দেশকে পরাধীনতা, অপশাসনের হাত থেকে মুক্ত করে নতুন এক শাসন কাঠামো নির্ধারণেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বড় ভূমিকা রেখেছেন। এমন নজির রাখা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও প্রতিরোধের মঞ্চে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখলেও এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। গবেষণাকাজেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। এমনকি গবেষণা বরাদ্দের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায় প্রতি বছর, যা গবেষণা পরিচালনার অদক্ষতা বা অনাগ্রহকে তুলে ধরে। ফলে ঐতিহাসিক ভূমিকার জৌলুস ক্রমেই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভবিষ্যতে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে হলে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের বিকল্প নেই।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বিবেচিত হয় গবেষণা, জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবন, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং বিশ্বমানের পাঠদানের সক্ষমতা অনুযায়ী। এসব ক্ষেত্রে ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে এর অবস্থান সন্তোষজনক নয়। গবেষণা খাতে বরাদ্দ সীমিত, উপরন্তু বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় না। বহু গবেষণা কেন্দ্র কাগজে-কলমে থাকলেও কার্যকর গবেষণা কর্মকাণ্ডও সীমিত। আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, যৌথ গবেষণা, গবেষণা অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এর পেছনে বহু কারণ রয়েছে যার মধ্যে একটি হলো বিগত সময়ে এটি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শিকার হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতিই যেন এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রাধান্য পেয়েছে। এতে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকেরও বড় ঘাটতি তৈরি হয় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক দর্শন বা অর্থনৈতিক কাঠামোয় যত পার্থক্যই থাকুক না কেন, একটি জায়গায় তারা অভিন্ন নীতি নিয়েছে—শিক্ষা ও গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকারে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারভিত্তিক অর্থনীতি কিংবা চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান কিংবা মালয়েশিয়ার অগ্রযাত্রার পেছনেও পরিকল্পিত শিক্ষা, গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের কার্যকর সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও শিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অর্থনীতিবিদ রবার্ট সোলোর প্রবৃদ্ধি তত্ত্বে প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন আবার নির্ভর করে দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ওপর। উন্নয়নশীল অনেক দেশ প্রথম দিকে বিদেশী প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভর করলেও সময়ের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে তারা শুধু উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম হয়নি, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
অবশ্য গবেষণা ও দক্ষতার মান বিচারে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা একই। এর পেছনে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ঘাটতির পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণা বরাদ্দের একটি বড় অংশ বছরের পর বছর অব্যবহৃত থেকে যাওয়া পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণাবান্ধব পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানে পৌঁছতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় যখন অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব ও মেরুকরণের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষা ও গবেষণার মৌলিক লক্ষ্য অনিবার্যভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শ্রমবাজারের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কর্মমুখী দক্ষতা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞান, গণিত, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক শিক্ষায়ও গবেষণার মান উন্নয়ন জরুরি। কারণ টেকসই উন্নয়ন কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নয়, সুশাসন, নীতি প্রণয়ন ও সামাজিক উদ্ভাবনের ওপরও নির্ভরশীল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই নতুন এক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার ঐতিহাসিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে, কিন্তু ভবিষ্যতের মর্যাদা নির্ধারিত হবে গবেষণা, উদ্ভাবন, একাডেমিক উৎকর্ষ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে। সে লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন, বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার, যুগোপযোগী পাঠক্রম, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তবে এগুলো দেশের সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিশ্চিত করাটাও আবশ্যক।