নদীমাতৃক এ দেশে আবহমানকাল থেকেই অর্থনীতির প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে কৃষি। নদীর জোয়ার-ভাটার জলে বয়ে আসা পলিমাটি যেমন জমির উর্বরতা বাড়িয়েছে, তেমনি এ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমভাবাপন্ন আবহাওয়া তৈরি করেছে চাষের অনুকূল পরিবেশ। ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, রোদে পুড়ে, হাড় খাটুনি খেটে দেশের বিপুল জনসংখ্যার মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে আমাদের দরিদ্র কৃষক। তবে দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে যেন ম্যালথাসের তত্ত্ব মেনে। অর্থাৎ খাদ্যের উৎপাদন অপেক্ষায় মানুষ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে বা দ্রুততার সঙ্গে। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দখলে চলে যাচ্ছে কৃষিজমি। শিল্প বিপ্লবের নামে যত্রতত্র শিল্প-কারখানা তৈরির কারণেও কমছে ফসলের খেত। জনসংখ্যা অনুপাতে বাড়ছে না খাদ্যশস্যের উৎপাদন।
মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যুদ্ধ এবং মানুষে মানুষে যুদ্ধের কারণে আজ বৈশ্বিক অর্থনীতি সংকটে। ব্যাহত হচ্ছে খাদ্যোৎপাদন। বছর চারেক আগের অর্থাৎ ২০১৯ সালের কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে? হঠাৎ করেই পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল প্রতিবেশী ভারত। দেশের বাজারেও তখন প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসে নিত্যপণ্যটির মজুদ। সরকার তাই মরিয়া হয়ে মিয়ানমার, তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড থেকে হরেক রকমের পেঁয়াজ আনা শুরু করে। যদিও ততক্ষণে খুচরা বাজারে ছড়িয়ে যায় দামের ঝাঁজ, ২০-৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ আড়াইশ টাকায় গিয়ে পৌঁছে। আমদানিতে আস্থা রাখা যে ঢের বিপদ, তা সম্প্রতি বছরগুলোতেও টের পাওয়া যাচ্ছে। আর সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী বারবার বলে আসছেন, ‘এক ইঞ্চি জায়গাও খালি ফেলে রাখা যাবে না।’ সরকারপ্রধানের এ মহৎ বাণীর সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন দায়িত্বশীলদের প্রায় সবাই। অনেকে তো আবার চেঁচিয়ে, গলা ফাটিয়েও দিয়েছেন চারদিক। পত্রিকার পাতায় পাতায় ছাপা হচ্ছে নানা প্রতিবেদন আর প্রবন্ধ-নিবন্ধ। শহুরে বিশ্লেষকরা বলে বেড়াচ্ছেন কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষকের প্রাণ। এ খাতের উন্নতি না হলে রসাতলে যাবে দেশ। উপায় বাতলিয়ে কেউ কেউ বলছেন—দেশের খাদ্য সমস্যা মেটাতে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে, ভর্তুকি দিতে হবে কৃষি উপকরণে, সেচ-সার সহজলভ্য করতে হবে। আসলে পরিকল্পনা করা হয় ভূরি ভূরি। বাস্তবায়নও হয়তো হয় অনেক কিছুই। কিন্তু কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না কখনোই। সার ও বীজ পেতে আছে রাজ্যের ভোগান্তি। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট পেরিয়ে কিনতে হয় চড়া দামে। সরকার বারবারই উৎপাদন বাড়াতে কৃষির ওপর জোর দেয়ার কথা বলছে কিন্তু এ সিন্ডিকেট তো ভাঙতে পারছে না।
সে যাই হোক, কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় কিন্তু এ দেশের। কারণ তারা যদি আর্থিকভাবে সুরক্ষিত বোধ না করে, তবে কৃষিকাজে কোনো একসময় সে উৎসাহ হারাবেই এবং কৃষিজমি ক্রমাগত ব্যবহৃত হবে অকৃষি কাজে। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম কিন্তু ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া।
কৃষকের সমস্যা হিসেবে উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং ফসলের ন্যায্যমূল্যের অভাবকে চিহ্নিত করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। এ দুইয়ের ফলে লাভ না পাওয়ায় তাদের হতাশ করছে। আর কৃষকের এ হতাশা দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকেই দুর্বল করে তোলে। বিশ্বায়ন এবং উদার অর্থনীতিও আমাদের কৃষকের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। উন্নত দেশগুলো অবশ্য তাদের কৃষককে এ সংকট থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি উন্নয়নশীল অনেক দেশও অভ্যন্তরীণ কৃষিকে জাগিয়ে রাখতে দিচ্ছে প্রণোদনা। সম্প্রতি মিসরের কৃষিবান্ধব এক উদ্যোগের কথা এখানে না আনলেই নয়। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম আমদানিকারকের একটি। চাহিদার ৫০ শতাংশই নির্ভর করতে হয় বিদেশী সরবরাহকারীর ওপর। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন রফতানিকারকরা। এতে আরব দেশটির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সরকার তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্থানীয় চাষীদের কাছ থেকেই বেশি দামে গম কিনবে। এর সুফলও মিলেছে, কৃষকের মধ্যে গম চাষের আগ্রহ বেড়েছে আগের বছরগুলোর তুলনায়। কৃষকবন্ধু প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতও তাদের কৃষককে বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। কৃষি অর্থনীতিকে একটি স্থির ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতেও কাজ করে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশটি।
দেশে চালের ৬০ ভাগ জোগানই আসে বোরো মৌসুম থেকে। কিন্তু গত বছরের মাঝামাঝি ডিজেলের দাম বৃদ্ধি আর এ বছরের শুরুতে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় গত মৌসুমের তুলনায় এবার সেচনির্ভর বোরো উৎপাদনে খরচ বেড়েছে ঢের। কৃষক দাবি করছেন, গত মৌসুমে এক বিঘা জমিতে বোরো উৎপাদনের খরচ ছিল ১৪ হাজার ৯০০ টাকা। আর এ বছর তা গিয়ে ১৯ হাজার ৪৫০ টাকায় ঠেকবে। অর্থাৎ বিঘায় খরচ বাড়ছে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। এর প্রভাবে কৃষক ও খেতমজুর—উভয়ই যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা ধরেই নেয়া যায়। কৃষকের আবার লোকসানের আশঙ্কা। তাই লক্ষ্য থাকবে খরচ কমানোর। সার, রাসায়নিক, পানির মতো উপকরণে অবশ্য বিশেষ কোনো পথ তার সামনে নেই। ফলে নিজেই বাড়াবে শ্রম। তাতে কমবে খেতমজুরের কাজ ও আয়। এর মধ্যে আবার ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় জামিতে সেচের ঘাটতি। এ অবস্থা চলমান থাকলে হোঁচট খাবে ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা। ফসল ঘরে তোলার সময় আছে ফড়িয়াদের উৎপাত।
আমাদের বিদ্যমান খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালাও গরিব প্রান্তিক কৃষকবান্ধব নয়। সরকার মূলত ধান, চাল ও গম কেনে। কিন্তু এ নিয়ে কত যে সিন্ডিকেট, কত যে টালবাহানা তা কেবল কৃষকই টের পান। সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, সারা দেশের খাদ্য কর্মকর্তাদের সে দামেই কৃষকের কাছ থেকে কেনার কথা, কিন্তু তা কি কেনা হয়? চাল আবার কৃষকের কাছ থেকে কেনা হয় না, এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন মিলমালিকরা। উপজেলা পর্যায়ে কৃষকের একটি তালিকা থাকার কথা, আছেও। তবে পাতার পর পাতা উল্টালেও গরিব প্রান্তিক চাষীদের নাম খুঁজে পাওয়া ভার! মূলত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পছন্দের লোক কিংবা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নামই তালিকার সিংহভাগজুড়ে, যাদের বেশির ভাগ আবার ব্যবসায়ী, দোকানি, ফড়িয়া, আড়তদার।
খাদ্য সংরক্ষণকে জোর দিয়ে সরকার এবারও সরাসরি ধান ও চাল সংগ্রহের অভিযানে নেমেছে। কিন্তু নানা অনিয়মের বেড়াজাল থেকে বাঁচতে কৃষক যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বণিক বার্তায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেই তা অনুমেয়। পত্রিকার ১১ নম্বর পাতায় প্রকাশিত সেই খবরে বলা হয়েছে, জয়পুরহাট জেলায় ধান সংগ্রহের অভিযানের সময় শেষ হয়ে এলেও এখন পর্যন্ত কেনা হয়েছে কেবল এক টন ধান। অথচ লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ৩২৬ টন। মূলত সরকারি গুদামে ধান দিয়ে টাকা পেতে নানা জটিলতার কথা বলছেন কৃষক। স্থানীয় কৃষক আল ফারুকের ভাষ্য, ‘আমরা কৃষক মানুষ। ফসল উৎপানের পর বাজারে নিয়ে নগদ টাকায় বিক্রি করি। অথচ খাদ্যগুদামে ধান দিতে গেলে লেবারের পাশাপাশি অফিসারকেও খুশি করতে হয়। আবার টাকা নিতে ব্যাংকে যেতে হয়। এত ঝামেলার চেয়ে বাজারই ভালো।’ চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে অবশ্য এ জটিলতা নেই। এরই মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৭৬ শতাংশই গুদামজাত হয়ে গেছে। এর কারণ মধ্যস্বত্বভোগী, সরকারকে চাল দিচ্ছে এ জেলার ১৬৪ চালকল মালিক।
রাজধানীর খুচরা বাজারে বেগুনের কেজি ৬০-৭০ টাকা, বিশেষ বিশেষ সময়ে ১০০ বা ১২০ টাকায়ও বিক্রি হয়। কিন্তু এর ছিটাফোঁটাও দরিদ্র কৃষকের ঘরে পৌঁছে না, লাভের গুড় পুরোটাই খাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী। কৃষকও অসহায়, ফসল উঠলে দ্রুতই বেচে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কখনো-সখনো মূল্য না পেয়ে খেতের সবজি গরুকেও খাওয়াতে দেখা যায়। এসব পচনশীল পণ্যের জন্য যদি কোনো সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা যেত তবে পানির দরে না বেচে কৃষক কিছুটা হলেও নিজের জোরটা দেখাতে পারত। কৃষিপণ্যের সিংহদুয়ারটিও যদি প্রতিযোগিতার জন্য খুলে দেয়া হতো, যদি ক্ষেত্রটি উন্মুক্ত হতো; তাহলেও পরিস্থিতি পাল্টে যেত হয়তো। জোগান-শৃঙ্খলের দৈর্ঘ্য কমলে যেমন ক্রেতা অপেক্ষাকৃত কম দামে পণ্য পেত, তেমনই লাভের মুখ দেখতেন কৃষকও। কিন্তু শ্রমজীবী এ মানুষগুলোকে ক্ষমতায় আসার মই হিসেবে ব্যবহার করলেও কোনো সরকারই এদের লাভের কথা ভাবেনি কখনো। ভবিষ্যতে যে ভাববে, সে আশাও ক্ষীণ। তাই বাজারের অবস্থা যেমনই থাকুক না কেন, কৃষককে বেঁচে থাকতে হবে দারিদ্র্যেই।
ওবায়দুল্লাহ সনি: সাংবাদিক