বিশ্বব্যাপী জোরালোভাবে ডিজিটাল রূপান্তর ঘটে চলেছে। সম্ভবত চাকরি, কাজ, কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর স্বয়ংক্রিয়তার প্রভাবের চেয়ে ডিজিটাল বিপ্লবের আর কোনো একক দিক এতটা মনোযোগ পায়নি। তার জন্য অন্তত একটি খুব ভালো যুক্তি আছে। কিন্তু সম্ভবত বেশির ভাগ লোকই এটি উল্লেখ করবে না।
উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যন্ত্রের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কোনো হাতিয়ার হিসেবে যন্ত্র যা করে, মানুষ এই ধরিত্রীতে ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়ই তা করে আসছে। কিন্তু প্রথম শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে (যখন বাষ্পশক্তি ও যান্ত্রিকীকরণ বিপুলভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছিল) প্রক্রিয়াটি অত্যধিক কর্মকাণ্ডে ভারাক্রান্ত হয়ে নিঃশেষিত হয়েছিল।
সবাই এই উত্তরণকে স্বাগত জানায়নি। অনেকেই উদ্বিগ্ন ছিল যে হ্রাস পাওয়া মানবশ্রমের চাহিদা স্থায়ীভাবে উচ্চ বেকারত্ব সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি ঘটেনি; বরং এ উত্ক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী উৎপাদনশীলতা ও আয় চাহিদা চাঙ্গা করেছিল এবং এভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়িয়েছিল। সময়ে সময়ে শ্রমবাজার দক্ষতার নিরিখে অভিযোজিত হয়েছিল। আয়-শ্রান্তিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় চূড়ান্তভাবে শ্রমঘণ্টা কমে এসেছিল।
আগের অভিজ্ঞতা বলে যে এখনো মানবশ্রমের বৃদ্ধি অটোমেশনের পথ সুগম করলেও—বিশেষ করে তথ্য, নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতির লেনদেন অংশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপুলসংখ্যক কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পাদনের কারণে—বড় মাত্রায় চাকরি হারানোর শঙ্কা আবারো বাড়ছে। সর্বোপরি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রুটিন কাজের (যা সহজেই পদ্ধতিগতভাবে সন্নিবেশ করা যায়) সঙ্গে যুক্ত হোয়াইট ও ব্লু-কলার চাকরিগুলোর প্রয়োজনীয়তা খুব দ্রুতগতিতে ফুরিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে ২০০০ সাল থেকে। কেননা এসব চাকরির অনেকগুলোই আয়ের মধ্যভাগ দখল করেছে। ফলে প্রক্রিয়াটি চাকরি ও আয় মেরুকরণে ব্যাপক সহায়তা করেছিল।
উনিশ শতকের মতো অবশ্য এবারো শ্রমবাজার অভিযোজিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রথমে কর্মচ্যুত কর্মীরা তাদের বিদ্যমান দক্ষতা দিয়ে নতুন কর্মসংস্থান খুঁজতে পারেন। কিন্তু সীমিত সুযোগের মুখোমুখি হয়ে তারা শিগগিরই ইন্টারনেটভিত্তিক গিগ ইকোনমিতে খণ্ডকালীন কাজসহ নিম্ন দক্ষতা (বা সহজেই পাওয়া যায় এমন) প্রয়োজন হওয়া বিভিন্ন কাজে চাকরি খোঁজা শুরু করবেন; এমনকি এর মানে নিম্ন মজুরি-আয় মেনে নেয়া হলেও।
সময়ান্তরে বিপুলসংখ্যক কর্মী অগতানুগতিক, উচ্চবেতন দেয়া চাকরি ক্যাটাগরিতে চাহিদা থাকা দক্ষতাগুলো অর্জনে বিনিয়োগ করবে। সাধারণত এটি অধিক সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। যদিও যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশ সরকার, ব্যবসায়ী মহল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগের মাধ্যমে এরই মধ্যে প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করেছে।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট মেকানিজম সত্ত্বেও দক্ষতা উন্নয়নের প্রবেশাধিকার সাধারণত সমতামূলক থেকে এখনো অনেক দূরে। এখানে বিপুল বৈষম্য বিরাজমান। কেবল যাদের প্রচুর সময় ও আর্থিক সম্পদ আছে, তারাই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারে। তদুপরি ব্যাপকভাবে অসম একটি সমাজে অনেক কর্মী এই গ্রুপ থেকে সংগত কারণে বাদ পড়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটের বিপরীতে আমাদের সম্ভবত বৃহৎ মাত্রার স্থায়ী কর্মসংস্থানের বিষয়ে কম উদ্বিগ্ন এবং বেড়ে চলা অসমতা ও এর সামাজিক-রাজনৈতিক অভিঘাত সম্পর্কে অধিক চিন্তিত হওয়া উচিত।
সত্যি বলতে কি, প্রযুক্তিগত অভিযোজন দক্ষতা অর্জন সমস্যার ব্যাপকতা কমাতে পারে। সর্বোপরি, ব্যবহার করতে সহজ এমন ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট এবং সিস্টেম তৈরি করার উদ্ভাবনগুলোকে বাজার ত্বরান্বিত করবে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস, যা ভিজুয়াল ইন্ডিকেটর রিপ্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিয়ে মিথস্ক্রিয়া করতে আমাদের সমর্থ করে তোলে। এটি এখন এতটা সর্বব্যাপ্ত যে আমরা এটিকে অনুমোদন করেছি। অব্যাহত জটিল প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় পুনঃপ্রশিক্ষণের প্রয়োজনে এ ধরনের স্বজ্ঞামূলক অ্যাপ্রোচগুলো প্রয়োগ করা যায় এবং এভাবে ডিজিটাল বিপ্লবের বণ্টনগত প্রভাবেরও অবসান ঘটবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ওপরও এর একটা প্রভাব থাকবে। প্রায় ১০ বছর আগে পর্যন্ত অটোমেশন কাজের কোডিফিকেশনের ওপর নির্ভর করেছিল। যন্ত্রগুলো একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়ে প্রোগ্রামড করা, যা মানুষের সিদ্ধান্তগ্রহণ যুক্তি পুনরুৎপাদন করতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, যৌক্তিক ও কয়েকটি পূর্বনির্ধারিত ধাপে ফেলতে না পারা কাজের ক্ষেত্রে তাহলে কী হবে? দৃশ্যমানগত অবজেক্ট চিহ্নিত করার স্বাভাবিক ভাষার বোঝাপড়া থেকে বিপুলসংখ্যক কাজই—এমনকি সহজ কিছু কাজও—অনায়াসেই এ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এটি অটোমেশনের অভিঘাত থেকে অনেক কাজকে ‘নিরাপদ’ রেখেছে কিন্তু মেশিন লার্নিংয়ে অগ্রগতির কারণে সেই তালিকা আর খুব একটা দীর্ঘ হবে না বলে ধারণা।
মেশিন লার্নিং আবশ্যিকভাবে খুব জটিল প্যাটার্ন রিকগনিশন। বিপুল তথ্য ও ব্যাপক কম্পিউটিং পাওয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে মেশিন সেসব জিনিস করতে পারে, যা কোড করা যায় না। নীতিভিত্তিক যুক্তির বিপরীতে উদাহরণগুলো ব্যবহার করে তারা এটি করে থাকে। মেশিন লার্নিংয়ে অগ্রগতি অটোমেশনের নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত করেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রোবোটিকস, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন এবং টেকনিক্যাল মেডিকেল লিটারেচারের স্ক্যানিং। অনেক ক্ষেত্রে যেমন জেনিটিকস অ্যান্ড বায়োমেডিকেলস সায়েন্সে প্যাটার্ন রিকগনিশন—মেশিন কেবল মানুষকে প্রতিস্থাপনে সমর্থ নয়, কিছু ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা মানুষকেও ছাড়িয়ে গেছে।
যতটা মনে হয়, তার চেয়েও এটি ভালো সংবাদ। হ্যাঁ, আরো কাজ ও উপকাজ মেশিনের কাছে পুনর্বণ্টিত হবে। তবে ডিজিটাল বিপ্লবের উদ্দেশ্য ও এর শেষ বিন্দু অবশ্যই কাজের অটোমেশনের দিকে মোড় নেবে। মানুষ যা পারে না, তা যখন মেশিন করবে, সেটিই হলো অটোমেশনের বিস্তারের প্রভাব।
প্রাথমিক ধাপে এটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না হলেও বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ আছে যে কাজ সম্পর্কিত ব্যাহতকরণের এই নতুন ধরনের উত্তরণ অভিঘাত/ক্ষতি প্রথমটার চেয়ে আরো ব্যাপকভাবে আয় পরিসরে অনুভূত হবে। বৈশ্বিকভাবে আয় পরিসরের নিম্ন প্রান্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসে অগ্রগতি ব্যাহত করবে এবং চূড়ান্তভাবে শ্রমনিবিড় ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিস্থাপন করবে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে নির্ভর করা উন্নয়ন মডেলগুলোও বিচ্যুত করবে। উচ্চ প্রান্তে মেশিন লার্নিংভিত্তিক সক্ষমতাগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উচ্চ প্রান্তের পেশাগত সার্ভিসের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
অবশ্য যে বিষয়টি বাকি রয়ে গেছে তা হলো, আমরা ইকুইলিব্রিয়াম নয়, ব্যাপকভাবে জটিল ট্রানজিশন ডিল করছি। এ অবস্থায় সূচনাবিন্দু হিসেবে আমরা সমতামূলক ফল তৈরিতে কর্মী ও শ্রমবাজারের স্বাভাবিক অভিযোজন আশা করতে পারি না। ফলে পারিবারিক সম্পদে বিপুল পার্থক্য থেকে যাবে। সেজন্য নীতিনির্ধারকদের (ব্যবসা, শ্রম ও স্কুলের অংশীদারিত্বে) অবশ্যই আয় ও সম্পদবৈষম্য কমানোর পদক্ষেপগুলোর ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা ও দক্ষতাবিষয়ক প্রশিক্ষণের মতো উচ্চ গুণগত মানের সামাজিক সেবার বৃহত্তর প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের ওপর। এ ধরনের হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতিতে তাত্পর্যপূর্ণ ঝুঁকি থেকে যায় যে কাজের ডিজিটাল রূপান্তর সামাজিক সংহতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকূল পরিণাম সৃষ্টি করবে এবং অনেক মানুষকে পিছিয়ে রাখবে। [স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
মাইকেল স্পেন্স: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক, হুভার ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির