শেষ পর্যন্ত দেশে আরো একটি একতরফা সাধারণ নির্বাচনই হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বেশির ভাগ পর্যবেক্ষক। তবে সেটি ২০১৪ কিংবা ২০১৮ সালের কোনো নির্বাচনের মতোই না হয়ে এ দুটি নির্বাচনের মিশেলে অন্য একটি তৃতীয় আঙ্গিক ধারণ করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে ওই দুটি নির্বাচনের প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই হয়তো কমবেশি বহাল থাকবে। আর এর অনিবার্য ফলাফল হিসেবে ক্ষমতাসীন দল টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার সরকার গঠন করে এক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড স্থাপন করবে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের কাছে অতীতের ভাষ্য অনুযায়ী যা হচ্ছে সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র (প্রথম আলো, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২)। তো, এ রকম একটি একতরফা নির্বাচনের পর দেশের রাষ্ট্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী রূপ ধারণ করতে পারে, এখানে তার একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলো।
একেবারে প্রথম কথা হলো, এ রকম একটি একতরফা নির্বাচন আয়োজনকে সম্ভব করে তুলতে সরকারি দলকে যারা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের নানা পর্যায় থেকে নানাভাবে শক্তি ও সহযোগিতা জুগিয়ে যাচ্ছে, নির্বাচনের পর তাদের প্রায় সবাই চাইবে সেসব অবদানের প্রতিদানটুকু নির্বাচনে বিজয়ীদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুদে-আসলে ও কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিতে। এখন দেখা যাক, উল্লিখিত প্রতিদান দাবিকারীদের মধ্যে কারা কারা রয়েছে বা থাকতে পারে এবং তাদের দাবিদাওয়ার আওতাধীন আকাঙ্ক্ষাগুলো কী হতে পারে। তদুপরি এসব প্রতিদান বা আকাঙ্ক্ষা পূরণে তারা কী ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারে, তা নিয়েও এখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হতে পারে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে এ ধরনের একটি অগ্রহণযোগ্য একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে যখন দলটি পুনরায় ক্ষমতায় আসবে, তখন তার বৈধতাগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বহু সুবিধাবাদী নতুন সুহৃদরাও এসব সুবিধার ভাগীদার হতে চেষ্টা করবে, তাতে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই।
তো এ সমগ্র প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভাগাভাগির উল্লিখিত দাবিদারদের তালিকা তৈরি করতে গেলে প্রথমেই বিবেচনা করতে হবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ও প্রার্থীদের যারা চাঁদা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন, তাদের কথা। এদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আছেন ব্যবসায়ীরা। তো যে ব্যবসায়ীরা অর্থ ও সমর্থন নিয়ে নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীনদের পাশে থাকবেন, নির্বাচনের পর তারা যে তাদের সে চাঁদা-বিনিয়োগের অর্থ বাড়তি মুনাফাসহ উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আর তা করতে গিয়ে তারা যখন বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটকে নিকট অতীতের চেয়েও আরো শক্তিশালী করে তুলতে প্রয়াসী হবেন, তখন বাজারে পণ্যমূল্য পরিস্থিতি যে আরো নাজুক হয়ে পড়বে, তা তো প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। একইভাবে তারা যখন আমদানি শুল্ক হ্রাস, কর রেয়াত, নগদ ভর্তুকি ইত্যাদির মতো আর্থিক সুবিধাদি দাবি করবেন, তখন সরকারের রাজস্ব তহবিলে ঘাটতি পড়বে জেনেও সেটাকে মেনে নিতে হবে এবং সে ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রকে তখন কর বসাতে হবে সাধারণ জনগণের ওপর। আর এতে করে দেশের যে ৭০ শতাংশ মানুষ এখন মোট আয়ের মাত্র ৩৩ দশমিক ৯৭ শতাংশের অংশীদার (খানা ও আয় জরিপ-২০২২, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো), তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ও জীবনযাপন অনিবার্যভাবেই আরো অধিক সংকটের মধ্যে পড়বে।
এর পরই আসে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যারা পরিশোধ করেনি, সেইসব ঋণখেলাপিদের কথা। এ ঋণখেলাপিরা নির্বাচনের আগে ঋণ পরিশোধ করেনি দলীয় পরিচয় ও সুপারিশে। নির্বাচনের পর ওই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে শুভার্থী হিসেবে পাশে থাকার প্রমাণিত অঙ্গীকার, যেটি তখন নতুন সরকারের জন্য খুবই প্রয়োজন হবে একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে বৈধতাদানের লক্ষ্যে সমর্থক গোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি বা তা বহাল রাখার স্বার্থে। আর খেলাপি ঋণ ছাড়াও ব্যাংকের পরিচালকদের মেয়াদকাল একাধিক দফায় বাড়াতে বাড়াতে শেষ পর্যন্ত ১২ বছরে নির্ধারণ, সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, ব্যাপক মাত্রার মূলধন ঘাটতি ইত্যাদি নানা কারণে ব্যাংকগুলোয় এখন এক চরম নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করছে। ধারণা করা যায় যে এ ধারায় অর্থাৎ একতরফাভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হলে সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক মালিকরা সে নৈরাজ্যকে আরো বহগুণে বাড়িয়ে তুলবেন বলেই আশঙ্কা করা চলে। আর একই দুর্বলতার কারণে বাস্তবে আদৌ কোনো স্বায়ত্তশাসন না থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষেও ওই ঋণখেলাপি ও ব্যাংক মালিকদের ব্যাপারে কঠোর হওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
একতরফা নির্বাচনের পর কেমন হবে রাজনীতিজনিত সামাজিক পরিস্থিতি? ধারণা করা যায় যে নির্বাচনে বিজয়ী দল এবং তার যুব ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা আরো অধিক উগ্র, উচ্ছৃঙ্খল ও মারমুখী হয়ে উঠবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কই শুধু বাড়বে না, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনও ক্রমে আরো সংকুচিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠবে। কারণটি সহজেই বোধগম্য—ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই তখন হয়ে ওঠবে সমাজ ও অর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। তারা সমাজের সালিশ-দরবার, বিচার-আচার ইত্যাদি সামাজিক অনুষঙ্গগুলো যেমনি নিয়ন্ত্রণ করবে, তেমনি আবার নিয়ন্ত্রণ করবে জলমহাল ও বাজারঘাটের ইজারা, দোকান ও ফুটপাতের চাঁদা, ঠিকাদারের মুনাফার অংশ, মেগা প্রকল্পের কমিশন ইত্যাদি অর্থনৈতিক বিষয়াদিও। মোট কথা, সমাজ ও অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রের যে সীমিত নিয়ন্ত্রণটুকু এখনো অবশিষ্ট আছে, তার প্রায় পুরোটাই তখন চলে যাবে বিজয়ী দলের নেতাকর্মীদের হাতে।
এরপর আসে আমলাতন্ত্রের কথা। ধারণা করা যায় যে একতরফা নির্বাচনে ২০১৪ ও ২০১৮-এর ন্যায় প্রশাসনের সদস্যরাই তা গুছিয়ে দেবেন। আর তা তারা যাতে ‘ঠিকঠাক মতো’ করেন তার জন্য এরই মধ্যে সম্ভব সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তাদের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে কাজটি প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পন্ন করে নির্বাচনের পর তারা যে আরেক দফা বাড়তি সুবিধাদি চাইবে তাতে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই। আর আমলাতন্ত্রের সেসব নতুন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে, যা সামাল দেয়া বর্তমানের নাজুক অর্থনীতির পক্ষে খুবই কঠিন হবে। একইভাবে আমলা ও সরকারের অপরাপর সুবিধাভোগীদের স্বার্থ ও সুবিধা রক্ষার প্রয়োজনেও সরকারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে। এদিকে বর্তমান সরকার তার মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধাদানের লক্ষ্যে কোনো বাছবিচার ছাড়াই যেসব উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে, নির্বাচনের পর সেসব প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য অর্থ জোগান দিতে গিয়েও সরকারকে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে।
এদিকে নির্বাচনী ইশতেহারের পুরোটা না হোক, ঘোষিত অঙ্গীকারগুলোর কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে হলেও সরকারকে বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে। তাছাড়া বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে নিজেদের দলীয় বিজয় উদযাপন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা লাভের জন্য লবিং, দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার জন্য নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও তার আওতায় সুবিধা বিতরণ ইত্যাদির পেছনেও।
মোটকথা, এ সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি হতে পারে অনেকটাই ‘দাও দাও আরো দাও’ গোছের, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক চরম সংকটের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় দেশে উচ্চবিত্ত মানুষের সঙ্গে নিম্নবিত্ত মানুষের আয় ও সম্পদের বৈষম্য এতটাই প্রকট আকার ধারণ করতে পারে যে তা ক্রমান্বয়ে ১৯৭১-পূর্ব পরিস্থিতির চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আর সে ধারাবাহিকতায় এ মুহূর্তে দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ যেখানে মোট আয়ের ৪০ দশমিক ৯২ শতাংশ দখল করে আছে, ২০৩০ সাল নাগাদ তা যদি ৬০ শতাংশেও পৌঁছে যায়, তাহলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, বরং বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে সে আশঙ্কাই অধিক। তো, স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরোবার আগেই যদি রাষ্ট্র ও সমাজের পরিস্থিতি এই হয়, তাহলে একাত্তরে বুকের রক্ত ঢেলে যারা এ দেশকে স্বাধীন করেছিল, তাদের কাছে কী জবাব দেবেন এ দেশের রাজনীতিক ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারী অন্যান্য কুশীলব? একাত্তরের শহীদ ও যুদ্ধে অংশ নেয়া অপরাপর মানুষের বড় অংশই আজ আর বেঁচে নেই বলে তাদের আত্মার অধিকারও কি বিলুপ্ত হয়ে গেছে?
আবু তাহের খান: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত