ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক

‘যত গর্জে তত বর্ষে না’

নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করা হয় সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথমদিকে। তাহলে হাতে আছে আর দেড় মাসের কম সময়। এ সময়ের মধ্যে ট্রাম্প ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। নইলে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা, গর্জন—সবই বিফলে যাবে।

বিখ্যাত ও বহুল প্রচলিত একটি বাংলা প্রবাদ হলো ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’। এর আক্ষরিক অর্থ মেঘ যত জোরে গর্জন করে, ততটা বৃষ্টি দেয় না। অর্থাৎ শব্দ বা ভয় দেখানো বেশি হলেও বাস্তব কাজ বা ফল কম হয়। শুক্রবার অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার বৈঠকের ফলাফলও তাই। এ বৈঠক নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ গর্জন করেছিলেন। গরম গরম কথা ছড়িয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্কোরেজ শহরে এক সামরিক ঘাঁটিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি হয়নি। হয়নি কোনো চুক্তিও। বহুল আলোচিত বৈঠকের তাৎক্ষণিক ফলাফল এমনই। কিন্তু বৈঠকের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব তর্জন-গর্জন দেখিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথম দুই-চার মিনিটের মধ্যেই তিনি বুঝে যাবেন যুদ্ধবিরতি অর্জন সম্ভব হবে কিনা। যদি দেখেন, না, কোনো আশা নেই; তাহলে নিজেই সভা থেকে বেরিয়ে যাবেন।’ এখানেই শেষ নয়। আরো হাঁকডাক করে বলেছেন, ‘রাশিয়া যদি যুদ্ধ শেষ করতে রাজি না হয়, তবে অনেক গুরুতর পরিণতির" মুখোমুখি হবে।’ ট্রাম্পের গর্জনের ভাব এমন ছিল যে এবার আর দেরি নয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিরতি বা বন্ধ করে ছাড়বেন তিনি। নইলে একটা কিছু ঘটাবেন।

এ বৈঠক ও তার ফলাফল নিয়ে মার্কিনসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো টিপ্ননী বা ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবেদন করতে ছাড় দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কার ডটকম একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নাম করে আগ্রাসীকেই লালগালিচায় স্বাগত জানানো হলো, তাকে করতালি দেয়ার মতো আর কিছু হতে পারে না। শুক্রবার আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের শুরুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক এ কাজই করলেন। এই জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার পর এল একাধিক বন্ধুত্বপূর্ণ করমর্দন, হাতের ওপর হালকা চাপড় আর একসঙ্গে হাঁটা—এটি ঘটল আমেরিকান এফ-২২ ফাইটার জেটের সারির পাশ দিয়ে, আলাস্কার জয়েন্ট বেস এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসনে।’

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর ওয়াশিংটনে ফিরে এলে সেখানেই সমালোচনার মুখে পড়েন। কারণ তিনি আগেই হুমকি দিয়েছিলেন যে যদি পুতিন ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হন তবে কঠোর শাস্তি দেবেন, কিন্তু তিনি সেই হুমকি বাস্তবায়ন করেননি। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে লড়াই তখনো চলছিল।’

যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ানে শিরোনাম ছিল আরো ব্যঙ্গাত্মক, ‘ঠাণ্ডা পরিবেশে প্রেমের গল্প: আলাস্কায় ট্রাম্প-পুতিনের রোমান্স, জালিয়াতি করা নির্বাচনের আলোচনা আর মস্কো ভ্রমণের প্রস্তাব।’

বিলো রেইলি যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার, টেলিভিশন উপস্থাপক, সাংবাদিক ও লেখক। ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, বৈঠক থেকে কোনো ‘কংক্রিট সাফল্য’ পাওয়া যায়নি। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচিত অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। তিনি আরো মন্তব্য করেন যেন ‘সময় ট্রাম্পের পক্ষে নেই’।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম সরাসরি বৈঠক। বৈঠক শেষে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘বৈঠকে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও এখনো আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। তবে পরে এ বিষয়ে ভালো অগ্রগতির সুযোগ আছে।’ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ‘আমিও আন্তরিকভাবে চাই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হোক। তবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য এ যুদ্ধের মূল কারণগুলোও নিরসন করতে হবে।’

অল্পভাষী পুতিন যুদ্ধের কারণগুলো নিরসনের দিকে জোর দিয়েছেন। সেই কারণগুলো নিরসন করলে লাভের হিসাবে পুতিনই এগিয়ে থাকবেন। কারণ যুদ্ধ বন্ধে পুতিন তার পুরনো শর্তগুলোর পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ, দেশটির ন্যাটো জোটে যুক্ত না হওয়ার নিশ্চয়তা এবং ইউক্রেনে নতুন নির্বাচন।

এ নিয়ে রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির এক প্রতিবেদন বলছে, ‘আলাস্কায় রাশিয়া ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যকার বৈঠক সমস্যার শেষ নয়, বরং দীর্ঘযাত্রার সূচনামাত্র।’ এখানে শান্তি আলোচনা বা ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের দীর্ঘযাত্রা হিসেবে দেখা হয়েছে। এটা কতুটুকু দীর্ঘায়িত হবে তা অবশ্য অনিশ্চিত। এ অনিশ্চয়তা যদি চলমান থাকে তাহলে আপাতত যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তি ঝুলন্তই থেকে যাবে।

পুতিনের শর্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মানবেন কিনা- এ নিয়ে যথেষ্ঠ সংশয় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতিক বিশ্লেষকরা। এরইমধ্যে গতকাল সোমবার জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় বসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে স্থানীয় সময় দুপুর একটা (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টার দিকে) এই বৈঠকটি শুরু হয়। সেখানে কী সিন্ধান্ত হয়, বিশ্লেষকদের চোখ ছিল সেদিকে। গণমাধ্যমের খবর হলো, এই বৈঠকের পরিবেশ ও আলোচনা ছিল আগের তুলনায় শীতল ও ফরমাল। বৈঠকের পর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের প্রথম ১০ সেকেন্ডেই জেলেনস্কি চারবার ট্রাম্পের প্রতি ‘ধন্যবাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। জেলেনস্কি বলেন, ‘আমন্ত্রণের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। হত্যাকাণ্ড থামাতে এবং এই যুদ্ধ বন্ধে আপনার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। আর আপনার স্ত্রীকেও অনেক ধন্যবাদ।’

বৈঠকে জেলেনস্কি এবার স্যুট পরেছিলেন। আগের বৈঠকে তিনি সামরিক পোশাকে ছিলেন, বুঝিয়েছিলেন যে, তিনি আসলে যুদ্ধাক্রান্ত। কিন্তু ট্রাম্প সে পোশাকে নাখোশ হয়েছিলেন।ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পকে খুশি করতেই জেলেনস্কি এবার এমনটা করেছেন। তার প্রমাণও মিলেছে। কারণ বৈঠকে জেলেনস্কির পোশাক নিয়ে দুই নেতা হালকা রসিকতা হয়েছে।

বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি এদিন ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গেও ট্রাম্প ও জেলেনস্কি বৈঠক করেন। গুরুত্বপূর্ণ ওই বৈঠকের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টেলিফোনে কথা বলেন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে।

বৈঠকে ইউরোপীয় নেতারা যুদ্ধ বন্ধ ও ইউক্রেন তথা ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন।

বিবিসির খবর হলো, ইউরোপীয় নেতাদের সাথে বৈঠকে ট্রাম্প বলেছেন, "‘আমি জানি না এটা (যুদ্ধবিরতি) কতটা জরুরি।’"তবে ইউরোপীয় নেতারা এর বিরোধিতা করেন। কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেছেন,"‘আমি কল্পনাও করতে পারি না যে পরবর্তী বৈঠক যুদ্ধবিরতি ছাড়া হবে। তাই চলুন, এ নিয়েই কাজ করি এবং রাশিয়ার ওপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা করি।’"

অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধ বা বিরতির এখনই কোনো সিদ্ধান্ত দেখা যাচ্ছে না। তবে ‘বিহাইন্ড সিন’ কিছু হয়েছে কিনা- তাও সম্পষ্ট নয়। আপাত দৃষ্টিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা বা যুদ্ধ বিরতি ঝুলন্তই দেখা যাচ্ছে।

এ ঝুলন্ত অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ট্রাম্পের জন্য তা আবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ ট্রাম্পের উদ্যোগ থেকে বুঝানা যায় যে, তিনি একান্তভাবে চান, দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ হোক। তার আশা, রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি করাতে সক্ষম হলে তিনি এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হবেন। এরই মধ্যে ইসরায়েল, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ট্রাম্পকে মনোনয়ন দিয়ে নোবেল কমিটির কাছে চিঠি দিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও তদবির করছেন—এমন খবর ভালোই ছড়িয়েছে।

ট্রাম্পের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা দৌড়কে বাড়তি আকর্ষণ দিয়েছেন একসময়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। পুতিনের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে এক পডকাস্টে হিলারি বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেন, তবে তিনি তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করবেন। তবে শর্ত প্রযোজ্য। আর তা হলো ইউক্রেনকে যেন কোনো ভূখণ্ড রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিতে না হয়।

নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করা হয় সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথমদিকে। তাহলে হাতে আছে আর দেড় মাসের কম সময়। এ সময়ের মধ্যে ট্রাম্প ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। নইলে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা, গর্জন—সবই বিফলে যাবে।

আরও