ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো আমদানীকৃত পণ্য দ্রুত খালাস করা। সময়মতো পণ্য খালাস না হলে এর প্রভাব ব্যবসা ব্যয়, উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে পড়তে পারে। বন্দরে জাহাজজট তৈরি হতে পারে। এসব ঝুঁকি থাকার পরও দেশের চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভেড়ার পর আমদানি পণ্য খালাস করতে গড়ে ১৩ দিন সময় লেগে যায়। এ তথ্য সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ‘বর্ডার ক্লিয়ারেন্স টাইম’ গবেষণায় ৩ হাজার ১৯১টি বিল অব এন্ট্রি বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে। গবেষণা প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গড়ে ৭ দিন ৯ ঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে মূলত ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) দাখিলের পর বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে। এছাড়া শুল্কায়নে লাগছে প্রায় দুইদিন, রাজস্ব পরিশোধ থেকে এক্সিট নোট পেতে ১ দিন ২ ঘণ্টা, আর বন্দর ছাড়তে আরো প্রায় ২২ ঘণ্টা। গবেষণার এসব তথ্য মূলত আইনের ব্যত্যয়সহ আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে তুলে ধরেছে।
কাস্টমস আইন, ২০২৩ এর ৮৪(১) ধারা অনুযায়ী পণ্য বন্দরে পৌঁছান বা অবতরণের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে আমদানিকারককে পণ্য ঘোষণা, অর্থাৎ বিল অব এন্ট্রি দাখিল করতে হয়। এমনকি ধারা ৮৪ (২) এ বলা হয়েছে, যে যানবাহনে পণ্য আসছে তা ৩০ দিনের মধ্যে পৌঁছানর কথা থাকলে আমদানিকারক পণ্য আসার আগেই বিল অব এন্ট্রি দাখিল করতে পারেন। এমনকি কাস্টমসের ওপরও আইনি সময়সীমা রয়েছে। ধারা ৯৫ অনুযায়ী যথাযথভাবে ঘোষণা দাখিলের পর সাত কার্যদিবসে শুল্কায়ন না হলে আমদানিকারক কমিশনারকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে নোটিস দিতে পারেন। আইনে পণ্য খালাস হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট আইন থাকার পরও অতিরিক্ত সময় লাগাটা আইনের পরিপালন না হওয়াকে যেমন নির্দেশ করছে, তেমনি প্রশাসনিক অদক্ষতাও স্পষ্ট করছে। সুতরাং এ দুই ক্ষেত্রে পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস হওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন এক্ষেত্রে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ হয় এবং এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পেছেনে যেসব বিষয়ের দায় রয়েছে সেগুলোর সমাধানেও মনোযোগ দিতে হবে।
পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের অন্যতম কারণ প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও যাচাইয়ের জটিলতা। ম্যানিফেস্ট দাখিলের পর বিল অব লেডিং, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্টসহ আমদানি-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ব্যাংক থেকে পাওয়ার পর তা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে পাঠানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যানিফেস্টে সংশোধনের প্রয়োজন হলে প্রক্রিয়াটি আরো দীর্ঘ হয়। অর্থাৎ একটি চালান খালাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার আলাদা আলাদা কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে একটি ধাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী ধাপ শুরু করা যাচ্ছে না। এ ধরনের পরস্পরনির্ভরশীল প্রক্রিয়া যতদিন থাকবে, ততদিন পণ্য খালাসে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রক্রিয়াগুলোকে সমন্বিত করা। শিপিং এজেন্ট, ব্যাংক, আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান যত দ্রুত ও নির্বিঘ্ন করা যাবে, পণ্য খালাসের সময়ও তত কমবে। একই তথ্য একাধিকবার বিভিন্ন দপ্তরে জমা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনতে হবে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা তথ্য সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠান যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে যাচাই করতে পারে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
আবার প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে জাহাজ বা কনটেইনার বন্দরে পৌঁছানর আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে পণ্য বন্দরে আসার আগেই ঝুঁকি মূল্যায়ন, নথি যাচাইসহ প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে জাহাজ বন্দরে ভেড়ার পর প্রক্রিয়া শুরু করার পরিবর্তে আগে থেকেই অনেক কাজ এগিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে এ ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এপিআই ইন্টিগ্রেশনের ফলে আমদানিকারকের এলসি ও ইনভয়েসের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড থেকে সরাসরি যাচাই করা যাচ্ছে। কিন্তু শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি ডিজিটালাইজড না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াকে এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। ফলে ডিজিটাল ব্যবস্থার একটি অংশ চালু হলেও অন্য অংশে কাগজপত্র ও ম্যানুয়াল যাচাইয়ের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।
সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট সব নথি দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা। ফলে আমদানিকারকের দাখিল করা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে থাকা তথ্যের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় ক্রস-ভেরিফিকেশন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভুল তথ্য, অসংগতি কিংবা অনিয়ম শনাক্ত করাও সহজ হবে। এতে কাগজপত্রের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের ম্যানুয়াল যাচাইয়ের চাপও কমবে। তবে ডিজিটালাইজেশনের নামে নতুন কোনো জটিলতা যাতে তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হতে হবে প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা। এছাড়া পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একটি ধাপে অস্বাভাবিক সময় লাগলে শুধু সেই ধাপের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে নয়, পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একটি চালান দ্রুত খালাসের জন্য যদি প্রতিটি সংস্থা নিজের অংশের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে, তাহলে সামগ্রিক সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
আমদানি পণ্য বন্দরে পড়ে থাকার প্রতিটি অতিরিক্ত দিনের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়ে। পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ, অর্থায়ন ও উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে দেরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে পণ্য খালাসের সময় কমানোকে কেবল বন্দরের ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই আইনে নির্ধারিত সময়সীমা কার্যকর করার পাশাপাশি আমদানি-খালাস প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে আরো সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে।