নীতি আলোচনা

স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ কোনো সুবিধা নয়, মৌলিক মানবাধিকার

স্বাস্থ্যবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি একটি সুস্পষ্ট নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এমন কোনো বিশেষ সুবিধা হওয়া উচিত নয়, যা আয়, অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এটি সহজলভ্য হওয়া উচিত।

সবার জন্য স্বাস্থ্য উদ্ভাবন এবং সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ নিয়ে আজকের এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় আপনাদের সবার সঙ্গে যোগ দিতে পারা আমার জন্য সত্যিই অত্যন্ত সম্মানের। কোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান শুধু সেখানকার হাসপাতাল কতটা অত্যাধুনিক বা প্রযুক্তি কতটা উন্নত, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। আমি সবসময় বলি, আমরা বিশ্বাস করি স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার।

অনেক মানুষ তাদের শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে যাওয়ার পরই বিশেষায়িত হাসপাতালে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় সেবা কাছাকাছি না থাকায় রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। আধুনিক টারশিয়ারি স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তবে এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

তাই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রিক হতে পারে না। আমরা প্রায়ই বলি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম—এ কথা এখনো সত্য। রোগ গুরুতর হয়ে ওঠার আগেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঝুঁকি ও রোগ শনাক্ত করতে হবে।

আমরা দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাই। আমাদের দেশের ৯০ হাজারের বেশি গ্রামে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের যেন চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে না হয়। হামে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকেরা যেন বাড়ির কাছেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পান। ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। হামের টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে কেউ টিকা থেকে বাদ না পড়ে।

হৃদরোগ আমাদের দেশে অক্ষমতা ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। উন্নত চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি জীবনযাপনে সাধারণ কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। ক্যান্সারবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরো ব্যাপক করা যেতে পারে।

ডায়াবেটিস সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান ও দক্ষতা রয়েছে। তার পরও অনেক মানুষ নিজের ডায়াবেটিস আছে, তা না জেনেই জীবনযাপন করছে। প্রতিটি স্ক্রিনিং কর্মসূচির সঙ্গে নিশ্চিত রোগনির্ণয়, পরামর্শ, চিকিৎসা, ওষুধ, পর্যবেক্ষণ ও রেফারেলের ব্যবস্থা যুক্ত থাকতে হবে।

বাংলাদেশ এখন থেকেই বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে পারে। এর মধ্যে ডিমেনশিয়া, পারকিনসনস ডিজিজ এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে এমন অন্যান্য রোগও রয়েছে।

স্বাস্থ্যবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি একটি সুস্পষ্ট নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এমন কোনো বিশেষ সুবিধা হওয়া উচিত নয়, যা আয়, অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এটি সহজলভ্য হওয়া উচিত।

এ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, মানুষের বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যাওয়া, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ ধীরে ধীরে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করা।

বিশেষ করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নারীদের জন্য সুযোগ তৈরির পাশাপাশি এ রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী কমিউনিটি পর্যায়ে স্ক্রিনিং, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যশিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং রেফারেল কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারেন।

আমাদের দেশে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে কিংবা প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মতো জটিলতায় নারীদের যথাযথ সুবিধাবিহীন যানবাহনে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়। অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়া নবজাতকদের জন্যও যথাযথ চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা নেই। রেফারেল ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যাতে রোগীরা কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে সহজে জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে যেতে পারেন। চিকিৎসার পর রোগীর তথ্য আবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের কাছে পৌঁছতে হবে, যাতে চিকিৎসার পর রোগী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়েন।

বাংলাদেশে এমন একটি জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে স্বেচ্ছায় রক্তদান থেকে শুরু করে নিরাপদে রক্ত সংগ্রহ, সংক্রামক রোগ পরীক্ষা, রক্তের বিভিন্ন উপাদান পৃথক করা, সংরক্ষণ ও পরিবহন এবং দাতা থেকে রোগী পর্যন্ত রক্তের পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণের ব্যবস্থা থাকবে। আমাদের জাতীয় পর্যায়ে প্লাজমা পরিবহন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠার দিকেও এগিয়ে যেতে হবে।

এসব প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকবে উদ্ভাবন। তবে উদ্ভাবন মানেই সবসময় ব্যয়বহুল কোনো যন্ত্র আবিষ্কার করা বা নতুন আরেকটি অ্যাপ্লিকেশন চালু করা নয়। সবচেয়ে মূল্যবান উদ্ভাবন হলো সেটিই, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীদের বাস্তব সমস্যার সমাধান করে।

এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অনেক প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে রয়েছে। আমাদের সম্মানিত গবেষক রয়েছেন, শক্তিশালী ওষুধ শিল্প রয়েছে, অভিজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন, ডিজিটাল সক্ষমতা সম্প্রসারণ হচ্ছে, কমিউনিটি পর্যায়ের সংগঠন রয়েছে এবং উদ্যমী নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাও রয়েছেন। কিন্তু প্রায় যেটা অনুপস্থিত থাকে, তা হলো তাদের মধ্যে কানেক্টিভিটি।

গবেষণার সঙ্গে যাচাইয়ের সংযোগ থাকতে পারে, যাচাইয়ের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে দায়িত্বশীল ক্রয় প্রক্রিয়ার সংযোগ থাকতে পারে। উদ্ভাবনকে অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি অংশে রোগীর প্রয়োজন ও অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু তখনই আমরা দেশের প্রতিটি নাগরিককে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারব।

গবেষক, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, ওষুধ প্রস্তুতকারক, উদ্ভাবক, পেশাজীবী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী ও কমিউনিটিগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তবে যথাযথ সুশাসনই দিকনির্দেশনা, মানদণ্ড ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে এবং সফল উদ্যোগগুলো গ্রহণ ও সম্প্রসারণ হবে, এমন আস্থা তৈরি করতে পারে। এর মধ্য দিয়েই একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্পষ্ট—মানুষ যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনে এ সংস্কারের সুফল অনুভব করতে পারে। পরবর্তী ধাপে এ উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থা, যা রোগ আগেভাগে শনাক্ত করবে, মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেবে, নিরাপদ চিকিৎসার মৌলিক ভিত্তি নিশ্চিত করবে এবং এড়ানো সম্ভব এমন আর্থিক সংকট থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেবে।

আসুন, এ উদ্ভাবনী উদ্যোগকে শুধু কী করা সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এখনই কী কী কাজ শুরু করব, সে বিষয়ে একমত হই।

ডা. জুবাইদা রহমান: ভাইস প্রেসিডেন্ট, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন

[বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এর ‘হেলথ ইনোভেশন ফর অল: এক্সপান্ডিং অ্যাকসেস টু অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ কেয়ার’ শীর্ষক প্লেনারি আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে]

আরও