতরেই স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ সুবিধা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে বেসরকারি খাত আর অর্থায়ন করবে রাষ্ট্র। এভাবেই একটি ব্যর্থ ‘সরবরাহভিত্তিক’ মডেলকে প্রাণবন্ত ‘চাহিদাভিত্তিক’ ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করা সম্ভব।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ। পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে গবেষণা সবকিছু নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ রয়েছে। এআইয়ের ব্যবহার কী এক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একটি শক্তিশালী দোধারী তলোয়ার। এটি রাতারাতি আমাদের সব শিক্ষাগত ব্যর্থতা দূর করার কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, আবার একে এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। বুনিয়াদি কাঠামো দুর্বল রেখে যদি আমরা শ্রেণীকক্ষে এআই টুল ছড়িয়ে দিই, তবে তা আরেকটি ‘দর্শনধারী প্রজেক্টে’ পরিণত হবে। তবে একটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষণ কাঠামোর অধীনে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা গেলে এআই আমাদের শিক্ষার গুণগত মানদণ্ডে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মূল্যায়ন পদ্ধতিকে প্রশ্নবিদ্ধ পাবলিক পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে এআই-চালিত ‘অ্যাডাপ্টিভ অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম’ বা আইটেম ব্যাংক ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি শিক্ষার্থীর মেধা ও অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করবে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে, এআই তাদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমিয়ে শ্রেণীকক্ষে সরাসরি পাঠদানের সময় বাড়াতে সাহায্য করবে। স্কুলগুলোতে এআই সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষকদের এমন এক একজন ‘সহায়তাকারী’ হিসেবে গড়ে তোলা, যারা প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ ঘাটতি পূরণ করবেন; যান্ত্রিক স্ক্রিন দিয়ে শিক্ষকের বিকল্প তৈরি করা এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে অনেক উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশের কোন খাতগুলো সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে পারে?
বিশ্বব্যাপী চলমান এআই বিপ্লব বাংলাদেশের চিরাচরিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মডেলের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা, কারণ আমাদের অর্থনীতি মূলত কম দক্ষ ও কম মজুরির শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাত (বিশেষ করে সাধারণ ফ্রিল্যান্সিং) এবং ঐতিহ্যগত সেবা খাত, যেমন ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ ও ব্যাক-অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। আমাদের বিপুলসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার যারা মূলত ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ কোডিং বা গ্রাফিক লেআউটের মতো রুটিন কাজের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বাজার দ্রুত সংকুচিত হবে; কারণ এআই এ প্রাথমিক স্তরের কাজগুলো অনায়াসেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে ফেলছে। করপোরেট খাতের সাধারণ ও রুটিন ক্ল্যারিক্যাল (দাপ্তরিক) পদগুলোও ঝুঁকিতে পড়বে। এমনকি তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি) ও পরোক্ষ চাপের মুখে পড়বে, কারণ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনগুলো এখন এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। রক্ষণশীল নীতি বা আইন দিয়ে এ চাকরিগুলো বাঁচানো যাবে না; এ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো আমাদের শ্রমশক্তিকে দ্রুত উচ্চমানের ‘প্রডাক্টভিত্তিক’ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম এবং জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতাসম্পন্ন কাজের দিকে ধাবিত করা।
আজকের শিক্ষার্থীরা যদি আগামী দশকের চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুতি নিতে চায়, তাহলে কোন দক্ষতাগুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত?
আগামী দশকের চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের ক্যারিয়ারকে সুরক্ষিত করতে হলে শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট বা সনাতন গণ্ডির মধ্যে বিদ্যা অর্জনের মানসিকতা সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। আগামী দশকের সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতা হতে যাচ্ছে ‘কগনিটিভ ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা মানসিক নমনীয়তা—যা একজন মানুষকে দ্রুত একটি পুরনো অকার্যকর পদ্ধতি ভুলে নতুন ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে সাহায্য করে। পরিসংখ্যান বলছে, নির্দিষ্ট কোনো সফটওয়্যার বা টেকনিক্যাল কোডিংয়ের কার্যকারিতা এখন দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাই শিক্ষাক্রমে তিনটি অপরিহার্য দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে: উন্নত ডিজিটাল সাক্ষরতা (যার মধ্যে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডাটা ট্রান্সলেশন অন্তর্ভুক্ত), জটিল ও পদ্ধতিগত যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং মানুষের নিজস্ব সফট স্কিল (যেমন পারস্পরিক যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স)। বৈশ্বিক গিগ ইকোনমি এবং উচ্চমানের উৎপাদন খাতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে আমাদের তরুণদের কেবল প্রযুক্তির ‘ভোক্তা’ হলে চলবে না, বরং প্রযুক্তিচালিত কর্মপ্রবাহের দক্ষ ‘ব্যবস্থাপক’ হয়ে উঠতে হবে।
আমাদের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আশানুরূপ নয় বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। টিচিং ইউনিভার্সিটি থেকে রিসার্চ ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তরের পথে বাধা কোথায়?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিছক শিক্ষাদান প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার প্রধান বাধাটি কেবল আর্থিক নয়, বরং কাঠামোগত ও আচরণগত। আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পিয়ার-রিভিউড একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা এবং দলীয় আনুগত্যকে বেশি পুরস্কৃত করা হয়। যখন পদোন্নতি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের মাপকাঠি আন্তর্জাতিক জার্নালে উচ্চ-প্রভাবশালী সাইটেশনের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দিয়ে নির্ধারিত হয়, তখন শিক্ষকরা গবেষণার পেছনে শ্রম দেয়ার কোনো তাগিদ পান না। এছাড়া আমাদের অর্থায়ন মডেলটিও ত্রুটিপূর্ণ। আমরা হাজার হাজার শিক্ষকের মাঝে সামান্য পরিমাণ অর্থ সাধারণ গবেষণা ভাতা হিসেবে ভাগ করে দিই, যা কোনো কাজেই আসে না। এর পরিবর্তে বড় অংকের তহবিল গঠন করে মেধাভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক ‘হাই ইমপ্যাক্ট রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড সিড গ্রান্টস ফান্ড’ বিবেচনা করা উচিত। এ স্থবিরতা ভাঙতে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন নেতৃত্ব ও কাঠামোগত পরিবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটগুলোকে দলীয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে অর্থায়নের কঠোর কাঠামো তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত ও কর্ম অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অকার্যকর সব গবেষণা সেন্টারগুলোর সংস্কার ও পুনরুদ্ধার। এক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ফ্ল্যাগশিপ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সংস্কার করে অন্য বিদ্যাপীঠগুলোকে পথ দেখাতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারকি, অর্থায়ন এবং মান নিয়ন্ত্রণ বিচারে আশাব্যঞ্জক ভূমিকা না রাখতে পারার বিচারে ইউজিসিকে বিলুপ্ত করে অধিক স্বায়ত্তশাসিত ও বিস্তৃত পরিসরের উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) রূপান্তরের উদ্যোগ ত্বরান্বিত করাও অত্যাবশ্যকীয়।
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদারে নির্বাচনী ইশতাহারে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এ কাজ কি সঠিক পথে এগোচ্ছে? কার্যকর ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ স্থাপনে করণীয় কী?
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদার করার বিষয়ে সরকারের রাজনৈতিক ঘোষণা প্রগতিশীল হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি বর্তমানে একটি নিষ্ক্রিয়, আমলাতান্ত্রিক পথে হাঁটছে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার বা বিভিন্ন ব্যবসায়ী চেম্বারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেবল দৃষ্টিনন্দন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ সংযোগ তৈরি সম্ভব নয়। এ সম্পর্ককে কার্যকর করতে রাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক প্রণোদনার কাঠামো তৈরি করতে হবে। প্রথমত, আমার প্রাক-বাজেট সুপারিশে যা উল্লেখ করেছিলাম—বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতরে শিল্প খাতের নেতাদের যৌথ পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক ও বাধ্যতামূলক ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার সেন্টার’ গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, এখানে রাজস্বনীতির ব্যবহার জরুরি: যেসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরঅ্যান্ডডি (আরঅ্যান্ডডি) ল্যাবরেটরিতে অর্থায়ন করবে বা গবেষণায় অনুদান দেবে, তাদের জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ কর রেয়াতের ব্যবস্থা রাখতে হবে। করপোরেট খাত যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মধ্যে তাদের ব্যবসায়িক বা আর্থিক লাভ না দেখে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তাদের সেকেলে কারিকুলাম পরিমার্জন না করে, তবে এ সংযোগের পরিকল্পনা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।